ভোরে ওঠার ভোগান্তি

জেরোম কে জেরোম

ভোর ছ'টায় আমার ঘুম ভাঙল। দেখি, আমার বন্ধু জর্জও জেগে উঠেছে। দুজনেই পাশ ফিরে আবার ঘুমোতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুম আর এল না। যদি দরকারি কাজের জন্যে ভোরে উঠতে হতো, তাহলে ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বেলা দশটা পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে ঘুমোতাম। কিন্তু আজ যেহেতু কোনও কাজ নেই আর আরও দু-ঘণ্টা আরামে ঘুমোনো যেত, প্রকৃতির এমনই বদ খেয়াল যে, আজই খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল এবং মনে হল যে, আর পাঁচ মিনিট ঘুমোলেও সেটা একটা মৃত্যুতুল্য ভয়ানক ব্যাপার হবে।

জর্জ বলল যে, বছর দেড়েক আগে ওর এর থেকেও একটা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তখন ও মিসেস গিপিংস বলে এক মহিলার বাড়িতে ভাড়া থাকত। একদিন সন্ধেবেলায় ওর ঘড়িটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল—ঘড়িটায় তখন সময় দেখাচ্ছিল সওয়া আটটা। সেদিন রাতে শুতে যাবার সময় জর্জ প্রতিদিনকার অভ্যাস অনুযায়ী ঘড়িটায় দম দিতে ভুলে গেল এবং ঘড়িটার দিকে একবারও না তাকিয়ে ওটাকে বালিশের পাশে রেখে দিল। অর্থাৎ ও লক্ষও করেনি যে, ঘড়িটায় ক'টা বেজেছে।

শীতকাল। দীর্ঘ রাত। তার ওপর এক সপ্তাহ ধরে শহরের ওপর কুয়াশার ঘন আস্তরণ। সুতরাং জর্জের যখন ঘুম ভাঙল, তখনও ঘুটঘটে অন্ধকার। ঘুম থেকে উঠেই জর্জ দেখল যে, সওয়া আটটা বাজে।

'হায় ভগবান! কী করি এখন? আমাকে তো সকাল ন'টার মধ্যে অফিসপাড়ায় পৌঁছোতে হবে! কেউ আমাকে একটু ডেকে দিল না?' ইত্যাদি বলতে বলতে জর্জ ঘড়িটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক লাফে শয্যা ত্যাগ করে ঠান্ডা জলেই স্নান করে নিল। গরম জল অত সকালে কোথায়? সুতরাং ঠান্ডা জলে দাড়িও কামিয়ে নিল। তারপর জামাকাপড় পরে রওনা হওয়ার আগে ঘড়িটার দিকে একবার তাকাল।

বিছানায় আছড়ে ফেলে দেওয়ার জন্যে বা অন্য কোনও অজানা কারণে ঘড়িটা তখন আবার চলতে শুরু করেছে। কেননা এখন ঘড়ির কাঁটা নির্দেশ করছে—আটটা চল্লিশ।

ঘড়িটা হাতে নিয়ে জর্জ পড়িমরি করে একতলায় নেমে এল। বৈঠকখানা স্তব্ধ, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা। প্রাতরাশ প্রস্তুত করার কোনও আয়োজন নেই। বাড়িওয়ালির ওপর ভীষণ রাগ হল জর্জের। সন্ধেবেলায় ফিরে এসে বুড়িকে দু-চার কথা শোনাতে হবে। তারপর টুপি আর ওভারকোট পরে ছাতা হাতে নিয়ে ও সদর দরজার কাছে এল। দরজার হুড়কো, তালা—কিছুই খোলা হয়নি। জর্জ মনে মনে অলস বুড়ি বাড়িওয়ালির শ্রাদ্ধ করতে করতে বেরিয়ে পড়ল।

সিকি মাইলটাক রাস্তা প্রায় দৌড়ে দৌড়ে যাবার পর জর্জের একটু খটকা লাগল। রাস্তা প্রায় জনহীন। দোকানপাট সব বন্ধ। যতই অন্ধকার আর কুয়াশা হোক না কেন, মানুষ কি তার জন্যে কাজকর্ম, ব্যবসাপাতি সব বন্ধ করে দিয়েছে? জর্জকে তো কাজে যেতে হবেই! তাহলে কি আর সবাই অন্ধকার আর কুয়াশার প্রভাবে বিছানায় সেঁটে থাকবে?

অবশেষে জর্জ ওবোর্ন পৌঁছোল। একটাও দোকান খোলা নেই। একটাও বাস চোখে পড়ল না। তিনটে লোক দেখা গেল, তার মধ্যে একজন পুলিশ। বাঁধাকপি ভরতি একটা ঠ্যালাগাড়ি। আর নজরে এল একটা ঝরঝরে ট্যাক্সি। জর্জ ঘড়ি দেখল—ন'টা বাজতে পাঁচ। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ও নিজের নাড়ি দেখল। একটু ঝুঁকে নিজের পা দুটোর অস্তিত্ব যাচাই করল। তারপর ঘড়িটা হাতে নিয়ে পুলিশটার কাছে গিয়ে জানতে চাইল, ক'টা বাজে।

সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে জর্জকে জরিপ করে পুলিশটা বলল, 'ক'টা বাজে? কান খাড়া রাখলেই শুনতে পাবেন, ক'টা বাজে।'

তক্ষুনি কানে এল রাস্তার একটা ঘড়ির ঢংঢং আওয়াজ।

'এ কী! এখন মাত্র তিনটে বাজে!' ঘড়ির আওয়াজ শুনে জর্জের ক্ষুব্ধ মন্তব্য।

পুলিশটা জিগ্যেস করল, 'ক'টা বাজলে আপনার সুবিধে হতো?'

'ন'টা।' বলে জর্জ নিজের ঘড়িটা দেখল।

এইবার সরকারি শান্তিরক্ষক কড়া গলায় বলল, 'আপনি কোথায় থাকেন, সেটা জানেন কি?'

জর্জ একটু ভেবে বাড়ির ঠিকানাটা বলল।

'তা-ই নাকি?' পুলিশ উপদেশ দিল, 'চুপচাপ বাড়ি চলে যান। ভালো কথা, আপনার ঘড়িটা সঙ্গে নিয়ে যান। আর হ্যাঁ, এইরকম ঘটনা যেন আর না হয়।'

চিন্তিতভাবে জর্জ বাড়ি ফিরে গেল। বাড়িতে ঢুকে ওর প্রথমে মনে হল, পোশাক পরিবর্তন করে আবার ঘুমোনো যাক। কিন্তু তার অনেক হ্যাপা—আবার যাওয়ার আগে স্নান, আবার পোশাক পরা ইত্যাদি। তাই সাত-পাঁচ ভেবে ঠিক করল যে, আরামকেদারায় বসেই ঘুমিয়ে নেবে।

কিন্তু ঘুম কিছুতেই এল না। বস্তুত সারাজীবনে জর্জ কখনও এত সজাগ থাকেনি। অগত্যা আলো জ্বালিয়ে দাবার বোর্ডটা বের করে নিয়ে নিজেই এক দান দাবা খেলল। ভালো লাগল না। সুতরাং দাবা ছেড়ে দিয়ে ও একটা বই পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বই পড়তেও একদম ভালো লাগল না। অবশেষে ওভারকোটটা আবার পরে নিয়ে জর্জ একটু হাঁটতে বেরোল।

বাইরে চারদিক নির্জন, রিক্ত। যে ক'জন পুলিশকে দেখা গেল, তারা প্রত্যেকেই সন্দিগ্ধ চোখে জর্জকে দেখছিল। কেউ কেউ আবার হাতের লণ্ঠন উঁচু করে ওকে অনুসরণ করতে লাগল। জর্জের মনে হল, ও সত্যিই হয়তো কোনও অপরাধ করেছে। অতএব পুলিশের বুটের আওয়াজ পেলেই ও আশপাশের গলিঘুঁজির মধ্যে ঢুকে পড়ছিল। কখনও বা কোনও কোনও বাড়ির সদর দরজায় সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়ছিল।

জর্জের এইরকম চোর-পুলিশ খেলা দেখতে দেখতে পুলিশরা ক্রমে ক্রমেই ওর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছিল। ওরা মাঝে মাঝে ওকে খুঁজে বের করে জিগ্যেস করছিল—ও সেখানে কেন এসেছে, কী করছে, কোথায় থাকে ইত্যাদি। যখন জর্জ বলছিল যে, ও কিছুই করছে না, খালি একটু হাঁটতে বেরিয়েছে (তখন রাত চারটে), বোঝাই যাচ্ছিল যে, পুলিশরা ওর কোনও কথাই বিশ্বাস করছে না। বস্তুত দুজন সাদা পোশাকের পুলিশ ওর সঙ্গে ওর বাড়ি পর্যন্ত এসে দেখে গেল যে, ও সত্যি সত্যিই ওই বাড়িতে থাকে কিনা। ওরা জর্জকে চাবি দিয়ে তালা খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখল, এবং তারপর বাড়ির উলটো দিকে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

জর্জ ভাবল, উনুন ধরিয়ে একটু প্রাতরাশের ব্যবস্থা করবে। খাওয়াও হবে, সময়টাও কেটে যাবে। কিন্তু জর্জ আনাড়ি—রান্না করতে গেলেই ওর হাত থেকে বাসনটাসন বা নিদেনপক্ষে চামচ ইত্যাদি কিছু ফসকে মাটিতে পড়বেই। সেই আওয়াজে বাড়িওয়ালির ঘুম ভেঙে যাবে এবং উনি বাড়িতে ডাকাত পড়েছে ভেবে জানলা খুলে 'পুলিশ, পুলিশ' বলে তারস্বরে চিৎকার করতে থাকবেন। তখন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই দুজন পুলিশ তৎক্ষণাৎ এসে ওকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ কোর্টে নিয়ে যাবে।

জর্জ ততক্ষণে পুরোপুরি নার্ভাস হয়ে পড়েছে। মনশ্চক্ষুতে বিচারের ছবিটা দেখতে পেল—জর্জ প্রাণপণে জুরিদের সত্যিটা বলার চেষ্টা করছে। জুরিরা কেউ ওর কথা একবর্ণ বিশ্বাস করছে না, অবশেষে বিচারক ওকে কুড়ি বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিলেন এবং এই সংবাদ পেয়ে ভগ্ন হৃদয়ে ওর মা প্রাণত্যাগ করলেন। সুতরাং প্রাতরাশ তৈরি করার পরিকল্পনায় জলাঞ্জলি দিয়ে ওভারকোট পরেই জর্জ আরামকেদারায় ঠায় বসে রইল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত, যতক্ষণ না মিসেস গিপিং একতলায় নেমে এলেন।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে জর্জ আর কোনও দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%