মতি নন্দী
কিক্ অফের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে কমলের শরীরে হালকা একটা কাঁপন লাগল। গত বছর আই এফ এ শীল্ডের প্রথম রাউণ্ডে এই মহমেডান মাঠেই শেষবার খেলেছে। তারপর ঘেরা মাঠে আজ প্রথম। প্রত্যেকবার, গত কুড়ি বছরই, কিক্ অফের বাঁশি শুনলেই তার শরীর মুহূর্তের জন্য কেঁপে ওঠে। স্নায়ুগুলো নাড়াচাড়া খেয়ে আবার ঠিক হয়ে যায়। তারপর প্রত্যেকটা কোষ ফেটে পড়ার জন্য তৈরী হয়ে উঠতে শুরু করে।
কমল অনুভব করল আজকেও সে তৈরী। বাটা আলস্যভরে খেলা শুরু করেছে। বল নিয়ে ওরা মাঝখান দিয়ে ঢুকছিল, রাইট হাফ সত্য চার্জ করে বলটা লম্বা শটে ডান কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে পাঠিয়ে দিল। কমল বিরক্ত হল। অযথা বোকার মত বলটা নষ্ট করল। উইং রুদ্র তখন সেণ্টার ফ্ল্যাগের কাছে, তার পক্ষে ওই বল ধরা সম্ভব নয়। তবু রুদ্র দৌড়িয়ে খানিকটা দম খরচ করল।
পেনাল্টি এরিয়ার ১৮ × ৪৪ গজ জায়গা নিয়ে কমল খেলতে থাকে। দু’বার তাকে বল নিয়ে আগুয়ান ফরোয়ার্ডকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে এবং দু’বারই বল দখল করেছে। নির্ভুল বল দিয়েছে ফরোয়ার্ডদের, কাঁচা ছেলে স্বপন নিজের জায়গা ছেড়ে বলের পিছনে যত্রতত্র ছুটছে, তাকে কোথায় পজিশন নিতে হবে বার বার চেঁচিয়ে বলছে, বল নিয়ে ওঠার মত ফাঁকা জমি পেয়েও সে প্রলোভন সামলেছে। খেলা পনেরো মিনিটে গড়াবার আগেই কমল নিজের সম্পর্কে আস্থাবান হয়ে উঠল।
সবুজ গ্যালারিতে দুটি মাত্র লোক। হাওড়া ইউনিয়নের মেম্বার গ্যালারিতে জনা পনেরো লোক। ওরা রোজই আসে, খেলার পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে। মহমেডান মেম্বার গ্যালারিতেও কিছু লোক। খেলা চলছে উদ্দেশ্যবিহীন, মাঝ মাঠে। কিন্তু এরই মধ্যে কমল লক্ষ্য করল, শোভাবাজারের তিন-চারজনের যেন খেলার ইচ্ছাটা একদমই নেই। বিপক্ষের পায়ে বল থাকলে চ্যালেঞ্জ করতে এগোয় না, ট্যাকল করতে পা বাড়ায় না, বল নিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলে তাড়া করে না। কমল ক্রমশ অনুভব করতে লাগল যে, তার উপর চাপ পড়ছে। মাঝমাঠে যে বাঁধটা রয়েছে তাতে একটার পর একটা ছিদ্র দেখা দিচ্ছে আর অবিরাম বল নিয়ে বাটা এগিয়ে আসছে।
কিন্তু অবাক হল কমল, রাইট ব্যাকে স্বপনের খেলা দেখে। যেখানেই বল সেখানেই স্বপন। এলোপাথাড়ি পা চালিয়ে, ঝাঁপিয়ে, লাফিয়ে সে নিজেকে হাস্যকর করে তুললেও, কমল বুঝতে পারছে, ওর এইভাবে খেলাটা ফল দিচ্ছে। নিজের জায়গা ছেড়ে ছোটাছুটি করলেও কমল ওকে আর নিষেধ করল না। তবে ডান দিকের বিরাট ফাঁকা জায়গাটা বিপজ্জনক হয়ে রইল।
হাফ-টাইমের পর প্রথম মিনিটেই শোভাবাজার গোলকিক পেয়েছে। ভরত বলটা গোল এরিয়ার মাথায় বসাবার সময় কমলকে বলল, “সত্য, শম্ভু, বলাই মনে হচ্ছে বেগোড়বাই শুরু করেছে। কমলদা, আপনি রুদ্রকে নেমে এসে ডানদিকটা দেখতে বলুন।”
কমল কিক করার আগে শুধু বলল, “আর একটু দেখি।”
কিন্তু এক মিনিটের মধ্যেই বাটা পেনাল্টি কিক পেল। লেফট ব্যাক বলাই অযথা দু’হাতে বলটা ধরল, যেটা না ধরলে ভরত অনায়াসেই ধরে নিত। ভরত তাজ্জব হয়ে বলল, “এটা তুই কি করলি?”
বলাই মাথায় হাত দিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “একদম বুঝতে পারিনি। ভাবলুম তুই বোধহয় পজিশনে নেই, বলটা গোলে ঢুকে যাবে।”
ভরত বিড়বিড় করে কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করে গোলে দাঁড়াল এবং পেনাল্টি কিক হবার পর গোলের মধ্য থেকে বলটা বার করে প্রবল বিরক্তিতে মাটিতে আছাড় মারল।
“বলাই!” গম্ভীর স্বরে কমল বলল, “তুমি রাইট উইংয়ে যাও। আর রুদ্র, তুমি নেমে এসে খেলো।”
বলাই উদ্ধতভাবে প্রশ্ন করল, “কেন? আমি পজিশান ছেড়ে খেলব কেন?”
“আমি বলছি খেলবে।”
“আপনি অর্ডার দেবার কে? ক্যাপ্টেন দেবীদাস কিংবা কোচ সরোজদা ছাড়া হুকুম দেবার অধিকার কারুর নেই।”
কমল চুপ করে সরে গেল। সভ্য চেঁচিয়ে বলাইকে জিজ্ঞাসা করল, “কি বলছে রে?”
রাগে অপমানে ঝাঁঝিয়ে উঠল কমলের মাথা। শুধুমাত্র স্বপন আর প্রাণবন্ধুকে দু’পাশে নিয়ে সে লড়াই শুরু করল। রুদ্র নেমে এসে খেলছে। এখন বাটাকে গোল দেবার কোন কথাই ওঠে না। শোভাবাজার গোল না খাওয়ার জন্য লড়ছে সাত-আটজনকে সম্বল করে।
পঞ্চাশ মিনিটের পর থেকেই শোভাবাজার ডিফেন্স ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করল। সত্য, শম্ভু, বলাই অযথা ফাউল করছে। তিনটে ফ্রি কিকের দুটি ভরত দুর্দান্তভাবে আটকেছে, অন্যটি ফিস্ট করে কর্নার করেছে। কমল দাঁতে-দাঁত চেপে পেনাল্টি এরিয়ার ফোকরগুলো ভরাট করে চলেছে আর চীৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছে স্বপন আর প্রাণবন্ধুকে। বাটার ছয়জন, কখনো আটজন আক্রমণে উঠে আসছে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আরো তিনটি গোল তারা দিল।
“কমলদা, আর আমি পারছি না।” হাঁফাতে হাঁফাতে স্বপন বলল।
ছেলেটার জন্য কষ্ট হচ্ছে কমলের। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার বা ওকে ঢিলে দিতে বলার সময় এখন নয়। চার গোল খেয়েছে শোভা-বাজার। বাটার দুজনের জন্য তাদের একজন। সংখ্যার অসমত্ব নিয়ে লড়াই অসম্ভব। খেলাটা এখন এলোপাথাড়ি পর্যায়ে নেমে এসেছে। বাটা গোল না দিয়ে শোভাবাজারকে নিয়ে এখন ছেলেখেলা করছে।
“তোর থেকে আমার ডবল বয়েস। আমি পারছি, তুই পারবি না কেন?”
স্বপন ঘোলাটে চোখে কমলের দিকে তাকিয়ে মাথাটা দু’বার ঝাঁকিয়ে আবার বলের দিকে ছুটে গেল। কমলের মনে হল, যদি এখন সলিলটাও পাশে থাকত। প্রাণবন্ধু, স্বপন এবং রুদ্রও এখন পেনাল্টি এরিয়ায় নেমে এসে খেলছে। ফরোয়ার্ডরা—দেবীদাস, গোপাল, শ্রীধর হাফ লাইনে নেমে এসেছে। বাটার গোলকীপার পোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। কমল কখনো যা করতে চায় না, যা করতে সে ঘৃণা বোধ করে, তাই শুরু করল। সময় নষ্ট করে কাটাবার জন্য, বল পাওয়া মাত্র গ্যালারিতে পাঠাতে লাগল। গ্যালারীতে লোক নেই, বল কুড়িয়ে আনতে সময় লাগে।
চার গোলেই শোভাবাজার হারল। খেলার শেষে মাঠের বাইরে এসেই স্বপন আছড়ে পড়ল। কমল এক গ্লাস জল মাথায় ঢেলে শুধু একবার সরোজের দিকে তাকাল। সরোজ মুখ ঘুরিয়ে নিল। বলাই হাসতে হাসতে সরোজকে বলল, “শুধু চিকেন চৌ-মিনে হবে না বলে রাখছি, এক প্লেট করে চিলি চিকেনও।”
কমল ঝুঁকে স্বপনের হাতটা তুলে নিয়ে নাড়ি দেখল। গতি অসম্ভব দ্রুত। মনে হল মিনিটে দেড়শোর উপর। ওর পাশে উবু হয়ে বসা রুদ্র আর প্রাণবন্ধুর দিকে তাকিয়ে কমল ম্লান হেসে বলল, “রেস্ট নিক আর একটু। পরশু থেকে তোদের নিয়ে প্র্যাকটিসে নামব।”
টেণ্টে এসে স্নান করে কমল যখন ড্রেসিং রুমে পোশাক পরছে, তখন শুনতে পেল বাইরে ক্লাবের দুই একজিকিউটিভ মেম্বার বলাবলি করছেঃ
“সরোজ তো তখনই বলেছিল, চলে না, বুড়ো ঘোড়া দিয়ে আর চলে না। মডার্ন ফুটবল খেলতে হলে খাটুনি কত!”
“কেষ্টদার যে কি দুর্বলতা ওর উপর, বুঝি না। ইয়াং ছেলেরা চান্স না পেলে টিম তৈরী হবে কি করে, কোচ রাখারই বা মানে কি? পাওয়ার ফুটবল এখন পৃথিবীর সব জায়গায় আর আমরা—”
“সরোজ বলছে, এভাবে তার উপর হস্তক্ষেপ করলে সে আর দায়িত্ব নিতে পারবে না।”
“কেষ্টদার উপর তো আর এখানে কথা চলে না, ডুবলো, ক্লাবটা ডুবলো।”
কমল ঘর থেকে বেরোতেই ওর চুপ করে ভ্যাবাচাকার মত তাকিয়ে রইল। তারপর একজন তাড়াতাড়ি বলল, “আাঁ, তা হলে চার গোল হল!”
“হ্যাঁ, চার গোল।” কমল গম্ভীরস্বরে জবাব দিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। টেণ্টের বাইরে এসে দেখল, ক্যাণ্টিনের কাউণ্টারে সরোজ চা খাচ্ছে। ওকে ডাকতে গিয়ে কমল ইতস্তত করল। কয়েকটা কথা এখন তার সরোজকে বলতে ইচ্ছে করছে। তারপর ভাবল, থাক, তর্কাতর্কি করে ভীড় জমিয়ে লাভ নেই। কমল বেরিয়ে এল ক্লাব থেকে।
বাসে দমবন্ধ ভীড়ে কমল মাথার উপরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে-ছিল। সামনেই মাঝবয়সী একটি লোক বার বার তার দিকে তাকাতে তাকাতে অবশেষে বলল, “আজ খেলা ছিল বুঝি?”
“হ্যাঁ।”
“কি রেজাল্ট হল?”
বুকের মধ্যে ডজনখানেক ছুচ ফোটার ব্যথা কমল অনুভব করল। ভাবল, না শোনার ভান করে মুখটা ঘুরিয়ে নেয়। কিন্তু লোকটির প্রত্যাশাভরা মুখটি অগ্রাহ্য করতে পারল না। আস্তে বলল, “ফোর নীল।” তারপর বলল, “হেরে গেছি।”
লক্ষ্য করল, সঙ্গে সঙ্গে লোকটির মুখ বেদনায় কালো হয়ে গেল। ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। কমলের দিকে আর মুখ ফেরাল না। মুঠোর মধ্যে হাতলটা দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙ্গে ফেলতে চাইল কমল। হয়তো এই লোকটি তার দশ কি বারো বছর আগের খেলা দেখেছে। তারপর নানান কাজে জড়িয়ে পড়ে আর মাঠে যায় না। কিন্তু মনে করে রেখেছে কমল গুহর খেলা। হয়তো একদিন এই লোকটিও তাকে কাঁধে তুলে মাঠ থেকে টেণ্টে বয়ে নিয়ে গেছে খেলার পর।
ভাবতে ভাবতে কমল নিজের উপরই রাগে ক্ষোভে আর অদ্ভুত এক অপমানের জ্বালায় ছটফট করে বাস থেকে নেমে হেঁটে বাড়ি ফিরল।
পরদিন অফিসে নিজের চেয়ারে বসতেই চোখে পড়ল, খড়ি দিয়ে তার টেবলে বড় বড় অক্ষরে লেখাঃ “৪—০। এবং যুগের যাত্রীর সঙ্গেও এই রেজাল্ট হবে।”
কমল কিছুক্ষণ টেবলের দিকে তাকিয়ে রইল। লেখাটা মুছল না।
“চ্যাংড়াদের কাজ। মুছে ফেলুন কমলবাবু।” বিপুল তার টেবল থেকে ঝুঁকে বলল।
“না থাক।” কমল ম্লান হাসল।
“আপনি বরং যুগের যাত্রীর দিন খেলবেন না।”
কমল শোনামাত্র আড়ষ্ট হয়ে গেল। বিপুল তার শুভার্থী। বিপুল চায় না সে আর অপমানিত হোক। বিপুল ধরেই নিয়েছে, সে পারবে না যুগের যাত্রীকে আটকাতে, তাই বন্ধুর মতই পরামর্শ দিয়েছে। কমল মুখ নামিয়ে বলল, “আমার ওপর কনফিডেন্স নেই আপনার?”
“না না, সে কি কথা। আমি তো খেলাটেল দেখি না, বুঝিও না। তবে আজকালকার ছেলেপুলেরা, বোঝেনই তো, মানীদের মান রাখতে জানে না।”
“কিন্তু আমি যাত্রীর সঙ্গে খেলব।” কমল দৃঢ়স্বরে বলল। “আমাকে অন্য কারণেও খেলতে হবে।”
একঘণ্টা পরেই বেয়ারা একটা খাম রেখে গেল কমলের টেবলে। খুলে দেখল, মেমোরাণ্ডাম। গতকাল অফিস ছুটির নিদিষ্ট সময়ের আগেই কমল বিভাগীয় ইনচার্জের বিনা অনুমতিতে অফিস ত্যাগ করার জন্য এই চিঠিতে তাকে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। এ রকম আবার ঘটলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমল দেখল, চিঠির নীচে রথীনের সই। চিঠিটা ভাঁজ করে খামে রাখার সময় লক্ষ্য করল, রণেন দাস মুচকি মুচকি হাসছে। কমল মনে মনে বলল, ব্যালান্স, এখন আমার ব্যালান্স রাখতে হবে যে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন