সাইকেল সারানোর সহজ পাঠ

জেরোম কে জেরোম

সাইকেল সারানো ও সার্ভিসিং-এর অভিজ্ঞতা আমার একবার হয়েছিল। একটা লোকের সঙ্গে সেই সময়ে আমার প্রায়ই দেখাসাক্ষাৎ হতো। একদিন সন্ধেবেলা লোকটা আমাকে প্রস্তাব দিল, 'চলো, দুজনে মিলে আগামীকাল সাইকেল চড়ে একটু দূরে কোথাও বেড়িয়ে আসি।'

আমি রাজি হয়ে গেলাম। কষ্ট করে পরের দিন খুব ভোরে উঠলাম। ভারি মনোরম দিন। লোকটি এল আধ ঘণ্টা পরে।

ও আমার সাইকেলটা দেখেই বলল, 'বাঃ! দারুণ তো সাইকেলটা! চলে কেমন?'

'অন্য সাইকেলের মতোই।' বললাম আমি, 'সকালে সুন্দর চলে, মধ্যাহ্নভোজের পর যখন চালাই, তখন অত ভালো চলে না।'

লোকটা হঠাৎ সাইকেলটার হ্যান্ডেল আর সামনের চাকাটা ধরে খুব জোরে ঝাঁকিয়ে দিল।

আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম, 'আরে, কী করছ তুমি? সাইকেলটার ব্যথা লাগবে যে!'

কেন যে ঝাঁকানিটা দিল লোকটা, বুঝতেই পারলাম না। সাইকেলটা তো ওর কোনও ক্ষতি করেনি। আর সাইকেলটা যদি স্বেচ্ছায় ঝাঁকুনি খেতে চাইত, মালিক হিসেবে তা আমিই দিতাম। আমার কুকুরকে অন্য কেউ এসে ঠেঙালে যেরকম লাগে, আমার ঠিক সেরকম লাগল।

লোকটা বলল, 'সামনের চাকাটা টলমলে।'

আমি বললাম, 'ওটাকে ধরে না নড়ালে তো টলমল করার প্রশ্নই নেই।'

'না, না, তুমি বুঝতে পারছ না—এটা খুব বিপজ্জনক। একটা স্ক্রু-ড্রাইভার দাও তো দেখি।'

তখনই আমার একটু কড়া হাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ভাবলাম লোকটা হয়তো সত্যিই এই ব্যাপারে অভিজ্ঞ। যন্ত্রপাতি কী পাওয়া যায় দেখতে বাড়ির ভেতর ঢুকলাম। ফিরে এসে দেখি লোকটা মাটিতে বসে, আর ওর দু-পায়ের ফাঁকে সাইকেলের সামনের চাকাটা। চাকাটা আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছিল লোকটা। সাইকেলের বাকি অংশ পড়ে আছে পাশেই নুড়ি বাঁধানো রাস্তার ওপর।

ও বলল, 'সামনের চাকাটায় একটা কিছু হয়েছে।'

'তা তো দেখতেই পাচ্ছি।' আমার ব্যঙ্গ বোঝার মতো বুদ্ধি ওর ছিল বলে মনে হয় না।

ও আবার বলল, 'বিয়ারিংগুলো খারাপ বলে মনে হচ্ছে।'

'ও নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না—অযথা ক্লান্ত হয়ে পড়বে। চাকাটা লাগিয়ে নাও, আর চলো, বেরিয়ে পড়ি।'

'না না। গন্ডগোল যখন চোখে পড়েছে, পুরোপুরি পরীক্ষা করে নেওয়াই ভালো।' লোকটার কথা শুনে মনে হল, বিয়ারিংগুলো যেন কোনও দুর্ঘটনায় খারাপ হয়ে গেছে।

ওকে থামতে বলব কি, তার আগেই ও কোথাও একটা স্ক্রু খুলে দিল, আর রাস্তার ওপর ছড়িয়ে পড়ল কয়েক ডজন লোহার ছোট ছোট বল।

লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, 'ধরো! ধরো! একটাও যেন না হারায়।'

দুজনে আধ ঘণ্টা হামাগুড়ি দিয়ে ষোলোটা বল উদ্ধার করলাম। লোকটা অম্লানবদনে জানাল, সব ক-টা বল না পেলে সাইকেলের বারোটা বেজে যাবে। কী আর বলি? ওকে বললাম যে, কখনও যদি ভবিষ্যতে সাইকেলটা খুলে ফেলি, ওর এই বহুমূল্য উপদেশ মনে রাখব।

বলগুলো সাবধানে আমার টুপির মধ্যে রেখে টুপিটা দরজার সামনে সিঁড়ির একটা ধাপের ওপর রাখলাম। স্বীকার করছি, এই কাজটা বোকার মতো করলাম। কেন তা পরে বলছি।

লোকটা বলল, 'সব কিছুই যখন দেখা হচ্ছে, তখন সাইকেলের চেনটাই বা বাদ দিই কেন?' বলেই ও সাইকেলের গিয়ার-বক্সটা খুলতে শুরু করল। আমি ওকে থামানোর চেষ্টা করলাম। বললাম, 'জানো তো, গিয়ার-বক্স খারাপ হলে কিন্তু এই সাইকেলটা বিক্রি করে নতুন একটা কিনতে হবে। সারানোর থেকে খরচ কম হবে তাতে।'

ও বলল, 'যারা সাইকেলের কিছু বোঝে না, তারাই এসব কথা বলে। গিয়ার-বক্স খোলার মতো সহজ আর কিছুই নেই।'

পাঁচ মিনিটেই লোকটার উক্তির যথার্থ প্রমাণিত হল। গিয়ার-বক্সের দুটি অংশ পড়ে রইল রাস্তায়, আর ও হামাগুড়ি দিয়ে স্ক্রুগুলো খুঁজতে লাগল। ওর বক্তব্য, স্ক্রুগুলো যে কীভাবে নজরের বাইরে চলে যায় তা এক রহস্য।

এমন সময় আমার স্ত্রী এথেলবার্টা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। ও অবাক হয়ে বলল, 'সে কী! তোমরা এখনও বেরিয়ে পড়োনি? আমি কিন্তু একটু বোটিং করতে বেরোব।' স্ত্রীর সঙ্গে নৌকা বাইতে পেলে আমি তখন বর্তে যাই। এই হতভাগার হাতে আমার সাধের সাইকেলের ছিন্নভিন্ন দশা দেখার বদলে সেটাই ভালো হতো।

আমার মন তখন বলছে, 'আরও বড় কিছু ক্ষতি হবার আগে লোকটাকে থামাও। নিজের সম্পত্তি রক্ষা করো। লোকটার ঘাড় ধরে লাথি মেরে গেটের বাইরে বার করে দাও।'

কিন্তু কাউকে মনে আঘাত দিতে পারি না যে। অর্থাৎ লোকটা ওর কাণ্ডকারাখানা চালিয়ে গেল।

বাকি স্ক্রুগুলো খোঁজার চেষ্টা ছেড়ে দিল লোকটা। বলল, 'স্ক্রুগুলোকে না খুঁজলে ওগুলো নিজে নিজেই ফিরে আসে। যা হোক, এবার সাইকেলের চেনটা দেখা যাক।' প্রথমেই ও চেনটা এত টাইট করে দিল যে, ওটার নড়াচাড়া বন্ধ হয়ে গেল। তারপর চেনটাকে স্বাভাবিকের থেকে দু-গুণ বেশি ঢিলে করে দিল। পরমুহূর্তেই বলল, 'সামনের চাকাটা এবার লাগিয়ে দেওয়া যাক।'

আমি হ্যান্ডেলটা চেপে ধরলাম আর ও চাকাটা লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দশ মিনিট পরে ও ধরল হ্যান্ডেল আর আমি চাকা। এক মিনিট পরেই লোকটা সাইকেলটা ফেলে দিয়ে দু-হাত পায়ের ফাঁকে চেপে ধরে লনের ওপর হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে বলল যে, সাইকেলের হ্যান্ডেল আর চাকার স্পোকের মাঝখানে আঙুল চেপে যাওয়ার ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতে। আমি এই সুচিন্তিত বক্তব্যে সায় দিলাম। তারপর ময়লা মোছার ন্যাকড়া দু-হাতে জড়িয়ে নিয়ে আবার ও শুরু করল চাকা লাগানোর কাজটা। শেষ পর্যন্ত চাকাটা লাগানো গেল। আর তক্ষুনি হো হো করে হেসে ও বলল, 'আমি একটা গাধা।'

কথাটা শুনে ওর প্রতি আমার শ্রদ্ধা হল। জানতে চাইলাম, ও কী করে এই সত্যিটা আবিষ্কার করল।

ও বলল, 'বল-বিয়ারিংগুলোর কথা একদম ভুলে গেছি—ওগুলো লাগাতে হবে তো!'

আমি আমার টুপির দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখি ওটা উলটে পড়ে আছে আর আমার স্ত্রীর পোষা কুকুরটা অতি দ্রুতবেগে বল-বিয়ারিংগুলো গলাধঃকরণ করছে।

হ্যাঁ, এইবার আমার লোকটার নাম মনে পড়েছে—এবসন (ঈশ্বরের কৃপায় ওর সঙ্গে আর কখনও আমার দেখা হয়নি)। ও বলল, 'বল-বিয়ারিংগুলো নিরেট ইস্পাতের। কুকুরটা নির্ঘাত মারা পড়বে।'

বললাম, 'আমি কুকুরের কথা ভাবছি না। এই সপ্তাহেই ও একজোড়া জুতোর ফিতে আর এক বাক্স ছুঁচ খেয়েছে। আমি ভাবছি আমার সাইকেলের কথা।'

এবসন বেশ খোশমেজাজে বলল, 'যে ক'টা পাওয়া যায়, সেগুলো লাগিয়ে দিয়ে বাকিটা ভগবানের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাক।'

এগারোটা বল-বিয়ারিং খুঁজে-পেতে পাওয়া গেল— একদিকে লাগালাম ছ'টা, অন্য দিকে পাঁচটা। আধ ঘণ্টা পরে চাকাটা লাগানো গেল। বলা বাহুল্য, সাইকেলটা এখন সত্যি সত্যিই টলমল করছে। এবসন বলল যে, আপাতত এতেই চলবে। ও নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মনে হয়। ওকে ছেড়ে দিলে ও হয়তো তক্ষুনি বাড়ি চলে যেত। কিন্তু আমি সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নই—কাজটা ওকে শেষ করতেই হবে। অবশ্য সাইকেল নিয়ে বেড়াতে যাবার আশা ততক্ষণে আমি ছেড়ে দিয়েছি। ওকে এক গ্লাস পানীয় দিয়ে চাঙ্গা করে ওর প্রশংসা শুরু করলাম, 'তোমাকে কাজ করতে দেখে অনেক কিছু শিখলাম। দক্ষতা ও নৈপুণ্যের ব্যাপারে তো তুমি অসাধারণ। তবে সবচেয়ে ভালো লাগল তোমার নিজের ওপর আস্থা ও ভিত্তিহীন আশাবাদিতা।'

উৎসাহ পেয়ে ও এবার গিয়ার-বক্সটা নিয়ে পড়ল। প্রথমে সাইকেলটা বাড়ির দেওয়ালে ঠেকিয়ে কাজ শুরু করল। তারপর ওটাকে একটা গাছের গায়ে ঠেকিয়ে অন্য দিকটায় হাত লাগল। তারপর আমি সাইকেলটা ধরলাম, আর ও মাটিতে শুয়ে দু-চাকার মাঝখানে মাথা ঢুকিয়ে নীচের দিক থেকে খুটখাট করতে লাগল। মেশিনের তেল খানিকটা গড়িয়ে পড়ল ওর ওপর। একটু পরে সাইকেলটা আমার কাছ থেকে নিয়ে ওটার ওপর ঘোড়া-চড়ার স্টাইলে বসল। কিন্তু প্রায় তক্ষুনি তাল হারিয়ে মাটিতে চিতপটাং হয়ে পড়ল। বার তিনেক বলল, 'যাক বাবা, সাইকেলটা ঠিক হয়ে গেছে।' দু-বার বলল, 'না, মনে হয়, ঠিক হয়নি।'

তারপর মেজাজ হারিয়ে ও তর্জন-গর্জন করে সাইকেলটাকে শাসাতে শুরু করল। কিন্তু সাইকেলটাও কম যায় না। শুরু হয়ে গেল সাইকেল ও এবসনের মধ্যে নির্ভেজাল ধস্তাধস্তি। একবার সাইকেল মাটিতে আর এবসন তার ওপরে, আবার পরক্ষণেই দুজনের অবস্থান যাচ্ছে পালটে। একবার দু-পায়ের ফাঁকে সাইকেলটা ধরে এবসন বিজয়ীর হাসি হাসছিল। পরমুহূর্তেই কিন্তু একটা ঝটকা মেরে সাইকেলটা হ্যান্ডেল দিয়ে ওর মাথায় মারল এক বাড়ি।

বেলা পৌনে একটা নাগাদ বিধ্বস্ত, ধূলিধূসর, আহত ও রক্তাক্ত এসবন বলল, 'মনে হয়, এতেই হবে।' ও কপালের ধুলো, ঘাম, রক্ত মুছল। সাইকেলটার ভাবসাব দেখেও মনে হল যে, ওটার ওপর যথেষ্ট ধকল গেছে। অবশ্য দু-পক্ষের মধ্যে কে বেশি মার খেয়েছে, সেটা বলা কঠিন। রান্নাঘরে হাত-মুখ ধুয়ে এবসন বাড়ি চলে গেল।

পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। একটা ভাঙা গাড়িতে করে সাইকেলটা নিয়ে গেলাম সারাইয়ের দোকানে। মেকানিক সাইকেলটায় চোখ বুলিয়ে জিগ্যেস করল, 'কী করতে চান এটা দিয়ে?'

বললাম, 'যেটুকু সম্ভব, এটা একটু সারিয়ে দাও।'

'মোটামুটি বারোটা বেজে গেছে সাইকেলটার। দেখি কী করা যায়।' বলে লোকটা যেটুকু সম্ভব তা-ই করল। আমার খরচ হল দু-পাউন্ড দশ শিলিং। কিন্তু সাইকেলটা আর আগের মতো চলল না।

কিছুদিন পরে এক দালালকে বললাম ওটা বিক্রি করে দিতে। আরও বললাম যে, বিজ্ঞাপনে যেন লেখা হয় সত্যি কথাটাই—সাইকেলটা এক বছর পুরোনো। দালাল বলল, 'কিছু মনে করবেন না স্যার। সাইকেলটাকে দশ বছর পুরোনো লাগছে। সুতরাং সাইকেলটার বয়স উল্লেখ করার দরকার নেই। যা পাওয়া যায় তা-ই যথেষ্ট।'

ব্যাপারটা দালালের হাতেই ছেড়ে দিলাম। ও শেষমেশ ওটা পাঁচ পাউন্ডে বিক্রি করতে পারল। আশাতীত দাম!

এই রচনাটি

‘Three Men on the Bummel’

বই থেকে সংকলিত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%