মতি নন্দী
পরদিন অফিসে পৌঁছনমাত্র কমল শুনল, রথীন তাকে দেখা করতে বলেছে।
ওর চেম্বারে ঢুকতেই রথীন টেলিফোনে কথা বলতে বলতে ইশারায় কমলকে বসতে বলল।
“তারপর,” রথীন টেলিফোন রেখে বলল, “কাল নাকি দারুণ খেলেছিস।”
“কে বলল!” কমল ভাবতে শুরু করল, রথীনকে এর মধ্যেই কে খবর দিতে পারে!
“যেই বলুক না। তিন গোল খাইয়ে অনুপমকে মাঠে নামিয়ে-ছিস, এমন থ্রু বাড়িয়েছিস যাতে না ও ধরতে পারে, তারপর গোল দিয়ে মান বাঁচিয়েছিস। সাবাস, অসাধারণ! এক ঢিলে তিন পাখি—একেই বলে।”
কমল কথা না বলে ফিকে হাসল। রথীনের মুখ থমথম করছে।
“একজন সিনিয়ার প্লেয়ার জুনিয়ারকে মাঠের মাঝে অপদস্থ করবে ভাবা যায় না। আনস্পোরটিং।”
কমল শক্ খেয়ে সিধে হয়ে বসল। রাগটা কয়েকবার দপদপ করে উঠল চোখের চাউনিতে।
“ব্যাপারটা কি? অনুপম তোর ক্লাবের প্লেয়ার বলেই কি আমি আনস্পোরটিং?”
“আমার ক্লাব বলে কোন কথা নয়। একটা উঠতি প্রমিসিং ছেলে, তাকে হাস্যকর করে তুললে সাইকোলজিক্যালি তার একটা সেটব্যাক হয়। এ বছর যাত্রীর ফরোয়ার্ড লাইনে অনুপম অত্যন্ত ইম্পর্ট্যাণ্ট রোল প্লে করছে। যাত্রী শীল্ড পেয়েছে কিন্তু লীগ পায়নি কখনো। আমার আমলে যাত্রীকে আমি লীগ এনে দেবো। এ বছর নিখুঁত যন্ত্রের মত যাত্রী খেলছে। আমি চাই না এর সামান্য একটা পার্টসও বিগড়ে যাক। আমি তা হতে দেবো না।”
রথীনের মুঠো করা হাতটার দিকে কমল তাকাল। হিংস্র আঘাতের জন্য মুঠোটা তৈরী। কমল নির্লিপ্তস্বরে বলল, “আমি কি এবার উঠতে পারি?”
কঠিন চোখে রথীন তাকাল। কমলও।
“আমার কথাটা আশা করি বুঝিয়ে দিতে পেরেছি।”
কমল ঘাড় নাড়ল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “একশো টাকাটা এখনো শোধ দিতে পারিনি, হাতে একদমই টাকা নেই। সামনের মাসে মাইনে পেলেই দিয়ে দেবো।”
“না দিলেও চলবে। একশো টাকার জন্য যাত্রী মরে যাবে না।”
“কত টাকার জন্য তাহলে মরতে পারে?”
“মানে?”
“পাঁচ হাজার?”
রথীনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কমল সেটা লক্ষ্য করে বলল, “আমার মনে হয় না যুগের যাত্রী খুব একটা স্পোরটিং ক্লাব।”
“এখন তুমি যেতে পার।” রথীন দরজার দিকে আঙুল তুলল।
কমল নিজের চেয়ারে এসে বসা মাত্র বিপুল থোষ ফিসফিস করে বলল, “কাল কি রকম খেলেছেন মশাই, অফিসের ছোকরারা খাপ্পা হয়ে গেছে। আপনি নাকি খুব বড় একজন প্লেয়ারকে খেলতে না দিয়ে একাই খেলেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কত বড় প্লেয়ার সে?”
“মস্ত বড়। আট হাজার টাকা নাকি পায়।”
“আ—ট! বলেন কি মশাই, সাত ঘণ্টা চোদ্দ বছর ধরে কলম পিষে আজ পাচ্ছি বছরে আট হাজার। আর এর একটা বলকে লাথি মেরে পাচ্ছে আট হাজার টাকা! তার সঙ্গে চাকরির টাকাটাও ধরুন।”
“পাক না টাকা। ভালই তো। কলম পেষার থেকে ফুটবল খেলা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়।”
কমল আলোচনা বন্ধের জন্য চিঠির গোছা সাজাতে শুরু করল। এগুলোর কুষ্ঠি-ঠিকুজি এখন খাতায় এণ্ট্রি করতে হবে। তারপর খামে ভরে দপ্তরির কাছে পাঠানো স্ট্যাম্প দিয়ে ডাকে পাঠাবার জন্য। ভুল হয়ে গেলে একের চিঠি অন্যের কাছে চলে যাবে। চাকরি নিয়ে তখন টানাটানি পড়বে।
রণেন সাহা এতক্ষণ একমনে কাজ করছিল। মাথা না তুলে এবার বলল, “আজও তিনটের সময় চলে যাবেন নাকি?”
“কেন?” কমল বলল।
“কাল যে দুটো গোল করেছেন।”
কমল হেসে উঠল।
ছুটির কিছু আগে ফোন এল কমলের। অরুণার গলাঃ “কমলদা, একবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। বেলেঘাটায় একটা স্কুলে টিচার নেওয়া হচ্ছে। তোমাদের ক্লাবের সেক্রেটারির সঙ্গে একবার আলাপ করিয়ে দেবে? উনি ঐ স্কুলের কমিটিতে আছেন। যদি চাকরিটা পাই, তা হলে এখন যেটা করি সেটা বরুণাকে দিয়ে দেবো।”
কমল ওকে জানাল, ক্লাবে গিয়ে কেষ্টদার সঙ্গে সে আজকেই কথা বলবে।
অফিস থেকে বেরিয়ে কমল হেঁটেই ময়দানে যায়। আজ যাবার পথে সারাক্ষণ রথীনের কথাগুলো, তার আচরণের পরিবর্তন এবং সব থেকে বেশি ‘আনস্পোরটিং’ শব্দটি কমলের মাথার মধ্যে ঠকঠক করে আঘাত করতে লাগল।
“এই যে। আপনার কাছেই যাব ভাবছিলুম। দেখা হয়ে ভালই হল।”
চমকে উঠে কমল দেখল, সাংবাদিকটি সামনে দাঁড়িয়ে। হেসে বলল, “কেন?”
“একটা কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি, আপনি কি রিটায়ার করেছেন?”
“সে কি! কোথায় শুনলেন?”
“কাল যুগের যাত্রীর টেণ্টে গেছলুম। সেখানে প্রতাপ ভাদুড়ী বলল আপনি নাকি রিটায়ার করেছেন।”
চলতে চলতে কমল বলল, “আচ্ছা, তাই নাকি! আর কি শুনলেন?”
“যাত্রীর কে যেন কাল অফিস লীগে আপনার খেলা দেখতে গিয়েছিল। তার সঙ্গেই আলোচনা করছিল প্রতাপ ভাদুড়ী। আপনি অনুপমকে নাজেহাল করেছেন শুনে বলল, কমল তো শুনেছি রিটায়ার করে গেছে। ওকে কিছু টাকা বেনিফিট হিসাবে দেবো ভাবছি, অনেক বছর যাত্রীতে খেলে গেছে তো।”
“কত টাকা দেবে কিছু বলেছে?”
“না।”
“শোভাবাজারের পরের ম্যাচেই আমি খেলছি।”
“তা হলে রিটায়ার করেননি!”
কমল জবাব না দিয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে গেল বিস্মিত সাংবাদিককে ভীড়ের মধ্যে ফেলে রেখে।
শোভাবাজার টেণ্টে ঢোকার মুখেই কমলের সঙ্গে দেখা হল সত্য আর বলাইয়ের।
“কাল আপনি এলেন না কমলদা? খেলা আরম্ভ হবার পাঁচ মিনিট আগে পর্যন্ত সরোজদা আপনার জন্য অপেক্ষা করেছে।”
“অফিস আটকে দিল।” কমল অপ্রতিভ হয়ে বলল। “খেললি কেমন তোরা?
বলাই হেসে বলল, “আর খেলা! আপনার জায়গায় স্বপনকে নামানো হয়েছিল। তিনটে গোল ওই খাওয়াল।”
“লাস্ট গোলটা, বুঝলেন কমলদা, যদি দেখতেন তো হাসতে হাসতে মরে যেতেন। ওদের শ্যামল বোস দুটো গোল করেছে। রাইট আউট বল নিয়ে এগোচ্ছে। স্বপন ট্যাকল করতে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে এগিয়ে হঠাৎ ঘুরে পেনাল্টি বক্সের মধ্যে শ্যামল বোসের কাছে দৌড়ে এসে দাঁড়াল। ওদিকে রাইট আউট ফাঁকা এগিয়ে এসে গোল করে দিল। আমরা তো অবাক। বললুম—স্বপন, তুই ওভাবে ছেড়ে দিয়ে এদিকে দৌড়ে এলি কেন? কি বলল জানেন! যদি শ্যামল বোসকে বল দিত আর যদি শ্যামল বোস গোল করত তাহলে ওর হাটট্রিক হয়ে যেত না?”
বলতে বলতে সত্য হো হো করে হেসে উঠল। বলাইও। “বুঝলেন কমলদা, উফ্ফ, স্বপন হাটট্রিক করতে দেয়নি। ওহঃ, গোল খাও, পরোয়া নেই, হাটট্রিক হোনে নেহি দেগা।”
কমলও হাসল। তারপর চোখে পড়ল, ভরত টেণ্টের মধ্যে চেয়ারে বসে তাদের দিকেই তাকিয়ে। কমল এগিয়ে এসে বলল, “সরি ভরত।”
“আপনি থাকলে কাল গোল খেতুম না।”
“কি করব, অফিসের খেলা ফেলে আসতে পারলুম না।”
“কমলদা, শোভাবাজারে ন’বছর আছি। ফার্স্ট গোলি সাত বছর ধরে। এমন জঘন্য টিম কোনো বার দেখিনি। থার্ড ডিভিশনেও এরা খেলার যোগ্য নয়। না আছে স্কিল না আছে ফুটবল সেন্স। পারে শুধু গালাগালি আর লাথি চালাতে। বলাই, সত্য, শ্ৰীধর তিনজনকেই রেফারী ওয়ার্ন করেছে। স্বপন যতই বোকামি করুক, প্রাণ দিয়ে খেলেছে ওর সাধ্য মত।”
“নেক্স্ট ম্যাচ কার সঙ্গে? বাটা?”
“হ্যাঁ।”
সেক্রেটারির ঘর থেকে এই সময় সরোজ বেরোল। কমলকে দেখেই গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ।
“আসতে পারলাম না সরোজ।”
“জানি, অফিসের হয়ে খেলেছেন।”
“পরের ম্যাচে অবশ্যই খেলব। তাতে চাকরি যায় যাবে।”
“সরি কমলদা, টিম হয়ে গেছে। স্বপনই খেলবে।”
“সরোজ, আমি রিটায়ার করেছি বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ওটা মিথ্যা রটনা প্রমাণ করতে আমাকে নামতেই হবে মাঠে।”
“টিম আর বদলান যাবে না।” সরোজ স্বরে কাঠিন্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “অন্য ম্যাচে খেলবেন।”
শোভাবাজারের মত নগণ্য টিমের অতি নবীন কোচ যে এভাবে তার সঙ্গে কথা বলবে, কমলের তা কল্পনার বাইরে। কথা না বাড়িয়ে সে সেক্রেটারির ঘরে ঢুকল।
কৃষ্ণ মাইতি বাড়িতে তিন-চার টাকার বেশি বাজার করেন না। বাইরে লুকিয়ে রসনা-তৃপ্তিকর খাদ্য উদরস্থ করাই তাঁর জীবনের এক-মাত্র শখ। আস্ত চিকেন রোস্ট নিয়ে ধস্তাধস্তি করছিলেন। যখন কমল সামনে এসে বসল, কথা না বলে একবার তাকালেন শুধু তিনি।
“সামনের ম্যাচ বাটার সঙ্গে। কেষ্টদা, আমি খেলতে চাই।”
“বেশ তো, নিশ্চয় খেলবি।”
“সরোজ টিমে আমার নাম রাখেনি।”
“সে কি!” কৃষ্ণ মাইতি চীৎকার করে উঠলেন, “সরোজ, সরোজ!”
সরোজ ঘরে ঢোকা মাত্র বললেন, “কমল বাটা ম্যাচ খেলবে।”
“কিন্তু—” সরোজ কড়া চোখে কমলের দিকে তাকাল।
“কিন্তু-টিন্তু নয়। কমল কলকাতা মাঠের সব থেকে সিনিয়ার প্লেয়ার। বড় বড় টিম এখনো মাঠে ওকে দেখলে ভয়ে কঁপে। ও খেলতে চেয়েছে, খেলবে।”
“কিন্তু কেষ্টদা, আমি টিমটা অনেক ভেবেই করেছি একটা বিশেষ প্যাটার্নে খেলাব বলে। তা ছাড়া কমলদা তো একদিনও প্র্যাকটিস করলেন না ছেলেদের সঙ্গে।”
“প্র্যাকটিস!” কেষ্টদা দারুণ বিষম খেলেন। কয়েকবার ব্রহ্মতালু থাবড়ে নিয়ে ধাতস্থ হয়ে বললেন, “প্যাটার্ন, প্র্যাকটিস সব হবে, সব হবে। যা বললুম তাই করো। কমল খেলবে।”
“আচ্ছা।”
সরোজ বেরিয়ে যাবার সময় কঠিন দৃষ্টি হেনে গেল কমলের দিকে।
“বুঝলে কমল, বাবুরা কোচিং করে ক্লাবকে উদ্ধার করবে। শেষ দিকে পয়েণ্টে ম্যানেজ করে তো রেলিগেশন থেকে বাঁচতে হবে। ওঠা-নামা যদ্দিন বন্ধ ছিল, বুঝলে, শান্তিতে ছিলুম।”
“কেষ্টদা, আপনি যে মেয়েদের স্কুলের কমিটি মেম্বার, সেখানে টিচার নেওয়া হচ্ছে। আমার একজন পরিচিত অ্যাপ্লাই করেছে। আপনি একটু দেখবেন?”
“কে হয় তোর?”
“পল্টু মুখার্জির বড় মেয়ে।”
ভ্রূ কুঁচকে কৃষ্ণ মাইতি আঙুলে লেগে থাকা ঝোল চাটতে চাটতে কি যেন ভাবল। তারপর বলল, “আচ্ছা দেখব’খন। কিন্তু তোর সঙ্গে একটা কথা আছে। যুগের যাত্রীর সঙ্গে লীগের প্রথম খেলা সতেরোই। পয়েণ্ট নিতে হবে। যদি নিতে পারিস, তা হলে চাকরিটা হবে।”
কমল অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। চাকরি দেবার এরকম অদ্ভুত সর্তের কারণ সে বুঝতে পারছে না।
“কেষ্টদা, তা কি করে হয়!”
“হতেই হবে। পয়েণ্ট দে, আমিও তা হলে চেষ্টা করব। গুলোকে আমি একবার দেখে নেব। গত বছর কথা ছিল, ম্যাচ ছেড়ে দিলে আর গভর্নিং বডির মিটিংয়ে কালিঘাটের সঙ্গে গণ্ডগোল বন্ধ হয়ে যাওয়া খেলাটা রি-প্লে হওয়ার পক্ষে ভোট দিলে সাতশো টাকা দেবে টেণ্ট সারাতে। ম্যাচ ছাড়ার আর দরকার হয়নি, এমনিতেই যাত্রী চার গোল দিয়েছে। ভোট দিয়েছিলুম কিন্তু যাত্রী জিততে পারেনি। ব্যস, ব্যাটা আর টাকা ঠেকাল না। যদি পারিস ফার্স্ট ম্যাচে পয়েণ্ট নিতে তা হলে ভয় খাবে, রিটার্ন লীগ ম্যাচে সুদে-আসলে তখন কান মলে আদায় করে নেব। পল্টু মুখুজ্যের মেয়ের চাকরি, কমল এখন তোর হাতে।”

পয়েন্ট দে, আমিও তা হলে চেষ্টা করব।
কমল কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না, শুধু তাকিয়ে রইল চশমার পিছনে পিটপিটে দুটো চোখের দিকে। যাত্রীকে পয়েণ্ট থেকে বঞ্চিত করার ইচ্ছাটা তারও প্রবল। কিন্তু কৃষ্ণ মাইতির ইচ্ছাটার সঙ্গে তারটির কিন্তু ভীষণ অমিল। সব থেকে অস্বস্তিকর ও ভয়ের ব্যাপার এই সর্তটা। যাত্রীর কাছ থেকে পয়েণ্ট নেওয়া একার সাধ্যে সম্ভব নয়। বয়স হয়েছে, দমে কুলোয় না। এজিলিটি কমে গেছে, স্পীডও। শুধু অভিজ্ঞতা সম্বল করে একটা তাজা দলের সঙ্গে একা লড়াই করা যায় না। তার থেকেও বড় কথা, অরুণার চাকরি পাওয়া যদি যাত্রীর সঙ্গে খেলার ফলের উপর নির্ভর করে, তবে সেটা একটা বাড়তি চাপ হবে মনের উপর।
কমলের মনের মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল এক বৃদ্ধের ছবি। কি যেন বলছেন, কমল মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করল, তারপর বিড়বিড় করে বলল, “ব্যালান্স! হ্যাঁ পল্টুদা, ব্যালান্স রাখতে হবে।”
“ব্যালান্স কি রে, পয়েণ্ট চাই।”
কমল উঠে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল, “আমি চেষ্টা করব।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন