হোটেল খোঁজার হয়রানি

জেরোম কে জেরোম

সেটা ছিল একটা শনিবার। আমরা তিন মূর্তি অর্থাৎ জর্জ, হ্যারিস আর আমি সারাদিন নৌকা চালিয়ে ড্যাচেট নামের একটা গ্রামে পৌঁছেছি। তিনজনেই পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত। নৌকা বেঁধে দুটো ব্যাগ, একটা বড় ঝুড়ি, কম্বল, কোট, মানে সমস্ত লটবহর নিয়ে একটা থাকার জায়গার খোঁজে বেড়িয়ে পড়লাম। ভারি সুন্দর একটা হোটেল চোখে পড়ল। হোটেলের গাড়ি বারান্দা বনলতা দিয়ে সাজানো। কিন্তু আমার পছন্দের ফুল হানিসাকল চোখে পড়ল না। বললাম, 'না, না। এই হোটেলে ওঠার দরকার নেই। চলো, একটু এগিয়ে দেখি হানিসাকল ফুলওয়ালা কোনো হোটেল পাই কি না।'

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম আর একটা হোটেলে। সুন্দর হোটেল—দেয়ালে হানিসাকল ফুলের বাহার। কিন্তু হোটেলের দরজায় হেলান দিয়ে যে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে মোটেই পছন্দ হল না হ্যারিসের। হ্যারিসের মতে, লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়। লোকটার জুতো জোড়াটাও বিচ্ছিরি। অগত্যা আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু প্রচুর হেঁটেও আর কোনো হোটেল চোখে পড়ল না। তখন রাস্তায় একটি লোকের কাছে আশেপাশের হোটেলের সন্ধান ও পথনির্দেশ জানতে চাইলাম।

লোকটা বলল, 'আরে, আপনারা তো হোটেল চত্বর থেকে দূরে চলে এসেছেন! যেদিক থেকে এলেন ওদিকেই চলে যান আবার। ওখানে পাবেন একটা হোটেল—নাম ''স্ট্যাগ''।'

আমরা বললাম, 'আমরা ওখানে গেছিলাম। কিন্তু হোটেলটা পছন্দ হয়নি—দেয়ালে হানিসাকল ফুল নেই।'

'আচ্ছা। তাহলে ওই হোটেলটার ঠিক উল্টোদিকে আর একটা হোটেল আছে—''ম্যানর হাউস।'' ওটা ট্রাই করেছেন?'

হ্যারিস বলল, 'ওই হোটেলে আমরা যেতে চাই না। ওখানে একটা লোক দাঁড়িয়ে ছিল যাকে আমাদের পছন্দ হয়নি। লোকটার চুলের রং, জুতোজোড়া—কিছুই পছন্দ হয়নি।'

তখন লোকটা বলল, 'তাহলে তো মুশকিল। এই অঞ্চলে হোটেল কেবল ওই দুটোই।'

হ্যারিস জিগ্যেস করল, 'আর কো-নো হোটেল নেই?'

'নাঃ।'

এবার হ্যারিসের ব্যাকুল চিৎকার, 'তাহলে এখন কী হবে?'

এতক্ষণে জর্জ মুখ খুলল, 'হ্যারিস আর তুমি নিজেদের পছন্দমতো একটা হোটেল বানিয়ে নাও আর সেই হোটেলেই থাকার মতো লোকও জোগাড় করে নাও। আমি কিন্তু ''স্ট্যাগ''-এ চললাম।'

কী আর বলব? মহৎ মানুষেরা তাঁদের আদর্শ অনুযায়ী কাজ কখনোই করতে পারেন না। হ্যারিস আর আমি পার্থিব কামনার অসারতার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগত্যা জর্জের পিছু নিলাম।

স্ট্যাগ হোটেলের মালিক এগিয়ে এসে বলল, 'শুভ সন্ধ্যা।'

জর্জ বলল, 'শুভ সন্ধ্যা। তিনটে বেড চাই।'

'দুঃখিত, স্যার। হবে না।'

'ঠিক আছে—দুটো বেড হলেই চলবে। দুজনে না হয় একটা বিছানায় শুয়ে যাব, তাই না?' বলে জর্জ আমার আর হ্যারিসের দিকে তাকাল।

হ্যারিস বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলবে।' ওর মনের ভাবটা এই—জর্জ আর আমি এক বিছানায় শোব।

হোটেল মালিক বলল, 'খুবই দুঃখিত স্যর, পুরো হোটেলে একটাও বেড খালি নেই। কী বলব স্যর, এক একটা বিছানায় দুজন এমনকী তিনজন করে শোবে এই অবস্থা। এই উইক এন্ডের পর ব্যাংকের ছুটি আছে না? তাই এত ভিড়!'

এবার আমরা একটু ঘাবড়ে গেলাম।

কিন্তু হ্যারিস হচ্ছে পোড়-খাওয়া পর্যটক। ও খোশ মেজাজে হাসতে হাসতে বলল, 'কী আর করা যাবে? একটু কষ্ট হবে হয়তো। হোটেলের বিলিয়ার্ড রুমেই শুয়ে যাব না হয়!'

'দুঃখিত, স্যর! বিলিয়ার্ড টেবিলের ওপর তিনজন শুয়ে আছেন। আর কফি-রুমে দুজন। আজ রাতে আপনাদের রাখতে পারব না।'

লটবহর নিয়ে এবার গেলাম 'ম্যানর হাউস'-এ। বেশ ছোট হোটেল। আমার কিন্তু 'স্ট্যাগ'-এর তুলনায় এই হোটেলটাই বেশি ভালো লাগল। হ্যারিসকে একথা বলতেই ও এককথায় সম্মতি দিল, 'ঠিক বলেছ। এই হোটেলটাই ভালো। নাহয় ওই লাল চুলের লোকটার দিকে তাকাব না। ওর চুলের রং লাল—এতে তো ওর কোনো দোষ নেই!' হ্যারিসের বক্তব্য সহৃদয়, সংবেদনশীল।

হোটেলের কেউ কিন্তু আমাদের কোনো কথা শোনার জন্য অপেক্ষাই করল না। হোটেলের মালকিন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই আমাদের বলে দিল যে, গত দেড় ঘণ্টায় তারা তেরোটা পার্টিকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা হচ্ছি চোদ্দো নম্বর পার্টি। আমরা মিনমিনে গলায় অনুরোধ করলাম যে, বিলিয়ার্ড রুম, ঘোড়ার আস্তাবল, কয়লার ঘর—যেখানে হোক একটু জায়গা চাই। মহিলা ব্যঙ্গের হাসি হেসে আমাদের প্রস্তাব উড়িয়ে দিল। বলল যে, ওসব অনেক আগেই ভরে গেছে।

'আচ্ছা, এই গ্রামে এমন কোনো জায়গা আছে কি যেখানে আমরা রাতটুকুর জন্যে মাথা গুঁজতে পারি?' মহিলার প্রতি আমাদের সমবেত আকুল প্রশ্ন।

'দেখুন, আমি কিন্তু ঠিক সুপারিশ করছি না। যদি কষ্ট করে থাকতে পারেন, আধ মাইল দূরে এটন রোডে একটা বিয়ারের দোকান আছে,' বললেন মহিলা।

আমরা আর কিছু শোনার জন্যে অপেক্ষা করলাম না। লটবহর নিয়ে দৌড় লাগালাম। আধ মাইল নয়—জায়গাটা প্রায় এক মাইল দূরে। হাঁফাতে হাঁফাতে সোজা ঢুকে পড়লাম দোকানটায়। দোকানের লোকগুলো বাজে টাইপের। তারা আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। দোকানটায় তিনটি বিছানার ব্যবস্থা আছে। তবে সাতজন পুরুষ আর দুজোড়া স্বামী-স্ত্রী অর্থাৎ মোট এগারোজন ওই বিছানাগুলোয় এখন নিদ্রিত। দোকানের সঙ্গে লাগোয়া একটা ছোট ঘরে একজন দয়ালু ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি বললেন, 'স্ট্যাগ হোটেলের পাশেই একটা মুদিখানা আছে—ওখানে গিয়ে দেখতে পারেন।' ক্লান্ত পা টেনে টেনে আবার চললাম 'স্ট্যাগ' হোটেলের দিকে।

মুদিখানা রাতের অতিথিতে গিজগিজ করছে। দোকানে এক বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে আলাপ হল। উনি সিকি মাইল দূরে ওঁর এক বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বন্ধুটি কখনো সখনো তাঁর ঘর ভাড়া দেন।

বৃদ্ধা মহিলা এত আস্তে হাঁটেন যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছতে প্রায় কুড়ি মিনিট লেগে গেল। তাঁর পিঠে কতরকম ব্যথা তা বলতে বলতে তিনি যাত্রাপথে আমাদের আনন্দবর্ধন করলেন।

হা হতোস্মি! বৃদ্ধার বাড়িতে অতিথি আছে। জায়গা নেই। ওঁর কথামতো গেলাম ২৭ নম্বর বাড়িতে। সেখানেও ঠাঁই নেই। সেখান থেকে ৩২ নম্বর বাড়ি। সেটাও ভর্তি।

তারপর আমরা হাইওয়েতে ফিরে গেলাম। হ্যারিস বড় ঝুড়িটার ওপর বসে বলল যে ও আর কোথাও যাবে না। ওর বক্তব্য, এই জায়গাটা বড় শান্তির এবং ও এখানেই দেহ রাখতে চায়। ও আমাকে আর জর্জকে বলল যে, আমরা যেন ওর হয়ে ওর মাকে একটা চুম্বন করি এবং ওর আত্মীয়দের বলে দিই যে ও সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছে আর পরম শান্তিতে এ জগৎ ছেড়ে চলে গেছে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি কিশোরের রূপ ধরে যেন এক দেবদূত আবির্ভূত হল। ছেলেটির এক হাতে বিয়ারের মগ, অন্য হাতে মোটা সুতোর মুখে কিছু বাঁধা। বস্তুটি দিয়ে আঘাত করে আবার সুতোটা টেনে নিচ্ছে। এতে যে শব্দটা বেরোচ্ছে সেটা মোটেই শ্রুতিসুখকর নয়। মনে হচ্ছে যেন কারোর শারীরিক যন্ত্রণার আওয়াজ।

আমরা এই ঈশ্বরপ্রেরিত দূতকে জিগ্যেস করলাম যে, তার কাছে কী নিরিবিলি জায়গায় এমন কোনো বাড়ির সন্ধান আছে, যেখানে কম মানুষ আছে এবং যারা দুর্বল (বৃদ্ধা মহিলা অথবা পক্ষাঘাতগ্রস্থ ভদ্রলোক হলে ভালো হয়), যাদের ভয় দেখিয়ে তিনজন বেপরোয়া মানুষ এক রাতের জন্যে তাদের বিছানা দখল করতে পারে। আর, এরকম বাড়ি যদি না পাওয়া যায়, তাহলে সে কী কোনো শুয়োরের খোঁয়াড়, পরিত্যক্ত চুনের ভাটা অথবা ওই ধরনের কোনো জায়গার খোঁজ দিতে পারে? না, ছেলেটির কাছে উপরোক্ত কোনোরকম জায়গারই সন্ধান নেই। তবে হ্যাঁ, চাইলে আমরা ওর সঙ্গে ওদের বাড়িতে যেতে পারি। ওদের একটা খালি ঘর আছে। আমরা একরাত সেখানে থাকতে পারি।

আমরা সেই জ্যোৎস্নালোকিত রাতে ওকে জড়িয়ে ধরে অনেক আশীর্বাদ করলাম। আমাদের পুঞ্জীভূত আবেগের চাপে ও যদি নুয়ে পড়ত এবং আমরা তিনজন যদি ওর ওপর পড়তাম, তাহলে হয়তো দারুণ একটা দৃশ্য হত। আনন্দে অভিভূত হয়ে হ্যারিস প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সময়ে ছেলেটির হাত থেকে বিয়ারের মগটা ছিনিয়ে নিয়ে মগের তরল বস্তুর অর্ধেকটা গলাধঃকরণ করে হ্যারিস অবধারিত মূর্ছা যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিল। তারপর ও দৌড়তে শুরু করল এবং আমার আর জর্জের ওপর পড়ল লটবহর বহন করার দায়িত্ব।

ছেলেটির বাড়িতে চারটে ঘর ছিল। আর ওর মা—কী ভালো মানুষ—মাত্র পাঁচ পাউন্ডের বিনিময়ে আমাদের খেতে দিলেন গরম মাংস, মিষ্টি ও চা। তারপর আমরা শুতে গেলাম। ঘরে দুটো খাট। একটা চাকা-লাগানো নীচু খাট—আড়াই ফুট চওড়া। জর্জ আর আমি শুলাম ওটায়। অবশ্য যাতে খাট থেকে পড়ে না যাই, সেজন্যে বিছানার চাদর দিয়ে দুজনে নিজেদের বেঁধে নিলাম। ছেলেটির ছোট খাটে হ্যারিস একা শুয়ে পড়ল। সকালে উঠে দেখি ঘুমন্ত হ্যারিসের পা দুটো খাটের বাইরে ঝুলছে। স্নান করতে যাওয়ার সময় আমি আর জর্জ আমাদের তোয়ালে হ্যারিসের পায়ের ওপর ঝুলিয়ে রেখেছিলাম।

অধ্যায় ১৫ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%