মাছ ধরার গালগল্প

জেরোম কে জেরোম

এই অঞ্চলটি ফিশিং সেন্টার হিসেবে বিখ্যাত। টেমস নদীর এই অংশ বিভিন্নরকম মাছে ভরতি। দিনভর ছিপ ফেলে বসে থাকা যায়। অবশ্য 'ফিশিং' বা মাছ ধরা হবে কি না বলা কঠিন। বরাবর দেখেছি, টেমস নদীতে ছিপ ফেললে কিছু ছোট মাছ কিংবা মরা বেড়াল ওঠে, কিন্তু আসল মাছ কোথায়? নদীর পাড়ে বেড়ানোর সময় ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ চোখে পড়বে—জলের মধ্যে থেকে অর্ধেক শরীরটা খাড়া করে মুখ হাঁ করে আছে বিস্কুটের আশায়। নদীতে স্নান করতে গেলে মাছেরা ঘিরে ধরে বিরক্ত করবে। কিন্তু ওরা বঁড়শির টোপটুকু কিছুতেই খাবে না।

অবশ্য মাছ শিকারিদের গল্প অন্যরকম। খাঁটি মাছ শিকারির চাই কল্পনার দৌড় আর গল্প বানানোর ক্ষমতা। অনেকের ধারণা, গম্ভীর মুখে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলার ক্ষমতা চাই মাছ শিকারিদের। এটা কিন্তু ভুল ধারণা। নিছক মিথ্যে কথা লোকে চট করে ধরে ফেলে। গল্পের মধ্যে খুঁটিনাটি ব্যাপার, মানে ডিটেলস থাকতে হবে, গল্পটা সম্ভাব্যতার সীমা ছাড়াবে না, আর গল্পে থাকবে পাণ্ডিত্যের ছোঁয়া—তবেই না আসল মাছ শিকারির গল্প! যে কেউ এসে বলতে পারে, জানো? কাল বিকেলে আমি পনেরো ডজন মাছ ধরেছি। অথবা গত সোমবার একটা মাছ ধরেছিলাম—ওজন আঠারো পাউন্ড আর লম্বায় তিন ফুট। এসব গল্পে কোনও শিল্প নেই, দক্ষতা নেই। কিন্তু পাক্কা মাছ শিকারির গল্প বলার কায়দাই আলাদা।

সে আড্ডাখানায় গিয়ে পাইপ ধরিয়ে চুপচাপ বসে থাকে একটা চেয়ারে। ছেলেছোকরারা তাদের মাছ ধরার গল্প ফলাও করে বলতে থাকে, আর সে চুপচাপ পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে শোনে। কোনও এক মুহূর্তে হঠাৎ হট্টগোল থামলে সে পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলে ওঠে, মঙ্গলবার বিকেলে একটা মাছ ধরেছিলাম। অবশ্য কাউকে বলার মতো কিছু নয়।

সমস্বরে প্রশ্ন—বলা যাবে না কেন?

পাইপে তামাক ভরতে ভরতে শান্তভাবে সে বলে, বললে তো কেউ বিশ্বাস করবে না।

সবাই চুপ করে থাকে। অগত্যা সে বলতে থাকে, আমাকেও যদি কেউ বলত, আমি বিশ্বাস করতাম না। যা হোক, ঘটনাটা কিন্তু সত্যি। সারা দুপুর ছিপ ফেলে বসে আছি—কয়েক ডজন চুনোচানা মাছ ছাড়া কিছুই ওঠেনি। ভাবছিলাম উঠে পড়ি। হঠাৎই সুতোটায় বেশ জোরে টান পড়ল। ভাবলাম বড় কিছু নয়, তাই মারতে গেলাম এক হ্যাঁচকা টান। কিন্তু কী কাণ্ড! ছিপটাই নাড়তে পারি না। আধ ঘণ্টা লাগল—বুঝলে, পাক্কা আধ ঘণ্টা—মাছটাকে তুলতে। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সুতো গেল ছিঁড়ে। বলো তো কী মাছ?

চল্লিশ পাউন্ড ওজনের একটা সামুদ্রিক মাছ! ছিপ দিয়ে ধরা! অবাক লাগছে না?

আমার পরিচিত এক ছোকরা ছিল। ছোট বঁড়শিওয়ালা ছিপ দিয়ে মাছ ধরত। ওর ন্যায়-অন্যায়বোধ খুব প্রখর ছিল—মিথ্যে কথা বলত না। কেবল ধরা মাছের সংখ্যা শতকরা পঁচিশ ভাগ বাড়িয়ে বলত। কিন্তু এই পদ্ধতিতে একটু অসুবিধে হতে লাগল। হয়তো কোনও দিন তিনটে মাছ ধরল, সেটার ওপর শতকরা পঁচিশ ভাগ বাড়াতে ফল হবে ভগ্নাংশে। মাছ তো আর সেভাবে গোণা যায় না। তখন ও ঠিক করল, শতকরা তেত্রিশ পূর্ণ একের তিন ভাগ বাড়িয়ে বলবে। কিন্তু এতেও সমস্যা—একটা বা দুটো মাছ ধরলে ওই বাড়িয়ে বলার পরিমাণটা খাটত না। তখন ও ঠিক করল, সোজাসুজি দ্বিগুণ করে বলবে।

এই পদ্ধতিতে চলল মাস দুয়েক। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করত না যে ও মাত্র দ্বিগুণ করে মাছের সংখ্যা বলছে। অতএব কম মিথ্যে বলার জন্য পাওনা কৃতিত্বটুকুও ওর ভাগ্যে জুটত না। এদিকে আর সবাই ধরা মাছের সংখ্যা যা খুশি বাড়িয়ে বলত। ও বেচারা তিনটে মাছ ধরে যখন বলত, ছ'টা মাছ ধরেছি, তখন হয়তো দলের আরেকজন, যে মাত্র একটা মাছ ধরেছে, সে দু'ডজন মাছ ধরার গল্প শোনাত।

অবশেষে ছেলেটি নিজের সঙ্গে একটা শেষ বোঝাপড়া করে নিল—যতগুলো মাছ সে ধরবে, তার দশগুণ বাড়িয়ে বলবে। কিছু না ধরতে পারলে বলবে, দশটা মাছ ধরেছে। এই পরিকল্পনায় কমপক্ষে দশটা মাছ ধরার কথা বলা যাবেই। একটা ধরলে বলবে কুড়িটা ধরেছে। দুটো হলে তিরিশ, তিনটে—চল্লিশ—হিসেব হবে এইভাবে। এই পদ্ধতিটাই ছেলেটি এখন একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছে।

নৌকা থেকে নেমে বেড়াতে বেড়াতে আমি আর জর্জ এই অঞ্চলের ওয়ালিংফোর্ড গ্রামের একটা সরাইখানায় ঢুকে পড়লাম। হ্যারিস আশপাশে কোথাও গেছে। ওখানে বৈঠকখানায় বসে ঘরটায় চারদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ চোখে পড়ল ধূলিমলিন একটা লম্বা কাচের বাক্স, প্রায় চিমনির কাছে দেওয়ালের উঁচু অংশে লাগানো। বাক্সের মধ্যে একটা বিশাল স্টাফড রুই মাছ—খড়, তুলো ইত্যাদি দিয়ে ভরা মাছটার বহিরাবরণ। দেখে অবাক হয়ে গেলাম—এত বড় মাছ!

এক স্থানীয় বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে বলে উঠলেন, দারুণ না মাছটা?

আমি বললাম, সত্যিই অসাধারণ! জর্জ মাছটার ওজন জানতে চাইল।

ভদ্রলোক কোটটা তুলে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আঠারো পাউন্ড ছ'আউন্স। গত বছর আমি ওটা ধরেছিলাম। আগামী মাসের তিন তারিখে এক বছর পূর্ণ হবে। ব্রিজের নীচে ছোট মাছের টোপ দিয়ে ওটাকে ধরেছিলাম। এই সাইজের মাছ কিন্তু আজকাল আর এ তল্লাটে দেখা যায় না। শুভরাত্রি!

ভদ্রলোক চলে গেলেন, আর আমরা দুজন বসে রইলাম। মাছটা থেকে চোখ সরাতে পারছি না। এমন সময় আর-একটি স্থানীয় লোক, সম্ভবত মালবাহী গাড়ির চালক, হাতে পানীয়ের পাত্র নিয়ে সরাইখানায় ঢুকে পড়ল। লোকটিও মাছটাকে দেখল।

জর্জ লোকটিকে বলল, কী বিশাল মাছ!

লোকটি বলল, তা অবশ্য বলতে পারেন। তারপর পানীয়ে একটা চুমুক দিয়ে বলল, এই মাছটা যখন ধরা হয়, তখন হয়তো আপনারা এখানে ছিলেন না।

—না, আমরা এ অঞ্চলে থাকি না। বেড়াতে এসেছি।

—ও! তাহলে আর কী করে জানবেন? বছর পাঁচেক আগে ওই মাছটাকে আমি ধরেছিলাম।

—তা-ই নাকি? আপনি ধরেছিলেন?—আমার প্রশ্ন।

—হ্যাঁ মশাই। এক শুক্রবার বিকেলে বাঁধের লক গেটের কাছে ওটাকে ধরেছিলাম। জানেন কি? ওটা ধরেছিলাম মাছির মতো দেখতে যে বঁড়শি তা-ই দিয়ে। গেছলাম ছোট মাছ ধরতে। রুই-কাতলার ব্যাপারটা মাথায় আসেনি। তারপর সুতোর শেষ প্রান্তে ওই বিশাল মাছটা দেখে, সত্যি বলতে কী, ঘাবড়ে গেছলাম। কম তো নয়, ওজন ছাব্বিশ পাউন্ড। শুভরাত্রি, বন্ধুরা, শুভরাত্রি।

মিনিট পাঁচেক পরে ঘরে ঢুকল তৃতীয় ব্যক্তি। সে-ও নাকি ওই মাছটাই ধরেছিল এক শীতের সকালে। এই লোকটি চলে যাওয়ার পর ঘরে ঢুকলেন এক মধ্যবয়স্ক রাশভারী চেহারার ভদ্রলোক। উনি জানলার পাশে গিয়ে বসলেন।

আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর জর্জ ভদ্রলোককে বলল, আমরা স্থানীয় লোক নই। বেড়াতে এসেছি। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করব। দেওয়ালে কাচের বাক্সে রাখা ওই মাছটা কি আপনি ধরেছিলেন?

ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে পালটা প্রশ্ন করলেন, আপনাদের কে বলল যে মাছটা আমি ধরেছি?

আমরা আমতা আমতা করে জানালাম যে, আমাদের কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু আমাদের মন বলছে কাজটা আপনার।

রাশভারী ভদ্রলোক এবার এক গাল হেসে বললেন, বিচিত্র ব্যাপার! অদ্ভুত! ঠিকই ধরেছেন আপনারা, মাছটা আমারই শিকার। কী অপূর্ব আপনাদের অনুমানশক্তি!

তারপর ভদ্রলোক গল্পটা বললেন। মাছটাকে খেলিয়ে তুলতে নাকি লেগেছিল ঝাড়া আধ ঘণ্টা। শেষে নাকি তাঁর বঁড়শিটাই ভেঙে যায়। তারপর মাছটাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দেখেন ওটার ওজন পাক্কা চৌত্রিশ পাউন্ড।

ভদ্রলোক চলে যাবার পর ঘরে ঢুকলেন সরাইখানার মালিক। ওপরে রাখা মাছটা ধরার কী কী বৃত্তান্ত আমরা শুনেছি তা ওঁকে জানালাম। উনি আমাদের কথা শুনে বেশ মজা পেলেন। তারপর তিনজনেই খুব হাসতে লাগলাম।

হাসতে হাসতেই উনি বললেন, দেখুন দেখি কাণ্ডটা! জিম বেটস, জো মাগলস, মিঃ জোনস আর ওই বয়স্ক বিলি মল্ডার্স—সবাইয়ের দাবি, মাছটা নাকি ওরাই ধরেছে। হা হা হা! ওরা নাকি 'ওদের' ধরা মাছ 'আমাকে' দিয়েছে, 'আমার' বৈঠকখানায় রেখেছে। ওরা তেমন লোকই নয়।

তারপর উনি আসল ঘটনাটা বললেন। উনি এই মাছটা ধরেছিলেন বহু বছর আগে। তখন উনি নেহাতই ছোকরা। মাছ ধরার কোনও কায়দা বা নিয়ম কিছুই জানতেন না। কপালগুণেই ওটা ধরেছিলেন। স্কুল পালিয়ে রোদ-ঝলমলে এক দুপুরে একটা মোটা সুতো গাছের গুঁড়িতে বেঁধে ওই মাছটা ধরেছিলেন। মাছটা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন বলে বাড়িতে মার খেতে হয়নি। এমনকী স্কুলের মাস্টারমশাই বলেছিলেন, তোর এই কৃতিত্ব অঙ্ক শেখার কৃতিত্বের থেকে কোনও অংশে কম নয়।

এই সময় কে যেন বাইরে থেকে ওঁকে ডাকল। উনি বেরিয়ে গেলেন। আমি আর জর্জ আবার মাছটাকে দেখতে লাগালাম। যত দেখছি, ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি—সত্যিই অসাধারণ মাছটা।

জর্জ এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়ল যে ও একটা চেয়ারের পিঠে পা রেখে মাছটাকে ভালো করে দেখতে গেল। আর তক্ষুনি চেয়ারটা গেল হড়কে। অবশ্যম্ভাবী পতন থেকে নিজেকে বাঁচাতে জর্জ হাঁচোড়পাঁচোড় করে মাছের বাক্সটা গেল ধরতে। যা হবার তা-ই হল। বাক্সটা সশব্দে নীচে পড়ল আর সেটার ওপর চেয়ারটা আর জর্জ।

আমি কাছে গিয়ে ত্রস্তভাবে বললাম, মাছটার তো কোনও ক্ষতি করোনি?

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে জর্জ পুরো দৃশ্যটা দেখে বলল, মনে তো হয় না।

কিন্তু ও ক্ষতি করেছিল। মাছটা চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়ে আছে মেঝেতে। ঠিক গুনে দেখিনি—হাজার না হলেও অন্তত নশো টুকরো হয়ে গেছে মাছটা। খড়, তুলো ইত্যাদিতে ভরা একটা মরা মাছের খোল চুরচুর হয়ে ভেঙে যাবে কেন? ব্যাপারটা অদ্ভুত!

তবে ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত হতো, যদি মাছটা আদৌ স্টাফড হতো—মানে খড়, তুলো দিয়ে ভরা থাকত। মাছটা কিন্তু সেরকম ছিল না।

মাছটা ছিল প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে তৈরি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%