ত্রয়োদশ অধ্যায়

মতি নন্দী

যুগের যাত্রী ৫—০ গোলে শোভাবাজারকে হারাল।

অন্ধকার ঘরে বিছানায় উপুড় হয়ে কমল শুয়ে। অ্যালার্ম ঘড়ির টিকটিক শব্দ একটানা তার মাথার মধ্যে হাতুড়ির ঘা মেরে চলেছে। কমল হাত দিয়ে দু’কান চেপে অস্ফুটে কাতরাল। এখনো কানে বাজছে ভয়ঙ্কর চীৎকারগুলো। ঘড়িটা আছড়ে ভেঙ্গে ফেলা যায়, কিন্তু পাঁচটা গোলের চীৎকার!

গ্যালারীর মাঝখানের সরু পথ দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় উপর থেকে তার মাথায় থুথু পড়ে, ইটের টুকরো লাগে পিঠে। একটা চীৎকারও শুনেছিল, “কি রে কমল, অনুপমকে আটকাতে পারিস বলেছিলি না!”

আজ অনুপম তিনটি গোল দিয়েছে। তবে হ্যাটট্রিক হয়নি। কমল বিছানায় বার কয়েক কপাল ঠুকল। অজান্তে একটা গোঙানি মুখ থেকে বেরিয়ে এল।

“কি গো কমল, যাত্রীর জার্সিকে ভয়ে কাঁপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা এবার ছাড়ো।”

গুলোদার হাসিখুশি মুখ আর চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথাগুলো যেন বিছানার মধ্যে থেকে উঠে আসছে। বিছানাটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে একশা করা যায়, কিন্তু কথাগুলোকে!

“আমি কি করব, যিনি টিম করেছেন তাকে গিয়ে বলুন। বুড়ো প্লেয়ার দিয়ে যদি ফুটবল খেলাতে চান তা হলে খেলান। বলিহারি সখ! নিজেরও তো একটা আক্কেল-বিবেচনা থাকে।” সরোজ খেলাশেষে মাঠের উপর দাঁড়িয়ে একজনকে যখন কথাগুলো বলছিল, কমল মুহূর্তের জন্য দেখেছিল চাপা তৃপ্তির আমেজ তার চোখেমুখে ছড়িয়ে রয়েছে।

খেলার শেষ বাঁশি বাজতেই ভরত ছুটে গিয়ে মাঠের মধ্যেই শম্ভুকে চড় কষায়। শম্ভু লাথি মারে ভরতকে। দু’জনকে যখন সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন চীৎকার করে শম্ভু বলে, “গোল কি আমার দোষে হয়েছে? ওই লোকটা, ওই লোকটার জন্য।”

শম্ভুর আঙুল একটা ছোরার মত উঠে কমলকে শিকার করে। কোনদিকে না তাকিয়ে কমল মাঠ থেকে বেরিয়ে আসে।

“এত ভরসা করেছিলুম তোর ওপর। আমায় একেবারে ডুবিয়ে দিলি।” কেষ্টদার হতাশ এবং বিরক্ত কণ্ঠস্বরে কমলের চকিতে মনে পড়েছিল, অরুণার চাকরিটা বোধহয় হল না!

মুখ দেখাবার উপায় কোথাও আর রইল না। বাটার সঙ্গে খেলাটাই আবার অনুষ্ঠিত হল। তবে যাত্রী আরো দক্ষ, আরো কঠিন এবং উদ্দেশ্যপরায়ণ। কমল চোখ বুঁজে এখনো দেখতে পাচ্ছে, অনুপম আর প্রসূন তার দু’পাশ দিয়ে ঢুকছে আর ফাঁকা মাঝমাঠ দিয়ে বল নিয়ে উঠে আসছে যাত্রীর রাইট ব্যাক। স্বপন আর-রুদ্র কোন্‌দিকে কাকে আটকাবে ভেবে পাচ্ছে না। কমল স্থির করেছিল আজ সে অনুপমকে রুখবে। কিন্তু অনুপমের পাশাপাশি প্রসূন সব সময় ছিল তাকে ধাঁধায় ফেলার জন্য। যেখানেই বল প্রসূন সেখানে তার দলের খেলোয়াড়ের পাশে গিয়ে হাজির হয়েছে। শোভাবাজারের একজনের সামনে যাত্রীর দু’জন ফরোয়ার্ড সব সময়ই। লোক পাহারা দেবে না জমি আগলাবে কমল এই সমস্যা সমাধান করতে পারেনি লোকের অভাবে। এবং কেন এই অভাব ঘটল একমাত্র সে আর ভরত তা জানে।

কিন্তু সে-কথা এখন বললে লোকে বলবে সাফাই গাইছে। উপায়ও নেই, মুখ দেখাবার কোন উপায় আর রইল না। বিদ্রূপ আর ইতর মন্তব্য শুনতে হবে বহুদিন। কমল বিছানায় মুখটা চেপে ধরে থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করল।

হঠাৎ ঘরের আলোটা কে জ্বালল। কমল ছিটকে উঠে বসল।

“কমলদা, আমি এসেছি।” ঘরের মধ্যে সলিল দাঁড়িয়ে। মুখে লাজুক বিব্রত হাসি।

“কেন?”

“শুনলুম আজ পাঁচ গোলে শোভাবাজার হেরেছে।”

কথা না বলে কমল একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

“আমি খেলব কমলদা। আমি আর বাড়িতে ফিরব না। কাজ আমি করতে চাই না, আমি খেলতে চাই। আমাকে শুধু দু’মুঠো খেতে দেবেন আর একটু ঘুমোবার জায়গা।”

উঠে দাঁড়াল কমল।

“আমি বাড়ির জন্য আর ভাবব না। ওদের বাঁচানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি—”

এরপরই সলিল পেটটা চেপে ধরে ছিটকে দেয়ালে আছড়ে পড়ল কমলের লাথি খেয়ে।

“কি জন্য এসেছিস এখানে! রাসকেল, করুণা দেখাতে এসেছিস? পাঁচ গোল খেয়েছি বলে সাহায্য করতে এসেছিস? ফুটবল খেলে আমায় উদ্ধার করতে এসেছিস?” বলতে বলতে কমল আবার লাথি কষাল। সলিল কাত হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল। তার পিঠে কোমরে মাথায় কমল পাগলের মত এলোপাথাড়ি লাথি মারতে শুরু করল। চুল ধরে টেনে তুলে মুখে ঘুষি মারল।

“আমায় মারবেন না কমলদা, আমি চলে যাচ্ছি, আমি চলে যাচ্ছি।” সলিল উঠে বসতেই কমল ওর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল।

“কেন এসেছিস, বল কেন এসেছিস?”

সলিল হাঁ করে মুখটা তুলে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণ বেয়ে, নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে আর চোখ বেয়ে জল। ও বলার আগেই দরজার কাছে অমিতাভ বলে উঠল, “ছাড়ুন, ওকে ছাড়ুন।”

দ্রুত ঘরে ঢুকে সে সলিলের চুল-ধরা কমলের হাতে ধাক্কা দিল।

“তোমার কি দরকার এখানে?”

“আপনি এ-ভাবে মারছেন কেন ওকে?”

“আমি যা করছি তাতে তোমার নাক গলাতে হবে না।”

“একজনকে এ-ভাবে মারবেন আর তাই দেখে বাধা দেবো না? দেখুন তো কি অবস্থা হয়েছে ওর! জানোয়ারকেও এভাবে মারে না।”

“না না, কমলদা আমায় মারেননি।” সলিল দু’হাত তুলে অমিতাভর কাছে আবেদন জানাল ঘড়ঘড়ে স্বরে। “কমলদা আমায় কখনো মারেন না, শুধু আমায় শাস্তি দেন।”

“চুপ করো তুমি।” অমিতাভ ধমক দিল সলিলকে। তারপর ঝুঁকে তার শীর্ণ হাতটা বাড়িয়ে সলিলের কাঁধে আঙুল ছোঁয়াল। “এসো আমার ঘরে, মুখ ধুইয়ে মলম লাগাতে হবে।”

অমিতাভ বেরিয়ে যাবার সময় থমকে একবার কমলের দিকে তাকাল। অদ্ভুত একটা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে কমলের মুখে ফুটে উঠেছে দীনতার ছাপ। বয়সটা যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। কমল কুঁজো হয়ে ধীরগতিতে এসে খাটের উপর বসল। শূন্য দৃষ্টিতে সলিলের দিকে তাকিয়ে থেকে অন্যমনস্কের মত চুলে আঙুল চালাতে লাগল।

সলিল ওঠবার চেষ্টা করে যন্ত্রণায় কাতরে উঠে পেট চেপে বসে পড়ল। আবার চেষ্টা করল ওঠবার। আবার বসে পড়ল। অসহায়-ভাবে কমলের দিকে তাকাল। একদৃষ্টে কমল তার দিকে তাকিয়ে, চোখে কোন অভিব্যক্তি নেই।

“আপনার মাথায় দাগটা এখান থেকেও আমি দেখতে পাচ্ছি কমলদা।”

কমল নিরুত্তর রইল। সলিল হাসবার চেষ্টা করল, তারপর হামাগুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কমল চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে যেতে লাগল। অনেকক্ষণ পর অমিতাভ ঘরে ঢুকে মৃদুস্বরে বলল, “আপনি শুয়ে পড়ুন।”

কমল মুখ তুলে কিছুক্ষণ ধরে অমিতাভর মুখের উপর চোখ রাখল। ক্রমশ সংবিৎ ফিরে এল তার চাহনিতে। মুখ দুমড়ে গেল বেদনায়। ফিসফিস করে সে বলল, “আমি শেষ হয়ে গেলাম!”

অমিতাভ আলো নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%