রোগ নির্ণয়

জেরোম কে জেরোম

মনে পড়ে একবার আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গেছিলাম—ওদের লাইব্রেরিতে অ্যালার্জি সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করতে। আসলে আমার একটু জ্বরভাব হয়েছিল, খুব সম্ভবত অ্যালার্জি থেকেই।

বইটা নামিয়ে যেটুকু পড়ার পড়ে ফেললাম। তারপর কিছুটা অন্যমনস্কভাবে বইটার পাতা উলটোতে উলটোতে অলসভাবে পাতাগুলোর ওপর চোখ বোলাতে শুরু করলাম।

বইটা ছিল একটা মেডিক্যাল অভিধান গোছের। মনে নেই কোন রোগটার কথা পড়ে প্রথম ধাক্কাটা খেলাম—সেটা নিশ্চয়ই কোনো ভয়াবহ মারণ রোগ—এবং তারপর সেই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো পড়ে মনে হল, রোগটি আমার শরীরে বেশ ভালো করেই বাসা বেঁধেছে।

ভয়ে, উৎকণ্ঠায় কাঠ হয়ে খানিকক্ষণ বসে রইলাম। তারপর হতাশায় অবসন্ন হয়ে আবার বইটার পাতা উলটোতে শুরু করলাম।

যে পৃষ্ঠায় টাইফয়েড সম্বন্ধে লেখা আছে, সেটিতে রোগের লক্ষণগুলো পড়ে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে, বেশ কয়েকমাস ধরে আমি টাইফয়েডে ভুগছি, অথচ তা আমি জানিই না।

তখন ভাবলাম—আচ্ছা, দেখাই যাক না, আমার আর কী কী রোগ আছে!

চলে গেলাম সেই পৃষ্ঠায়, যেখানে 'সেন্ট ভাইটাস ড্যান্স' নামক রোগটি সম্বন্ধে লেখা আছে। এটা স্নায়ুর অসুখ—হাত, পা, মুখ অনিয়ন্ত্রিতভাবে নড়তে থাকে। যা ভেবেছিলাম তাই—আমার এই রোগটিও আছে।

আমার শারীরিক অবস্থা সম্বন্ধে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল হওয়ার জন্য ততক্ষণে মনে প্রবল ঔৎসুক্য জেগেছে। ঠিক করলাম, বইটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবার পড়ে দেখব।

বর্ণানুক্রমিকভাবে বিভিন্ন রোগ সম্বন্ধে পড়তে শুরু করলাম। প্রথমেই এল 'ague' অর্থাৎ কম্প দিয়ে জ্বর। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, আমার এই জ্বর হয়েছে এবং এক পক্ষকালের মধ্যেই চরম অবস্থায় পৌঁছোবে জ্বরটা।

পরের রোগটার নাম—'Bright’s Disease'—কিডনি সংক্রান্ত অসুখ। একটু স্বস্তি হল এই দেখে যে, এই রোগটি আমার হলেও খুবই পরিমিতভাবে হয়েছে। রোগটি পুষে রেখেও বহু বছর বেঁচে থাকা যায়।

কিন্তু হায়! আমার কলেরা আছে—বেশ জটিল রকমের কলেরা। আর ডিপথেরিয়া রোগটা সম্বন্ধে পড়েই বোঝা গেল যে আমি ওটা সঙ্গে নিয়েই জন্মেছি।

ইংরেজি ভাষার ছাব্বিশটা বর্ণের সবক'টি বর্ণ দিয়ে শুরু যতগুলো অসুখ আছে, সবই আমার আছে। অবশ্য একটা রোগ আমার নেই— 'Housemaid’s Knee অর্থাৎ কাজের মহিলারা যাঁরা হাঁটু মুড়ে ঘর-টর মোছেন, তাঁদের যে রোগটা হয়।

মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। আমাকে যেন উপেক্ষা করা হয়েছে। কেন আমার ‘Housemaid’s Knee’ হয়নি? কেন আমাকে এইভাবে পৃথক করে রাখা?

একটু পরে অবশ্য মনক্ষুণ্ণ ভাবটা কমে গেল। ভাবলাম, চিকিৎসাশাস্ত্রের বাকি সমস্ত রোগ যখন আমার আছে, তখন একটা মাত্র রোগ নেই বলে অতটা স্বার্থপরের মতো চিন্তা করা উচিত নয়।

ঠিক করলাম, ওই রোগটা ছাড়াই আমি চালিয়ে নেব। গেঁটে বাত, দেখলাম, আমার ভালোরকমই আছে—বেশ মারাত্মক গেঁটে বাত। অথচ এটার ব্যাপারে আমি জানতাম না। আর ‘Zymosis’ রোগটা, যেটা ব্যাকটিরিয়া থেকে হয় এবং অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, মনে হল বাল্যকাল থেকেই আমার সঙ্গী।

এর পরে বইটাতে আর কোনো রোগের উল্লেখ নেই। সুতরাং আমার আর কোনো রোগ নেই—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোলাম।

চুপচাপ বসে আমি ভাবতে থাকলাম। ডাক্তারি শাস্ত্রে আমার মতো এইরকম একটা কেস নিশ্চয়ই অসাধারণ। ডাক্তারি ছাত্রদের ক্লাসে এমন নমুনা নিশ্চয়ই অভূতপূর্ব। ছাত্ররা যদি আমাকে পেয়ে যায়, তাহলে হাসপাতালের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রোগে অসুস্থ রোগীদের দেখে বেড়াতে হবে না তাদের। আমি নিজেই তো একটা হাসপাতাল। ছাত্ররা আমাকে প্রদক্ষিণ করেই স্বচ্ছন্দে ডিগ্রি পেয়ে যাবে।

হঠাৎ মনে হল—আচ্ছা, আমার আয়ু আর কতকাল? নিজেকে পরীক্ষা করার চেষ্টা করলাম। নাড়ি দিয়ে শুরু। প্রথমে তো নাড়ির স্পন্দনই অনুভব করতে পারলাম না। তারপর হঠাৎ নাড়ির স্পন্দন শুরু হল। ঘড়িটা পকেট থেকে বের করে দেখলাম, এক মিনিটে একশো সাতচল্লিশটা স্পন্দন।

এরপর বুকে হাত দিয়ে হৃদযন্ত্রটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম। কিছুই বোঝা গেল না—হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি হচ্ছে না। অগত্যা এই সিদ্ধান্তে এলাম যে, হৃদযন্ত্রটা এত কাল ধরে যথাস্থানে নিশ্চয়ই আছে এবং ধুকপুক করছে, কিন্তু কীভাবে ওটা চলছে তার সম্যক কারণ আমার জানা নেই।

এবার কোমর থেকে মাথা অবধি শরীরের সামনের দিকটা একটু থাবড়ে থাবড়ে দেখলাম। পাঁজরার দুই পাশে এবং পিঠের ওপরেও চাপড়-টাপড় মারলাম। কিন্তু কোনো আওয়াজও পেলাম না, কিছু বুঝতেও পারলাম না।

জিভটা দেখার চেষ্টা করলাম এবার। জিভটা যতটা বের করা যায় ততটা বের করে এক চোখ বন্ধ করে অন্য চোখ দিয়ে জিভটাকে দেখতে গেলাম। জিভের ডগাটুকু খালি দেখতে পাওয়া গেল। সেটুকু দেখেই নিশ্চিন্ত হলাম যে, জিভে ফুসকুড়িওয়ালা জ্বর অর্থাৎ 'Scarlet Fever' হয়েছে আমার।

পাঠাগারে ঢুকেছিলাম স্বাস্থ্যবান, সুখী একটা মানুষের মতো। বেরিয়ে এলাম প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে—রোগজীর্ণ, ভগ্নস্বাস্থ্য একটি প্রাণী।

ডাক্তারের কাছে গেলাম। সে আমার পুরনো বন্ধু। যখনই মনে হয় আমি অসুস্থ, তখন ওর কাছে গেলে ও আমার নাড়ি টেপে, জিভটা দেখে আর আবহাওয়ার ব্যাপারে কথা বলে—অর্থাৎ আমার যেন কিছুই হয়নি। এবার বাছাধনের কাছে সত্যি সত্যি অসুখ নিয়ে হাজির হব।

মনে মনে বললাম, ডাক্তারের দরকার প্র্যাকটিসের। ও আমাকে এবার রোগী হিসেবে পাবে। সতেরোশো সাধারণ রোগীর মাথাপিছু একটা দুটো রোগ সারিয়ে ওর চিকিৎসাশাস্ত্রের যা চর্চা হয়, খালি আমাকে দেখলে তার থেকে বেশি প্র্যাকটিস হবে।

সুতরাং সোজা গেলাম ডাক্তারের কাছে। ও আমাকে দেখেই বলল—কী হয়েছে তোমার?

আমি বললাম,—আমার কী হয়েছে সেটা বলে তোমার সময় নষ্ট করব না। জীবন বড়ই সংক্ষিপ্ত। আমার বলা শেষ হওয়ার আগেই হয়তো তুমি মরে গেলে। তাই তোমাকে বলব আমার কী হয়নি। আমার ‘Housemaid’s Knee’ রোগটা হয়নি। কেন যে ওটা হয়নি, তা বলতে পারব না। তবে সত্যিই ওই রোগটা হয়নি। আর সমস্ত রোগ কিন্তু আমার আছে।

ওকে বললাম কী করে ব্যাপারটা আমি আবিষ্কার করেছি।

ডাক্তার আমার দিকে একবার তাকিয়ে বিনাবাক্যব্যয়ে আমাকে পরীক্ষা করতে শুরু করল। কব্জিটা ধরল। বুকে একটা চাপড় মারল। আশা করিনি ওটা করবে। কাপুরুষের মতো!

নিজের মাথাটা আমার মাথায় ঠুকল একবার। তারপর ও বসে একটা প্রেসক্রিপশান লিখল। ওটা ভাঁজ করে আমাকে দিতেই আমি ওটা পকেটে পুরে ওর চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম।

প্রেসক্রিপশানের কাগজটার ভাঁজ না খুলেই কাছের একটা ওষুধের দোকানে ওটা দিলাম। দোকানদার ওটায় একবার চোখ বুলিয়ে ফেরত দিয়ে দিল। বলে দিল যে, এইসব জিনিস ওর দোকানে নেই।

—আপনার তো ওষুধের দোকান? আমার প্রশ্ন।

—হ্যাঁ, এটা ওষুধেরই দোকান। এটা যদি মুদির দোকান আর হোটেল মিশিয়ে একটা জগাখিচুড়ি হতো, তাহলে হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে পারতাম। গন্ডগোলটা এই যে এটা ওষুধের দোকান।

আমি তখন কাগজটা পড়লাম। ওটায় লেখা ছিলঃ

১. এক পাউন্ড মাংস, সঙ্গে

২. এক পাঁইট বিয়র,—প্রতি ছ'ঘণ্টা অন্তর

৩. দশ মাইল হাঁটা—রোজ সকালে।

৪. ঠিক রাত এগারোটায় শুয়ে পড়া আর যে জিনিস বোঝো না, সেগুলো মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা না করা।'

অধ্যায় ১ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%