মতি নন্দী
বাসে উঠে দমবন্ধ করা ভীড়ে কমল মাথার উপরের রড ধরে মনে করতে চেষ্টা করল পুরনো কথা। তেরো বছর আগে প্রথমবার যুগের যাত্রীতে খেলার সময় রথীন ছিল রাইট ব্যাক, কমল স্টপার। রথীন সে বছর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ক্যাপ্টেন হয়ে লখনৌ থেকে স্যার আশুতোষ ট্রফি এনেছে। মোটামুটি কাজ চালাবার মত খেলত। তখন ডাকত ‘কমলদা’। রথীন ছিল গুলোদার খুবই প্রিয়পাত্র। মালয়েশিয়ায় নতুন টুর্নামেণ্ট শুরু হয়েছে মারডেকা নামে। ইণ্ডিয়া টিম খেলতে যাবে। বোম্বাইয়ে ট্রেনিং ক্যাম্পে বাংলা থেকে বারো-জন গিয়েছিল। যাত্রী থেকে তিনজন—রথীন, আমিরুল্লা আর সুনীত। বলা হয়েছিল, কমলের হাঁটুতে চোট আছে তাই ট্রায়ালে পাঠানো হয়নি, তাছাড়া চোখেও নাকি কম দেখছে। দুটোই ডাহা মিথ্যে কথা।
কমল সামান্য একটু চোট পেয়েছিল ইস্টার্ন রেলের সঙ্গে খেলায়। পরের ম্যাচে কমল বসে, রথীন স্টপারে খেলে কালিঘাটের বিরুদ্ধে।
ভালোই খেলেছিল। তার পরের ম্যাচে এরিয়ান্সের কাছে একগোলে যাত্রী হারে। কমল একটা হাই ক্রসের ফ্লাইট বুঝতে না পেরে হেড করতে গিয়ে ফসকায়। সেণ্টার ফরোয়ার্ড পিছনে ছিল, বলটা ধরেই গোল করে। খেলার পর ক্লাবে কানাঘুষো শোনা যায়, কমল চোখে ভাল দেখতে পাচ্ছে না।
কমল ছুটে গেছল পল্টু মুখার্জির কাছে।
“পল্টুদা, এরা আমায় বসিয়ে দিল একেবারে।”
“সে কি রে, একেবারে বসে গেছিস!” পল্টুদা সদর দরজার বাহরে একচিলতে সিমেন্টের দাওয়ায় ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে কাগজ পড়ছিলেন। খুব একচোট প্রথমে হো হো করে হাসলেন।
“বসে গেছিস? কই দেখছি না তো, দিব্বি তো দাঁড়িয়ে আছিস।”
“না পল্টুদা, ঠাট্টা নয়। আর ভালো লাগছে না কিছু। আমি খেলা ছেড়ে দেব।”
“ভালো লাগছে না বুঝি! আচ্ছা, ভালো লাগার ব্যবস্থা করছি। এখান থেকে একদৌড়ে যাদবপুর স্টেশন যাবি আর একদৌড়ে আসবি। এখুনি।”
কমল কথাটাকে আমল না দিয়ে বলল, “আমি সত্যিই খেলা ছেড়ে দেবো। এমন জঘন্য অন্যায়, নখের যুগ্যি নয় রথীন, সে—” বলতে বলতে কমল থেমে গেল।
পল্টুদা ইজিচেয়ারে খাড়া হয়ে বসেছেন। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। দু’চোখে ঘনিয়ে উঠেছে রাগ।
“অরু!” পল্টুদা ঘরের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় ডাকলেন, “অরু, শুনে যা।”
পল্টুদার বড় মেয়ে অরুণা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই পল্টুদা বললেন, “আমার লাঠিটা নিয়ে আয়।”
কমল শোনা মাত্র অজান্তে এক-পা পিছিয়ে গেল। অরুণা অবাক হয়ে বলল, “এখন আবার কোথায় বেরোবে?”
“লাঠিটা নিয়ে আয় বলছি।” পল্টুদা হুঙ্কার দিলেন।
বাচ্চা ছেলের মত কমলের সন্ত্রস্ত মুখটা দেখে অরুণা আঁচ করতে পারল যে, লাঠি আনার কাজটা উচিত হবে না। এ রকম দৃশ্য সে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। শুধু মজা করার জন্য বলল, “মোটা। লাঠিটা আনব বাবা?”
পল্টুদা উত্তর দিলেন না। অরুণা ঘরের দিকে পা বাড়ানো মাত্র কমল আর একটিও কথা না বলে ঘুরেই দ্রুত ছুটতে শুরু করল। যতক্ষণ দেখা যায় অপসৃয়মান ছুটন্ত কমলকে দেখতে দেখতে পল্টুদা। এগিয়ে গেলেন। রাস্তার ধারে এসে থুতনি তুলে চেষ্টা করলেন কমলকে দেখার।

পল্টুদা ইজিচেয়ারে খাড়া হয়ে বসেছেন।
অবাক হয়ে রাস্তার লোকেরা তাকিয়ে। বহুলোক কমলকে চেনে। এতবড় এক নামকরা ফুটবলারকে জুতো, জামা আর ফুলপ্যাণ্ট পরা অবস্থায় সকাল আটটার সময় গিজগিজ ভীড়ের রাস্তা দিয়ে ছুটতে দেখবে, এমন দৃশ্য তারা কল্পনাও করতে পারে না।
পল্টুদা অবসন্নের মত ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। বাঁ হাতটা চোখের উপর রাখলেন। অরুণা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাবার কপালে সে হাত রাখতেই পল্টুদা চোখ থেকে বাঁ হাতটা নামালেন। জলের শীর্ণ ধারা দু’টি গাল বেয়ে নেমে আসছে।
“মনে বড় দাগা পেয়েছে ছেলেটা। দুঃখ তো জীবনে আছেই, কিন্তু এমন অন্যায় পথ ধরে দুঃখগুলো কেন যে আসে!” পল্টুদা আবার চোখের উপর হাত রাখলেন।
অনেকক্ষণ পর পল্টুদার রান্নাঘরের জানালায় উকি দিল দরদর ঘাম-ঝরা আর পরিশ্রমে লাল হয়ে ওঠা কমলের মুখ।
“অরু!”
অরুণা মুখ তুলল বাটনা বাটা বন্ধ করে।
“কমলদা? এখনো তো—।”
“অ্যাঁ, এখনো?”
“হ্যাঁ, লাঠিটা তো হাতেই রেখেছে দেখলাম। তুমি যাদবপুর স্টেশন পর্যন্ত ঠিক গেছ তো?”
“ফুটবলের দিব্যি।”
“দাড়াও দেখে আসি।”
আধ মিনিট পরেই অরুণা ফিরে এসে বলল, “সদর দরজা দিয়ে এসো। না, হাতে লাঠি নেই আর।”
পল্টুদা তখন ছুঁচ-সুতো নিয়ে জামায় বোতাম লাগাতে ব্যস্ত। কমলকে একনজর দেখে বললেন, “খেয়ে এসেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“ছেলে কেমন আছে? বয়স কত হল?”
“ভালো, পাঁচ বছর পূর্ণ হবে এই সেপ্টেম্বরে।”
“প্র্যাকটিসটা আরো ভালো করে কর্। হতাশা আসবে, তাকে জয় করতে হবে। ইণ্ডিয়া টিমে খেললেই কি বড় প্লেয়ার হয়? বড় তখনই হয়, যখন সে নিজে অনুভব করে মনের মধ্যে আলাদা এক ধরনের সুখ, প্রশান্তি। সেখানে হতাশা পৌঁছয় না। তুই খেলা ছেড়ে দিবি বলছিস, তার মানে তুই বড় খেলোয়াড় হতে পারিসনি।”
কমল মাথা নিচু করে কাঠের মত দাঁড়িয়ে থাকে। একটা অদ্ভুত ক্ষোভ আর কান্না মিলেমিশে তখন তার বুকের মধ্যে দুলে উঠেছিল।
আর এখন, তেরো বছর আগের ওইসব কথা মনে করতে করতে যখন সে বাস থেকে নেমে মিনিট চারেক হেঁটে পল্টুদার বাড়িতে ঢুকল, তখন একটা অদ্ভুত মমতা আর বেদনা কমলের বুকের মধ্যে ফেঁপে উঠছিল। থাক্ দেওয়া তিনটে বালিশের উপর হেলান দিয়ে পল্টুদা আধশোয়া। ওকে দেখে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।
“ভালই আছি।” মৃদুস্বরে পল্টুদা বললেন।
“কথা বলা একদম বারণ।” অরুণা কথাটা বলল কমলকে লক্ষ্য করে।
কমল তাকাল অরুণার দিকে। সাদা থান পরনে। পাঁচ বছর আগে বিধবা হয়ে একটি ছেলে নিয়ে বাপের বাড়িতেই রয়েছে। এখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। পল্টুদা আরো তিনটি মেয়ের বিয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। স্ত্রী দু’বছর আগে মারা গেছেন। সংসারে ছোট মেয়ে বরুণা ছাড়াও আছে এক বিধবা বোন। শুকনো মুখে তারা খাটের ধারে দাঁড়িয়ে। অরুণার ছেলে পিন্টু, দাদুর খাটের একধারে বসে।
“কেমন আছেন?” কমল ফিসফিস করে অরুণাকে জিজ্ঞেস করল। “ডাক্তার দেখানো হয়েছে?”
“হ্যাঁ, বললেন কিছু করার নেই।”
“ওষুধ?”
“দিয়েছেন লিখে। আনা হয়নি। বাবাই বারণ করলেন।”
“প্রেসক্রিপসানটা দাও।” কমল হাত বাড়াল।
পল্টুদা ওদের দিকেই তাকিয়েছিলেন। ক্লান্ত এবং গম্ভীর স্বরে বললেন, “আমার জন্য আর টাকা নষ্ট করার দরকার নেই।”
বাড়ানো হাতটা কমল সন্তর্পণে নামিয়ে নিল।
“আর কেউ আসেনি?” কমলের প্রশ্নে অরুণা মাথা নাড়ল। পল্টুদার হাতে গড়া চারজন প্লেয়ার ইণ্ডিয়া টিমে খেলেছে, পনেরোজন বেঙ্গল টিমে।
“ব্যালান্স, কমল, ব্যালান্স কখনো হারাসনি। আমি ব্যালান্স রাখতে পারিনি তাই কিছুই রেখে যেতে পারছি না, একমাত্র তোকে ছাড়া।” পল্টুদা ডান হাতটা পিন্টুর মাথায় রেখে চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন, “এই পৃথিবীটা ঘুরছে ব্যালান্সের ওপর। মানুষ হাঁটে ব্যালান্সে, দৌড়ায়, ড্রিবল করে, এমন কি মানুষের মনও রয়েছে ব্যালান্সের ওপর। চালচলনে, ব্যবহারে ও চিন্তাধারায় কখনো ব্যালান্স হারাসনি। কে আমায় দেখতে এল কি এল না, তাই নিয়ে আমার আর কিছু যায়-আসে না। তুই এসেছিস, জানতুম তুই আসবি।” একমুহূর্ত থেমে বললেন, “এদের তুই একটু দেখিস। আজ তোর কাছে এইটেই আমার শেষ চাওয়া।”
“পল্টুদা, আমি থাকলে আপনি কথা বলেই যাবেন, তার থেকে আমি বরং চলে যাই।”
“পারবি যেতে?” মুচকি হাসলেন পল্টুদা, “যদি বলি আমার সামনে তুই শুধু দাঁড়িয়ে থাক্। আমি তোক দেখব আর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠবে তোর বল কন্ট্রোল, মুখ তুলে বলটাকে পায়ে স্ট্রোক দিতে দিতে এগিয়ে যাওয়া, এধার ওধার তাকানো। আমার তখন কেন জানি না অভিমন্যুর কথা মনে পড়ত। শুটিংয়ের পর ফলো থ্র-র ভঙ্গিটা, আর সেই ডজটা। ডান দিকে হেলে, বাঁ দিকে ঝুঁকেই আবার ডান দিকে—একটুও স্পিড না কমিয়ে। পারিস এখনো?”
“না। আমার বয়স হয়ে গেছে পল্টুদা।”
“না, হয়নি। চেষ্টা করলেই পারবি। করবি?”
কমল বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল—পল্টুদার মুখের দিকে। শীর্ণ মুখে দুটি চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। কিন্তু কি অদ্ভুত জ্বলজ্বল করছে। প্রায় কুড়ি বছর আগে অমন করে তাকাতেন।
“তুই আমার কাছ থেকে যা শিক্ষা পেয়েছিস সেটা দেখাবি?” পল্টুদার সেই হুকুমের গলা নয়, মিনতি।
কমলের হাত অদৃশ্য সুতোর টানে পুতুলের মত মাথায় উঠে গেল। চুলগুলো ফাঁক করে মাথা হেঁট করল পল্টুদাকে দেখাবার জন্য। তারপর আস্তে আস্তে মাথাটা হেলিয়ে অস্ফুটে বলল, “হ্যাঁ করব।”
তার চোখে পড়ল খাটের নীচে একটা রবারের বল, সম্ভবত পিণ্টুর। কমল বলটা পা দিয়ে টেনে আনল। চেটোর তলা দিয়ে বলটাকে ডাইনে বাঁয়ে খেলালো। তাই দেখে পিণ্টু খাট থেকে নেমে গুটিগুটি কমলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ কচি পা-টা বাড়িয়ে দিল। বলটা ছিটকে দেয়ালে গিয়ে লাগল। ঘরে একমাত্র পিণ্টু ছাড়া আর কেউ হেসে উঠল না।
ছিলে-টানা ধনুকের মত কমল কুঁজো হয়ে গেল নিজের অজান্তেই। সামনে যেন একজন প্রতিদ্বন্দ্বী বল কেড়ে নিতে অপেক্ষা করছে। কমল একদৃষ্টে পিণ্টুর দিকে তাকিয়ে বলটাকে চেটো দিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে, সামনে-পিছনে গড়িয়ে গড়িয়ে সারা ঘরটা ঘুরতে লাগল, পিণ্টু, এলোপাথাড়ি লাথি ছুঁড়ছে, বলে পা লাগাতে পারছে না। কমল হঠাৎ একটা পাক দিয়ে পিন্টুর মুখোমুখি দাড়িয়ে কোমর থেকে শরীরের উপরটা ডাইনে ঝাঁকিয়ে, বাঁয়ে হেলেই সিধে হয়ে গেল। পিন্টু, ব্যালান্স হারিয়ে মেঝেয় পড়ে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে সকলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লাফ দিয়ে উঠে অরুণাকে জড়িয়ে ধরল লজ্জা লুকোবার জন্য।

কমলের কোন খেয়াল নেই।…আপন মনে বলটাকে নিয়ে দুলে দুলে সারা ঘর ঘুরছে।
কমলের কোন খেয়াল নেই। আস্তে আস্তে সে ভুলে গেল ঘরটাকে, ঘরের মানুষদের, মৃত্যুপথযাত্রী পল্টুদাকেও। তার মনে হচ্ছে সে মাঠেই নেমে খেলছে। গ্যালারী ভরা দর্শক তাকে তুমূল উচ্ছ্বাসে তারিফ জানাচ্ছে। প্রমত্ত নটরাজের মত কমল বুঁদ হয়ে আপন মনে বলটাকে নিয়ে দুলে দুলে সারা ঘর ঘুরছে। কাল্পনিক প্রতিপক্ষকে একের পর এক কাটাচ্ছে। বলটাকে পায়ের পাতার উপর তুলে নাচাতে নাচাতে ঊরুর উপর, সেখান থেকে কপালে। আবার ঊরু, আবার পাতায়—কমলের সর্বাঙ্গে বল খেলা করছে।
পল্টুদা নিৰ্ণিমেষে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। মুখ হাসিতে ভরে রয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুঁজলেন।
কিছুক্ষণ পর মৃদুস্বরে অরুণা বলল, “কমলদা, বাবা বোধহয় মারা গেলেন!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন