মতি নন্দী
সকাল নটায় অফিসে বেরিয়ে পরদিন রাত নটায়, ছত্রিশ ঘণ্টা পর কমল বাড়ি ফিরল। চোখ দুটি লাল, চুল এলোমেলো, ক্লান্তিতে নুয়ে পড়েছে সটান শরীরটা।
একতলায় দুটি ঘর নিয়ে কমল থাকে। একটিতে সে, অপরটিতে অমিতাভ। দুটি লোকের এই সংসারের যাবতীয় কাজ ও রান্না করে দিয়ে কালোর মা রাতে চলে যায়। দশ বছর আগে শিখা মারা যাবার পরই সাত বছরের অমিতাভকে তার দিদিমা গৌহাটিতে নিয়ে চলে যান। দু’বছর আগে সে বাবার কাছে ফিরেছে। প্রথমে দু’জনের সম্পর্কটা ছিল স্কুলে ভর্তি হওয়া নতুন দুটি ছেলের মত।
দু’ বছরেও কিন্তু ওদের মধ্যে ভাব হয়নি। ওরা কথা কমই বলে, দু’জনে দু’জনকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। কেউ কারুর ঘরে পর্যন্ত ঢোকে না। তবে একবার রেজেস্ট্রি চিঠি সই করে নেবার জন্য অমিতাভর ঘরে কমল ঢুকেছিল কলমের খোঁজে। একটা খাতার মধ্যে কলম পায়। তখন দেখেছিল, খাতাটা কবিতায় অর্ধেক ভরা আর টেবিলের উপর থাক দিয়ে রাখা বইয়ের ফাঁকে অমিতাভর মায়ের ফোটো। ছবিটা কমলের ঘরে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে ছিল। কমল দুঃখ পেয়েছিল। অমিতাভ তার মা’র ছবিটা চুরি না করে যদি চেয়ে নিত তাহলে সে খুশিই হতো। মেধাবী গম্ভীর মৃদুভাষী ছেলেকে কমল ভালোবাসে। শুধু অস্বস্তি বোধ করে তার দুর্বল পাতলা শরীর ও পুরু লেন্সের চশমাটার দিকে তাকালেই। অমিতাভ তার বাবাকে ‘আপনি’ বলে। কমলের ইচ্ছে ও ‘তুমি’ বলুক।
অমিতাভর ঘরে আরো দুটি ছেলে বসে কথা বলছে। কমল একবার সেদিকে তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। ইজিচেয়ারটা পাতাই ছিল, তাতে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। একে একে তার মনে ভেসে উঠতে লাগল গত চব্বিশ ঘণ্টার ব্যাপারগুলো। কান্না, ছোটা-ছুটি, টেলিফোন করা, শ্মশান যাওয়া, আবার পল্টুদার নাকতলার বাড়ি। পল্টুদার জামাইরা এসেছিল, তাদের আর্থিক সঙ্গতিও ভাল নয়। একশোটা টাকা খুবই কাজে লেগেছে।
পায়ের শব্দে কমল চোখ খুলল। অমিতাভ, তার পিছনে ছেলে দুটি।
“এরা আমার কলেজের বন্ধু, আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছে।” অমিতাভর বিব্রত স্বর কমলের কানে বিশ্রী লাগল। ক্লান্ত ভঙ্গিতে সে বলল, “আজ থাক, অন্য আর একদিন এসো। আজ আমার শরীর মন দুটোই খারাপ।”
কথা না বলে ওরা চলে গেল। কমল আবার চোখ বন্ধ করল এবং মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
প্রতিদিনের মত ঠিক পাঁচটায় ওর ঘুম ভাঙল। ঘরের আলোটা পর্যন্ত নেভান হয়নি, জামা-প্যান্টও বদলান হয়নি। কমল তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই সে হীটারে চায়ের জল বসিয়ে, প্রতিদিনের মত অমিতাভর ঘরের দরজায় কয়েকটা টোকা দিয়ে, খাওয়ার টেবিলে এসে অপেক্ষা করতে লাগল। অমিতাভ এসে যখন চেয়ার টেনে বসল তখন চা তৈরী হয়ে গেছে।
“পরশু আমার গুরু মারা গেলেন, তাই বাড়ি ফেরা হয়নি।”
অমিতাভ ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, “কে?”
“পল্টু মুখার্জি।” কমল আর কিছু না বলে অমিতাভর একমনে রুটিতে জেলি মাখানো দেখতে লাগল।
“তুমি অবশ্য ওঁর নাম নিশ্চয় শোনোনি।”
“না। খেলার আমি কিছুই জানি না।”
“পল্টুদা হচ্ছেন,” কমল উৎসাহ দেখিয়ে বলে উঠল, “সাহিত্যে যেমন ধরো⋯”
অমিতাভর পুরু লেন্সের ওধারে চোখ দুটোকে কৌতুকভরে তাকিয়ে থাকতে দেখে কমল ঘাবড়ে গেল।
“যেমন রবীন্দ্রনাথ?”
“না না, অতবড় নয়!” কমল অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। এবং অবস্থাটা কাটিয়ে ওঠার জন্য মরিয়া হয়ে বলল, “কিন্তু আমার জীবনে উনি রবীন্দ্রনাথের মতই।”
“তাহলে আপনি খুবই আঘাত পেয়েছেন।”
কমল চুপ করে রইল।
“মা মারা যেতে আঘাত পেয়েছিলেন কি?”
কমল তীব্র দৃষ্টিতে অমিতাভর দিকে তাকাল। সে মাথা নামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল।
“তোমার মা মানিয়ে নিতে পারেনি আমার জীবনকে, আকাঙ্ক্ষাকে। একজন ফুটবলারের স্ত্রী হতে গেলে তাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়, সহ্য করতে হয়। তা করার মত মনের জোর তার ছিল না। ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়ে থেকেছি, টুর্নামেণ্ট খেলতে বাইরে গেছি—এ-সব সে পছন্দ করত না। তাই নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হত। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই যাত্রীর সঙ্গে রোভার্সে খেলতে যাই। তখনি ঘটনাটা ঘটে।”
“মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর আপনাকে টেলিগ্রাম করা হয়েছিল। কিন্তু আপনি আসেননি।” অমিতাভ কঠিন ঠাণ্ডা গলায় অভিযুক্ত করল কমলকে। ‘আসেননি’-র পর নিঃশব্দে একটি ‘কেন’ আপনা থেকেই ধ্বনিত হলে কমলের কানে। সঙ্গে সঙ্গে রাগে পুড়ে গেল তার মুখের কোমল বিষাদটুকু।
“আগেও বলেছি তোমায়, সেই টেলিগ্রাম আমাদের ম্যানেজার গুলোদর হাতে পড়ে। সেটাকে তিনি চেপে রাখেন, কেননা পরদিনই ছিল হায়দ্রাবাদ পুলিশের সঙ্গে সেমি-ফাইনাল খেলা। আমাকে বাদ দিয়ে যাত্রীর পক্ষে খেলতে নামা সম্ভব ছিল না।” কথাগুলো বলতে বলতে কমল তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল অমিতাভর দিকে।
বাঁকানো ঠোঁটের কোলে মোটাদাগে আগের মতই অবিশ্বাস ফুটে রয়েছে। আজও ওকে বোঝানো গেল না, টেলিগ্রামটা পেলে সে অবশ্যই খেলা ফেলে বোম্বাই থেকে ছুটে আসত।
কমল খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ল। ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িতে হাত বোলাল। বেশ বড় হয়েছে। কিন্তু অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না। দাড়ি না কামালেও চলে। গালে। কয়েকটা পাকা চুল। কমল কাঁচি দিয়ে সেগুলো সাবধানে কাটতে বসল।
সদর দরজা খোলার শব্দ হলো। কালোর মা বোধহয়, কিংবা খবরের কাগজওলা। কমল কাঁচি রেখে প্যাণ্টের পকেট থেকে টাকা বার করতে লাগল। বাজার করে কালোর মা। টাকা পেতে দেরি করলে গজগজ শুরু করে।
“কমল দা!”
সলিল ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছে।
“কি রে, এত সকালে?”
“মাঠ থেকে আসছি। প্র্যাকটিস করতে গেছলুম।”
“তোর না পায়ে চোট!”
“ডাক্তারবাবু বললেন কিছু নয়, রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।” সলিল খাটের উপর বসল। কমলের মনে হলো ও যেন অন্য কিছু বলতে এসেছে।
“পল্টুদা মারা গেলেন?”
“হুঁ। তিয়াত্তর বছর বয়স হয়েছিল।” কমল দাড়ি কাটতে কাটতে আয়নার মধ্যে দিয়ে সলিলকে লক্ষ্য করতে লাগল।
“কিছু বলবি আমায়?”
সলিল মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুলটা মেঝেয় কিছুক্ষণ ঘষাঘষি করে ধরা গলায় বলল, “কমলদা, দু’দিন আমাদের কিছু খাওয়া হয়নি। আমাদের সংসারে আটটা লোক।”
কমল ভেবে পেল না এখন সে কি বলবে! এ রকম কথা প্রায়ই সে শোনে ময়দানে। প্রথম প্রথম একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের মধ্যে কেঁপে উঠত, এখন শুধু তার চোয়ালটা শক্ত হয়ে যায়।
“একটা কার্ডবোর্ড কারখানায় কাজ পেয়েছি, হপ্তায় আঠারো টাকা। আজ থেকেই কাজে লাগতে হবে।”
“ফুটবল?”
সলিল আবার মাথা নামিয়ে চুপ করে রইল। কমল দেখল, টসটস করে ওর চোখ বেয়ে জল পড়ছে। তারপর নিঃসাড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওকে ডাকবে ভেবেও কমল ডাকল না।
জীবনে প্রথম বড় সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে ছেলেটা। এখন ওর মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছে ফুটবলের সঙ্গে সংসারের। আকাঙ্খার সঙ্গে মায়া-মমতা-ভালবাসার। যদি ফুটবলকে ভালবাসে, বড় খেলোয়াড় হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যদি থাকে, তাহলে ওকে নিষ্ঠুর হতে হবে। সংসারের সুখ-দুঃখ থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। বাঙালীরা বড় কোমল। বেশির ভাগ ছেলেরাই তা পারে না। সংসারের সর্বগ্রাসী হাঁ-এর মধ্যে ঢুকে যায়। ও নিজেই সিদ্ধান্ত নিক। দু-চার টাকা দিয়ে করুণা করে ওকে ফুটবলার হয়ে ওঠায় সাহায্য করা যাবে না।
কমলের নিজের কথা মনে পড়ে গেল। মা মারা যাবার পর সংসার দেখাশুনোর জন্য জোর করে বাবা তার বিয়ে দেয়। তখন বয়স মাত্র কুড়ি। তারপর অদ্ভুত একটা লড়াই তাকে করে যেতে হয় অমিতাভর মায়ের সঙ্গে। কিন্তু ছেলে সে-সব কথা বুঝবে না। ওর বন্ধুরা আগ্রহ নিয়ে আলাপ করতে আসে অথচ অমিতাভ তার বাবার খেলা সম্পর্কে উদাসীন। একদিনও বলেনি, টিকিট দেবেন—খেলা দেখতে যাব! কমলের বহু দিনের সাধ ছেলে তার খেলা দেখতে আসুক।
“বাবা, দর্জির দোকান থেকে আজ প্যাণ্টটা আনার তারিখ।”
“আজকেই,” কমল ব্যস্ত হয়ে চাবি নিয়ে দেরাজের দিকে এগোল। “কত টাকা?”
“কুড়ি।”
টাকাটা অমিতাভর হাতে দেবার সময় কমলের মুহূর্তের জন্য মনে পড়ল, সলিল হপ্তায় মাত্র আঠারো টাকা মাইনের একটা চাকরি নিচ্ছে। অমিতাভ আর সলিল প্রায় এক বয়সী হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন