কৌটো খুলতে কুপোকাত

জেরোম কে জেরোম

নৌকাবিহার করতে করতে একদিন দুপুরে আমরা নদীর পাড়ে নৌকা বেঁধে মধ্যাহ্নভোজন করতে বসলাম। ঠান্ডা মাংস দিয়েই খাওয়া হয়ে যাবে—কিন্তু সর্ষের সস তো আনা হয়নি।

তক্ষুনি মনে হল, সর্ষের সস না হলে তো চলবে না। সর্ষের জন্যে এমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা এই দিনের আগে বা পরে আমার সমগ্র জীবনে আর কখনো অনুভব করিনি। এমনিতে আমি সর্ষে পছন্দ করি না, খাইও না বড় একটা, কিন্তু সেই দিন একটু সর্ষের সস-এর জন্যে আমি সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত ছিলাম। আমার এই এক বদভ্যাস—যেটা চাই সেটা না পেলে প্রায় উন্মাদ হয়ে যাই।

হ্যারিসও বলল যে, সর্ষের জন্য সে সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত। এক কৌটো সর্ষের সস নিয়ে তখন আমাদের কাছে কেউ এলে তার ভাগ্য খুলে যেত—দু-দুটো মানুষের সর্বস্বের মালিক হতে পারত সে।

তবে হ্যাঁ, আমার মনে হয় সর্ষের সসটুকু পেয়ে গেলে আমি আর হ্যারিস দুজনেই হয়তো এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার চেষ্টা করতাম। উত্তেজনার বশে আমরা অনেক সময় অতি উদার হয়ে বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দিই, কিন্তু পরে একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারি যে, কাঙ্ক্ষিত জিনিসটির মূল্যের অনুপাতে প্রতিশ্রুতির মূল্য হয়ে গেছে অনেক বেশি।

একটা লোকের গল্প শুনেছিলাম। সুইজারল্যান্ডে কোনো এক পাহাড়ে চড়ার সময় সে নাকি বলেছিল যে, এক গ্লাস ঠান্ডা পানীয় পেলে সে সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত। কিছুক্ষণ পরে একটা ঝুপড়ির মতো দোকান থেকে লোকটা পানীয় পেয়ে গেল। কিন্তু পানীয়র দাম পাঁচ ফ্রাংক শুনে লোকটা ভয়ানক চেঁচামেচি করেছিল, 'অন্যায্য দাম' ইত্যাদি বলে টলে 'টাইমস' পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে চিঠি পর্যন্ত পাঠিয়েছিল।

সর্ষের সস-এর অভাবে নৌকায় নেমে এল বিষাদের ছায়া। আমরা চুপচাপ শুধু মুখে মাংস চিবিয়ে যাচ্ছি। জীবনটাই যেন কেমন শূন্য, ম্যাড়মেড়ে লাগছিল। শৈশবের আনন্দের দিনগুলির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

এমন সময় হঠাৎ খুশির ঝলকানি—জর্জ খাবারের ঝুড়ির ভেতর থেকে বের করল এক কৌটো আনারস। টিনের কৌটোটা ও যেই নৌকার মাঝখানে গড়িয়ে দিল, আমাদের সবার মনে হল—নাঃ, বেঁচে থাকাটা একেবারে নিরর্থক নয়।

আমরা তিনজনেই আনারস খেতে ভালোবাসি। টিনের ওপর আনারসের ছবি দেখে ভাবছিলাম ভেতরের মিষ্টি ও রসাল ফলের টুকরোগুলোর কথা। তিনজনেই পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে পরিতৃপ্তির হাসি হাসলাম। আর হ্যারিস একটা চামচ বের করল—আনারস পরিবেশনের জন্যে।

এবার খোঁজ পড়ল একটা ছুরির। টিনটা তো খুলতে হবে! বড় ঝুড়িটার সমস্ত জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি করা হল। প্রত্যেকটা ব্যাগের জিনিসপত্র বের করে দেখা হল। নৌকার পাটাতন তুলে খোঁজাখুঁজি করা হল। নদীর পাড়ে জমির ওপর দাঁড়িয়ে মালপত্তর ঝেড়ে ঝুড়ে দেখা হল। টিন খোলার মতো কিছু পাওয়া গেল না।

তখন হ্যারিস ওর পকেট-ছুরিটা বের করে টিনটা খুলতে গেল। ফল? ছুরিটা গেল ভেঙে আর হ্যারিসের হাত গেল কেটে। এবার জর্জ একটা কাঁচি নিয়ে এল। কিন্তু কাঁচিটা প্রায় উড়ে গিয়ে জর্জের চোখে লাগতে লাগতে এক চুলের জন্যে বেরিয়ে গেল।

হ্যারিস আর জর্জ যখন নিজেদের আঘাতের পরিচর্যা করছে তখন আমি একটা ছড়ির ছুঁচলো দিকটা দিয়ে কৌটোটায় একটা ফুটো করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ছড়িটা হড়কে গিয়ে আমার গায়ে এমনভাবে লাগল যে, নