ছবি টাঙালেন আঙ্কল পোজার

জেরোম কে জেরোম

আমাদের আঙ্কল পোজার কোনও একটা কাজ করতে গেলে সারা বাড়িতে যেন ঝড় বয়ে যেত। এই রকম একটি ঘটনার কথা শোনাই।

একটা বড় ছবি সদ্য বাঁধাই হয়ে বাড়িতে এসেছে। খাবার ঘরের একধারে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা রাখা—একটা ভালো জায়গায় টাঙাতে হবে। আন্টি এসে আঙ্কলকে জিগ্যেস করলেন যে ছবিটার কী ব্যবস্থা হবে? আঙ্কলের তৎক্ষণাৎ জবাব—আরে! এ ব্যাপারে তোমরা কিচ্ছু ভেবো না। পুরোটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।

তারপর আঙ্কল কোটটা খুলে কাজ শুরু করলেন। প্রথমেই কাজের মেয়েটাকে দোকানে পাঠালেন কয়েকটা পেরেক কিনতে। পরক্ষণেই বড়ছেলেকে পাঠালেন কাজের মেয়েটার পেছনে—তাকে পেরেকের সাইজ বলতে। এরপর তাঁর কাজ পুরোদমে শুরু হল এবং বাড়িতে আরম্ভ হল হুলস্থুল কাণ্ড।

—উইল, তুই হাতুড়িটা নিয়ে আয়, আর টম, তুই স্কেলটা আন। আঙ্কল বেশ জোর গলায় নির্দেশ দিলেন।

—আর হ্যাঁ, মইটা চাই। রান্নাঘরের উঁচু চেয়ারটাও লাগবে। জিম, তুই চট করে মিঃ গগলস-এর বাড়ি চলে যা। ওঁকে আমার নমস্কার জানাবি। আর আমার হয়ে বলবি যে আশা করি ওঁর পায়ের ব্যথাটা সেরে গেছে। ওঁর যে লেভেল মাপার যন্ত্রটা আছে, সেটা কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে আয়।

—আরে মারিয়া, তুমি কোথায় যাচ্ছ? কাউকে আলোটা দেখাতে হবে তো! ভালো কথা, কাজের মেয়েটা পেরেক নিয়ে ফিরলেই ওকে আবার একটু দোকানে পাঠাতে হবে—ছবি টাঙানোর দড়ি চাই তো। টম, তুই আবার কোথায় গেলি? এখানে আয়—ছবি ধরে আমার হাতে দিবি তো!

এবার আঙ্কল ফ্রেম সমেত ছবিটা তুলে ধরলেন আর পরমুহূর্তেই সেটা তাঁর হাত থেকে ফসকে নীচে পড়ে গেল। ছবিটা ফ্রেমের থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। এবং ফ্রেমের কাচটা বাঁচাতে গিয়ে আঙ্কলের আঙুল কেটে গেল। তখন উনি ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকলেন রুমালের খোঁজে। রুমালটা অবশ্যই পাওয়া গেল না কেননা সেটা আছে ওঁর ছেড়ে রাখা কোটের পকেটে। আর কোটটা উনি কোথায় রেখেছেন তা এখন আর ওঁর মনে নেই। সুতরাং বাড়ির সকলে এখন যন্ত্রপাতি, সাজসরঞ্জাম ইত্যাদির বদলে তাঁর কোট খুঁজতে শুরু করল। আর উনি যন্ত্রণায় লাফাতে লাফাতে ওদের যাতায়াতের রাস্তা আটকে দিলেন।

—সারা বাড়ির এত লোক কেউ জানে না আমার কোটটা কোথায়! জীবনে তোমাদের মতো লোক দেখিনি। ছ'-ছ'জন মানুষ—পাঁচ মিনিট আগে ছেড়ে রাখা একটা কোট খুঁজে পাচ্ছ না?

একটু পরে আঙ্কল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই দেখা গেল যে তিনি কোটের ওপরেই এতক্ষণ বসে ছিলেন। তখন আঙ্কলের চিৎকার—খুব হয়েছে! আর কোট খুঁজতে হবে না। আমি নিজেই ওটা খুঁজে বের করেছি। বেড়ালটাকে কিছু খুঁজতে বলা আর তোমাদের কিছু খুঁজতে বলা একই ব্যাপার!

তারপর ঝাড়া আধ ঘণ্টা কেটে গেল—রুমাল দিয়ে আঙুলের ক্ষতস্থান বাঁধা, নতুন কাচ জোগাড় করা, যন্ত্রপাতি, মই, চেয়ার, মোমবাতি—এসব কাছে আনা ইত্যাদিতে। এবার আঙ্কল আবার তৈরি। বাড়ির সকলে, এমনকী কাজের মেয়েটি ও ঠিকে-ঝি সবাই অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে—কখন কী দরকার লাগে তার প্রতীক্ষায়। দুজন মিলে চেয়ারটাকে ধরে রইল, আর একজন আঙ্কলকে ধরে চেয়ারে উঠিয়ে তাঁর কোমর ধরে দাঁড়িয়ে রইল। চতুর্থজন ওঁর হাতে একটা পেরেক ধরিয়ে দিল। পঞ্চমজন এগিয়ে দিল হাতুড়িটা। আর উনি পেরেকটা ধরার পরেই সেটা হাত থেকে পড়ে গেল।

খানিকটা হতাশার সুরে আঙ্কল বলে উঠলেন, যা! পেরেকটা গেল।

তক্ষুনি আমরা সকলে হামাগুড়ি দিতে দিতে পেরেকের জন্য ঘরের মেঝেটা তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করে দিলাম। আর আঙ্কল চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে রাগে ও বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন যে, তাঁকে কী পুরো সন্ধেটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে!

শেষ পর্যন্ত অবশ্য পেরেকটা খুঁজে পাওয়া গেল, কিন্তু ততক্ষণে হাতুড়িটা হারিয়ে গেছে।

আঙ্কলের হতাশামিশ্রিত বক্তব্য—হাতুড়িটা কোথায় গেল? কী করলাম হাতুড়িটা দিয়ে? হায় ভগবান, তোমরা সাত-সাতজন এখানে হাঁ করে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছ অথচ জানো না হাতুড়িটা কোথায় গেল!

একটু পরে আমরা হাতুড়িটা তো খুঁজে বের করলাম, কিন্তু ততক্ষণে দেওয়ালে পেরেক পোঁতার জন্য দেওয়া দাগ আর আঙ্কলের চোখে পড়ছে না। এক এক করে আমরা সকলে তখন চেয়ারে উঠে আঙ্কলের পাশে দাঁড়িয়ে দাগটা ঠাহর করার চেষ্টা করলাম। প্রত্যেকেই দাগটা দেখতে পেলাম, তবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। আঙ্কল আমাদের 'বুদ্ধু', 'গবেট' ইত্যাদি বিশেষণ দিয়ে একে একে সবাইকে চেয়ার থেকে নামিয়ে দিলেন। তারপর স্কেলটা নিজের হাতে নিয়ে পেরেক পোঁতার সঠিক জায়গার জন্য আবার দেওয়ালে মাপজোক শুরু করলেন। একত্রিশ পূর্ণ আটের তিন ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটা জায়গার ঠিক মাঝখানে পেরেকটা লাগাতে হবে। ওই সংখ্যাটাকে মনে মনে অর্ধেক করতে গিয়ে আঙ্কল অঙ্কটা গুলিয়ে ফেললেন। ফলে মাথা গরম হয়ে গিয়ে তাঁর আচরণ প্রায় উন্মাদের মতো হয়ে উঠল।

আমরাও সকলে মনে মনে হিসেবটা করতে লাগলাম। উত্তর প্রত্যেকেরই আলাদা হল। এবং একে অপরকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মুখ ভেঙাতে লাগলাম। আর এই হট্টগোলে আসল মাপটা সবাই গুলিয়ে ফেলল। অগত্যা আঙ্কল আবার নতুন করে মাপ নিতে শুরু করলেন।

এইবার উনি সুতো দিয়ে মাপ নিতে গেলেন। মাপ নেওয়ার সময় যখন উনি চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি হেলে গিয়ে নাগালের অন্তত তিন ইঞ্চি দূরে দেওয়ালের নির্ধারিত জায়গাটা ছুঁতে গেলেন, তখনই সুতোটা তাঁর হাত থেকে গেল ফসকে আর উনি টাল সামলাতে না পেরে ধড়াস করে পড়ে গেলেন পিয়ানোর ওপর। আঙ্কলের শরীরের চাপে পিয়ানোর সব ক'টা রিড একসঙ্গে বেজে উঠে ঘরটা একটা জম্পেসরকম সুরে ভরে গেল।

আর আঙ্কলের মুখ থেকে যেসব কথা বেরোল, তা শুনে আন্টি বললেন যে, তিনি বাড়ির ছেলেমেয়েদের এই জায়গায় থাকবে দেবেন না। ওরা খারাপ খারাপ কথা শিখে ফেলবে।

অবশেষে দেওয়ালে পেরেক পোঁতার জায়গাটা ঠিক করে আঙ্কল বাঁ-হাতে নিলেন পেরেকটা আর ডান হাতে হাতুড়িটা। হাতুড়ির প্রথম ঘা-টা পড়ল আঙ্কলের বুড়ো আঙুলের মাথায় আর যন্ত্রণায় চিৎকার করে উনি দুম করে হাতুড়িটা দিলেন ফেলে। সেটা গিয়ে পড়ল একজনের পায়ের ওপর।

আন্টি মৃদু স্বরে বললেন যে, আঙ্কল ভবিষ্যতে যদি কখনও পেরেক পুঁততে চান, আন্টিকে সেটা যেন যথেষ্ট আগে জানিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তিনি সপ্তাহখানেকের জন্য মায়ের কাছে চলে যেতে পারেন।

নিজেকে একটু ধাতস্থ করে আঙ্কল বললেন, আঃ! তোমরা মেয়েরা সব কিছুতেই বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করো! আসলে এইরকম ছোটখাটো কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগে।

এইবার হাতুড়ির দুটো ঘা পড়তেই পেরেকটার পুরোটা সোজা দেওয়ালের প্লাস্টারের মধ্যে ঢুকে গেল এবং তার পেছনে হাতুড়ির অর্ধেকটা। আঙ্কলও সেই গতির প্রভাবেই নিজে দেওয়ালে প্রায় চেপটে যান আর কী!

তখন আমরা আবার স্কেল ও সুতো বের করলাম। নতুন একটা ফুটো করা হল। ছবিটা যখন শেষ পর্যন্ত টাঙানো হল, তখন প্রায় মধ্যরাত। ছবিটা দেওয়ালে বেঁকে রইল আর এমনভাবে টাঙানো হল যে মনে হয় যে-কোনও সময় খুলে পড়ে যাবে। চারপাশের দেয়ালটার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যে কেউ যেন দেওয়ালের ওপর যথেচ্ছভাবে র্যাঁদা চালিয়েছে। আমরা সকলেই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত—অবশ্য আঙ্কল ছাড়া।

চেয়ার থেকে নামতে গিয়ে ঠিকে ঝিয়ের পায়ের কড়ার ওপর পা ফেললেন আঙ্কল। তারপর চতুর্দিকের ছত্রাকার অবস্থা গর্বের সঙ্গে দেখতে দেখতে বললেন, এই তো! কাজটা হয়ে গেল। বুঝি না বাবা, এইসব ছোটখাটো কাজের জন্য লোকে বাইরে থেকে মিস্ত্রি কেন ডেকে আনে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%