মতি নন্দী
দু’দিন কামাই করে কমল অফিসে এল। রণেন দাসকে চেয়ারে দেখতে পেল না। খাটো চেহারার ঘোষদা অর্থাৎ বিপুল ঘোষকে অবশ্য প্রতিদিনের মত কাঁটায়-কাঁটায় দশটায় চেয়ারে বসে কাগজে লাল কালিতে ‘শ্রীশ্রীদুর্গা সহায়’ লিখতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে চারশো লোকের বিরাট পাঁচতলা অফিস বাড়িটা হট্টগোলে মুখর। সাড়ে দশটার আগে কেউ কলম ধরে না। কমলদের ডেসপ্যাচ বিভাগে তারা মাত্র তিনজন।
বিপুল তার নিত্যকর্ম সেরে কমলকে বলল, “দু’দিন আসেননি, অসুখবিসুখ করেছিল?”
“এক আত্মীয় মারা গেলেন তাতেই ব্যস্ত ছিলাম। ঘোষদা, আপনার কাছে লীভ অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম আছে?”
বিপুল ড্রয়ার থেকে ছুটির দরখাস্তের ফর্ম বার করে দিল। কমল তাতে যা লেখার লিখে সেটা নিয়ে নিজেই গেল চারতলায় লীভ সেকশনে জমা দিতে। সেখানে অনুপম ঘোষালকে ঘিরে অল্পবয়সীরা জটলা করছে। অনুপম যুগের যাত্রীর উঠতি রাইট উইঙ্গার। রথীনই চাকুরি করে দিয়েছে। কাল অনুপম হ্যাটট্রিক করেছে কুমারটুলির বিরুদ্ধে।
“আর একটা গোল কি অনুপমের হত না! সেকেণ্ড হাফের শুরুতেই প্রসূন তিনজনকে কাটিয়ে যখন সেলফিসের মত একাই গোলটা করতে গেল, তখন অনুপম তো ফাঁকায় গোল থেকে পাঁচ হাত দূরে। প্রসূন ওকে বলটা যদি দিত, তাহলে কি অনুপমের আর একটা গোল হত না? কি অনুপম, হত কি না?”
মৃদু হেসে অনুপম বলল, “ফুটবল খেলায় কিছুই বলা যায় না।”
“প্রসূনকে তুই দোষ দিচ্ছিস কেন? অনুপমকে বল দেবে কি, ও তো তখন ক্লিয়ার অফ সাইডে!”
“বাজে কথা। অনুপম, তুই তখন অফ সাইডে ছিলিস কি?”
অনুপম গম্ভীর হয়ে মুখটা পাশে ফিরিয়ে বলল, “লেফটব্যাক আর আমি এক লাইনেই ছিলুম।”
“তবে, তবে। আমি কতদিন বলেছি প্রসূনটা নাম্বার ওয়ান সেলফিস। বল পেলে আর ছাড়ে না, একাই গোল দেবে। ওর জন্য যাত্রীর অনেক গোল কমেছে। বালী প্রতিভার দিন পাঁচটা গোল হলো বটে, কিন্তু প্রসূন ঠিক ঠিক যদি বল দিত অনুপমকে, অন্তত আরো পাঁচটা গোল হত। অনুপম হার্ডলি চারটে বলও প্রসূনের কাছ থেকে পেয়েছে কিনা সন্দেহ। কি অনুপম, ঠিক বলেছি কিনা?”
অনুপম উদাসীনের মত হেসে বলল, “যাকগে ওসব কথা।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বাদ দে তো ফালতু কথা। প্রসূন বল দিল কি না দিল তাতে অনুপমের কিছু আসে যায় না। এর পরের ম্যাচ ইসটার্ন রেল। অনুপম, আগেই কিন্তু বলে রাখছি, আমার ভাগ্নেটা ধরেছে খেলা দেখার জন্য।”
“সত্যদা, আজকাল ঢোকানো বড্ড শক্ত হয়ে পড়েছে। ডে-ক্লিপ দেওয়ার ব্যাপারেও গোনাগুনতি।”
“ওসব কোন কথা শুনব না। তোমায় ব্যবস্থা করে দিতেই হবে।”
অনুপম সেকশনাল ইন-চার্জ নির্মল দত্তর টেবিলের দিকে এগোবার উদ্যোগ করে বলল, “আচ্ছা দেখি।”
দত্তর কাছে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে অনুপম রোজই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে।
“অনুপম, ইস্টবেঙ্গলের দিন কিন্তু এই রকম খেলা চাই।”
অনুপম এগিয়ে যেতে যেতে হাসল মাত্র।
এবার ওদের চোখ পড়ল কমলের ওপর। দরখাস্তটা হাতে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছে।
“কি ব্যাপার কমলবাবু, ক্যাজুয়াল? এই টেবিলে রেখে যান।”
কমল রেখে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, একজন ডেকে বলল, “আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় অনুপমের খেলা সম্পর্কে? দারুণ খেলে, তাই নয়?”
