মতি নন্দী
পরদিন থেকে কমল যেন বদলে গেল। চেহারায় এবং মনেও। অফিসে সারাক্ষণ নিজের চেয়ারে থাকে। কথা বলে না প্রয়োজন না হলে। ছুটির পর সোজা বাড়ি চলে আসে। গড়ের মাঠের পথ আর মাড়ায় না। অফিসে অরুণা ফোন করেছিল। কমল কথা বলেনি। বিপুল ঘোষকে সে বলতে বলে, ‘অফিসে আসেনি, জানিয়ে দিন।’
কমল যটটা ভেবেছিল তেমন কোন বিদ্রূপ অফিসে বা অন্য কোথাও তাকে শুনতে হয়নি। সবাই যেন ধরেই নিয়েছে এমনটিই হবে। ওর মনে হয়, এইরকম ঔদাসীন্যের থেকে বরং বিদ্রূপই ভাল ছিল। মাসের মাইনে পেয়েই সে রথীনের ঘরে গিয়ে একশো টাকার নোট টেবলে রেখে বলে, “ধার নিয়েছিলাম, সেই টাকাটা।”
“ধার! আমি তো দিইনি। যে দিয়েছে তাকে দিয়ে এসো।” রথীন কমলের দিকে আর না তাকিয়ে কাজে মন দেয়।
কমল দ্বিধায় পড়ে। অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভেবে সে স্থির করে, তপেন রায়ের হাতেই টাকাটা দিয়ে আসবে। ছুটির পর সে যাত্রীর টেণ্টের দিকে রওনা হয়। যখন পৌঁছল, যাত্রীর প্লেয়াররাও ঠিক তখনই এরিয়ান মাঠ থেকে ফিরল বি এন আর-কে ২—০ গোলে হারিয়ে। প্রায় শ’খানেক লোক হৈ-চৈ করছে টেণ্টের মধ্যে ও বাইরে। কমল একধারে দাঁড়িয়ে খুঁজতে লাগল তপেন রায়কে।
“আরে কমলবাবু, ইখানে দাঁড়িয়ে!” ক্লাবের বুড়ো মালী দয়ানিধি কমলকে দেখে নমস্কার করে এগিয়ে এল।
“তপেনবাবুকে খুঁজছি, কোথায় বলতে পার?”
“ভিতরে আছে বোধ হয়, যান না।”
ইতস্তত করে কমল ভিতরে গেল।
তপেন রায় কয়েকটি ছেলের পথ আটকে প্লেয়ারদের ড্রেসিংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বলছে, “না না, এখন নয়। ওরা এখন টায়ার্ড। এখন কোন কথাবার্তা নয়।”
কমল এগিয়ে গেল। তাকে দেখে তপেন রায় অবাক হয়েও অস্বাভাবিক স্বরে বলল, “কি খবর কমল?”
“একটু দরকার ছিল।”
“দেখছ তো কি অবস্থা, এখান থেকে নড়ার উপায় নেই, যা বলার বরং এখানেই বলো।”
কমল নোটটা পকেট থেকে বার করে এগিয়ে ধরে বলল, “টাকাটা দিতে এসেছি।”
তপেন রায় কি ভেবে নিয়ে তাচ্ছিল্যভরে বলল, “ও টাকা তুমিই রাখো। এই বছর যাত্রীতে খেলে গেলে—ট্রফি-ফ্রফি তো কিছুই ক্লাবকে দিতে পারোনি, টাকা ফেরত দিয়ে ক্লাবের কি আর এমন উপকার করবে? এ-বছর যাত্রী লীগ পাচ্ছেই, শুধু বড় টিম দুটোর সঙ্গেই আসল যা খেলা বাকি; তারপর শুধু বাজিই পুড়বে দশ হাজার টাকার। একশো টাকার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় আমার নেই।”
শুনতে শুনতে কমলের পা দুটো কেঁপে উঠল। মাথার মধ্যে লক্ষ গোলের চীৎকার। তবু ঠাণ্ডা গলায় বলল, “বাজি পোড়ানো দেখতে আমি আসব। কিন্তু টাকা আপনাকে ফেরত নিতে হবে। যাত্রীর কাছে আমি ঋণী থাকব না, থাকতে চাই না।”
ওদের ঘিরে বহু লোকের ভিড় জমে গেছে। গুলোদা এই সময় টেণ্টে ঢুকল। ভিড় দেখেই কৌতূহলভরে এগিয়ে এল।
“ব্যাপার কি? আরে কমল যে!”
“এক সময় দরকারে টাকা নিয়েছিলুম। ফেরত দিতে এসেছি, কিন্তু তপেনদা নিচ্ছেন না।”
“সেই টাকাটা গুলোদা, আপনিই তো বলেছিলেন দরকার নেই ফেরত নেবার।” তপেন রায় মনে করিয়ে দিল ব্যস্ত ভঙ্গিতে।
“অ। দিতে চায় যখন নিয়ে নাও তবে”, গুলোদা অতি মিহি স্বরে বলল, “যাত্রীর শেষ খেলা শোভাবাজারের সঙ্গে, যদি কমল কথা দেয় সেদিন খেলবে না, তা হলেই ফেরত নেব।”
ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলল, “খেললেই বা কমল গুহ, যাত্রী এবার দশ গোল ভরে দেবে শোভাবাজারকে।”
স্মিতমুখে গুলোদা বলল, “সেইজন্যই তো বলছি, কমলের মত এতবড় প্লেয়ারের টিম দশ গোল খাচ্ছে, এ দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারব না। এটা যাত্রীর পক্ষেও বেদনাদায়ক হবে। হাজার হোক এক সময় কমল তো যাত্রীর-ই ছিল।”
“ঠিক ঠিক, গুলোদা ঠিক বলেছেন।” ভিড়ের মধ্যে একজন মাথা নেড়ে বলল, “কমলদা, আপনি কিন্তু সেদিন খেলতে পারবেন না। আপনার ইজ্জতের সঙ্গে যাত্রীর ইজ্জতও জড়িয়ে আছে।”
পাংশু কালো মুখ নিয়ে কমল হাসল। এরা আজ অপমান করার জন্য পন্থা নিয়েছে করুণা দেখাবার। ওর ইচ্ছে করল নোটটা টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়ে চীৎকার করে বলে উঠতে—আমি এখনো শেষ হয়ে যাইনি, যাইনি। ঠিক তখনই কমলের বুকের মধ্যে এক বৃদ্ধের কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠল—ব্যালান্স, কমল, ব্যালান্স কখনো হারাসনি।
ম্লান চোখে কমল সকলের মুখের উপর দিয়ে চাহনি বুলিয়ে ধীর স্বরে বলল, “টাকাটা ফেরত নিন। আমার আর খেলার ইচ্ছে নেই।”
নোটটা তপেন রায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে কমল বেরিয়ে এল যাত্রীর টেণ্ট থেকে। মাথার মধ্যেটা অসাড় হয়ে গেছে। হাঁটু দুটো মনে হচ্ছে মাখনে তৈরী, এখনি গলে গিয়ে তাকে ফেলে দেবে। বুকের মধ্যে দপদপ করে জ্বলে উঠতে চাইছে শোধ নেবার একটা প্রচণ্ড ইচ্ছা। যে বিমর্ষতা, হতাশা তাকে এই ক’দিন দমিয়ে রেখেছে, সেটা কেটে গিয়ে এখন সে অপমানের জ্বালায় ছটফট করে উঠল। উদ্দেশ্য-হীনের মত ময়দানের মধ্য দিয়ে এলোপাথাড়ি হাঁটতে হাঁটতে কমল কখন যে শোভাবাজার টেণ্টে পৌঁছে গেছে খেয়াল করেনি। ডাক শুনে তাকিয়ে দেখল, ভরত আর সলিল ক্যাণ্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে। ভরত এগিয়ে এল, সলিল এল না।
“আপনার কি অসুখ করেছে কমলদা? কেমন যেন শুকনো দেখাচ্ছে। অনেকদিন আসেন না, ভেবেছিলুম আপনার বাড়িতে যাব।”
প্রশ্নটা এড়িয়ে কমল বলল, “ক্লাবের খবর কি, বল।”
“খবর আর কি, যা হয়ে থাকে প্রতি বছর তাই হচ্ছে। তিনটে ড্র করে তিন পয়েণ্ট ম্যানেজ হয়েছে, তবু এখনো ভয় কাটেনি।” ভরত বিপন্ন হয়ে বলল, “ভাল লাগে না কমলদা। এইভাবে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলার কোন মানে হয় না।”
“সলিল কি খেলছে?”
“কেন, আপনি জানেন না! ও তো লাস্ট চারটে ম্যাচে খেলেছে, বেশ ভাল খেলছে। ইস্টবেঙ্গলের দিন হাবিবকে নড়াচড়া করতে দেয়নি। সব কাগজে ওর কথা লিখেছে।”
“তাই নাকি, আমি কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছি। আর কি খবর আছে?”
“আর যা আছে সেটা খুব মজার। সত্য আর শম্ভু তো গোলাম আলীতে স্যুটের মাপ দিয়ে এসেছিল। সাত দিন পর ট্রায়াল দিতে গিয়ে শোনে, গুলোদা টেলিফোন করে আগেই জানিয়ে রেখেছিল, তার অর্ডার না পাওয়া পর্যন্ত কাঁচি ধরবে না, শুধু মাপটা নিয়ে রেখে দেবে। গুলোদা আর ফোন করেনি। শুনে সত্য আর শম্ভু তো ফুঁসছে, এভাবে বোকা বনে যাবে ওরা কল্পনাও করতে পারেনি। কথাটা কাউকে বলতেও পারছে না, কিল খেয়ে কিল চুরি করা ছাড়া ওদের আর উপায় নেই। এখন বলছে, রিটার্ন ম্যাচটায় যাত্রীকে দেখে নেবে।”
কমল ফিকে হাসল মার কথাগুলো শুনে। বলল, “সরোজ কোথায়, প্র্যাকটিস কেমন চলছে?”
“কোথায় প্রাকটিস! সরোজদা তো প্রায় দশ দিন হল টেণ্টই মাড়ায় না। শুনছি জামসেদপুর না দুর্গাপুরে চাকরি পেয়েছে। সলিল, স্বপন, রুদ্র, এরাই যা বল নিয়ে সকালে নাড়াচাড়া করে। সকালে এখন এক কাপ চা আর দুটো টোস্ট ছাড়া আর সব বন্ধ করে দিয়েছে কেষ্টদা।”
“সলিল চাকরিটা করছে কি এখনো?”
“একদিন ওর বাবা এসেছিল খুঁজতে। সলিল কাজ ছেড়ে দিয়েছে, বাড়িতেও থাকে না। কোথায় থাকে কেউ জানে না। ওকে জিজ্ঞেস করেছি, ঠিকানা দেয়নি।”
“সলিলকে বলিস আমার সঙ্গে দেখা করতে।”
কমল বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হতেই ভরত মাথা চুলকে বলল, “সেদিনের পর থেকে আর আপনি মাঠে আসেন না।”
“হ্যাঁ, আর ভাল লাগে না। মাঠ থেকে এবার চলে যাওয়াই উচিত। আমার কোনো ফোন এসেছিল কি?”
“জানি না তো।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন