মতি নন্দী
বাড়ি ফিরেই কমল শুনল যে, কালোর মা গজগজ করে চলেছে, “বাইরের লোকের প্যাণ্ট আমি কেন কাচব? বাইরের লোকের খাওয়া এঁটো বাসন মাজতে হবে, এমন কথা তো বাপু ছিল না। মাইনে না বাড়ালে আমি আর বাড়তি কাজ করতে পারব না।” ইত্যাদি ইত্যাদি।
“বাইরের লোকটা আবার কে?” কমল কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করে।
“কেন, দাদাবাবুর যে বন্ধুটি থাকে!”
“থাকে! দাদাবাবুর বন্ধু?”
“কেন, আপনি জানেন না?” কালোর মা বিস্ময়ে চোখ কপালে তোলার উপক্রম করতে কমল আর কথা বাড়াল না।
রাত্রে কমলের মনে হল, অমিতাভর ঘরে চাপা স্বরে কারা কথা বলছে। সকালে অমিতাভর ঘরের সামনে দিয়ে যাতায়াত করবার সময় খুটিয়ে ঘরের মধ্যে লক্ষ্য করে সে কিছুই বুঝতে পারল না। ভাবল, অমিতাভকে জিজ্ঞাসা করবে।
অফিসে বেরোবার সময় অমিতাভ তার কাছে কুড়িটা টাকা চাইল। এক সপ্তাহে চল্লিশ টাকা দিয়েছে, তাই কমল অস্বস্তিভরে বলল, “হঠাৎ এত ঘন ঘন টাকার দরকার হচ্ছে যে? আমি যা মাইনে পাই তাতে এভাবে চললে কুলিয়ে ওঠা তো সম্ভব হবে না।”
“এক বন্ধুর অসুখ, তাকে ওষুধ কিনে দেবার জন্য—” অমিতাভ ঢোঁক গিলে বলল।
“কালোর মা বলছিল তোমার এক বন্ধু নাকি এখানে খায়?”
“তিন-চারদিন খেয়েছে। আর খাবে না।”
টাকা দেবার সময় কমল বলল, “খাওয়ার জন্য আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না।”
এরপর কমল লক্ষ্য করল, অমিতাভ যেন ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। গম্ভীর ভারিক্কি ভাবটা আর নেই, চলাফেরায় চঞ্চলতা দেখা যাচ্ছে, চেঁচিয়ে হঠাৎ গানও গেয়ে ওঠে, এমনকি একদিন সকালে উঠে চা তৈরী করে সে কমলকে ডেকে তুলেছে। কমল লজ্জা পেয়ে তাড়া-তাড়ি বলে, “খেলা ছেড়ে দিয়ে দেখছি অভ্যাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সকালের এক্সারসাইজটা আবার শুরু করতে হবে কাল থেকে।”
“আপনি খেলা ছেড়ে দিয়েছেন?” অবাক হয়ে অমিতাভ জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
কমল জবাব না দিয়ে বাজার রওনা হয়। সেইদিন শোভাবাজার টেণ্টে গিয়ে সে শোনে, মহমেডানের সঙ্গে খেলায় বলাই ও অ্যামব্রোজ মারপিট করায় রেফারী দু’জনকেই মাঠ থেকে বার করে দিয়েছে, আর শ্রীধরের হাঁটুর পুরনো চোটটায় আবার লেগেছে, যার ফলে তার দাঁড়াবার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। টেণ্টে সকলেরই মুখ শুকনো দুশ্চিন্তায় কপালে কুঞ্চন। খেলার মত এগারজন প্লেয়ার এখন শোভাবাজারের নেই। সহ-সম্পাদক অবনী মণ্ডল ওকে দেখে ছুটে এসে বলে, “কমলবাবু, আপনার কাছেই যাব ভাবছিলুম! আপনাকে বাকি ম্যাচ তিনটে খেলতে হবে।”
“না।” কমল গম্ভীর স্বরে বলে, “আমি আর খেলব না।” তারপর সে টেণ্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে হতভম্ব অবনী মণ্ডলকে ফেলে রেখে।
অস্বস্তিপূর্ণ মন নিয়ে কমল বাড়ি ফিরল। শোভাবাজার এখন সত্যিই দুরবস্থায়। অথচ সে বলে এল খেলবে না। এই ক্লাব থেকেই সে গড়ের মাঠে খেলা শুরু করেছিল। ব্যাপারটা নেমকহারামির মত লাগছে। ইচ্ছে করলে তিনটে ম্যাচ এখন সে অনায়াসে খেলে দিতে পারে। শেষ ম্যাচটা যাত্রীর সঙ্গে। গুলোদার বিদ্রূপভরা কথা-গুলো কমলের কানে বেজে উঠল। তপেন রায়ের হাতে একশো টাকার নোটটা দেবার আগে সে বলেছিল, আর খেলব না। তখন দাউদাউ আগুন জ্বলছিল মাথার মধ্যে। আর এখন শুধু ছাই হয়ে পড়ে আছে তার প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছাটা।
অমিতাভর ঘর অন্ধকার। কমল নিজের ঘরে ঢুকে জামা-প্যাণ্ট বদলে ইজিচেয়ারে গা ঢেলে দিল আলো নিভিয়ে। কুড়ি বছরের খেলার জীবনের অজস্র কথা আর দৃশ্য মনের মধ্যে ভীড় করে ঠেলাঠেলি করছে। তার মধ্যে বার বার দেখতে পাচ্ছে পল্টুদাকে, শুনতে পাচ্ছে তার গলার স্বর—“প্র্যাকটিসটা আরো ভালো কর। হতাশা আসবে, তাকে জয় করতেও হবে⋯তুই খেলা ছেড়ে দিবি বলছিস, তার মানে তুই বড় খেলোয়াড় হতে পারিসনি।”
না, পারিনি। কমল বার বার নিজেকে শোনাতে থাকে, পারিনি, পারিনি, আমি হতে পারিনি। আমার মধ্যে প্রশান্তি আসেনি। অনেক কিছুই অপূর্ণ রয়ে গেছে।
অমিতাভর ঘরের দরজা খোলার এবং আলো জ্বালানোর শব্দ হল। কমলের মনে পড়ল আজ সকালে সে স্কিপিং দড়িটা খুঁজে পায়নি। অমিতাভ কি কোন কাজে নিয়ে গেছে তার ঘরে! জিজ্ঞাসা করার জন্য সে উঠল। আলো জ্বালল। চটি পরে ‘অমিত’ বলে ডেকে ঘর থেকে বেরোবার সময় তার মনে হল, পাশের ঘরে দ্রুত একটা ঘষড়ানির শব্দ হল। দ্রুত অমিতাভর ঘরের দরজায় পৌঁছে সে দেখল, খাটের নীচে কেউ ঢুকে যাচ্ছে, পলকের জন্য দুটি পা শুধু দেখতে পেল।
চোর! কমল থমকে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও চেঁচাল না। পা দুটো তার চেনা মনে হল। প্যাণ্টের যতটুকু দেখতে পেয়েছে, সেটাও খুব পরিচিত। সলিল!
দু’হাতে পাঁউরুটি নিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে অমিতাভ থমকে তারপর আড়ষ্ট হয়ে গেল কমলকে খাটে বসে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে দেখে।
“পাঁউরুটি! কেন, ভাত রান্না হয়নি?”
“আজ শরীরটা ভাল নয়, তাই—”
“এতগুলো? এ তো প্রায় দু’জনের মত দেখছি।”
“কালকের জন্যও এনে রাখলুম।”
কমল গম্ভীর মুখে আবার কয়েকটা পাতা উলটিয়ে গেল। অমিতাভ সন্তর্পণে ঘরের চারধারে চোখ বুলিয়ে নিল।
“ফুটবল যারা খেলে তাদের তুমি ঘৃণা করো। যেমন আমায় করো।” কমল অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে, কিন্তু প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, “তোমার মা’র মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী ভেবে তুমি কখনো আমায় সহজভাবে নিতে পারনি, বাপ-ছেলের স্বাভাবিক সম্পর্ক আমাদের যেন হয়নি। হ্যাঁ, স্বীকার করি, তাকে অবহেলা করে আমি ফুটবলকেই বড় করে দেখেছি। আমি শুধু জানতে চাই, আমার প্রতি ঘৃণাটা তোমার আছে কি এখনো?”
অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি বুঝতে পারছি না, হঠাৎ এসব কথা বলছেন কেন?”
“কৌতূহলে। তোমার কি কখনো কৌতূহল হয় না, খেলার জন্য তোমার মাকে অগ্রাহ্য করেছে যে লোক, তার খেলা একবারও দেখার?”
“হয়, কিন্তু ওই কারণে নয়। ফুটবলকে এত ভালবেসে শেষে অপমান ও তাচ্ছিল্য নিয়ে খেলা থেকে সরে যাচ্ছে যে লোকটি, তার খেলা একবার দেখতে ইচ্ছে করে।”
কমল তীব্র চোখে তাকাল ছেলের দিকে। অমিতাভ অচঞ্চল।
“শুধু এইজন্য ইচ্ছে করে?”
“না। খেলাকে ভালবাসলে মানুষ কি পরিমাণ পাগল হয়, সেটা দেখতে দেখতেই আমার কৌতূহল জেগেছে।”
“কাকে দেখে, সলিলকে?”
অমিতাভ চমকে উঠে কমলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিস্ময় তার সারা মুখে।
“তুমি ওকে আশ্রয় দিয়েছ কেন?” কমল কঠিন স্বরে প্রশ্ন করল।
“ও আমাকে অবাক করেছে। সেদিন অমানুষিক মার খাবার পর বলেছিল, কমলদার মত আমার মাথায় দাগ, তৈরী হবে না, আমার মাথা ফাটেনি। এই বলে ও কেঁদেছিল। ও আশ্রয় চেয়েছিল, আমি আশ্রয় দিয়েছি। এই ঘরে। ভোরে বেরিয়ে যায়, দুপুরে আসে, বিকেলে বেরিয়ে রাত্রে আসে। ও নিজের বাপ-মা ভাই-বোনদের ত্যাগ করেছে। ওর মধ্যে আমি অনেক কিছু না-বোঝা ব্যাপার বুঝতে পেরেছি।”
“কি বুঝেছ, কি বুঝেছ?” কমল উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠল। “আমার কোন দোষ ছিল না। খেলা শুধু শারীরিকই নয়, একটা মানসিক ব্যাপারও—সেটা বুঝেছ কি?”
“আপনার খেলা দেখার পর সেটা বুঝব।”
“তুমি আমার খেলা দেখবে!” কমল হাত বাড়িয়ে ধীরে ধীরে হাতটা নামিয়ে নিল। অমিতাভ মাথাটা কাত করল।
কমল পরদিন অফিস থেকে শোভাবাজার টেণ্টে ফোন করল, “আমি খেলব, যাত্রীর সঙ্গে খেলাটায়।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন