মতি নন্দী
কাঁসর, শাঁখ, পটকা নিয়ে যাত্রীর সমর্থকরা ইস্টবেঙ্গল মাঠের সবুজ গ্যালারী ছেয়ে রয়েছে। দশ গজ পর পর হাতে উড়ছে যাত্রীর পতাকা। যুগের যাত্রী আজ লীগ চ্যামপিয়ন হবে। যাত্রীর ইতিহাসে প্রথম। আর দু’টি পয়েণ্ট তাদের দরকার। যাত্রীর সমান খেলে ইস্টবেঙ্গল এক পয়েণ্টে পিছিয়ে, মোহনবাগান তিন পয়েণ্টে, মহমেডান ছয় পয়েণ্টে। প্রত্যেকেরই একটি করে খেলা বাকি। যাত্রীকে আর ধরা যাবে না। যদি আজ যাত্রী ড্র করে এক পয়েণ্ট খোয়ায়, তা হলে ইস্টবেঙ্গল সমান-সমান হবার সুযোগ পাবে, কেননা তাদের শেষ ম্যাচ জর্জ টেলিগ্রাফের সঙ্গে। প্রথম খেলায় টেলিগ্রাফকে চার গোলে হারিয়েছে ইস্টবেঙ্গল।
গ্যালারীতে একজন দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলল, “যাত্রী আজ যদি হেরে যায়। খেলার কথা তো কিছুই বলা যায় না।”
অবশ্য লোকটি কয়েক মুহূর্ত পরেই বুদ্ধিমান হয়ে গেল এবং সবাইকে শুনিয়ে বলল, “পি সি সরকার কিংবা পেলে ছাড়া যাত্রীকে আজ হারাবার ক্ষমতা কার আছে! আগের ম্যাচে কিভাবে শোভাবাজার পাঁচ গোল খেয়েছিল মনে পড়ে?”
“শোভাবাজারের সেই টিমই খেলবে।” খুব বোদ্ধার মত আর একজন বলল, “সিজন যত শেষ হয়ে আসে, বর্ষা নামে, ছোট টিম ততই টায়ার্ড হয়, খারাপ খেলে। আমার তো মনে হয়, রেকর্ড গোল দিয়ে যাত্রীর লীগ চ্যামপিয়ন হওয়ার আজই সুযোগ।”
“দাদা, আগের ম্যাচে তো কমল গুহ খেলেছিল, আজও খেলবে কি?”
“কে জানে? অনেকদিন তো কাগজে নাম-টাম চোখে পড়েনি। আর খেললেই বা কি আসে যায়?”
“জানেন তো যাত্রী ছেড়ে যাবার সময় কমল গুহ কি বলেছিল?”
“আরে রাখুন ওসব বলাবলি। অনুপম আর প্রসূন আজ ওর পিণ্ডি চটকে ছাড়বে। দম্ভ নিয়ে মশাই ক’জন তা রাখতে পেরেছে? রাবণ পারেনি, দুর্যোধন পারেনি, হিটলার পারেনি, আর কমল গুহ পারবে?”
আজ শোভাবাজারের সমর্থক শুধু ইস্টবেঙ্গল মেম্বার গ্যালারীতে। তাদের মনে একটা ক্ষীণ আশা—যদি যাত্রী হারে। হারলে, ইস্টবেঙ্গলের চ্যামপিয়ন হওয়া এই পেলে বা পি সি সরকারও বন্ধ করতে পারবে না।
“অসম্ভব, হতি পারে না। যাত্রীর হার হতি পারে না। শোভা-বাজারের আছেডা কে? লীগটা লইয়াই গেল শ্যাস পর্যন্ত।” কপালে করাঘাত হল।
“চ্যাঁচাইয়া যদি জেতান্ যায় তো আজ কল্জে ফাটাইয়া দিমু। কি কস্?”
“তাই দে।”
“নিচ্চয়, আজ যেমন কইরা হোক জেতাইতে হইবই। ক্যান, স্পোর্টিং ইউনিয়নের দিন জেতাই নাই ইস্টবেঙ্গলেরে।”
“আরে মশাই, চেঁচিয়ে জেতাবেন স’বাজার সে টিম নয়। পহা-কড়ি দিয়ে দু-চারটে প্লেয়ারকে যাত্রী ঠিক ম্যানেজ করে রেখেছে। যোল বচ্চরতো খেলা দেখচি।”
“ছারপোকা! আমাগো গ্যালারীতে?”
“ছাইড়া দে। অগো আর আমাগো আজ কমন্ ইণ্টারেস্ট। ইংরাজি বোঝেস তো?”
“চার বছ্ছর আই এছ্ছি পড়ছি। ইণ্টারেস্ট মানে সুদ তা আর জানি না?”
পাশেই এরিয়ানের গ্যালারীর অংশে রয়েছে যুগের যাত্রীর মেম্বাররা। সেখানে হৈ হৈ পড়ে গেছে বিপুল কলেবর ‘ফিল্ড-মার্শাল’কে দেখে। বিরাট গোঁফওলা লোকটি, চারটি সিগারেট মুঠো করে রাখা পাঁচ আঙুলের ফাঁকে। এক একটি টান দিচ্ছে আর মুখ থেকে পাটকলের চিমনীর মত ধোঁয়া বার করছে। যাত্রী ম্যাচ জেতার পর ‘ফিল্ড-মার্শাল’ এইভাবে সিগারেট খায়। আজ খেলা শুরুর আগেই খাচ্ছে।
‘ফিল্ড-মার্শালে’র পিছন পিছন দু’টি চাকর বিরাট এক হাণ্ডা নিয়ে গ্যালারীতে এসেছে। ওতে আছে ১৫ কিলো রান্না করা মাংস!। খেলা শেষে ভাঁড়ে বিতরণ করা হবে। হুটোপুটি পড়ে গেল হাণ্ডার কাছাকাছি থাকার জন্য।
“বড় খিদে পেয়েছে দাদা, ব্যাপারটা অ্যাডভান্সই চুকিয়ে ফেলুন না। রেজাল্ট তো জানাই আছে, তবে আর আমাদের কষ্ট দেওয়া কেন?”
“নৌ নৌ। এখন নয়।” ফিল্ড-মার্শাল দু’হাত তুলল। “অফি-সিয়াল ভিকট্রির পর।”
মাঠের এক কোণায় গ্যালারীতে রয়েছে শোভাবাজার স্পোর্টিংয়ের ডে-স্লিপ নিয়ে যারা এসেছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই অবশ্য মনে মনে যাত্রীর সমর্থক। বিপুল ঘোষ আজ প্রথম মাঠে এসেছে কমলের কাছ থেকে স্লিপ নিয়ে। তার পাশেই বসেছে অমিতাভ। চুপচাপ একা। সলিল তাকে স্লিপ দিয়েছে। ফুটবল মাঠে আজই প্রথম আসা। ওদের পিছনে বসে অরুণা আর পিণ্টু। গতকাল কমল গেছল ওদের বাড়িতে; পল্টু মুখার্জির ছবির সামনে চোখ বুঁজে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, ছবিতে মাথা ঠেকিয়ে সে বিড়বিড় করে কিছু বলে। পিণ্টুও তার দেখাদেখি প্রণাম জানায়। পিণ্টুই বায়না ধরে, কমলমামার খেলা সে দেখবে।
গ্যালারীতে পিণ্টু, অধৈর্য হয়ে ছটফট করে, কখন টিম নামবে! অরুণা ছোটবেলায়, পিণ্টুরই বয়সে, বাবার সঙ্গে মাঠে এসে দেখেছে কমলের খেলা, শুধু মনে আছে, সারা মাঠ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল কমলকে নিয়ে। আজ তারও প্রচণ্ড কৌতূহল। বিপুল ঘোষ ঘড়ি দেখে পাশের অমিতাভকে বলল, “খেলা ক’টায় আরম্ভ বলতে পারেন?” অমিতাভ মাথা নাড়ল। শোভাবাজারকে কতকটা বিদ্রূপ জানাতেই প্রচণ্ড শব্দে মাঠের মধ্যে পটকা পড়ল, তারপর পিণ্টু, প্রবল উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠে বলল, “ওই যে কমলমামা।”
কয়েক দিন ধরে কমল বারোটি ছেলেকে নিয়ে রীতিমত ক্লাস করেছে তার শোবার ঘরে। মেঝেয় খড়ি দিয়ে মাঠ এঁকে, তার মধ্যে ঢিল সাজিয়ে (ঢিলগুলি প্লেয়ার) সে যাত্রীর এক একটা মুভ দেখিয়ে কি ভাবে সেগুলো প্রতিহত করতে হবে বুঝিয়েছে। ওরা গোল হয়ে ঘিরে বসে গভীর মনোযোগে শুনেছে। যাত্রীর অ্যাটাক প্রধানত কাকে ঘিরে, কোথা থেকে বল আসে, কি কি ফন্দি এঁটে ওরা স্যুটিং স্পেস তৈরী করে, পাহারা দেওয়া ডিফেণ্ডারকে সরাবার জন্য কি ভাবে ওরা বল-ছাড়া দৌড়োদৌড়ি করে, ওভারল্যাপ করে ওদের ব্যাক কি ভাবে ওঠে, কমল ওদের দেখিয়েছে ঢিলগুলি নাড়াচাড়া করে। তারপর বুঝিয়েছে কার কি কর্তব্য। যাত্রীর প্রতিটি প্লেয়ারের গুণ এবং ক্রটি এবং শোভাবাজারের কোন্ প্লেয়ারকে কি কাজ করতে হবে বার বার বলেছে। খেলার দিন সকালেও সে সকলকে ডেকে এনে শেষবারের মত বলে, “চারজন ব্যাকের পিছনে থাকব আমি। যখনই দরকার তখনই প্রত্যেক ডিফেণ্ডারকে কভার দেবো। ডিফেন্ডাররা নিজের নিজের লোককে ধরে রাখবে। মুহূর্ত দেরী না করে ট্যাকল করবে। বল ওরা কণ্ট্রোলে আনার আগেই চ্যালেঞ্জ করবে। বিশেষ করে প্রসূনকে। যেখানে ও যাবে সলিল ছায়ার মত সঙ্গে থাকবে। অনুপমকে দেখবে স্বপন। চারজন ব্যাকের সামনে থাকবে শম্ভু। প্রত্যেকটা পাস মাঝপথে ধরার চেষ্টা করবে, যেন যাত্রীর কোন ফরোয়ার্ডের কাছে বল পৌঁছতে না পারে। অ্যাটাক কোথাও থেকে শুরু হচ্ছে দেখামাত্র গিয়ে চ্যালেঞ্জ করবে। শম্ভুর সামনে তিনজন হাফব্যাক থাকবে। যাত্রীর অ্যাটাক শুরু হবার মুখেই ঝাঁপিয়ে পড়বে, আবার দরকার হলে নেমে এসে হেল্প করবে, আবার কাউণ্টার-অ্যাটাকে বল নিয়ে এগিয়ে যাবে। আর যাত্রীর পেনাল্টি বক্সের কাছে থাকবে গোপাল। মোট কথা, আমাদের ছকটা হবে ১—৪—১—৩—১।”
“কমলদা, আমি কিন্তু ওদের দু-একটাকে বার কোরবই।” শম্ভু গোঁয়ারের মত বলেছিল।
কমল কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ওদের একজনকে বার করার সঙ্গে সঙ্গে তোমাকেও বেরিয়ে যেতে হবে। তাতে ক্ষতি হবে শোভাবাজারেরই। শম্ভু, আজ সব থেকে দায়িত্বের কাজ তোমার উপর। তুমি কি দায়িত্বের ভয়ে পালিয়ে যেতে চাও?”
“কে বলল?” শম্ভু লাফিয়ে উঠল! চোখ দিয়ে রাগ ঠিকরে পড়ল। দেয়ালে ঘুষি মেরে সে বলল, “আমি পালাব, আমি পালিয়ে যেতে চাই? আমার বাপ দেশ ভাগ হতে পালিয়ে এসেছিল। শেয়ালদার প্ল্যাটফর্মে আমি জন্মেছি কমলদা, আমার মা মরেছে উপোস দিয়ে, বড় ভাই মরেছে খাদ্য আন্দোলনে গুলি খেয়ে। আমি চুরি-চামারি অনেক করেছি। আজ ছিঁড়ে খাবো সবাইকে।”
কমল পর পর সকলের মুখের দিকে তাকায়, তারপর ফিসফিসে গলায় বলে, “আজ শোভাবাজার লড়বে।”
ওরা চুপ করে শুধু কমলের দিকে তাকিয়ে থেকেছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন