মতি নন্দী
প্রগ্রেসিভ ব্যাঙ্কের ভ্যান ওদের চারটের সময় মাঠে পৌঁছে দিল। কমল লক্ষ্য করে, ভ্যানের এককোণে অনুপম বসে মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছিল, তাইতে ওর মনে হয়, নিশ্চয় কথাটা কানে গেছে। কমল অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে। ড্রেস করে মাঠে নামতে গিয়ে সে দেখল, অনুপম ড্রেস করেনি। নতু সাহাকে কমল জিজ্ঞাসা করল, “অনুপম নামবে না?”
“বলছে, দরকার হলে নামব। বড় প্লেয়ার, বুঝলেন না!” তির্যকস্বরে নতু সাহা বিরক্তি চাপতে চাপতে বলল, “কিছু বলাও যাবে না, সারা অফিস জুড়ে অমনি ভক্তরা হৈ হৈ করে উঠবে।”
কমল হাসল। তার মনে পড়ল, এমন মেজাজ একদিন সে-ও দেখিয়েছে।
হাফ-টাইমে প্রগ্রেসিভ ব্যাঙ্ক তিন গোলে হারছে। বেঙ্গল টিউব চারবার মাত্র বল এনেছিল, আর তাতেই তিনটি গোল! একমাত্র রাইট আউট আর সেণ্টার ফরোয়ার্ডটিই যা কিছু খেলছে এবং তাদের গোলের দিকে এগোনোর পথ কমল অনায়াসেই বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু তা সে করল না ইচ্ছে করেই। দু’বার সে ট্যাকল করতে গিয়ে কাঁচা খেলোয়াড়ের মত হুমড়ি খেয়ে পড়ল, আর একবার হেড করতে উঠল দু’সেকেণ্ড দেরি করে। তাতেই গোল তিনটি হয়ে যায়।
হাফ-টাইমে মাঠ থেকে বেরিয়ে এসেই কমলের চোখে পড়ল, অনুপম ড্রেস করে তার জনাচারেক ভক্তর সঙ্গে কথা বলছে। কমল মনে মনে হাসল। নতু সাহা বিরক্ত ও উত্তেজিত হয়ে ছুটে এসে কমলকে বলল, “এভাবে গোল খাওয়ার মানে হয়? অ্যালেন লীগের প্লেয়ারও অমন করে চার্জ করে না, আপনি যা করলেন।”
কমল কথা না বলে ঘাসের উপর বসে পড়ে লিমনেডের একটা বোতল তুলে নিল।
“লোকে যে কেন আপনাকে বড় প্লেয়ার বলতো বুঝি না!”
মুখ থেকে বোতলটা নামিয়ে কমল হেসে নিচু গলায় বলল, “আর গোল হবে না। আপনারা যাকে বড় প্লেয়ার বলেন, তাকে এবার গোল শোধ করতে বলুন।”
“সেজন্য ভাবছি না। অনুপম খানপাঁচেক অনায়াসেই চাপিয়ে দেবে। কিন্তু দোহাই আর গোল খাওয়াবেন না।”
কমল খালি বোতলটা রেখে উঠে দাঁড়াল। একটু দূরে বেঙ্গল টিউবের খেলোয়াড়রা বসে জিরোচ্ছে। কমল লক্ষ্য করেছে, ওদের লেফট-হাফ বেঁটে গাঁট্টাগোঁট্টা ছেলেটি এলোপাথাড়ি পা চালায়, পাস দিতে গিয়ে কেমন গোলমাল করে ফেলে, বিন্দুমাত্র কণ্ট্রোল নেই বলের উপর কিন্তু প্রচণ্ড দম আর বেপরোয়া গোঁয়ার্তুমিটা আছে। যার ফলে যেখানে বল সেইখানেই ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত গুঁতোতে ছুটছে। বল ধরতে গিয়েও ওকে দেখে অনেকেই বল ছেড়ে সরে যাচ্ছে।
কমল ওর কাছে গিয়ে বলল, “দারুণ খেলছো তো। প্রগ্রেসিভকে তো দেখছি তুমি একাই রুখে দিয়েছ।”
আনন্দে এবং লজ্জায় ছেলেটি মাথা চুলকোতে লাগল। কমল গুহর কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া সাধারণ ব্যাপার নয়।
“তবে এবার তোমার কপালে দুঃখ্যু আছে।”
সচকিত হয়ে ছেলেটি বলল, “কেন, কেন?”
“এবার অনুপম নামছে। ও বলেছে—পাঁচখানা চাপাবো, বেঙ্গল টিউব আবার টিম নাকি?”
কমল লক্ষ্য করল, ছেলেটির মুখ রাগে থমথমে হয়ে উঠল।
“দেখি তুমি কত ভাল প্লেয়ার, এইবার বুঝব।” এই বলে কমল সরে এল।
খেলা আবার শুরু হয়ে বল মাঝ-মাঠেই রইল মিনিট পাঁচেক। অনুপম কোমরে হাত দিয়ে ডান টাচ্, লাইনের কাছে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বিরক্ত হয়ে ভিতরে ঢুকে এল বলের আশায়।
বল পেল অনুপম। কাটাল একজনকে, পরের লোকটাকেও। কমল দেখল টিউবের লেফট হাফ প্রায় চল্লিশ গজ থেকে ছুটে আসছে। সামনে তিন ডিফেণ্ডার। অনুপম বল থামিয়ে দেখছে কাকে দেওয়া যায়। চোখে পড়ল বুলডোজারের মত আসছে লেফট হাফ। অনুপম তাড়াতাড়ি বলটা নিজেদের সেণ্টার ফরোয়ার্ডকে ঠেলে দিয়ে সরে দাঁড়াল। লেফট হাফ ব্রেক কষতে ১৫ গজ এগিয়ে গেল এবং তারপরই ঘুরে আবার বলের দিকে তাড়া করল।
অনুপমের দেওয়া বল সেণ্টার ফরোয়ার্ড রাখতে পারেনি। বল এল কমলের পায়ে। অবহেলায় সে ছোট্ট জায়গার মধ্যে পাঁচ-ছয়বার কাটিয়ে নিতে নিতে দেখে নিল অনুপম ও তার প্রহরী লেফট হাফটি কোথায়। তারপর অনবদ্যভাবে ঠিক দু’জনের মাঝ বরাবর বলটা ঠেলে দিল, যাতে ছুটে গিয়ে অনুপমকে পাসটা ধরতে হয়।
অনুপম ছুটে গিয়ে বলে পা দিতে যাবে, তখন আর একটি পা সেখানে পৌঁছে গেছে। টায়ার ফাটার মত চার্জের শব্দ হলো। বলটা ছিটকে এল প্রগ্রেসিভের হাফ লাইনে। পর পর তিনবার কমল থ্রু দিল অনুপমকে, অবশ্যই লেফট হাফের দিকে ঘেঁষে। সবাই দেখল, অনুপম বল ধরতে পারল না বা ছুটেও থমকে পড়ল। রাইট উইং থেকে সে লেফট উইংয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে লেফট-হাফও ডানদিকে চলে এল। মাঠের বাইরে মুখ টিপে অনেকে হাসল। কমল দেখল, অনুপমের মুখে রাগ, বিরক্তি ও হতাশা।
আবার অনুপমকে বল বাড়ালো কমল। টিউব যেন জেনে গেছে সব বল অনুপমকেই দেওয়া হবে। তিনজন ওর উপর নজর রেখে ওর কাছাকাছি ঘুরছে। অনুপম বলটা ধরার জন্য এক হাতও এগোল না। বরং দু’হাত নেড়ে চীৎকার করতে করতে সে কমলের কাছে এসে বলল, “আমাকে কেন, আমাকে কেন। বল দেবার জন্য আর কি মাঠে লোক নেই?”

সবাই দেখল, অনুপম বল ধরতে পারল না…
অবাক হয়ে কমল বলল, “সে কি, অফিসে শুনলুম, কাল প্রসূন বল দেয়নি বলে তুমি তিনটের বেশি গোল পাওনি!”
অনুপম আর কথা বলেনি। মাঠের মধ্যে সে ছোটাছুটি শুরু করল, লেফট-হাফের পাহারা থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তার তখন একমাত্র চিন্তা—চোট যেন না লাগে। এর পরই কমল বল নিয়ে উঠল। এগোতে এগোতে টিউবের পেনাল্টি এরিয়ার কাছে পৌঁছে অনুপমকে বল দেবার জন্য তার দিকে ফিরে হঠাৎ ঘুরে গিয়ে একজনকে কাটিয়েই প্রায় ১৬ গজ থেকে গোলে শট নিল। টিউবের কেউ ভাবতে পারেনি, অনুপমকে বল না দিয়ে কমল নিজেই আচমকা গোলে মারবে। বল যখন ডান পোস্টের গা ঘেঁষে গোলে ঢুকছে, গোলকীপার তখনো অনুপমের দিকে তাকিয়ে বাঁ পোস্টের কাছে দাঁড়ানো।
তিন মিনিট পরে ঠিক একইভাবে কমল আবার গোল দিল। টিউব এবার অনুপমকে ছেড়ে কমল সম্পর্কে সজাগ হয়ে পড়ল। খেলা শেষ হতে চার মিনিট বাকি, রেজাল্ট তখন ৩—২। প্রগ্রেসিভ হারছে। কমল বল নিয়ে আবার উঠতে শুরু করল, তিন জনকে কাটিয়ে সে বল দিল রাইট-ইনকে। সে আবার ফিরিয়ে দিল কমলকে। অনুপমের প্রহরী তেড়ে আসছে। কমল বলটা রেখে অপেক্ষা করল এবং শেষ মুহূর্তে নিমেষে বল নিয়ে সরে দাঁড়াল। লেফট হাফ ফিরে দাঁড়িয়ে আবার তেড়ে এল। কমল আবার একইভাবে সরে গেল। তিনবার এই দৃশ্য ঘটতেই টিউবের দু’জন খেলোয়াড় এগিয়ে এল। কমল ডান পায়ে বল মারার ভঙ্গি করে চেঁচিয়ে উঠল, “অনুপম!”
অনুপম বাঁ দিক দিয়ে এগিয়ে গেল বলের আশায়। তার সঙ্গে গেল টিউবের তিনজন। কমল বাঁ পায়ে, বলটা ঠেলে দিল দুজন ডিফেণ্ডারের মাঝ দিয়ে পেনাল্টি বক্সের মাঝখানে। আর রাইট-ইন, যে বল সে একশোটার মধ্যে আটানব্বুইটা গোলের বাইরে মারবে, সে-ই বল গোলে পাঠিয়ে দিল।
খেলা শেষে নতু সাহা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল কমলের দিকে। কমল থমকে দাঁড়িয়ে অনুপমকে বলল, “পাস কখন দেবে, কেন দেবে এবং দেবে না, সেটা প্রসূন জানে। বল পেয়ে খেলা যেমন, না পেয়েও তেমন একটা খেলা আছে। সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
অনুপমের কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে নতু সাহার হাতটা সরিয়ে কমল টেণ্টের দিকে এগিয়ে গেল।
বাড়ি ফেরার পথে সে ট্রামে শুনল, শোভাবাজার তিন গোলে রাজস্থানের কাছে হেরেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন