একাদশ অধ্যায়

মতি নন্দী

এগারো

অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই কমল শুয়ে পড়ে। শরীর গরম, জ্বর-জ্বর ভাব। ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। অমিতাভর ডাকে চোখ মেলল।

“খাবেন না, রাত হয়েছে!”

কমল উঠে বসার সময় অনুভব করল, তার সারা গায়ে ব্যথা। অমিতাভ দেখল, কমলের চোখ দুটি লাল।

“তোমার খাওয়া হয়েছে?”

ইতস্তত করে অমিতাভ বলল, “না, একসঙ্গেই খাব।”

“আমার বোধহয় ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে, আমি কিছু খাব না।”

অমিতাভ চলে যাচ্ছে, কমল তাকে ডাকল।

“তোমার অ্যালার্ম ঘড়িটা আমায় একটু দেবে? কাল খুব ভোরে উঠতে হবে। প্র্যাকটিসে যাব।”

“প্র্যাকটিসে!” অমিতাভর চোখ বড় হয়ে গেল। “আপনার তো জ্বর হয়েছে।”

এই বলে অমিতাভ এগিয়ে এসে কমলের কপালে হাত রাখল। “প্রায় একশো।”

কমল চোখ দুটি বন্ধ করে অমিতাভর শীর্ণ আঙুলের স্পর্শ অনুভব করতে করতে বলল, “আমাকে খেলতে হবে।”

“এই শরীরে?”

“হাঁ! প্র্যাকটিস না করলে খেলা যায় না। আমি আর সময় নষ্ট করতে পারি না।”

“কিন্তু—” অমিতাভ চুপ করে গিয়ে একরাশ প্রশ্ন তুলে ধরল।

কমল একটু হাসল। “সারাজীবন পারফেকশন খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। যে যার নিজের ক্ষেত্রে পারফেক্ট হতে চায়; আমার ক্ষেত্রটা ফুটবল! আমি মানুষ হতে পারব না জেনে ফুটবলার হতে চেয়েছি। কিন্তু দুঃখের কথা কি জানো, ফুটবলারের সময়টা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তার শরীর, তার যৌবনই তার সময়, কিন্তু বড্ড ছোট্ট সময়টা। আমার মত তৃতীয় শ্রেণীর ফুটবলার অল্প সময়ের মধ্যে কি করতে পারে যদি না খাটে, যদি না পরিশ্রম করে?”

“কিন্তু আপনি অসুস্থ।”

“হোক। চ্যালেঞ্জ এসেছে, আমি তা নেবই। বহু অপমান সহ্য করেছি, তার জবাব না দিতে পারলে বাকি জীবন আমি কি করে কাটাব?”

কমল উঠে দাঁড়াল। কুঁজো হয়ে খাটের তলা থেকে ধুলোয় ভরা নীল রঙের কেডস্ জুতোজোড়া বার করে বুরুশ দিয়ে ঘষতে শুরু করল। হঠাৎ অমিতাভ বলল, “আপনি ফুটবলকে এত ভালবাসেন!”

মাথা হেলিয়ে কমল কয়েক সেকেণ্ড থেমে বলল, “হ্যাঁ, এজন্য আমায় দাম দিতে হয়েছে। অনেক কিছুই হারিয়েছি, তার বদলে এমন কিছুই পেলাম না যা দিয়ে আমার লোকসান পূরণ করতে পারি। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ খেলার জীবনে অনেক শুনেছি, কিন্তু মূর্খ, বোকা, বদমাস অহঙ্কারীদের অপমানের জবাব না দিয়ে আমি রিটায়ার করব না। আমি খেলব, যেমন করেই হোক, যদি মরতে হয় তবুও।”

“যদি না পারেন? সময় তো ফুরিয়ে এসেছে বললেন।”

“আমি ভয় পাই এ কথা ভাবতে। আমাকে পারতেই হবে, একাই আমায় চেষ্টা করতে হবে। আমি জানি, ঠিক সময়ে বল এগিয়ে দেবো কিন্তু তখন বল ধরার লোক থাকবে না। নিখুঁত পাস দেবো কিন্তু কণ্টোলে আনতে পারবে না, বল পাব কিন্তু এত বিশ্রী-ভাবে আসবে যে কাজে লাগাবার উপায় তখন থাকবে না। নানান অসুবিধা নিয়ে আমার চারপাশের প্লেয়ারদের সঙ্গে মানিয়ে খেলতে হবে। কেউ কারুর খেলা বোঝে না, ওরা এক-একজন এক-এক রকমের। ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এজন্য প্র্যাকটিস চাই একসঙ্গে।”

“তাহলেই আপনি সফল হবেন?”

কমল তীব্র কৌতূহল দেখতে পেল অমিতাভর চোখে। এতক্ষণ ধরে এত কথা তারা আগে কখনো বলেনি। কমলের মনে হল, তার কথা শুনতে অমিতাভর যেন ভাল লাগছে। যে ভয়ঙ্কর ঔদাসীন্য এবং চাপা ঘৃণা নিয়ে সে বাবার সঙ্গে কথা বলতো, সেটা সরে গিয়ে একটা কৌতূহলী ছেলেমানুষ বেরিয়ে এসেছে। আর একটা ব্যাপার কমল বুঝতে পারল, তার জ্বর-জ্বর ভাব এবং গায়ের ব্যথা এখন আর নেই।

স্কিপিং-এর দড়িটা টেনে পরীক্ষা করতে করতে কমল বলল, “সফল? তোমার কি মনে হয়?”

অমিতাভ গম্ভীর হয়ে গেল।

কমল উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রইল।

“আমি ফুটবলের কিছু বুঝি না।”

“কিন্তু এটা ফুটবল হিসাবে দেখছ কেন, জীবনের যে-কোন ব্যাপারেই তো এরকম পরিস্থিতি আসে। যে মানুষ একা, যার কেউ নেই, সে তখন সফল হবার জন্য কি করতে পারে?”

অমিতাভ চুপ করে রইল।

কমল উত্তেজিত হয়ে বলল, “সে তখন পারে শুধু লড়তে। তুমি কি নিজেকে একা বোধ করো অমিতাভ?”

অমিতাভ জবাব দিল না।

কমলের উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমে এল। আস্তে আস্তে সে বলল, “যোগাযোগ করো। মাঠে আমি খেলার সময় তাই করি। কিন্তু বাড়িতে ফিরে আর তা পারি না। বড় একা লাগে।”

খাটের উপর বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে কমল বলল, “অনেক কথা বললাম, হয়তো এর মানে আমরা কেউই জানি না। তুমি আমাকে ভালবাস না, আমাকে ঘৃণা করে, এটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু আমি তোমায় ভালবাসি।”

কমলের চোখ জলে চিকচিক করছে। স্বর ভারী। অমিতাভ পাথরের মূর্তির মত একইভাবে দাঁড়িয়ে। কমল মুখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকাল।

“ফুটবল খেলা একদিন আমায় শেষ করতেই হবে, তারপর আমি কি নিয়ে, কাকে নিয়ে থাকব?”

একথা শুনে অমিতাভর মুখে কোন্ ভাব ফুটে ওঠে দেখার জন্য মুখ তুলে কমল দেখল, ঘরে অমিতাভ নেই। নিঃসাড়ে সে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে।

ভোর সাড়ে পাঁচটায় কমল কিটব্যাগ হাতে বাড়ি থেকে বেরোল। বাগবাজার থেকে ময়দান সে ধীরগতিতে জগ্‌ করে পৌঁছল যখন, শোভাবাজারের টেণ্টে তখন তিনটি ছেলে সদ্য এসে পৌঁচেছে। ওরা —স্বপন, রুদ্র আর শিবশম্ভু চটপট তৈরী হয়ে নিল।

“এখান থেকে চৌরঙ্গী রোড ধরে ভিক্‌টোরিয়া, তারপর পশ্চিমে বেঁকে রেস কোর্সের দক্ষিণ দিয়ে ট্রামলাইন পেরিয়ে প্রিনসেপ্‌ ঘাট। সেখান থেকে গঙ্গা ধরে উত্তরে, তারপর বেঁকে মোহনবাগান মাঠের পাশ দিয়ে নেতাজী স্ট্যাচু ঘুরে আবার এখানে। কমল দৌড়ের পথ ছকে দিল রওনা হবার আগে। ওরা ঘাড় নাড়ল।

চৌরঙ্গী দিয়ে দৌড়বার সময় একটা বাস থেকে লাফিয়ে নামল ভরত। ওরা থমকে দাঁড়াল।

“কমলদা, আপনারা বেরিয়ে পড়েছেন, আমিও তো প্র্যাকটিস করব বলে এলুম।”

“ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই আসছি। তুই রেডি হয়ে থাক।”

ওরা চারজন আবার ছুটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ ছোটার পর কমল পাশে তাকিয়ে স্বপনকে বলল, “সাত-বারো কত হয় রে?”

বিস্ময় ফুটে উঠল স্বপনের মুখে। ছুটতে ছুটতে একি বেয়াড়া প্রশ্ন! ক্লাস এইটে ফেল করার পর স্বপন আর স্কুল-মুখো হয়নি এবং মাথা খাটানোর মত কোন ঝঞ্ঝাটে ব্যাপারে ব্যস্ত হয়নি। কমলের প্রশ্নের জবাব দিতে সে বিড়বিড় করে সাতের ঘরের নামতা শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর স্বপন বলল, “চুরোআশি।”

“দেশ কোথায় ছিল, যশোরে?”

স্বপন একগাল হাসল।

ওরা ছুটতে ছুটতে রবীন্দ্রসদন পার হয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পিছন দিয়ে পশ্চিমে চলেছে। কমল এবার রুদ্রকে বলল, “পাখি সব করে রব—পদ্যটা মুখস্থ আছে?”

“না, পড়িনি।”

“পঞ্চনদীর তীরে বেণী পাকাইয়া শিরে?”

“মুখস্থ নেই।”

“এগারোর উপপাদ্য কিংবা ভারতের জলবায়ু মনে আছে? তুই তো গত বছর বি-কম্ পরীক্ষা দিয়েছিস, বল তো।”

ছুটতে ছুটতে রুদ্রর ভুরু কুঁচকে গেল। প্রাণপণে সে মনে করার চেষ্টা শুরু করল। কমল তখন শিবশম্ভুকে কর্মধারয় ও দ্বিগু সমাসের ধাঁধায় ফেলে স্বপনকে একটি সহজ মানসাঙ্কের জট ছাড়াতে দিল। কমল ট্রেনিংয়ের অঙ্গ হিসাবে মাথার কাজ শরীরের খাটুনি একসঙ্গে করার এই পদ্ধতিটা শিখেছে পল্টুদার কাছে। তাকে দিয়ে তিনি এইভাবে কাজ করাতেন। কমল নিষ্ঠার সঙ্গে বরাবর তা পালন করে এসেছে। পল্টুদা বলতেন, শরীর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন মাথাও আর কাজ করতে পারে না। ফুটবলে মাথা খাটাতে হয় ক্লান্তির মধ্যেও। সেইজন্যে ব্রেনটাকে তৈরি করতে হয়, তারও ট্রেনিং লাগে। যখন দৌড়বি তখন মাথাকে অলস রাখবি না কখনো।

গঙ্গার ধার দিয়ে ছোটার সময় মালভর্তি লরী যেতে দেখে কমল বলল, “তাড়া কর লরীটাকে, দেখি কে ধরতে পারে।”

চারজনে একসঙ্গে স্প্রিণ্ট শুরু করল। প্রায় সত্তর মিটার দৌড়ে লরীটাকে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে ওরা দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগল। একটা বাস ওদের পাশ দিয়ে চলে গেল। কমল হঠাৎ বলল, “স্বপন, এটাকে ধর।”

হকচকিয়ে স্বপন বলল, “আবার?”

“কুইক্।”

স্বপন প্রাণপণে ছুটে পঁচিশ মিটার যেতেই কমল চেঁচিয়ে তাকে দাঁড়াতে বলল। এইভাবে রুদ্র ও শিবশম্ভুকেও আচমকা সে ছুটতে বলল বাস বা লরীর পিছনে পালা করে। এরপর ওরা আবার ছুটতে শুরু করল। কমল তিনজনের আগে দৌড়চ্ছে। ইডেনের কাছে এসে কমল বলল, “চল, গাছে চড়ি।”

একটা জামরুল গাছ বেছে নিয়ে কমল বলল, “কে আগে চড়ে ওই ছড়ানো ডালটা ধরে ঝুলে নীচে লাফিয়ে পড়তে পারে!”

চারজনে একসঙ্গে গাছটাকে আক্রমণ করল। স্বপন ধাক্কা দিয়ে কমলকে ফেলে দিয়ে সবার আগে গাছে উঠল, তারপর রুদ্র। শিব-শম্ভুর পর কমল যখন গাছে উঠে ডালের প্রান্তে পৌঁছে প্রায় ১২ ফুট উঁচু থেকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন স্বপন কাঁচুমাচু মুখে কমলকে কিছু বলার জন্য এগোতেই সে হেসে বলল, “ঠিক আছে, খেলার সময়ও ওই রকম শ্যোলড়ার চার্জ করবি।”

শোভাবাজারের মাঠে ওরা যখন পৌঁছল, ভরত তখন শূন্যে উঁচু করে বল মেরে দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে মাথার উপর থেকে বল ধরা প্র্যাকটিস করছিল একা একাই। ওদের দেখে সে চেঁচিয়ে বলল, “আমাকে কেউ একটু প্র্যাকটিস দিয়ে যাও।”

“হবে হবে, আগে একটু জিরোতে দে।” কমল এই বলে ঘাসের উপরে শুয়ে পড়ল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই পর্যন্ত সে প্রায় দশ-বারো মাইল ছুটেছে। ফুটবল মরশুমের মাঝামাঝি এমন পরিশ্রমী ট্রেনিং কেউ করে না।

ঘণ্টা দেড়েক বল দেওয়া, বল ধরা, দুজনের বিরুদ্ধে একজনের ট্যাক্‌লিং হেডিং এবং শুটিংএর পর কমলের খেয়াল হল, অফিস যেতে হবে। অফিস থেকে শুধু বেরিয়ে যাওয়ারই নয়, এখন থেকে অফিসে হাজিরা দেওয়ার সময় সম্পর্কেও তাকে সাবধান হতে হবে। তাছাড়া ছেলেগুলো পরশু খেলবে মহমেডানের সঙ্গে। এখন আর খাটানো ঠিক হবে না। কমল টেণ্টেই স্নান করে, ক্যাণ্টিনে ভাত খেয়ে হেঁটেই অফিস রওনা হয়ে গেল।

দুপুরে নতু সাহা তাকে জানাল, কাল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে খেলা আছে। কমল বলল, “শরীর খারাপ, খেলব না।”

গম্ভীর হয়ে নতু সাহা চলে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%