ষষ্ঠ অধ্যায়

মতি নন্দী

॥ ছয় ॥

বিকেলে কমল শোভাবাজার টেণ্টে এল। পল্টু মুখার্জির মারা যাবার খবর সবাই জেনে গেছে। কমলকে অনেকের কৌতূহলী প্রশ্নের জবাব দিতে হলো। শোভাবাজারের কোচ সরোজ বলল, “কমলদা, কাল রাজস্থানের সঙ্গে খেলা। একবার তো বসতে হয় টিমটা করার জন্য।”

“বসার আর কি আছে! আগের ম্যাচে যারা খেলেছে, তাদেরই খেলাও। শুরুতেই বেশি নাড়াচাড়া করার দরকার কি?”

“সলিল বলছে, খেলবে। কিন্তু আমি মনে করি না ও ফিট। সকালে প্র্যাকটিসে দেখলাম, দুটো ফিফ্‌টি মিটার স্প্রিন্ট করার পর লিম্প্‌ করছে। লাফ দেওয়ালাম, পারছে না।”

“অন্তত-দু-সপ্তাহ রেস্ট দাও।”

“কিন্তু রাইট স্টপারে খেলবে কে? প্লেয়ার কোথায়? সত্য বা শম্ভু জানেনই তো কেমন খেলে। স্বপনকে হাফ থেকে নামিয়ে আনতে পারি, কিন্তু ফরোয়ার্ড লাইনকে ফিড করাবে কে? রুদ্রকে দিয়ে আর যাই হোক, বল ডিস্‌ট্রিবিউশনের কাজ চলে না।”

“তাহলে?” কমল চিন্তিত হয়ে সরোজের মুখের দিকে তাকাল এবং ম্লান হেসে বলল, “অগত্যা আমি?”

সরোজ মাথা হেলাল।

“কিন্তু এ সিজনে দু-তিনদিন মাত্র বলে পা দিয়েছি। ভালোমত ট্রেনিং করিনি।”

“তাতে কিছু এসে যায় না।” সরোজ উৎসাহভরে বলল। “এক্সপিরিয়েন্সের কাছে সব বাধা ভেসে যাবে। আমার ডিফেন্সে সব থেকে বড় অভাব অভিজ্ঞতার। মোহনবাগানের দিন দেখেছেন তো, চারটে ব্যাক এক লাইনে দাঁড়িয়ে, এক-একটা থ্রু, পাশে চারজনই কেটে যাচ্ছে। ওরা প্রচণ্ড স্পেসে খেলা শুরু করল আর এরাও তার সঙ্গে তাল দিয়ে মাঠময় ছোটাছুটি করে আধ ঘণ্টাতেই বে-দম হয়ে গেল। গেমটাকে যে স্লো ডাউন করবে, বল হোল্ড করে করে খেলবে—কেউ তা জানে না।”

“জানবে, খেলতে খেলতেই জানবে। আচ্ছা, আমি কাল খেলব। কাল সকালে ছেলেদের আসতে বলে দিও মাঠে। একটু প্র্যাকটিস করব।”

“খেলার দিনে?”

“সামান্য। দু-চারটে মুভ প্র্যাকটিস করাব। ভয় নেই, তোমার প্লেয়ারদের এক ঘণ্টার বেশি মাঠে রাখব না।”

সরোজের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। কমল বুঝল, ব্যাপারটা ও পছন্দ করছে না। কোচের আত্মমর্যাদায় লেগেছে। কমল সুর বদল করে মৃদু স্বরে এবং বন্ধুর মত বলল, “আমাদের মত ছোট ক্লাব, সঙ্গতি কিছুই নেই। প্লেয়াররা অত্যন্ত কাঁচা, অমার্জিত, সিজনের শেষ দিকে ম্যাচ গট-আপ করে ফার্স্ট ডিভিশনে টিকে থাকতে হয়—এদের নিয়ে আর্টিস্টিক ফুটবল খেলতে গেলে পরিণাম কি হবে তা কি ভেবেছ? এই বছর প্রথম গড়ের মাঠে কোচিং করছ, তুমি কি চাও এটাই তোমার শেষ বছর হোক?”

সরাজের মুখ ক্ষণিকের জন্য পার হয়েই কঠিন হয়ে উঠল। “আমি ফুটবল খেলতে চাই, কমলদা। ফুটবল খেলে শোভাবাজার নেমে যাক্‌ আমার দুঃখ নেই, আমিও যদি সেই সঙ্গে ডুবে যাই, আফসোস করব না। কিন্তু শুরুতেই আত্মসমর্পণ করব না।”

“তোমার এই মনোভাব শোভাবাজারের অফিসিয়ালরা জানে? কেষ্টদা জানে?”

“জানলে এই মুহূর্তে ক্লাবে ঢোকা বন্ধ করে দেবে।” সরোজ হাসিটা লুকোল না।

“সরোজ, তোমায় বলাই বাহুল্য, তবু দু-চারটে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তোমার থেকে বোধ হয় আমি বেশি খেলেছি, বড় বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতাও বেশি। সেই সূত্রে, বরং বলা ভালো, আলোচনা করতে চাই।”

“কমলদা, এ সব বলছেন কেন, আপনার সঙ্গে আমার তুলনাই হয় না। আপনার কাছে আমার অনেক কিছু শেখার আছে।” সরোজ বিনীতভাবে বলল।

“তুমি যেভাবে খেলাতে চাও, সেইভাবে খেলার মত প্লেয়ার আমাদের আছে কি?”

“নেই।” সরোজ চটপট জবাব দিল।

“তাহলে আমরা একটার পর একটা ম্যাচ হারবো। শেষে পয়েন্ট ম্যানেজ করার নোংরা ব্যাপারে ক্লাব জড়াবেই, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। লাভ নেই সরোজ আর্টিষ্টিক ফুটবলে। যতদিন না উপযুক্ত ছেলেদের পাচ্ছ ততদিন তোমার চিন্তা শিকেয় তুলে রাখ। আগে ক্লাবকে বাঁচাও, তারপর খেলা! আগে ছেলে যোগাড় করো, তাদের তৈরী করো। আগে ডিফেণ্ড করো, তারপর কাউণ্টার অ্যাটাক। সর্বক্ষেত্রে এটাই সেরা পদ্ধতি, জীবনের ক্ষেত্রেও।”

“তার মানে যেমন চলছে চলুক!”

“হ্যাঁ, তবু এর মধ্যেই ডিফেন্সটাকে আরো শক্ত করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। তোমার যা কিছু ট্যাকটিকস্‌, সত্তর মিনিটের পুরো খেলাটায়, সব কিছুর মূলেই জমি দখলের, স্পেস কভার করার চেষ্টা। ফাঁকা জমিতে বল পেলে বল কন্ট্রোল করার সময় পাওয়া যায়। স্পেসই হচ্ছে সময়। অপোনেণ্টকে জমির সুবিধা না দেওয়া মানে সময় না দেওয়া। তাই এখন ম্যান টু ম্যান টাইট মার্কিং খেলা হয়। আমি তিন ব্যাকে খেলেছি, অনেক গলদ তখন ডিফেন্সে ছিল। চার ব্যাকে সেটা বন্ধ হয়েছে। আগে উইঙ্গাররা পঁচিশ গজ পর্যন্ত ছাড়া জমি পেত, চার ব্যাকে সেটা পাঁচ গজ পর্যন্ত কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু চার ব্যাকেও লক্ষ্য করেছ, শোভাবাজার সামলাতে পারে না।”

“আপনি কি পাঁচ ব্যাকে খেলতে চান!”

“প্রায় তাই। চার ব্যাকের পিছনে একজন ফ্রি ব্যাক রেখে খেলে দেখলে কেমন হয়। ফরোয়ার্ড থেকে একজনকে হাফে আনা যায়, দু’জনকেও আনা যায়। ফরমেশানটা ১—৪—৩—২ হবে।”

“আপনি কাতানাচ্চিও ডিফেন্স চাইছেন অর্থাৎ ফুটবলকে খুন করতে চাইছেন?”

সরোজ হঠাৎ গোঁয়ারের মত রেগে উঠল। কমল এই রকম একটা কিছু হবে আশা করেছিল। সে বলল, “মোহনবাগানের কাছে আমরা পাঁচ গোল খেয়ে দুটো পয়েণ্ট হারাতুম না এই ফরমেশনে খেললে। একটা পয়েণ্ট পেতুমই। সেটা কি মন্দ ব্যাপার হত? তুমি মিড ফিল্ড খেলার ওপর বড় বেশি জোর দাও, কিন্তু এখন ওটার আর কোন গুরুত্বই নেই। এখন লড়াই পেনাল্টি এরিয়ার মাথায়—অ্যাটাকিং অ্যাঙ্গেলকে সরু করে গোলে শট নেওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে। তুমি এটা বুঝছ না কেন, গোল করাই হচ্ছে খেলার একমাত্র উদ্দেশ্য, খেলা জেতা যায় গোল করেই। শোভাবাজারের ক্ষমতা নেই গোল দেওয়ার কিন্তু গোল খাওয়া তো বন্ধ করতে পারে।”

“কমলদা, আপনার আর আমার চিন্তাধারা এক খাতে বোধহয় বইছে না। শোভাবাজার টিম যতদিন আমার হাতে থাকবে, আমি আমার চিন্তা অনুসারেই খেলাতে চাই।”

সরোজ কঠিন এবং দৃঢ়স্বরে যেভাবে কথাগুলি বলল তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আর তর্ক করতে সে রাজী নয়। কমল মুখটা ঘুরিয়ে আলতো স্বরে বলল, “বেশ।”

“কাল তাহলে খেলছেন?”

কমল মাথা হেলিয়ে হাসল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%