“হ্যাঁ, দারুণ খেলে।”
“আপনি ওর এ-বছরের সব ক’টা খেলাই দেখেছেন?”
“একটাও না।”
“তাহলে যে বললেন দারুণ খেলে!”
“আপনারা বলছেন তাই আমিও বললাম।”
“না না, ঠাট্টা নয়, সত্যি বলুন, ছেলেটার মধ্যে পার্টস আছে কি না। আপনার চোখ আর আমাদের চোখ তো এক নয়।”
কমল কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর কঠিনস্বরে বলল, “শুধু খেলা দেখেই প্লেয়ার বিচার করবেন না। খেলা সম্পর্কে তার অ্যাটিচিউড, চিন্তা, সাধনা কেমন সেটাও দেখবেন। হয়তো ভাল খেলে। কিন্তু গোল থেকে পাঁচ হাত দূরে ফাঁকায় যে দাঁড়িয়ে, সে যদি বলে যে, গোল করতে পারতুম কিনা কিছুই বলা যায় না, তাহলে আমি তাকে প্লেয়ার বলে মনে করব না।”
“পৃথিবীর বহু বড় প্লেয়ার একহাত দূর থেকেও তো গোল মিস করেছে।”
“করেছে কিনা জানি না, কিন্তু তারা কখনোই বলবে না—পাঁচ হাত দূরের থেকে গোল করতে পারব কিনা! এই ‘কিনা’ অর্থাৎ অনিশ্চয়তা, নিজের উপর অনাস্থা, কখনোই তাদের মুখ থেকে বেরোবে না। দুইকে দুই দিয়ে গুণ দিতে বললে, আপনার কি সন্দেহ থাকতে পারে, উত্তরটা চারের বদলে আর কিছু হবে?”
ঝোঁকের মাথায় কথাগুলো বলে কমল লক্ষ্য করল, শ্রোতাদের মুখে অসুখী ছায়া পড়েছে।
“আপনার কথাগুলো একদিক দিয়ে ঠিক, তবে কি জানেন, যোগ-বিয়োগটা শিশুকাল থেকে করে করে শ্বাস-প্রশ্বাসের মত হয়ে যায়, আজীবন দুই দু-গুণে চারই বলব। কিন্তু ফুটবল খেলাটা তো তা নয়, একটা বয়সে রপ্ত করে আর একটা বয়সে ছেড়ে দিতেই হয়। যতবড় প্লেয়ারই হোক, একইভাবে সে খেলতে পারে না চিরকাল। আপনি যেভাবে একদিন চুনী কি প্রদীপ কি বলরামকে রুখতেন, পারবেন কি আজ সেইভাবে অনুপমকে আটকাতে?”
বক্তার বলার ভঙ্গিতে তেরছা বিদ্রূপ ছিল। কমলের রগ দুটো দপদপ করে উঠল। পিছন দিক থেকে কে মন্তব্য করল, “নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহ।”
কমলের ইচ্ছে হলো ঘুরে একবার দেখে, কথাটা কে বলল! কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বলল, “শিক্ষায় যদি ফাঁকি না থাকে, তাহলে যে স্কিল মানুষ পরিশ্রম করে অর্জন করে তা কখনো সে হারায় না, বয়স বাড়লেও।”
“তার মানে, আপনি আগের মতই এখনো খেলতে পারেন?”
“না। কিন্তু অনুপমদের আটকাবার মত খেলা বোধহয় এখনো খেলতে পারি।”
প্রত্যেকের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে তারপর সেটি অবিশ্বাস্যতা থেকে মজা পাওয়ায় রূপান্তরিত হলে কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে। কমলের মনে হলো সে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
“বুড়োবয়সে ল্যাজে-গোবরে করে ছেড়ে দেবে।”
দাঁতে দাঁত চেপে কমল বলল, “যাত্রীর সঙ্গে লীগে শোভা-বাজারের তো দেখা হবেই, তখন দেখা যাবে’খন।”
কমল যখন চারতলার হলঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে, শুনতে পেল কে চেঁচিয়ে বলছে, “ওরে চ্যালেঞ্জ দিয়ে গেল। অনুপমকে জানিয়ে দিতে হবে।”
কমল নিজের সেকশনে আসামাত্রই রণেন দাস তাকে ডাকল, “এই যে, ছিলেন কোথায় এই দু’দিন? ডুব মারবেন তো আগেভাগে বলে যেতে পারেন না? লোক তো তিনজন অথচ কাজ থাকে বারো-জনের। তার মধ্যে একজন কামাই করলে কি অবস্থাটা হয়? এর উপর তিনটে বাজতে না বাজতেই তো প্লেয়ার হয়ে যাবেন।”

পিছন দিক থেকে কে মন্তব্য করল, “নখদন্তহীন বন্ধ সিংহ!”
যে বিশ্রী মেজাজ নিয়ে কমল চারতলা থেকে নেমে এসেছে সেটা এখনো অটুট। তিক্তস্বরে সে বলল, “দরকার হয়েছিল বলেই ছুটি নিয়েছি। ছুটি নেবার অধিকারও আমার আছে।”
“অ। অধিকার আছে? রোজ তিনটের সময় বেরিয়ে যাওয়াটাও বুঝি অধিকারের মধ্যে!”
কমল জবাব দিল না। রণেন দাসকে সে একদমই পছন্দ করে না। লোকটা অর্ধেক সময় সীটে থাকে না। ক্যাণ্টিন অথবা ইউনিয়ন অফিস-ঘরে কিংবা চারতলা বা পাঁচতলায় গিয়ে পরচর্চায় সময় কাটায়, চুকলি কাটে আর ওভারটাইম রোজগারের তালে থাকে। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে, তিরিশ বছর প্রায় চাকরি করছে, এগারোশো টাকা মাইনে পায়, কিন্তু সিগারেটটা পর্যন্ত চেয়ে খায়। রণেন দাস ডেসপ্যাচের কর্তা।
দুপুর দুটো নাগাদ গেমস্ সেক্রেটারি নতু সাহা খাতা হাতে কমলের কাছে হাজির হলো।
“কাল আপনাকে খুঁজে গেছি, আপনি আসেননি। আজ খেলা আছে বেঙ্গল টিউবের সঙ্গে ভবানীপুর মাঠে।” বলতে বলতে নতু সাহা খাতাটা খুলে এগিয়ে দিল। খাতায় টিমের খেলোয়াড়দের নাম লেখা। কমলের নামটি দু’জনের পরেই। সকলেরই সই আছে নামের পাশে।
প্রথমেই কমলের মনে পড়ল, আজ শোভাবাজারের খেলা আছে, তাকে খেলতেই হবে। কিন্তু সেকথা বললে নতু সাহা রেহাই দেবে না। রথীনের কথাগুলো মনে পড়ল—অফিসের দুটো খেলায় তুই খেলিসনি⋯এই নিয়ে কথা উঠেছে⋯তোকে চাকরি দেওয়ায় ইউনিয়ন থেকে পর্যন্ত অপোজিশন এসেছিল⋯তোর জন্য এ জি এম পর্যন্ত ধরাধরি করেছি।
কমল খাতায় নিজের নামটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ভাবল, কি করি এখন! শোভাবাজারে আজ তাকে দরকার। সেখান-কার টিমেও তার নাম আছে। ওই খেলারই গুরুত্বটা বেশি, কিন্তু এই খেলাটা চাকরির জন্য। অবশ্য খেলব না বলে দেওয়া যায় নতু সাহাকে। তাহলে তিনটে-চারটের সময় অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুবিধেটা চিরকালের মত বন্ধ হয়ে যাবে।
“কি হলো, সইটা করে দিন। একটু পরেই তো বেরোতে হবে।” অধৈর্য হয়ে নতু সাহা বলল।
“আমাকে আজ বাদ দেওয়া যায় না কি?”
“না না, আমাদের ডিফেন্সে আজ কেউ নেই। ফরোয়ার্ডে শুধু অনুপম। গোবিন্দ তো এক হপ্তার ছুটিতে গেছে, জহরের পায়ে চোট, আজ তো টিমই হচ্ছিল না।”
কমল আর কথা না বলে নিজের নামের পাশে সই করে দিল। সেই মুহূর্তে একবার সরোজের মুখটা সে দেখতে পেল—অসহায় এবং রাগে থমথমে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন