তাঁবু নিয়ে নাস্তানাবুদ

জেরোম কে জেরোম

বৃষ্টিবাদলার সময় উন্মুক্ত পরিবেশে ক্যাম্পিং অর্থাৎ তাঁবু খাটিয়ে থাকা খুব একটা মজার অভিজ্ঞতা নয়।

মনে করো সন্ধে হয়ে গেছে। তুমি ভিজে একসা। তোমার নৌকায় দু'ইঞ্চি জল জমে গেছে। সঙ্গের জিনিসপত্র সব ভিজে, স্যাঁতসেঁতে। নদীর পাড়ে অপেক্ষাকৃত কম ভিজে একটা জায়গা তোমার চোখে পড়ল। নৌকা বেঁধে দুজন মিলে তাঁবুটা নিয়ে ওই জায়গায় গেলে। উদ্দেশ্য—আজ রাতটা তাঁবুর নীচে ওখানেই কাটিয়ে দেওয়া।

তাঁবুটা ভিজে কয়েক মণ ভারী হয়েছে। ওটা লটরপটর করতে করতে বার বার তোমাদের ঘাড়ের ওপর পড়ছে, কখনো বা মাথাটাকে ঢেকে ফেলছে। প্রায় পাগল হবার দশা। এদিকে বৃষ্টির ধারাপাত চলছে অবিরাম। শুকনো আবহাওয়াতেই তাঁবু খাঁটানো বিশেষ সহজ কাজ নয়, আর বৃষ্টির মধ্যে এই কাজ মহাবীর হারকিউলিস দ্বারাই সম্ভব। তোমার মনে হবে তোমার সঙ্গী তোমাকে তাঁবু খাটাতে কোনও সাহায্য তো করছেই না, বরং উজবুকের মতো আচরণ করছে। তোমার দিকটা যেই তুমি সুচারুভাবে খাটালে, ও অন্য দিক থেকে এমন একটা হ্যাঁচকা টান দিল যে তোমার দিকের কর্ম সাবাড়।

তুমি চেঁচালে, 'কী হচ্ছে কী এটা, অ্যাঁ?'

সঙ্গী উত্তর দিল, 'তুমি কী করছ? ওই দিকটা ছাড়ো তো দেখি!'

তুমি বললে, 'একদম টানাটানি করবে না। সব গন্ডগোল করে দিচ্ছ! গাধা কোথাকার!'

সে চেঁচিয়ে বলল, 'আমি কোনও গন্ডগোল করিনি। তুমি বরং তোমার দিকটা আলগা দাও।'

রাগে গরগর করে তুমি বললে, 'বলছি তো পুরো ব্যাপারটাই তুমি ভন্ডুল করে দিয়েছ।' তোমার তখন ইচ্ছে, ওকে একবার হাতে পেলে হয়। এবার তুমি দড়ি ধরে এমন টান মারলে যে ওর দিকের খুঁটিগুলো সব উপড়ে গেল।

তুমি শুনতে পেলে ও বিড়বিড় করে গাধা, ইডিয়ট ইত্যাদি কী সব বলছে। আর তারপরেই ও দিল এমন একটা মোক্ষম টান যে তোমার দিকের তাঁবুর অংশটা খুঁটিসমেত ধরাশায়ী হল। তুমি তখন কাঠের বড় হাতুড়িটা নামিয়ে রেখে ওর দিকে গেলে ওকে দু-চার কথা শোনাতে। সঙ্গীও ততক্ষণে তোমার দিকে এগিয়ে এল ওর বক্তব্য রাখতে। তারপর দুজনে পরস্পরের মুখোমুখি হবে বলে ঘুরপাক খেতে লাগলে—দুজনের মুখেই গালিগালাজের তুবড়ি। এর মধ্যে পুরো তাঁবুটাই স্তূপাকৃতি হয়ে মাটিতে পড়ে গেছে। ওই ধ্বংসস্তূপের দু'দিকে দুজন দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে রাগত দৃষ্টি মেলে একসঙ্গে বলে উঠলে, 'দেখলে তো ব্যাপারটা! আগেই বলেছিলাম!'

এমন সময় দলের তৃতীয় ব্যক্তি, যে এতক্ষণ নৌকায় জমা জল বাইরে ফেলছিল এবং তার জামা ভিজে যাওয়ায় গত দশ মিনিট ধরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে অভিশাপ দিচ্ছিল, হঠাৎ তোমাদের জিগ্যেস করল—তোমরা দুজনে কী খেলায় মেতে আছ এবং ওই হতচ্ছাড়া তাঁবুটা এখনো খাটানো হয়নি কেন।

অবশেষে কোনও রকমে তাঁবুটাকে দাঁড় করানো গেল এবং তোমরা জিনিসপত্র নিয়ে তাঁবুর মধ্যে ঢুকলে। বৃষ্টির মধ্যে কাঠকুটো জোগাড় করে আগুন জ্বালানোর প্রশ্নই ওঠে না, অতএব স্পিরিটের স্টোভটা জ্বালিয়ে তোমরা তার কাছে গোল হয়ে বসলে।

ডিনারের মেইন আইটেম হচ্ছে বৃষ্টির জল। পাঁউরুটির দুই-তৃতীয়াংশই জল। মাংসের পদটিতে বৃষ্টির জল মিশে স্বাদ হয়েছে জব্বর। আর জ্যাম, মাখন, নুন, কফি ইত্যাদি মিলে মিশে হয়ে গেছে স্যুপ।

ওই সব খাবারই গলাধঃকরণ করে দেখতে পেলে তামাক হয়ে গেছে স্যাঁতসেঁতে, ধূমপানের অযোগ্য। অবিশ্যি এক বোতল শক্তিবর্ধক পানীয় পাওয়া গেল। এমনই পানীয় যা ঠিক পরিমাণে খেলে বেঁচে থাকার উৎসাহ আবার ফিরে আসে এবং নিদ্রাদেবীর আরাধনা করতে সুবিধা হয়।

এরপর স্বপ্নের মধ্যে তুমি দেখলে একটা হাতি হঠাৎ তোমার বুকের ওপর চড়ে বসেছে এবং যেন কোনো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে উৎক্ষিপ্ত হয়ে তুমি সমুদ্রতলে পৌঁছে গেছ, অথচ হাতিটা তোমার বুকের ওপর আরামে ঘুমোচ্ছে। এমন সময় তোমার ঘুম ভাঙল এবং তুমি বুঝতে পারলে যে সত্যিই ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে। প্রথমে মনে হল—এটাই মহাপ্রলয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংসের সময় আগত। তারপর বুঝতে পারলে—না, তেমন কিছু নয়, চোর, খুনি কিংবা অগ্নি সম্পর্কিত কোনও ব্যাপার। তুমি সাহায্যের জন্য চিৎকার করলে, কোনও সাহায্য এল না। ততক্ষণে তোমার মনে হচ্ছে যে যেন কয়েক হাজার লোক তোমাকে লাথি মারছে আর তোমার দমবন্ধ অবস্থা।

হঠাৎ মনে হল, অন্য কেউ যেন বিপদে পড়েছে। তোমার বিছানার তলা থেকে যেন একটা ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পেলে। এদিকে, 'অত সহজে মরব না' এই পণ করে তুমি চার হাত-পা প্রাণপণে এদিক ওদিক ছুড়তে লাগলে, সঙ্গে চালিয়ে গেলে তারস্বরে চিৎকার। অবশেষে একটা পর্দা যেন সরে গেল এবং তোমার মাথাটা বেরিয়ে এল খোলা জায়গায়, নির্মল বায়ুর মধ্যে। তোমার দু'ফুট দূরে একটা গুন্ডা টাইপের লোক, তোমাকে খুন করতে এগিয়ে আসছে। তুমিও ততক্ষণে ওর সঙ্গে মরণপণ লড়াই করতে প্রস্তুত। তখনই তুমি বুঝতে পারলে—আরে! এটা তো আমাদের দলের জিম!

'আরে, তুমি!' জিমও আমাকে চিনতে পেরে বলল।

চোখ রগড়ে তুমি বললে, 'হ্যাঁ, আমি। কী হয়েছিল। বলো তো?'

জিম বলল, 'ঝোড়ো হাওয়ায় হতচ্ছাড়া তাঁবুটা খুলে পড়ে গেছে। বিল কোথায়?'

তখন তোমরা দুজনে 'বিল', 'বিল' বলে চেঁচাতে লাগলে। পায়ের নীচের জমি যেন ভূমিকম্পের মতো উঠে দুলতে লাগল এবং একটা চাপা আওয়াজ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল, 'আমার মাথার ওপর দাঁড়িও থেকো না। সরে যাও বলছি!'

একটু পরেই হাঁচর পাঁচর করে বিল বেরিয়ে এল—বিধ্বস্ত, কাদামাখা শরীর, ভাবভঙ্গি আক্রমণাত্মক। ওর দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁবুতে ওকে চাপা দেওয়ার ব্যাপারটা অভিসন্ধিমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সকালে তোমাদের তিনজনেরই কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ—রাতে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার পরিণতি। তিনজনেরই মেজাজ তিরিক্ষি। প্রাতরাশের পুরো সময়টা তোমরা কাটালে ভাঙা গলায় পরস্পরকে গালিগালাজ করে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%