জিরো পয়েন্ট

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি যেই না বলেছি, 'আমার মনে হয় বেস্ট অপশন হবে ট্রেনে যাওয়াটাই। নিম্নচাপের যা হাল পুজোটা মনে হচ্ছে পুরোটাই ভাসাবে, এই পরিস্থিতিতে বাইকে উত্তর সিকিমের মতো পাহাড়ি জায়গায় যাওয়াটা কি ঠিক হবে?'

শুনে ওরা, মানে আমাদের টিমটার সবাই কৌতুকোদ্দীপক ভঙ্গিতে হো হো করে হেসে ওঠল। রাহুল বলল, 'শোন সৌমিক, আমার মনে হয় তোর পক্ষে বেস্ট অপশন হল লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা। তোকে যেতে হবে না ভাই আমার, কাকিমা বকবে। সত্যিই তো, ঠিকই বলেছিস, ভরা শরতেও বৃষ্টি-বাদলার যেরকম মেজাজ-মর্জি, এই সময় তোর মতো খোকনসোনার পক্ষে বাইকে চেপে ওই সব রাস্তায় না যাওয়াই ভালো। কিচ্ছু বলা যায় না, কখন যে কী হয়ে যায়।'

লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে আমি বললাম, 'না না, কে কী বলবে সেটা বড় কথা না। কথা হল অহেতুক রিস্ক নেওয়ার কোনও মানে আছে কি? ইস্ট-সিকিম হলে চিন্তা ছিল না। কিন্তু বাইকে চেপে নর্থ-সিকিম, নট আ ম্যাটার অফ জোক। লাচুং থেকে ইয়ুংথাং হয়ে জিরো পয়েন্ট, অলটিচুড পনেরো হাজার তিনশো ফুট। না মানে, অ্যাডভেঞ্চার খুবই ভালো কিন্তু নট অ্যাট দ্য কস্ট অফ লাইফ। কি, খুব ভুল বললাম?'

'না না, এক্কেবারে ঠিক বলেছিস, হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট।' মুখ চাপা দিয়ে বুগবুগ শব্দে হেসে ওঠল দীপ্তনু। বিশ্রী অপমানজনকভাবে আমাদের টিম লিডার শৈবাল দত্তকে বলল, 'ফর গডস সেক শৈবাল, আর যাকে নিস না নিস, এই ভিতুর ডিমটাকে প্লিজ সঙ্গে নিস না। এই জাতীয় ডিসগাস্টিং মেটোরিয়াল সঙ্গে গেলে পুরো মজাটাই মাটি। ও গেলে কিন্তু আমি যাচ্ছি না।'

শৈবালও সুর মেলাল ওদের সঙ্গে, 'সত্যি আমি ভেবে পাই না, সৌমেন কাকুর মতো ওইরকম একজন দুর্দান্ত মাউন্টেনিয়ারের ছেলে হয়ে কী করে তুই এইসব বলতে পারিস। তুই আর পালটালি না। কাম অন, ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছিস। এই সবকিছুতেই ভয় ভয় নেগেটিভ অ্যাটিচুডটা পালটা। বলতে বাধ্য হচ্ছি কাকু বেঁচে থাকলে তোর কথাবার্তা শুনে ভয়ানক অপমানিত বোধ করত।'

ভেতরটা মুচড়ে উঠল আমার। শাম্বদের বাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভেতরে ভীষণ একটা ধিক্কার জেগে ওঠছিল। ওরা কেউ জানে না আমি কেন এইরকম, মা আমাকে কেনই বা ছোটবেলা থেকে এইরকম ধাঁচে তৈরি করেছে। মা হয়তো ভয় পেয়েছিল। আমার মধ্যে বাবার সেই দুর্দমনীয় স্বভাব, বিপদ নিয়ে খেলা, জীবন তুচ্ছ করে মারাত্মক সব অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়ার নেশা কোনোভাবেই যাতে দানা না বাঁধতে পারে সেই চেষ্টাই চালিয়ে গেছে প্রাণপণে।

আমি তখন সবে ক্লাস ফাইভ। বাবা সেবার সিকিমের দিক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে গিয়েছিল, শৃঙ্গ জয় করে ফেরার পথে আচমকা তুষারঝড়ের মুখে পড়ে ওরা। পাহাড়ের গা ভেঙে নেমে আসা ভয়ানক হিমানী সম্প্রপাতে তলিয়ে গিয়েছিল সেই দলটার সবাই, স্বরূপ কাকু আর দুজনের মৃতদেহ ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আকাশ ভেঙে পড়েছিল আমাদের দুজনের মাথায়, সেই ধাক্কা সামলে ওঠতে পারিনি আজও।

যাই হোক, সেদিন সেই চাপা পড়ে থাকা আঘাতটায় হাত পড়ায় হঠাৎ কেমন যেন মাথা ঘুরে গিয়েছিল। সত্যিই কি আমার মতো ভিতু ছেলে বাবার মতো বেপরোয়া অ্যাডভেঞ্চারারের সুনামের পক্ষে কলঙ্ক? জেদ চেপে গেল আমার। নাঃ কথায় না, কাজে এর জবাব দিতে হবে। বাইক চালানোর ব্যাপারে আমি কারও চেয়ে কম যাই না, তাই পারতেই হবে, আমায় পারতেই হবে। বাবা বলত সবটাই মনের খেলা, আসল চ্যালেঞ্জটা হল নিজের মনের ভয়টাকে জয় করা। দেওয়ালে বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে মুহূর্তে ঠিক করে ফেললাম, যা হয় হবে, আমি ওদের সঙ্গে যাব। আমায় যেতেই হবে, দেখিয়ে দিতে হবে মুখে যাই বলি না কেন, সাহস জিনিসটা আসলে আমার রক্তে রয়েছে।

বহু কষ্টে রাজি করলাম মা-কে। পরের দিনই কলেজে গিয়ে আমাদের বন্ধুদের গ্রুপটার সবাইকে ডেকে নিয়ে বললাম আমি ওদের সঙ্গে যাচ্ছি, কেউ না নিয়ে যেতে চাইলেও যাচ্ছি, দুনিয়া রসাতলে গেলেও যাচ্ছি। আমার বডি ল্যাঙ্গোয়েজে বদলটা নিশ্চয়ই ওদের চোখ এড়ায়নি, তাই হয়তো ওরা না করতে পারল না। ওই গাছতলায় বসে রোড ম্যাপ এঁকে ফাইনাল প্ল্যানিং ছকে ফেলা হল, ঠিক হল যার যার বাইকে সামনের শনিবারই আমরা রওনা দিচ্ছি সকাল সকাল।

সত্যিই বন্ধুরা মিলে হাই-পিকআপের বাইকে করে এইভাবে লংরুটে বেরিয়ে পড়ার আনন্দের কোনও তুলনাই হয় না। আকাশ মেঘলা, হু-হু করে হাওয়া দিচ্ছে চারদিক থেকে। এর মধ্যে মসৃণ পিচের হাইরোডের ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে এগোতে লাগল আমাদের ছ'জনের পাঁচটা বাইক। ফাঁকা রাস্তা পেলেই একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হামেশাই চলতে লাগল ঘণ্টায় নব্বই-একশো কিলোমিটার স্পিডে। আহা, এ উল্লাস কিছুতেই কথায় বলে বোঝানো যায় না!

শিলিগুড়ি অবধি এতটা রাস্তা পেরিয়ে এসেছি টেরই পাইনি। সেখান থেকে সেবক হয়ে গ্যাংটক, এমনকী মংগন অবধিও রাস্তা যথেষ্ট ভালো। ওখানে ফুল-ট্যাঙ্কি পেট্রল ভরে আমরা রওনা দিলাম লাচেনের দিকে। ওখান থেকে গুরুদংমার লেকের দিকে যেতে চাইছিল বেশিরভাগ, কিন্তু কিছুতেই পারমিট মিলল না। লোকাল থানা জানিয়ে দিল ওয়েদার ভালো না, ওদিকে যাওয়ার রুট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে আছে। অগত্যা ঠিক হল আমরা লাচুং হয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে যাব। রাতটা লাচুং-এ কাটিয়ে সকাল সকাল রওনা দেব উত্তর সিকিমের ওই শেষ পয়েন্টের উদ্দেশে।

সকালে আকাশ অংশত মেঘলা থাকায় একটু দোনোমনো ছিল, কিন্তু আবহাওয়া তেমন খারাপ না যে রওনা দেওয়া যাবে না। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে হেলতে-দুলতে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেল। দূরত্ব ভয়ানক বেশি তো কিছু না, হাতে সারাটা দিন পড়ে আছে, তাই দেরি নিয়ে তেমন চিন্তিত ছিলাম না আমরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলো পরিষ্কার হল, ঝলমলিয়ে উঠল চারদিক আর কুঁছ পরোয়া নেহি মনোভাব নিয়ে বাইকে স্টার্ট মেরে আমরা হোটেলের সামনেটা থেকে জার্নি শুরু করলাম হইহই করে। রাস্তা বলাই বাহুল্য দুর্গম, জোরে শোঁ শোঁ করে হাওয়া দিচ্ছে, মাথা থেকে পা সমস্তটাই ভারী আবরণে ঢাকা, তবু ছুঁচের মতো গায়ে এসে ফুটছে হিমের ছোঁয়া, কিন্তু উত্তেজনায় টগবগ করে ফোটা রক্তের তাপে কিছুই মালুম পড়ছে না তেমন।

যে যাই বলুক সমতলে বাইক চালানো আর এইরকম পাহাড়ি বিপজ্জনক রাস্তায় চালানো তো আর এক জিনিস না। কিছুক্ষণ আগে এদিকটায় বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বেশ খারাপ। আগে হয়তো রাস্তা ভালোই ছিল কিন্তু শেষবারের মারাত্মক ভূমিকম্পে সব কেমন ভেঙেচুরে গিয়েছে। তার মধ্যে মাঝেমধ্যেই আড়াআড়িভাবে বেশ কিছু ছোট-বড় ঝোরা অতিক্রম করে এগোতে হচ্ছে। চারপাশের আশ্চর্য সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ ওইসব অসুবিধের দিকগুলো থেকে মন তুলে নিলেও আমার মতো অনভ্যস্ত রাইডারের পক্ষে রাস্তাটা বেশ সমস্যাসংকুল তো বটেই। যতই বীরত্ব দেখিয়ে বাকিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোরে গাড়ি টানি না কেন, অস্বীকার করে তো লাভ নেই, আমার হাত বেশ কাঁপছিল। মাঝে মাঝেই চাকা আটকে যাচ্ছিল নুড়ি পাথরগুলোর মধ্যে।

ইয়ুংথাঙে এখন বরফ নেই, রডোডেনড্রনেরও সময় না এটা, তাই ওদিকটায় বেশিক্ষণ না থেকে আবার সোজা এগোতে লাগলাম জিরো পয়েন্টের দিকেই। শৈবাল, দীপ্তনু, রাহুল, শাম্ব, অঙ্কুররা এগিয়ে যাচ্ছে অনেকটা করে, কিন্তু আমার চোখ বারবার আটকে যাচ্ছিল দু'ধারের প্রকৃতির গায়ে গায়ে। আশপাশে কোনও গাছগাছালি নেই, তবু মনে হচ্ছে সত্যিই স্বর্গ বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে এইসব জায়গাই। বারবার পিছিয়ে পড়ছিলাম আর বাবার কথা মনে পড়ছিল। লাচুং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়োর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দু'চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল জল। বাবার শেষ নিশ্বাস ওই পাহাড়ের গায়েই কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল চিরকালের মতো। এইসব তীক্ষ্ন হাওয়ার ফলাগুলো কি ওইদিক থেকে ছুটে এসে আমার মাথার হেলমেট, গায়ের মোটা জ্যাকেট থার্মোকট ফুঁড়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে আশ্লেষে!

জিরো পয়েন্টে পৌঁছে মনে হল আমি যেন পৃথিবীর শেষ সীমায় এসে দাঁড়িয়েছি। বাকিরা সবাই আনন্দে ছুটোছুটি করছিল, নানারকম পোজে দাঁড়িয়ে ফটো তুলছিল। আমিও আত্মহারা। যেভাবেই হোক, আমার মতো ভিতু আর শেকি ছেলের পক্ষে এতটা রাস্তা নিজে বাইক চালিয়ে এসে এইরকম একটা পয়েন্টে দাঁড়ানো তো আর মুখের কথা না। সবই ঠিক ছিল, কিন্তু মাঝপথ থেকে লক্ষ করছিলাম আলো কমে আসছে, বিশেষ করে শেষ আধঘণ্টায় তো ভিজিবিলিটি লেভেল নেমে এল দ্রুত। ঘড়িতে এমনিতে দুপুরবেলা, কিন্তু মনে হল যেন শেষ বিকেল। এখানে বেশ কয়েকজন ইন্ডিয়ান আর্মির সঙ্গে দেখা হল, ওরা ফিরে যেতে বলছিল। আমরা কাঁচুমাচু, পীড়াপীড়ি করতে বলল জিরো পয়েন্টে অল্প কিছুক্ষণ কাটিয়েই নীচে নেমে আসতে। ওয়েদার বিশেষ ভালো ঠেকছে না, তা ছাড়া সেদিন ওখানে আমরা ছাড়া আর অন্য কোনও টুরিস্টও ছিল না আশপাশে।

কিন্তু জায়গাটা এমনই যে অল্পতে সাধ মেটার কথা না। এতই মশগুল ছিলাম যে খেয়ালও করিনি বিশাল একটা মেঘ নেমে আসছে ধীরে ধীরে। চারদিক থমথমে, প্রবল বেগে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, মুহূর্তে চারদিক অন্ধকার হয়ে এল। এখানকার ওয়েদার ভীষণরকম আনপ্রেডিক্টেবল কে না জানে! কিন্তু কয়েক মিনিট কাটতে না কাটতেই নিমেষে মেঘটা নেমে এসে ভর দুপুরবেলায় সব দিক এইরকম ঘুটঘুটে অন্ধকার করে দেবে কে জানত! আমরা একে অপরের গলা শুনতে পাচ্ছি কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পাহাড়ি এলাকা সম্বন্ধে আমাদের দলের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ রাহুল চেঁচিয়ে বলল, 'যে যার জায়গায় চুপচাপ বসে থাক, এই মেঘ না সরলে এখান থেকে যাওয়া যাবে না।'

মেঘটা সরতে পাক্কা পঞ্চাশ মিনিট সময় নিয়ে নিল। তারপর আবার সব আগের মতো। কিন্তু আলোর অবস্থা মোটেও ভালো না। আমরা নেমে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আবহাওয়ার যা ভাবগতিক তাতে ফেরার পথে আর কোথাও দাঁড়ানো যাবে না, ভালোয় ভালোয় হোটেলে ফিরতে পারলে বাঁচা যায়। ফেরার রাস্তায় মিনিট কুড়ির মধ্যে আকাশ কালো করে হঠাৎ নামল বৃষ্টি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজা ছাড়া উপায় নেই। তুষারপাতের ঠান্ডা একরকম, কিন্তু এইরকম জলীয় কনকনে হাওয়ার ঠান্ডা আর-একরকম। হাড়ে এসে লাগছে হাওয়া, আগে থেকেই কিছুটা ঠান্ডা লেগেই ছিল, তার ওপর এইরকম একটা ফাঁক জায়গায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে কেমন যেন একরকম জ্বর-জ্বর একটা ভাব ফিল করলাম।

রাহুল বলল, দাঁড়ালে চলবে না, এর মধ্যেই এগোতে হবে। অবস্থা বিশেষ সুবিধের ঠেকছে না, যতটা এগিয়ে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। জোরে চালাতে লাগল সবাই, কিন্তু আমার হাত-পা জমে গেছে, অত জোরে চালাতে পারছি না। আবার পিছিয়ে পড়াটা ডিসক্রেডিট, ওরা হাসবে, হোটেলে পৌঁছে হাসাহাসি করবে, আবার মিল্ক টুথ কাওয়ার্ড বলে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করবে। প্রাণপণে ছোটাতে লাগলাম চাকা, কিন্তু আমার হাত কাঁপছে, আসার সময় এতটা আনস্টেডি ছিলাম না, কিন্তু যাওয়ার সময় আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করছি বেশ। সামনের ঝোরাটা আসার সময় এইরকম ছিল না। এখন সেটা আড়েবহরে অনেকটা বড় মনে হচ্ছে, সশব্দে জল নেমে আসছে যথেষ্ট জোরে।

ওটার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় বাকিরা এগিয়ে গেলেও আমার বাইকের চাকা আবার আটকে গেল। কোনোরকমে গায়ের জোরে ঠেলেঠুলে পেরিয়ে এলাম বটে, কিন্তু বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়লাম। অতএব আবার পাল্লা দিয়ে ছুটতে হবে। বেরোনোর সময় মা পই পই করে বলে দিয়েছিল, পাহাড়ি রাস্তায় যাচ্ছ, আর যা করো করো কোনোরকম বাহাদুরি দেখাতে যেও না। সেই কথা কানে রেখে সাবধানেই এগোতে লাগলাম। পিছিয়ে পড়লে পড়ব, রাস্তা তো একটাই, আগে হোক বা পরে ঠিক পৌঁছে যাব।

তবে বাকিদের কারও মাথা চোখে না পড়ায় টেনশনটা গেড়ে বসল। বিশাল এই পাথুরে উপত্যকায় আমি একা ভাবতেই মাথাটা চিলচিল করে ওঠল, রক্তচাপ বেড়ে গেল দ্বিগুণ। দিশেহারা হয়ে জোরে সামনে ছোটালাম গাড়ি, দুশো কুড়ি সিসি হাইস্পিড ক্রুসার বাইক, অ্যাক্সেলেটরে চাপ দিতেই গাঁক গাঁক করে এগোতে লাগল। সামনের ঝোরার জলধারাটি সরু, কিন্তু হড়পা বান মতো কিছু একটা হয়ে যাওয়ার পর বিছিয়ে পড়ে থাকা ছোট ছোট নুড়ি পাথরগুলো অনেকটা এলাকা জুড়ে আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে মাটির সঙ্গে মিশে।

ওর ওপর দিয়ে একইরকম জোরে এগোতে গিয়ে যে চোখের পলকে এইরকম বিশ্রী একটা কাণ্ড ঘটে যাবে ভাবতেই পারিনি। ভিজে নুড়ি-পাথরের বিছানার ওপর দিয়ে দুটো চাকাই স্কিড করে গিয়ে বিপজ্জনক ভাবে কাত হয়ে গেল বাইক। বাঁ-পা দিয়ে ভার সামাল দিতে গিয়ে যেই ভর রেখেছি নুড়িগুলোর ওপর, পা পিছলে ওইরকম ভারী গাড়ি নিয়ে পড়লাম চিতিয়ে। চলন্ত গাড়ির গতির সঙ্গে সাত-আট ফুট ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে শরীরটা গিয়ে ধাক্কা মারল একটা বিশাল পাথরের স্তূপে আর বাইকটা ছিটকে ওটা টপকে ওপারে গিয়ে পড়ে গোঙাতে লাগল জখম জন্তুর মতো। হাঁটুর মাংস থেঁতলে গেছে আর কলার বোনটা গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে প্রচণ্ড জোরে। তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসে গলা চিরে, যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি এপাশ-ওপাশ। উঠতে পারছি না, বন্ধুদের নাম ধরে চেঁচাতে থাকি প্রাণপণে, কিন্তু কোথায় কে?

পা'টা মচকেছে তো বটেই, হাঁটুতে চোট গুরুতর, কিন্তু সবচেয়ে ব্যথা করছে কলার বোনটায়। ওটা মনে হচ্ছে ভেঙেছে বা চিড় ধরেছে, না হলে ব্যথা এমনভাবে বিষের মতো ফিনকি দিয়ে ওঠত না। যন্ত্রণায় চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছে আর আমার ক্ষমতার শেষবিন্দু অবধি গিয়ে চিৎকার করছি, 'রাহুল, দীপ্তনু, শাম্ব, শৈবাল, অঙ্কুর...।' কিন্তু এই বিশাল উপত্যকায় ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে আমারই কানে কিন্তু বন্ধুদের কারও দেখা নেই। অসহায় হয়ে তাকালাম চারদিকে, হামাগুড়ি দিয়ে বুকে ভর দিয়ে এগোনোর চেষ্টা করলাম বাইকের দিকে। কিছুদূর এগিয়ে আর পারলাম না। আশপাশে কোনও মিলিটারি বা টুরিস্ট কাউকেই চোখে পড়ছে না। এখানে ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে না, বৃথাই সেলফোনটা বার করা।

পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছি, মাঝে মাঝে বুকে অনেকটা করে হাওয়া পুরে নিয়ে চিৎকার করছি, পনেরো মিনিট কেটে গেছে কেউ আসেনি। আরও মিনিটকয়েক বাদে বাইকের শব্দ কানে এল। দেখি আমাদের গ্রুপের দুজন এদিকে আসছে। গলা ছেড়ে আবার চেঁচিয়ে উঠলাম। 'এ কী, কী হয়েছে, কী করে হল?' অঙ্কুর আর শাম্ব ছুটে এল ওদের বাইক স্ট্যান্ড করিয়ে। বাকিরাও এসে পৌঁছাল কিছুক্ষণের মধ্যে। বগলের তলা দিয়ে হাত পুরে কোনওরকমে আমায় দাঁড় করাল ঠিকই, কিন্তু বাঁ-হাঁটুর কাছের আঘাতটা এমনই যে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হল না বেশিক্ষণ। এই অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, পায়ের ভেতরে যেরকম ব্লিডিং আর কলার বোনের যা অবস্থা, তাতে গাড়ির পেছনে বসেও যেতে পারব না মনে হচ্ছে।

ওদিকে ওরা আমার বাইকটাকে তুলে স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখে কিছুতেই স্টার্ট হচ্ছে না। হেডলাইট তো ভেঙেইছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা হল গাড়ির ফুয়েল ওভারফ্লো হয়ে যাওয়ায় আশু স্টার্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তবু বারবার কিক করে করে স্টার্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে শৈবাল। বৃথা চেষ্টা, হতাশ চোখে একে অপরের দিকে তাকাই আমরা। গাড়িটাকে তো এখানে ফেলে রেখে যাওয়া যায় না, আবার আমার ফার্স্ট এইডটাও খুব জরুরি।

ব্যথায় মুচড়ে উঠছি পাথরে হেলান দিয়ে শুয়ে, দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক করছে বন্ধুরা। আচমকা শূন্যে হাত তুলে দূরে কারও উদ্দেশে চিৎকার করে উঠল রাহুল, 'ভাইসাব ভাইসাব, ইধার আয়েঙ্গে থোড়া...।' বেশ খানিকটা দূরের বাঁকটার ওপার থেকে একটা মাঝবয়সি লোককে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল পায়ে হেঁটেই। না, মিলিটারি ইউনিফর্ম পরা কেউ না, কানঢাকা টুপি, স্থানীয় ভারী পোশাক পরা ভুটিয়াদের মতো চেহারার একটা লোক। আমাকে মাটিতে পড়ে এইভাবে কাতরাতে দেখে লোকটা শেষ কিছুটা ছুটে এল প্রায়, 'কেয়া হুয়া, অ্যাক্সিডেন্ট...?' রাহুল ঘাড় নেড়ে বাইকটাকে দেখিয়ে বলল, 'আউর ওহ দেখিয়ে, ওহ বাইক গির যানে কে বাদ স্টার্ট নেহি হো রহা হ্যায়, কুছ কিয়া যা সকতা হ্যায়?'

'জারা দেখে তো সহি।' মিনিট পাঁচেক গাড়িটার কারবুরেটার ফুয়েলপাইপ নিয়ে কী সব কেরামতি করতে করতে দু-তিনবার কিক করে আশ্চর্যভাবে স্টার্ট করে ফেলল আমার বাইক। তারপর আমার দিকে এগিয়ে এসে একমুখ হেসে জিজ্ঞেস করল ডান হাত দিয়ে ওকে পিছন দিকে থেকে আঁকড়ে ধরে বাইকের পিছনে বসতে পারব কি না, তাহলে ও আমাকে পিছনে বসিয়ে বাইক চালিয়ে হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। আমি তো এককথায় রাজি, যত কষ্টই হোক আমাকে পারতেই হবে। বন্ধুরা কোলপাঁজা করে তুলে আমাকে বসিয়ে দিল ব্যাক-সিটে আর লোকটা চালাতে শুরু করল মসৃণ গতিতে। গ্রুপের বাকিদের এগিয়ে যেতে বলে আন্তরিক সুরে বলে ওর ওপর ভরসা রাখতে, ওদের বন্ধুকে একশোভাগ নিরাপদভাবে লাচুং-এর হোটেল অবধি পৌঁছে দেওয়ার জিম্মেদারি এখন তার।

একজন আহত লোককে পিছনে নিয়ে এইরকম এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে যে এত যত্ন করে চালানো যায় ভাবতেই পারছিলাম না। লোকটা আমি কতবার পাহাড়ে এসেছি, আমার নাম, কোথায় বাড়ি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতে করতে আমার বাবা সৌমেন চৌধুরী শুনে চমকে ওঠে বাইকের গতিকমিয়ে দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে হিন্দিতে বলল, 'তাই বলি, মুখটা এইরকম চেনা চেনা কেন লাগছে!' খুশিতে চকচক করে উঠল মুখ, আবার আগের গতিতে ফিরে লোকটা জানাল ওর নাম ছাঙ্গু শেরপা, একসময় প্রফেশনালি শেরপার কাজ অনেক করেছে, এখন বয়স হওয়ার পর আর্মি ক্যাম্পের হেল্পার হিসেবে কাজ করে। বলল বেশ কয়েকবার বাবাদের সঙ্গে মাউন্টেনিয়ারিং-এ গেছে, বাবার সঙ্গে খুব দোস্তি ছিল, উনি নাকি ওদের গ্রামেও একবার গিয়েছিলেন। বলল, 'ঘর পৌঁছনোকে বাদ সৌমেনসাব কো বোলনা, ছাঙ্গুকে সাথ মোলাকাত হুয়ে থে। সাব ক্যায়সে হ্যায়, তবিয়ত ঠিকঠাক হ্যায় ইয়া নেহি?'

বাবা আর নেই, কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে তুষার ধসে ওঁর মৃত্যুর কথা শুনে যেন কেঁপে উঠল লোকটার শরীর। লাচুং-এ আমাকে একটা হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত একটা কথাও বলল না। ওখানকার ডাক্তার এক্সরে করিয়ে জানালেন হাড় ভাঙেনি বটে কিন্তু চিড় আছে কলার বোনে। ক্ষত জায়গাগুলোও ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দেওয়ার পর লোকটা আমাকে হোটেল অবধি পৌঁছে দিয়ে গেল। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করার কোনও মানে হয় না, হাত ধরে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানালাম ওকে, প্রণাম করলাম। হোটেলের সামনে ওর সঙ্গে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গ্রুপ ফটো তুললাম। চলে যাওয়ার আগে পিতৃপ্রতিম মানুষটি আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন, 'জিতে রহো বেটা, ভগবান তুমকো শ'সাল কি উমর দে। ভাবিজি কো হামারি নমস্কার দেনা।'

একটা দিন রেস্ট নিয়ে বাড়ি ফিরলাম শৈবালের পিছনে চেপে। আমাকে এইরকম ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় দেখে মায়ের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। অভয় দিয়ে বললাম, 'একদম ঘাবড়িও না মা, আমি একদম ঠিক আছি। গিয়েছিলাম ভয়কে জয় করতে, জিতে ফিরেছি।' আমার গলায় আত্মবিশ্বাসের সুর শুনে মায়ের চোখে জল।

রাতের খাওয়া সেরে ডিভানে শুয়ে মাকে বলছিলাম পাহাড়ি রাস্তায় আমাদের সফরের গল্প। মোবাইলে যেসব ভিডিও তুলেছি সেই সব ছবি দেখাচ্ছিলাম। জিরো পয়েন্ট থেকে ফেরার সময় আমার অ্যাক্সিডেন্টের কথা শোনানোর পর ছাঙ্গু শেরপার আমায় উদ্ধার করার গল্প বলছিলাম, মা কেমন যেন কেঁপে উঠল। 'কী নাম বললি, লোকটার নাম কী বললি?' নামটা আরও একবার পরিষ্কার করে উচ্চারণ করাতে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল মা। 'কী বলছিস, এ কী করে সম্ভব...?'

'কেন, সম্ভব না কেন?' জিজ্ঞাসু চোখে তাকাই আমি।

'দেখি, লোকটার কোনও ছবি আছে, দেখা দেখি...।'

সেলফোনের গ্যালারি ঘেঁটে আমাদের সেই গ্রুপ ফটোটা মার চোখের সামনে মেলে ধরতে আপাদমস্তক থরথরিয়ে ওঠে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল মা। 'এ কী! এ তো সেই লোক! এক কী করে সম্ভব, এ তো অসম্ভব!'

'মানে, কী বলতে চাইছ?'

'এ তো সেই ছাঙ্গু শেরপা, এই লোকটাই তো ছিল সেবার তোদের বাবার টিমে! তোর বাবার সঙ্গে এরও তুষার সমাধি হয়েছিল! সেবারের সেই অ্যাভালাঞ্চে যাদের যাদের বডি পাওয়া যায়নি, তাদের সবার রেকর্ড আমার কাছে আছে। সরকার থেকে আমার কাছে সে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে এর নামটা ছিল চার নম্বরে। তোর বাবার মুখেও এই লোকটার কথা শুনেছি।'

'ধুস, তাই আবার হয় নাকি? জলজ্যান্ত লোকটাকে আঁকড়ে ধরে আমি অতখানি রাস্তা এসেছি! সেই লোক ওই নামের আরেকজন হবে নির্ঘাত...!'

'নাঃ, আমি একশোভাগ নিশ্চিত, এই লোক সেই লোকই। নাম এক হতেই পারে কিন্তু চেহারা তো আর এক হতে পারে না। এই লোক সেই লোকই...।'

'না না, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। একই চেহারা তার প্রমাণ কী? কীসের ভিত্তিতে এত জোর দিয়ে বলছ?'

'বলছি, কারণ তোর বাবা চলে যাওয়ার পর মাউন্টেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন থেকে ওদের টিমের একটা গ্রুপ ফটো আমার কাছে পাঠানো হয়েছিল। কাঞ্চনজঙ্ঘার একটা বেস ক্যাম্পে তোলা ছবি, এখনও আমার ফাইলে রাখা আছে!'

'সে কী, আমায় কখনও দেখাওনি তো?'

'দেখাইনি, কারণ ছোটবেলা থেকে ওই সব প্রসঙ্গ তোর সামনে বড় একটা তুলতে চাইনি। কিন্তু এখন তো আর না দেখালেই নয়...।'

লোহার আলমারির লকারের ভিতর থেকে মা একটা পুরোনো দড়ি বাঁধা ফাইল বার করে বিছানার ওপর রাখল। সেটার দু-পাল্লা খুলে বার করে আনল ব্রাউন পেপারের একটা খাম। তার ভেতরের অন্ধকারে হাত পুরে বার করে আনল একটা কালার প্রিন্টের বেশ বড় ছবি, আমার চোখের সামনে মেলে ধরল।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। বাবার পাশে স্বরূপ কাকু আর তার পাশেই সেই লোকটা। অবিকল সেই লোকটাই। বিড়বিড় করে উঠলাম নিজের অজান্তেই, 'হ্যাঁ এই ঠিকানাটাই তো বলেছিল লোকটা, এই একই গ্রাম, একই ল্যান্ডমার্ক...!' মায়ের মুখ থমথম করছে, এবার শিরদাঁড়া বরাবর একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল আমার।

অধ্যায় ১৫ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%