তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
সময়কাল : সন ১৮৮৬, ঘনঘোর শ্রাবণ মাস
স্থান : দিগনগর জমিদার বাড়ি
কী অসামান্য রূপবতী এই রানি! কাঠচাঁপা গাছটার দিকে আরও এক পা এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল কুসুম। চোখের পলক পড়তে চাইছে না একেবারে। তাঁর রূপের প্রশংসা অনেকবার এসেছে কানে, কিন্তু এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি আগে কখনও। কী অভিজাত নাকের বাঁক, ছোট্ট ঠোঁট, নিখুঁত চিবুক!
ভোররাত, ঠিকমতো অন্ধকার কাটেনি তখনও। ক্ষীণ নরম একধরনের বেগুনি আলো ছড়িয়েছে সবেমাত্র। ওই সামান্য আলোতেও রানির মুখের প্রান্তরেখাগুলো জ্বলছে যেন, ছটা বেরোচ্ছে একরকম। শ্বেতপাথরের মতো কঠিন একটা মুখ, থমথমে, গম্ভীর। মহিলার গা-ভরতি ভারী গহনা, জরির পাড়ওয়ালা মখমলের শাড়ি, এলোমেলো মাথাভরতিচুল কোমরছাপানো।
কিন্তু এত ভোরে রানিমা এই নির্জন পরিত্যক্ত ঘাটে একা কী করছেন! বর্ষার ভরা কালো দিঘির জল ফুলে-ফেঁপে ওঠে এসেছে সিঁড়ির আরও কিছু ধাপ ছাড়িয়ে। শেষ ধাপে বসে জলে পা ডুবিয়ে বসে আছেন উনি। সামনের দিকে একভাবে তাকিয়ে আছেন। নড়াচড়া করছেন না, অদ্ভুত নির্বিকার রহস্যময় দৃষ্টি। কেমন যেন একটা অস্বস্তি জড়িয়ে ধরে কুসুমকে, গা ছমছম করে ওঠে। ওদিকে গাছটার নীচটা বৃষ্টিতে ঝরে পড়া কাঠচাঁপায় সাদা হয়ে রয়েছে। তলার ফুলগুলো কাদায় মাখা, জলের আঘাতে কিছুটা বা দাগি। কিন্তু উপরেরগুলো বিলক্ষণ তাজা। নিষ্কলুষ ফুটফুটে ফুলগুলো হাতে ধরা বেতের সাজিতে তুলে নিতে নিঃশব্দে পা বাড়ায় কুসুম। ভিজে মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পা টিপে-টিপে এগোতে থাকে। কুসুমরা মালাকার। পারিবারিকভাবে তারা মালার কারবারি। বাড়ির মেয়েরা ফুল তোলে, মালা গাঁথে আর পুরুষরা সেগুলো নিয়ে যায় বাজারে। এই জমিদারবাড়ির সঙ্গে ওদের সমঝোতা আছে দু'পুরুষ আগে থেকেই। ওদের বাড়ির মা-বোনদের অনুমতি আছে এই বাড়ির বিস্তীর্ণ বাগানে কাকভোরে এসে ফুল তোলার। সেই ফুল দিয়ে ওরা বিশেষ এক ধরনের মোটা মালা তৈরি করে, সকালবেলায় ঝুড়ি করে এসে পৌঁছে দিয়ে যায় রাধামাধবের মন্দির দালানে। তার জন্য ওরা দাম চায়নি কোনওদিন, কিন্তু মাসের শেষে কাছারি থেকে ওদের বাড়িতে মূল্য পৌঁছে যায় যথারীতি।
যাই হোক, কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল। কুসুম ভেবেছিল সকালে আজ বুঝি আর জমিদার বাড়ির বাগানে ফুল তুলতে যাওয়া যাবে না। কিন্তু পাখি ডাকার আগেই ঘুম ভেঙে ওঠে দেখে বৃষ্টির বেগ অনেক কমে এসেছে। টিপটিপ করে যেটুকু বৃষ্টি পড়ছে, তাতে মানকচুর পাতা মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়াই যায় দিব্যি। নারকেলের কাঠি নিয়ে তিনখানা মানকচু পাতা ছাতার মতো জুড়ে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে মাথায় চাপিয়ে। টগর, রজনিগন্ধা, সাদা ফুলের ঝোপগুলো পেরিয়ে ভিতর দিকের এই কাঠচাঁপা গাছটার কাছে এসে মুখোমুখি হয় এই দৃশ্যটার। দিগন্তে আলো ফুটছে, কানে আসছে পাখপাখালির কলরব। আড়চোখে ঘাটের দিকে তাকিয়ে ফুল তুলতে-তুলতে আচমকা সচকিত হয়ে ওঠে কুসুম। রানি ওঠে দাঁড়ালেন, কেমন যেন একটা ঘোরের ভিতর হাঁটতে-হাঁটতে ওঠে এলেন সিঁড়ির ধাপগুলো ডিঙিয়ে। চোখ খোলা কিন্তু নিষ্পলক, মণিদুটো স্থির। অন্য কোনওদিকে তাকানোর নাম নেই, সোজা হেঁটে যাচ্ছেন জমিদার বাড়ির দিকে। পায়ের মল বাজছে, ঝম ঝম ঝম। ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে কুসুম। না লুকোলেও কিছু হত না, কারণ রানিমাকে দেখে মনে হচ্ছে বাহ্যজ্ঞানশূন্য।
সারাদিন ব্যাপারটা মনের মধ্যে উথালপাতাল হতে থাকে তার, কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। রাতে মাদুরের ওপর এপাশ-ওপাশ করতে-করতে ঘুম আসতে চায় না। সকালে আলো ফোটার আগে ঠিক আগের দিনের মতোই রওনা দেয় দুরুদুরু বুকে। এইদিন বৃষ্টি নেই বটে, কিন্তু আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। চেনা পথ ধরে এগিয়ে যায় সে, কাঠচাঁপা গাছটার কাছে এসে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায় ঝোপটার পাশ ঘেঁষে ঘাটটার আরও কাছে। বুকের ভিতরটা ধড়াস করে ওঠে। হাঁ, আজকেও সেই এক ছবি। রানি বসে আছেন ঠিক কালকের ভঙ্গিতে। পা-দুটো জলে ডোবানো, এলোমেলো বাদুলে হাওয়ায় উড়ছে ছাড়া চুল। একেবারে সাক্ষাৎ পাথরপ্রতিমা। চাঁপাফুলের গন্ধে দিশেহারা দশদিক, দিঘির জল ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় শিরশির করে ওঠে কুসুমের দেহ। আবার সেই এক ঘটনার পুনরাবৃত্তি। দিগন্তে আলোর রেখা জেগে উঠতেই সটান ওঠে দাঁড়ালেন রানিমা। পায়ের মল ঝমঝম করতে-করতে সিঁড়ির ধাপ ভেঙে ওঠে এসে দাঁড়ালেন ঘাটের ওপরে। ভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ ফেলতে-ফেলতে এগোতে লাগলেন নির্দিষ্ট অভিমুখে। চোখ খোলা, মুখ ফ্যাকাশে। চলার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ একবারে এক মাপের, বেলগাছের কাঁটা মাড়িয়ে চলে গেলেন ভাবলেশহীন, এভাবে কি কোনও মানুষ হেঁটে যেতে পারে!
ফুল তোলা মাথায় ওঠে কুসুমের, আঠারো-উনিশ বছরের আধপাকা মাথা কাজ করতে চায় না। বাড়ি গিয়ে সে প্রথমেই যায় জেঠিমা কমলাবালার কাছে, জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে যাতায়াত আছে তাঁর। কিছুই হয়নি, নিছক কৌতূহল এমন একটা ভান করে ওঁকে জিজ্ঞেস করে জমিদার বাড়ির রানিমা সম্পর্কে। তিনি জানান, রানিমা এমনিতে বেশ ভালোই, সকলের সঙ্গে হাসিমুখেই কথা বলেন। শান্তিপুরের খুব বড়ো ঘরের মেয়ে। জমিদারবাড়ির আত্মীয়স্বজনরা নাকি বলেন সুন্দরী বলে তাঁর নাকি বড় দেমাক, স্ত্রী-ধন নিয়ে এই ছোটো জমিদারবাবুরও নাকি খুব গর্ব। সবই তো ঠিক আছে, কিন্তু সমস্যা একটাই, ভদ্রমহিলা এখনও জমিদারবাবুকে তাঁর সন্তানের মুখ দেখাতে পারেননি। সেই নিয়ে ভারী মনঃকষ্টে ভোগেন দুজনেই। পুজো-আচ্চা হোম যজ্ঞ কত কিছুই তো করা হল, কত জায়গা থেকে এল সাধু, গুণিন, ফকির, দরবেশের দল, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হল কোথায়?
মহিলার সেই আশ্চর্য কঠিন মুখটা মনে পড়ে কুসুমের, আবার জেঠিমার এই কথাগুলো শুনে কেমন যেন কষ্টও হয়। পরের দিন ভোরের আবহাওয়া সুবিধের নয়, আকাশ ফুঁসছে গুমগুম শব্দে, চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। রীতিমতো বৃষ্টি পড়ছে তবুও কচুপাতা মাথায় দিয়ে একইভাবে রওনা দেয় একটু আগেই। অন্য কোথাও না থেমে সোজা গিয়ে পৌঁছায় সেই ঘাটে। কিন্তু আজ তো রানি বসে নেই! এইরকম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই আসেননি। দু'দণ্ড ওখানে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে সিঁড়ি ভাঙতে যাবে, সামনে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে সে। আপাদমস্তক বৃষ্টিতে ভিজে রানি দাঁড়িয়ে আছে ঘাটের ওপরে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে একঝলক যেটুকু দেখা যায়, তাতে মহিলার মুখে ভয়ানক বিরক্তি, ''কে তুই? কী করছিস এখানে?'' তীক্ষ্ন ধারালো গলার স্বরে ক্রোধ ছলকে ওঠে। ভয়ে হাত থেকে সাজি পড়ে যায় কুসুমের।
'আমি কুসুম রানিমা, রোজ ভোরে আপনাদের বাগানে ফুল তুলতে আসি।'
'ফুল তুলতে তো এখানে কেন?'
উত্তর করার শক্তি কেড়ে নিয়েছে গলার কর্কশ স্বরটা। শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে যায় ঠান্ডা স্রোত। পা নাড়ানোর সাধ্য নেই, তবুও আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। সাজিটা কোনওরকমে তুলে নিয়ে সে প্রাণপণে দৌড় লাগায় সে।
'আর কখনও যেন এদিকে না দেখি, এই ঘাটের ত্রিসীমানার মধ্যে',' পেছনের গলার আওয়াজটা বেজে উঠল মেঘের গুমরানির মতো। দৌড়তে-দৌড়তে জামগাছে ধাক্কা খাচ্ছিল প্রায়, কদমগাছটার তলায় পিছলে মুখ থুবড়ে পড়ছিল আর-একটু হলেই। বেলার দিকে রাধামাধবের মন্দিরে জমিদার কৃষ্ণমোহনের সঙ্গে পুজো দিতে এসেছিলেন রানিমা। ছড়ানো উঠোনের এককোণে বসে তখন মালা গাঁথছিল কুসুম। রানির ওপর চোখ পড়তেই নিদারুণ ভয়ে চোখ সরিয়ে নেয় সে। কিন্তু এ তো পুরো আলাদা একজন মহিলা। মুখ স্নিগ্ধতায় ভরা। ঠোঁটে প্রসন্ন হাসি। ভোরের সেই মহিলার সঙ্গে কিছুতেই এঁকে মেলাতে পারে না সে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। উনি নিশ্চয়ই ওকে চিনতে পারেননি।
সাহসে ভর করে এগিয়ে যায় কুসুম। রানির একেবারে পাশে এসে মিষ্টি হেসে হাতের মালাটা দেখিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে, 'রানিমা আপনাদের বাগানের আটরকম ফুল দিয়ে এই মালাটা আলাদা করে গেঁথেছি। আমার খুব ইচ্ছে আপনি যদি এটা নিজে হাতে রাধামাধবের গলায় পরিয়ে দেন।'
'বাঃ!' ওকে অবাক করে রানি মালাটা হাতে তুলে নেন। গর্ভগৃহের চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকে যান ভিতরে। মালা পরিয়ে দেন বিগ্রহের গলায়। বাইরে এসে কাছে ডেকে নেন কুসুমকে, ঘাড়ে হাত রেখে জানতে চান তার নাম কী, কোথায় থাকে, কী করে ইত্যাদি। সে কি সন্ধেবেলায় ওঁকে কয়েকগাছা করে জুঁইয়ের মালা দিয়ে আসতে পারবে? বেলি জুঁই তাঁর বড় প্রিয়। আপ্লুত হয়ে সম্মত হয় সে। কিন্তু এ কী! এই মহিলাই তো আজ ভোরে তাকে ঘাটে দেখে ভয়ানক বিরক্ত হয়েছিল, তাড়িয়ে দিয়েছিল ওইরকম কর্কশ গলায় মুখঝামটা দিয়ে। কিন্তু সেই গলা আর এই গলা তো এক নয়! কোথায় সেই মুখের ভাব, আর কোথায় এই মুখের! বলিহারি কৌতূহল মেয়েটার! যা হয় হবে, কথার শেষে মাথাটা রানির কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে বসে, 'আজ ভোরে দিঘির ঘাটে কচুপাতা মাথায় দেওয়া যার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল, সে কিন্তু আমিই ছিলাম।'
'ভোরে! দিঘির ঘাটে! আমি! কী সব বলছ আমার তো কিছু মাথায় ঢুকছে না!'' অবাক হয়ে তাকায় রানি।
'সে কী! আপনার মনে পড়ছে না! পরপর দু'দিন, ভোররাতে, আমি এই নিজের চোখে আপনাকে দেখলাম ঘাটের সিঁড়িতে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে। আজ সকালেই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, আপনি তো আমায় এই ঘাটের দিকে আসতে বারণ করে দিলেন।'
'অসম্ভব! হতেই পারে না, আমি তো আমাদের মহল-ঘাট ছাড়া অন্য কোনও ঘাটে যাই না, রোজ বেলা করে ঘুম থেকে ওঠি...' চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠল রানির চোখমুখ। অন্যমনস্ক হয়ে উঠলেন সহসা, জমিদারবাবু বা সহচরীদের কাউকে কিছু না বলেই সোজা হাঁটতে লাগলেন বাড়ির দিকে। পিছু ডাকার সাহস পেল না কুসুম।
সন্ধে নামার আগেই সাজিভরতি জুঁই বেলির মালা নিয়ে জমিদারবাড়িতে এসে উপস্থিত হয় সে। বারমহলে ঢুকতে বাধা পেলে দারোয়ানকে জানায়, রানিমা দেখা করতে বলেছিলেন। ভিতর থেকে অপেক্ষা করার বার্তা আসার কিছুক্ষণ পরে রানির ব্যক্তিগত পরিচারিকা এসে অন্দরমহলে নিয়ে যায় তাকে। পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসেন রানিমা। মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া, সকালের সেই হাসি নেই ঠোঁটে। কুসুমের হাত থেকে মালাগুলো নিয়ে ওকে ভিতরে নিয়ে যান উনি। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করছেন দেখে বুকের ভিতরটা ধড়াস ধড়াস করে ওঠে কুসুমের। অভয় দেন রানি, ওকে সামনের কেদারাটায় বসিয়ে বলেন, 'তুমি আমায় সকালে যে কথাটা বললে সেটা অন্য কাউকে বলেনি তো?'
'একেবারেই না রানিমা।'
'তুমি ভুল দ্যাখোনি তো?'
'হতে পারে না, আমি আপনাকে স্পষ্ট দিঘির ঘাটে...'
হাত দেখিয়ে ওকে থামান রানি, 'এত জোর দিয়ে যখন বলছ, তখন একেবারে অবিশ্বাস করি কী করে! একটা সন্দেহ বেশ কিছুদিন ধরে আমার মনেও দানা বেঁধেছে। সেই নিয়ে আমিও খুব চিন্তায় আছি। একটা ব্যাপার কিছু সপ্তাহ হল আমার নজরেও এসেছে। নজরে এসেছে তোমাদের জমিদারবাবুরও।'
'কোন ব্যাপার?'
'আমার এমনিতে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যেস। কিন্তু ঘুম ভেঙে ওঠেই লক্ষ করছি, আমার কাপড়ের তলার দিকটা ভেজা, কাদামাখা, চোরকাটা লাগা। কোনও-কোনওদিন দেখছি আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে জবজব করছে। সেদিন তো কাঁটা ফুটে ছিল পায়ে। মেঝেতে কাদা-পায়ের দাগ, বিছানা ভেজা। কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না, কেন এমনটা হচ্ছে!' বড় করুণ শোনায় রানির গলা। মুহূর্তে চোয়াল শক্ত করেন তিনি। চাপা স্বরে বলেন, 'কিন্তু একটা কথা যেন মনে থাকে, নিতান্তই অসহায় না হলে তোমাকে এসব কথা বলতাম না। ঘুণাক্ষরেও যেন পাঁচ-কান না হয়। তাহলে কিন্তু আমার চেয়ে ভয়ঙ্কর কেউ হবে না। আমি ভালোর ভালো, মন্দের যম, কথার খেলাপ হলে কিন্তু জান খোয়াতেও হতে পারে।'
'আপনি আমায় বিশ্বাস করুন...' থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে কুসুমের ঠোঁট।
সে ওঠে চলে যাচ্ছিল প্রণাম ঠুকে, রানি তাকে আটকালেন, 'আচ্ছা শোনো, একটা উপকার করবে? কাল ওইরকম কাকভোরে যদি ঘুম থেকে উঠতে পার, একবার আসবে ঘাটের কাছে?'
'কেন রানিমা?'
'লক্ষ রাখবে ঘটনাটা আবার ঘটছে কিনা।'
'ঠিক আছে রানিমা।'
আবার উদ্বেগের ছায়া পড়ে মুখে, ওঠে দাঁড়ালেন রানি, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, 'সাহেব ডাক্তারকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম, সমস্যাটা বললাম। উনি বললেন, ঘুমের মধ্যে ওঠে চলতে শুরু করা নাকি একটা রোগ। আমার কী তাই হচ্ছে? নাকি অন্য কিছু?'
'জানি না রানিমা, কিন্তু ওই সময় আপনার চোখ খোলা থাকে, দেখে মনে হয় আপনার বাইরের কোনও জ্ঞান নেই, আপনার গলাটা কেমন যেন ঘড়ঘড়ে, শুনলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।'
'কী বলছটা কী?' চিন্তাগ্রস্ত রানির কপালে ভাঁজ পড়ে, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখায় তাঁকে। জানালার কাছে চলে যান তিনি, গরাদটা ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন ভয়ার্ত চোখে। আচমকা কেঁপে ওঠে জানলাটা বন্ধ করে দেন সশব্দে, নিঃশ্বাস ফেলতে থাকেন জোরে জোরে।
'কী হল রানিমা, কিছু দেখলেন?'
'না, কিছু না, তুমি যাও। ও আমায় তিষ্ঠোতে দেবে না, বাঁচতে দেবে না, জীবন নরক করে ছাড়বে।'
'কে রানিমা?'
'না, কেউ না, কেউ না। যাও, কাল পারলে ওখানে যেয়ো। যাও, যাও। কাল পারলে ওখানে যেয়ো। যাও, এখন যাও।' সাহসটা চিরকালই একটু বেশি কুসুমের, না হলে পরিস্থিতি জানা নেই বোঝা নেই, মহিলা যেই হোন, চেনা নেই, জানা নেই, ওইভাবে কেউ ঝুঁকি নেয়! ঠিক সময় জাগার জন্য আগে-ভাগে শুয়ে পড়েছিল গত রাতে, ভোর রাতে ওঠে ঠিক জায়গায় পৌঁছে যেতে ভুল করেনি। ঝোপের আড়াল থেকে ঘাটের দিকে চোখ মেলে। আগের মতো বুকের ভিতরটা ধড়াস করে ওঠে সেই একই দৃশ্য দেখে। কিন্তু আজ রানিমার মুখটা দেখা যাচ্ছে না, কিছুটা তেরছা ভাবে বসে আছেন। গুটিগুটি পায়ে ওদিকে এগোতে থাকে কুসুম। খুব সন্তর্পণে চারটে সিঁড়ির ধাপ ভেঙে নেমে গিয়ে দাঁড়ায় ঠিক রানির পিছনে। অনেকক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে দুম করে ডেকে বসে, 'রানিমা!'
ওকে চমকে দিয়ে মুহূর্তের ভগ্নাংশে পিছন ফিরে তাকায় মুখটা। শিউরে ওঠে কুসুম! ভয়ানক আতঙ্কে পিছোতে গিয়ে সিঁড়ির ধাপে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। হৃৎপিণ্ড খামচে ধরে ভয়। এ কার মুখ! রানিমার অমন সুন্দর দেহে এ কার মুখ বসানো। ভয়াল, বীভৎস একটা মাঝবয়সি মহিলার ক্রুর মুখ! মিশকালো, ঘর্মাক্ত চামড়া। চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে, কপালের আড়াআড়ি লেপা এক খাবলা সিঁদুর। হিংস্র জন্তুর মতো গর্জন করে উঠল মুখটা, 'তোকে বলেছিলাম না, এখানে না আসতে। তবুও এসেছিস, এত দুঃসাহস। মরার সাধ হয়েছে, এই বয়সেই মরবি।'
ওঠে দাঁড়াল সম্পূর্ণ শরীরটা। দেখেই বুকের ভিতর ছলকে ওঠল রক্ত, আকাশে কড়কড় করে ডেকে উঠল মেঘ, বিদ্যুতের ঝলকানিতে মুখটা দেখে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হল কুসুমের। ওর নিকে এগিয়ে আসছে শরীরটা, মাঝখানে মাত্র দুটো সিঁড়ির ব্যবধান, সামনে মূর্তিমান বিভীষিকা। স্নায়ুগুলো বিকল হয়ে ওখানেই মূর্ছা যাচ্ছিল প্রায় কিন্তু শেষ মুহূর্তের মরিয়া চেষ্টায় ভীষণ একটা ঠেলা তুলে আনল, চকিতে শান বাঁধানো ধাপের ওপর ভর দিয়ে খানিকটা শক্তি সংগ্রহ করল, সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে কোনওরকমে মাথা তুলে ওঠে এল পাড়ের থামটার কাছে। আঁকড়ে ধরে ওঠে, চোখকান বুজে প্রাণপণে লাগাল দৌড়।
বাড়ি ফেরার পর থেকে ধুম জ্বর, ঘুমের মধ্যে ভুল বকছিল, মাঝে-মাঝে আঁতকে-আঁতকে উঠছিল দুঃস্বপ্ন দেখে, বিছানা থেকে ওঠার শক্তি ছিল না তিনদিন। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ওঠেই জেঠিমার মুখে শোনে ওদিকে জমিদার বাড়ির ভিতরের খবর। রানিমা নাকি ভীষণ অসুস্থ। তাঁকে নাকি প্রকাশ্যে ঘুমের মধ্যে চলতে দেখা গিয়েছে মহলের বারান্দা দিয়ে। জমিদারের কথামতো তাকে আপাতত রাখা হয়েছে আটকাঠ বন্ধ ঘরে। সাহেব ডাক্তার দেখতে এসেছিলেন। তাঁকে নাকি সারাদিন প্রায় ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে আফিম জাতীয় ওষুধ দিয়ে।
'সে কী? তা হলে তো আমাকে ওঁর সঙ্গে দেখা করতেই হবে,' গা ছাড়া দিয়ে ওঠে কুসুম। চোখে-মুখে জলের ছিটে দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় গায়ে চড়িয়ে সেই তক্ষুনিই সে রওনা দেয় জমিদার বাড়ির দিকে। প্রধান পরিচারিকা যূথিকা ওকে দেখতেই পাশে ডেকে নিল। রানি নাকি ওষুধের ঘোরের মধ্যে বেশ কয়েকবার কুসুমের নাম করেছে। কুসুম বলে যে করেই হোক এখনই ওকে রানির সঙ্গে একবার দেখা করিয়ে দিতেই হবে। যূথিকা জানায় সে তো বিকেলে রানিমা না জাগার আগে সম্ভব নয়, তা ছাড়া জমিদারবাবুর অনুমতি ছাড়া সে তো কিছুতেই হওয়ার নয়।
কুসুম ছোটে জমিদারের কাছে, তাঁর হাতেপায়ে ধরে কাকুতিমিনতি করে রানিমার সঙ্গে দেখা করার একটা সুযোগ চায়। রানি জেগে ওঠার পর এই মেয়েটিকে খুঁজেছিলেন, এই কথা যূথিকা জমিদারকে জানালে অবশেষে অনুমতি মেলে। বিকেলে প্রায়ান্ধকার ঘরটার দরজা খুলে যূথিকা ওকে নিয়ে যায় রানির কাছে। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে এই ক'দিনে! চোখ কোটরাগত, উজ্জ্বল ফরসা চামড়া কেমন যেন কালচে লাগছে, রক্তশূন্য পাংশুবর্ণ, দৃষ্টি ঘোলাটে। চোখের পাতা ভারী, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, যথেষ্ট কষ্ট করে বালিশ থেকে মাথা তুলে তিনি যূথিকাকে বাইরে যেতে বলেন। কুসুমকে কাছে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন সেদিনের ঘটনা। সে সব কথা সবিস্তারে জানালে বিস্ফারিত চোখে তাকান রানিমা, 'যা ভেবেছিলাম তাই।'
'কী রানিমা, কী ভেবেছিলেন?'
'সে অনেক বৃত্তান্ত, আমার পাপ তাই শাস্তি আমায় পেতেই হবে।'
জানার জন্য পীড়াপীড়ি করলে, কুসুমের উৎসুক চোখের দিকে অসহায়ভাবে তাকায় রানি। যন্ত্রণাকাতর মাথাটা বালিশে পেতে বলতে শুরু করেন, ওদের গ্রামে উদয় হয়েছিলেন এক অঘোরী তান্ত্রিক আর ভৈরবী। বছর ফিরতে না ফিরতেই তাঁরা একেবারে যাকে বলে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন জমিদারের পিতৃদেব যদুমোহনকে, বশীভূত করে ফেলেন তরুণ কৃষ্ণমোহনকেও। বিয়ের দু'বছর পরেও সন্তান না হওয়ায় রানিকে তাদের আখড়ায় নিয়ে যান নতুন জমিদার, সেখানে তাঁকে দেখেই চেঁচিয়ে ওঠেন ভৈরবী। স্বামীর সামনেই তাঁকে বাঁঝা বা বন্ধ্যা স্ত্রীলোক বলে সম্বোধন করে বিশ্রীভাবে অপমান করেন। কিছুকাল পরে ভৈরব কাশীযাত্রা করলে সেই ভৈরবী হয়ে ওঠেন জমিদারের প্রধান পরামর্শদাত্রী। জমিদারকে বারংবার মন্ত্রণা দিতে থাকেন দ্বিতীয় বিবাহ করতে, কিন্তু রানির প্রতি কৃষ্ণমোহনের প্রেম যথেষ্ট সুদৃঢ়!
সেই মহিলার আখড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করতে-করতে জমিদার শুরু করেন উদ্ভট সব তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ, শুরু করেন অপরিমিত মদ্যপান। রানিকে নিত্যনতুন যাগযজ্ঞ আচার-আচরণে বাধ্য করে অতিষ্ঠ করতে থাকেন সেই যক্ষিণী সাধিকা। নানাভাবে অত্যাচার করে নারকীয় করে তোলেন ওদের দাম্পত্যজীবন। ভৈরবীর বিচিত্র সব জড়িবুটির প্রয়োগে দিন-দিন অসুস্থ হতে থাকেন রানি। এমনকী একসময় তাঁকে বিষপ্রয়োগ করে মেরে ফেলারও চক্রান্ত করেন মহিলা। চর মারফত সেই খবর রানির কাছে এলে প্রাণের দায়ে রানিকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। জমিদারবাবুকে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বিশ্বস্ত কিছু পাইক-লেঠেলদের উৎকোচ দিয়ে নিজের কবজায় নিয়ে আসেন ভৈরবীকে এবং কৃষ্ণা-দ্বাদশীর এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে নিজে নেতৃত্ব দিয়ে সেই ভৈরবীকে খুন করান। মৃতদেহ পুঁতে দেওয়া হয় ওই পরিত্যক্ত ঘাটের আশপাশে। মরার সময় আর্তনাদ করতে করতে সে অভিসম্পাত করেছিল রানিকে। আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলেছিল, ভৈরবীর দেহ মরলেও আত্মা মরে না। ঠিক সময় সে ফিরে আসবে, আর যখন সে ফিরে আসবে তখন সেটা রানির কাছে হবে ভয়ানক এক মৃত্যুরই সমতুল্য ঘটনা। না, সে তাকে প্রাণে মারবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে করে তুলবে এক জ্যান্ত মৃতদেহ, সে দগ্ধে দগ্ধে মরবে। প্রতিদিন মরণের জন্য মাথা কুটবে কিন্তু মৃত্যু তার আসবে না।
ডুকরে কেঁদে উঠলেন রানি, কুসুমের হাতদুটো ধরে কাতরভাবে বললেন, সে যেন এসব কথা কাউকে না বলে। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তার সেইদিন আর বেশি দূরে নয়। ভৈরবীর আত্মা এবার তার প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে। এর শেষ কোথায় জানা নেই, কিন্তু প্রতিদিন তিনি অনুভব করছেন, কী যেন এক ভয়ানক দানবীয় শক্তি তাঁকে একটু একটু করে গ্রাস করছে। এইভাবে চলতে থাকলে সত্যিই জ্যান্ত মৃতদেহ হয়ে উঠতে তাঁর বেশি দেরি নেই।
'না, না রানিমা, আপনি ভালো হয়ে উঠবেন, সাহেব ডাক্তার দেখছেন... ওঁরা নাকি ধন্বন্তরি!'
'নিজের চোখে সব দেখেও এ কথা বলছ? কেউ কিছু করতে পারবে না। ও ফিরে এসেছে... আর কেউ আমায় বাঁচাতে পারবে না।' দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। যূথিকা এসে জানাল, ডাক্তার এসেছেন, ওষুধ দেওয়ার সময় হয়েছে। কুসুম উঠে পড়ে। রানিকে বিদায় জানিয়ে সে নিঃশব্দে পা বাড়ায় দরজার দিকে। হাত ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় রানি যে চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল, সে চোখ ঘন শ্রাবণ মেঘের চেয়েও বেশি আকুল। বুকটা মুচড়ে উঠেছিল কুসুমের। জমিদার বাড়ি যায় না সে আর, গিয়ে তো কোনও লাভ নেই। রানিমা নাকি এতই অসুস্থ বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। ভোর রাতের দিকে নাকি তাঁর বিকার ওঠে, তখন পালঙ্ক ছেড়ে উঠে আসুরিক শক্তিতে ধাক্কা মারতে থাকেন দরজায়। বন্ধ দরজায় অনেকক্ষণ ধরে ঘা মারতে মারতে অবশেষে মূর্ছা যান। জমিদার কৃষ্ণমোহন দিশেহারা, তিনি নাকি আরও বড় ডাক্তার আনতে চান কলকাতা থেকে।
কিন্তু তাতেই বা কী হবে! মনমরা কুসুমকে আজকাল প্রায়ই দেখা যায় কাছারিবাড়ির কাছে ঘুরঘুর করতে। জমিদারবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চায় মাঝে-মাঝে, কিন্তু দেখা করে না শেষমেশ। জমিদারবাবুকে কাছাকাছি পেলে কিছু যেন একটা বলতে চায়, কিন্তু বলে উঠতে পারে না। বিষয়টা লক্ষ করে জমিদারবাবু একাধিক দিন ওকে ডেকে বলেছেন, 'কী রে, কিছু বলবি?'
'না, না, রাজাবাবু...' মুখ দিয়ে কথা সরেনি কুসুমের।
জমিদারবাবু পিছন ফিরলে আবার কিছু বলার জন্য নিরুচ্চারে ঠোঁট খোলে, কিন্তু আবার সর্বশক্তি দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে। রানিকে কথা নিয়েছে সে, কিছুতেই মুখ খোলা যাবে না। রানির ভাবমূর্তির স্বার্থে তাকে মুখ বুজে থাকতেই হবে... হয়তো বা আজীবন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন