মতি নন্দী
যুগের যাত্রীর টেণ্টের সামনে রাস্তায় একটা সবুজ পুরনো ফিয়াট মোটর দাঁড়িয়ে। কমল দেখা মাত্র চিনল, এটি রথীনের। মাস ছয়েক আগে রথীনের পদোন্নতি হয়ে ডিপার্টমেণ্টাল ইন চার্জ হয়েছে। এখন মাইনে সতেরো শো। ব্যাঙ্কে রীতিমত ক্ষমতাবান। চলাফেরা কথা-বার্তায় সেটা সে সর্বদা বুঝিয়ে দিতে চায়। তাছাড়া রথীন সুদর্শন, যদিও এখন ভুঁড়ি হয়ে আগের মত আর ততটা কমবয়সী দেখায় না।
পাঁচবছর আগে সেদিন রথীনকে নিছকই ঠাট্টা করে কমল চাকরির কথা বলেছিল। পরের দিনই রথীন শোভাবাজার টেণ্টে ফোন করে তাকে দেখা করতে বলে। কমল খুবই অবাক হয়ে গিয়েছিল। গোঁয়ারের মত এক কথায় বেঙ্গল জুট মিলের চারশো টাকার চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে দু’মাস ধরে অবস্থাটা শোচনীয় হয়ে আসছিল। কমল ব্যাঙ্কে গিয়ে রথীনের সঙ্গে দেখা করে। রথীন বলে, “আমাদের অফিস টিমে তোকে খেলতে হবে। অফিস স্পোর্টস ক্লাবের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি পারিস দরখাস্ত দিয়ে যা। ডেসপ্যাচ সেকশন-এ লোক নেওয়া হবে।”
“মাইনে কত?” কমল প্রশ্ন করে।
রথীন ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, “যদি বলি একশো টাকা! দু’মাস বেকার আছিস, মাইনে যদি পঞ্চাশ টাকাও হয়, সেটাও তো তোর লাভ।”
কমল আর কথা বাড়ায়নি। পরদিনই দরখাস্ত নিয়ে হাজির হয় এবং যে চাকরিটি পায় তার বেতন এই পাঁচ বছরে ৪৬১ টাকায় পৌচেছে। কমল জানে, তার যা শিক্ষাগত যোগ্যতা তাতে এই চাকরি কোনভাবেই তার পক্ষে পাওয়া সম্ভব হত না, যদি না রথীন পাইয়ে দিত। পঞ্চান্ন থেকে ষাট সাল নাগাদ কমল গুহর যে নাম ছিল, এখন তার অর্ধেকও নেই। ফুটবল ভাঙ্গিয়ে চাকরি পাওয়ার দিন তার উতরে গেছে। তবু পেয়েছে একমাত্র রথীনের জন্যই।
সাত বছর পর যাত্রীর টেণ্টে আবার ঢুকতে গিয়ে কমলের মনে হল, তাকে দেখে সবাই নিশ্চয়ই অবাক হবে। কিন্তু কেউ যদি অপমান করার চেষ্টা করে? অবশ্য নিজের জন্য টাকা চাইতে নয় এবং ফুটবল সেক্রেটারি আসতে বলেছে বলেই এসেছি, সুতরাং, কমল মনে মনে বলল—আমার মনে গ্লানি থাকার কোন কারণ নেই।
টেন্টের বাইরে ইতস্তত ছড়ানো বেঞ্চে যাত্রীর প্রবীণ মেম্বাররা গল্পে ব্যস্ত। তারা কেউ কমলকে লক্ষ্য করল না। টেণ্টের মধ্যে ঢুকে কমলের সঙ্গে প্রথম চোখাচোখি হল যুগের যাত্রীর অ্যাকাউণ্ট্যাণ্ট তপেন রায়ের। টেবিলে আরো দু’জন লোক বসে। একজনকে কমল চেনে। গুলোদার ‘চামচা’ হিসাবে খ্যাতি আছে তার।
“আরে, কমল যে, কি ব্যাপার!”
“রথীন কোথায়? এইমাত্র ফোনে আমায় এখানে আসতে বলল।”
“হ্যাঁ, আমার কাছে একশো টাকা চেয়েছিল তোমাকে দেবার জন্য।”
বলতে বলতে তপেন বুক পকেট থেকে একটি নোট বার করে এগিয়ে ধরল। কমলের মনে হল টাকা নিয়ে তপেন যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছে।
গুলোদার চামচাটি ব্যস্ত হয়ে বলল, “ভাউচারে সই করাতে হবে না?”
তপেন তাচ্ছিল্যভরে বলল, “না, এটা ক্লাবের টাকা নয়। কমল তো যাত্রীর টাকা ছোঁবে না, আমার পকেট থেকেই দিচ্ছি।”
কমল গম্ভীর গলায় বলল, “টাকাটা কালই রথীনের হাতে দিয়ে দেবো। ও এখন কোথায়?”
“ঘরে কথা বলছে প্লেয়ারদের সঙ্গে। কাল কুমারটুলির সঙ্গে খেলা।”
কমল ইতস্তত করল। রথীনকে একবার বলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্লেয়ারদের সঙ্গে হয়তো কালকের খেলা সম্পর্কে আলোচনা করছে, তাহলে যাওয়াটা উচিত হবে না বাইরের লোকের।
“কমল এ বছর খেলছে তো?” তপেন রায় হাই চাপার জন্য মুখের সামনে হাত তুলে রেখে বলল। তারপর স্বগতোক্তির মত মন্তব্য করল, “আর কতদিন চালাবে!”
কমল হাসল মাত্র।
“তপেনদা, কমলের বডিটা দেখেছেন!” চামচা বলল। “এখনকার একটা ছেলেরও এমন ফিট বডি নেই।”
তপেন কথাগুলো না শোনার ভান করে তার আগের কথার জের ধরে বলল, “চার ব্যাক হয়ে বয়স্ক ডিফেন্সের প্লেয়ারদের সুবিধেই হয়েছে। কেরিয়ারটার সঙ্গে সঙ্গে রোজগারটাও বাড়াতে পেরেছে। শোভাবাজার থেকে এখন পাচ্ছ কত?”
“একটা আধলাও নয়।”
তপেনের ভ্রূ কুঞ্চিত হল কয়েক সেকেণ্ডের জন্য।
“ফ্রি সার্ভিস এই বাজারে!” চামচা অবাক হল। “অবশ্য কমল লীগে দুটো ছাড়া তো ম্যাচই খেলে না।”
“শুধু দুটো ম্যাচ! কেন, আর খেলে না?” তপেন প্রশ্ন করল চামচাকে।
“লাস্ট টু ইয়ার্স তো কমল শুধু আমাদের এগেন্স্টেই খেলেছে।” চামচা চোখ পিটপিট করল। “যাত্রীকে কিন্তু কাঁপাতে পারেনি কমল। আমরা ফুল পয়েণ্ট তুলেছি। যাত্রীর জার্সি সকলের সামনে খুলে ছুঁড়ে ফেলেছিল বটে, কিন্তু দম্ভ রাখতে পারেনি। ফুটবল কি একজনের খেলা!”
কমলের বলতে ইচ্ছে হল, ‘প্লেয়ার, অফিসিয়াল, রেফারি, সবকিছু ম্যানেজ করেই তো ফুল পয়েণ্ট তুলেছ।’ কিন্তু বলতে পারল না। রথীন স্প্রিংয়ের পাল্লা ঠেলে এই সময় ঘর থেকে বেরোল। সঙ্গে চারটি ছেলে। কমলকে দেখে সে বলল, “অঃ, কখন এলি? তপেনদা দিয়ে দিয়েছেন?”

যাত্রীকে কিন্তু কাঁপাতে পারেনি কমল।
তপেন ঘাড় নাড়তেই রথীন বলল, “আমি টালিগঞ্জের দিকেই এখন যাব। কমল, তুই তো নাকতলায় যাবি, যদি মিনিট কয়েক অপেক্ষা করিস তাহলে আমার সঙ্গে যেতে পারিস।”
কমল বলল, “আমি তোর গাড়িতে গিয়ে বসছি। তুই তাড়াতাড়ি কর।”
তপেন মৃদুস্বরে বলল, “টাকাটা ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হতে হবে না, কমল।”
“কেন?”
“যখন দরকার হবে আমি চেয়ে নেব। তোমার প্রয়োজনের সময় দিতে পেরেছি, শুধু এইটুকু মনে রাখলেই আমি খুশি হব। তুমি বিপদে পড়ে যাত্রীর কাছেই এসেছ এটা ভাবতে আমার ভালই লাগছে।”
শুনতে শুনতে কমলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে এল। সে বলল, “আমি টাকা চেয়েছি রথীনের কাছে, যাত্রীর কাছে নয়। চেয়েছি অন্যের জন্য, নিজের জন্য নয়।”
কমল বলতে যাচ্ছিল, এ টাকা যদি যাত্রীর হয় তাহলে এখুনি ফিরিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু পল্টুদার মুখটা ভেসে উঠতেই আর বলতে পারল না। তার মনে হচ্ছে, অদ্ভুত একটা খাঁচার মধ্যে সে ঢুকে পড়েছে, যার চারদিকটাই খোলা অথচ বেরোন যাচ্ছে না।
তপেন তার স্মিত হাসিটা কমলের মুখের উপর অনেকক্ষণ ধরে রেখে বলল, “যদি আরো টাকার দরকার হয় আমাকে বাড়িতে ফোন কোরো। পল্টু মুখার্জির চিকিৎসায় আমাদেরও সাহায্য করা কর্তব্য। এ টাকা ধার নয় কমল, পন্টুদাকে আমার⋯যুগের যাত্রীর প্রণামী।”
কমল শুনতে শুনতে হঠাৎ নিজেকে অসহায় বোধ করল। তার মনে হচ্ছে, পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বল নিয়ে দুটো ফরোয়ার্ড এগিয়ে আসছে। সে একা তাদের মুখোমুখি। ব্যাকেরা কোথায় দেখার জন্য চোখ সরাবার সময়ও নেই।
গাড়িতে দু’জনের কেউই অনেকক্ষণ কথা বলল না। রেড রোড ধরে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউণ্ডের পশ্চিম দিয়ে যখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের কাছে পৌঁচেছে তখন রথীন মুখ ফিরিয়ে বলল, “অফিসের দুটো খেলায় তুই খেলিসনি!”
“এসব খেলা অর্থহীন, আমার ভাল লাগে না খেলতে। তাছাড়া শোভাবাজারের প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল। কতকগুলো নতুন ছেলে কেমন খেলে দেখার জন্যই গেছলুম।”
“কিন্তু ব্যাঙ্ক চাকরি দিয়েছে তার হয়ে খেলার জন্য।”
কমল চুপ করে রইল।
“এই নিয়ে কথা উঠেছে। তাছাড়া রোজই তুই কাজ ফেলে সাড়ে তিনটে-চারটেয় বেরিয়ে যাস।”
“কে বলল, নিশ্চয় রণেন দাস?”
“যেই বলুক, সেটা কোনো কথা নয়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি তারা মিথ্যে বলেনি।”
পুলিশ হাত তুলেছে। রথীন ব্রেক কষল। ডানদিকে মোড় ফিরে হরিশ মুখার্জি রোডে এবার গাড়ি ঢুকবে। কমল পুলিশটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। রথীন মোড় ঘুরে গিয়ার বদল করে শান্ত মৃদুস্বরে বলল, “বুঝিস না কেন, তোর আর আগের মত নাম নেই, খেলা নেই। এখনকার উঠতি নামী প্লেয়াররা যে অ্যাডভান্টেজ অফিসে পায় বা নেয়, তোর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তোকে এখন চাকরিটাকেই বড় করে দেখতে হবে। তার জন্য যেসব নিয়ম মানতে হয় মেনে চলতে হবে। অন্য পাঁচজনের থেকে তুই এখন আর আলাদা নোস্।”
“আমি আর পাঁচজনের মত—কোনো তফাতই নেই?” কমল প্রায় ফিসফিস করে বলল।
রথীনের মুখে অস্বস্তিকর বেদনার ছাপ মুহূর্তের জন্য পড়ে মিলিয়ে গিয়েই কঠিন হয়ে উঠল।
“বিপুল ঘোষ, রণেন দাস কি সতু সাহার মত কেরানীদের সঙ্গে আমার তফাত নেই, রথীন এ তুই কি বলছিস! আমি ইণ্ডিয়া টিমে খেলেছি, দেশের জন্য আমার কণ্ট্রিবিউশন আছে। জীবনের সেরা সময়ে দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছি, কষ্ট করেছি, লেখাপড়া করার সময় পাইনি, জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি, সংসারের দিকে তাকাইনি। কি স্যাক্রিফাইস ওরা করেছে, বল্? ওরা আর আমি সমান হয়ে যাবে কোন্ যুক্তিতে?”
রথীন চুপ করে থাকল। গাড়ি চালানোয় ওর মনোযোগটাও বেড়ে গেল হঠাৎ।
“আমি এখনো ফুটবলের জন্য কিছু করতে চাই। প্লেয়ার তৈরী করতে চাই। তাই অফিস থেকে আগে বেরোই। আর অফিস লীগে খেলাটা তো এলেবেলে।”
“কমল, আমাদের দেশে খেলোয়াড়কে ততদিনই মনে রাখে যতদিন সে মাঠে নামে। তারপর স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। নতুন ‘হিরো’ আসে, তাকে নিয়ে নাচানাচি করে। দ্যাখ না, যাত্রীতে এখন প্রসুন ভট্চাজকে নিয়ে কী কাণ্ড চলছে, অথচ ওর বাবাকেই একদিন সাপোর্টাররা মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল ঘুষ খেয়েছে বলে। তোকে মনে রাখবে এমন একটা কিছু কর্।”
“রথীন, আমার বয়স হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার মত সামর্থ্য নেই। ফুটবলারের সামর্থ্য তো শরীর।”
“তাহলে মন দিয়ে চাকরিটা কর্। তোকে চাকরি দেওয়ায় ইউনিয়ন থেকে পর্যন্ত অপোজিশন এসেছিল। সবাই বলেছিল উঠতি নামী অল্প বয়সীকে চাকরি দিতে। তুই তো জানিস, সেকেণ্ড ডিভিশনে খেলে, অপূর্ব ছেলেটাকে চাকরি দেওয়া হবে বলে গত বছর আটটা ম্যাচ খেলানো হয়। ভালোই খেলে কিন্তু এখনো চাকরি পায়নি। কমিটি মেম্বররা বড় বড় নাম চায়। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের চারজনের নাম উঠেছিল। আমি তর্ক করে বলি, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, অফিসের খেলায় এইসব বড় ক্লাবের নামী প্লেয়াররা একদমই খেটে খেলে না। ওরা থেকেও টিম হারে। এতে অফিসের কোনো লাভ হয় না। বরং পড়তি প্লেয়াররা ভালো সার্ভিস দেয়। তোর জন্য এ-জি-এম পর্যন্ত ধরাধরি করেছি। এখন তুই যদি অফিসের হয়ে না খেলিস তাহলে আমার মুখ থাকে কোথায়? অফিসে নানাদিকে নানাকথা উঠছে, এ রকম ফাঁকি দিলে তো আমাকে তোর এগেনস্টে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নিতে হবে।”
“কিন্তু আমার পক্ষে শোভাবাজারের ম্যাচের দিন পাঁচটা পর্যন্ত অফিসে থাকা কিংবা অফিসের হয়ে খেলা সম্ভব নয়।”
কমল গোঁয়ারের মত গোঁজ হয়ে বসল। রথীনের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
“অনেকগুলো চাকরি তো ছেড়েছিস। এই বয়সে এই চাকরিটা যদি হারাস, তাহলে কি হবে ভেবে দেখিস। আমার তো মনে হয় না, আর কোথাও পাবি। দেশের লেখাপড়া জানা বেকার ছেলেদের সংখ্যাটা কত জানিস?”
“না, জানি না, জানার ইচ্ছেও নেই। এখানে থামা।”
কমল অধৈর্য ভঙ্গিতে প্রায় চিৎকার করে উঠল। রথীন একটু অবাক হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক কষে গাড়ি থামাল।
“আরো এগিয়ে তোকে নামিয়ে দিতে পারি।”
“না, এখানেই নামব আর টাকাটা কাল তোকে অফিসেই দিয়ে দেবো।”
কমল গাড়ি থেকে নেমে অনাবশ্যক জোরে দরজাটা বন্ধ করে হনহনিয়ে পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করল বাস স্টপের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন