মতি নন্দী
যুগের যাত্রীর পনেরোটা ম্যাচ খেলে ২৮ পয়েণ্ট। মোহন-বাগানের চৌদ্দটি খেলায় ২৪, ইস্টবেঙ্গলের চৌদ্দটি খেলায় ২৬, মহমেডানের পনেরোটি খেলায় ২৫ পয়েণ্ট। আর শোভাবাজারের যোলটি খেলায় ৬ পয়েণ্ট। লীগের প্রথমার্ধ শেষ হয়ে আসছে। ইতিমধ্যে ময়দানে গুলতানি শুরু হয়ে গেছে—দ্বিতীয় ডিভিশনে শোভাবাজার অবধারিত নামছে। বালী প্রতিভা, স্পোরটিং ইউনিয়ন, জর্জ টেলিগ্রাফ, কালিঘাট দু-তিন পয়েণ্টে শোভাবাজারের উপরে।
যুগের যাত্রীর সঙ্গে লীগের প্রথম খেলার আগের দিন, অফিসের লিফ্টে ওঠার জন্য কমল যখন দাঁড়িয়ে, পিছন থেকে একজন বলল, “কমলবাবু, কাল খেলছেন তো?”
গলার স্বরে চাপা বিদ্রূপ বিচ্ছুরিত হল। কমল জবাব দিল না। প্রশ্নকারী তাতে উত্তেজিত হয়ে উঠল। এবার রেগে বলল, “আরে মশাই, যেটুকু নাম এখনো লোকে করে সেটা ডুবিয়ে কোনো লাভ আছে? অনেক তত খেললেন সারা জীবনে।”
লিফ্টের দরজা খুলে গেল। লাইন দেওয়া লোকেরা ঢুকল, তাদের সঙ্গে কমলও। দরজা বন্ধ হবার সময় সে শুনতে পেল, লাইনে দাঁড়ানো প্রশ্নকারী সকলকে শুনিয়ে বলছে, “বুঝলেন, এরাই ফুটবলের ইজ্জৎ নষ্ট করে।”
টিফিনের সময় কমল নিজের চেয়ার থেকে উঠল না। আবার কে তাকে শুনিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথা বলবে কে জানে। একমনে মাথা নিচু করে সে কাজ করে চলেছে। চমকে উঠল যখন তার সামনে একটা লোক হাজির হয়ে বলল, “কমল, আছ কেমন?”
মুখ তুলে কমল দেখল, যুগের যাত্রীর তপেন রায়। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল, একশো টাকা ধার নেওয়ার কথাটা—মুখটা পাংশু হয়ে গেল।
“খেলাটেল। কেমন চলছে, শুনলুম দারুণ প্র্যাকটিস করছ?” চেয়ার টেনে বসতে বসতে তপেন রায় বলল।
“তপেনদা, আপনার টাকাটা এখনো দিতে পারিনি, এবার মাইনে পেলেই দিয়ে দেবো।”
“টাকা! কিসের টাকা?” তপেন রায় আকাশ থেকে পড়ল।
কমল আরো কুন্ঠিত স্বরে বলল, “মনে আমার ঠিকই আছে, তবে একবারে একশোটা টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তো নেই।”
তপেন রায় কিছুক্ষণ কমলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে যেন অতিকষ্টে মনে করতে পারল। তারপর, বলল, “ও হো, সেই টাকাটা! আমি তো ভুলেই গেছলুম। আরে দূর, ওটা তোমায় ফেরত দিতে হবে না।” তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “যাত্রীর কাছে কত টাকা তুমি পাও, সেটা তো আমি ভাল করেই জানি। তোমায় ঠকিয়েছে কি ভাবে তার সাক্ষী আমি ছাড়া আর কে! এ টাকা তো আর মামলা করে যাত্রী আদায় করতে পারবে না। যা পেয়েছ তাই নিয়ে নাও।”
মুহূর্তে কমল সাবধান হয়ে গেল। এতদিন ফুটবল খেলে সে মাঠের লোকেদের চিনেছে। হঠাৎ তপেন রায়ের আবির্ভাব এবং খুবই বন্ধুর মত কথাবার্তা তার ভাল লাগল না। সে সতর্ক স্বরে বলল, “তারপর, কি মনে করে হঠাৎ⋯।”
“বলছি।” তপেন রায় সিগারেট বার করল, ধরাল এবং প্রথম ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “যুগের যাত্রীকে কমল গুহ যে সার্ভিস দিয়েছে তা ভোলার নয়। কিন্তু যাত্রী তার বিনিময়ে তাকে কি দিয়েছে? কিছুই নয়। এই নিয়ে ক্লাবে অনেকে অনেক কথা বলেছে। কমিটি মিটিং ডাকা হয়েছিল। ঠিক হয়েছে, তোমাকে এবারের লীগের শেষ খেলার দিন মাঠেই পাঁচ হাজার টাকার চেক্ দেওয়া হবে।”
“যাত্রীর সঙ্গে লীগের শেষ খেলা কিন্তু শোভাবাজারের।”
“তাই নাকি! তাহলে তো ভালোই। কিন্তু সবার আগে তোমার অনুমতি চাই, তুমি গ্রহণ করবে কি না। অবশ্য বলে রাখছি, পরশু দিনই কমিটির একটা মিটিং আছে, ব্যাপারটা তখনই পাকা-পাকি ঠিক করা হবে।”
কমল একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছিল তপেন রায়ের চোখ দুটি। অতি সরল। ভিতর থেকে আন্তরিকতা ঠিকরে বেরোচ্ছে। কমল মনে মনে হেসে বলল, “কাল যাত্রীর সঙ্গে খেলার পর আপনাকে জানাব।”
“কাল তুমি খেলছ না কি?”
“হ্যাঁ।”
তপেন রায় ঘন ঘন সিগারেটে টান দিয়ে কি যেন ভাবতে ভাবতে বলল, “এই বাজারে পাঁচ হাজার টাকার দাম কম নয়। বলতে গেলে এক রকম পড়েই পাওয়া। মাথা গরম করে হারিয়ো না এটা। যাত্রী তো নাও দিতে পারে, তবু দেবে বলে মনস্থ করেছে। এতে তোমাকে যেমন সম্মান দেওয়া হবে, তেমনি যাত্রীর উপরও প্লেয়ারদের কনফিডেন্স আসবে, তাই নয় কি?”
কমল ঘাড় নাড়ল।
“এখনকার ক্লাবগুলো যা হয়েছে, বুঝলে কমল, একেবারে নেমকহারাম। প্লেয়াররাও সেই রকম। পয়সা ছাড়া মুখে কোন কথা নেই। কিন্তু যাত্রী তো সেরকম ক্লাব নয়। প্লেয়ারদের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক না থাকলে ক্লাব চলে না।” তপেন রায় আবেগ চাপতে গিয়ে চুপ করল। কমল কথা বলল না।
“তাহলে তুমি এখন বলবে না টাকা নিতে রাজী কি না?”
“না। কাল খেলার পর এ নিয়ে ভাবব।”
তপেন রায় চলে যাবার পর বিপুল ঘোষ গলা বাড়িয়ে বলল, “পাঁচ হাজার টাকা! ব্যাপার কি?”
“পরীক্ষা দিলাম। স্টপারে খেলি, নানান দিক থেকে আক্রমণ আসে। এটাও একটা।”
“তার মানে?”
“আমরা সবাই তো স্টপার ঘোষদা, কেউ মাঠের মধ্যে, কেউ মাঠের বাইরে। ঠেকাচ্ছি আর ঠেকাচ্ছি। এটাও ঠেকালাম— লোভকে। ঘুষ দেবার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল লোকটা। কাল ওদের টিমের সঙ্গে খেলা। আমাদের মজুমদার সাহেবের টিম। এ বছর লীগ চ্যামপিয়ন হবার জন্য খেলছে, ভালই খেলছে। হয়তো হয়েও যাবে। কিন্তু চ্যামপিয়ন হবার পথে যাতে একটিও কাঁটা না থাকে সেই ব্যবস্থা করতে এসেছিল। আমাকে ওরা একটা কাঁটা ভাবে।”
“ঘুষ দিয়ে? না না মশাই, কাল আপনি ভাল করে খেলুন। দারুণ খেলুন। আচ্ছা করে জব্দ করে দিন।”
কমল দেখল, বিপুল ঘোষের সারা মুখ আন্তরিকতায় কোমল ও উজ্জ্বল।
“কাল অফিসে আসছেন তো?” দূর থেকে রণেন দাস প্রশ্ন করল।
“কেন?” কমল সচকিত হয়ে বলল।
“সেটা আপনি ভালই জানেন। তবে বলে রাখছি, পাঁচটার আগে আপনাকে আমি ছাড়তে পারব না।”
“জানি আমি। তবে কাল আমি ক্যাজুয়াল নিচ্ছি।”
অফিস ছুটির পর শোভাবাজার টেণ্টে আসা মাত্র কৃষ্ণ মাইতি হাত ধরে বলল, “গুলোকে শিক্ষা দিতে হবে কমল। ব্যাটা টাকা মেরেছে কাজ হাসিল করে নিয়ে। পয়েন্ট চাই-ই চাই। তুই কিন্তু প্রধান ভরসা। ক্লাবের সবাই তোক খেলানোর এগেন্স্টে, আমি জোর করে বলেছি, কমলকে খেলাতেই হবে।”
নার্ভাস বোধ করল কমল। বিব্রত স্বরে বলল, “কিন্তু কেষ্টদা, একা আমার ওপর এতটা ভরসা করবেন না, করা উচিত নয়। ফুটবল একজনের খেলা নয়।”
“তুই একাই এগারোজন হয়ে খেলতে পারিস, যদি মনে করিস খেলবো। তাছাড়া—মনে আছে সেই চাকরির কথাটা, পল্টু, মুখুজ্যের মেয়ের চাকরি! যদি কাল একটা পয়েণ্ট আনতে পারিস, গ্যারান্টি দিচ্ছি চাকরিটা হবে।”
কমল তর্ক করে কথা বাড়াল না। হঠাৎ সে ক্লান্ত বোধ করতে শুরু করল। অনেক কিছু নির্ভর করছে কালকের খেলার উপর। এখন যার সঙ্গেই দেখা হবে, সে মনের উপর একটা দায়িত্বের পাথর চাপিয়ে দেবে। কমল চেয়ার নিয়ে টেণ্টের বাইরে বেড়ার ধার ঘেঁষে বসল।
ভরত এসে বলল, “কমলদা, একটা কথা বলার ছিল। খুবই জরুরি কিন্তু এখানে বলব না। আপনি বাইরে আসুন, মিনিট পাঁচেক পর আমি টাউন ক্লাব টেণ্টের সামনে থাকব।”
এই বলেই ভরত হনহন করে বেরিয়ে গেল। অবাক হয়ে কমল চারপাশে তাকাল। ক্যাণ্টিনের কাছে সত্য আর দেবীদাস হাসাহাসি করছে। স্বপন একটু আলাদা দাঁড়িয়ে ঘুগনি খাচ্ছে। টেণ্টের মধ্যে যথারীতি টেবিল ঘিরে গুলতানি। ভরতের কী এমন কথা থাকতে পারে যা একান্তে বলা দরকার!
কমল টাউন টেণ্টের কাছে পৌঁছতেই অপেক্ষমান ভরত বলল, “কমলদা, আমাদের দুজন কাল গট্ আপ্ হয়েছে।”
শোনামাত্র কমল জমে গেল। “গট্ আপ্! কারা?”
“আজ সকালে যাত্রীর লোক এসেছিল আমার বাড়িতে। সঙ্গে ছিল শম্ভু। টেরিলিন স্যুট করে দেবে যাত্রী। শম্ভু আর সত্য গোলাম আলীতে মাপ দিয়ে এসেছে।”
“তুই গেলি না?”
ভরত শুধু হাসল। কমলও হাসল। তারপর ভরতের পিঠ চাপড়ে বলল, “এখন কাউকে বলিসনি এসব কথা। আগে খেলাটা হোক।”
“সলিলের কিছু খবর জানেন, আসে না কেন? ও থাকলে খানিকটা সামলানো যেত।”
“সলিল একটা কাজ পেয়েছে, খেলার জন্য আর সময় পায় না। হয়তো আর কোনদিনই পাবে না। কিন্তু ভরত, বাটার সঙ্গে খেলার মত অবস্থা কাল যেন হবে মনে হচ্ছে।”
“কি জানি!” অনিশ্চিত স্বরে ভরত বলল, “আমাদের আর একটা ছেলেও নেই যাকে নামানো যায়। নইলে কেষ্টদাকে বলে সত্য আর শম্ভুকে বসিয়ে দেওয়া যেত।”
ম্লান হেসে কমল বলল, “তাহলে কাল ভাগ্যের উপরই ভরসা করতে হবে।”
“হ্যাঁ, ভাগ্যের উপরেই।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন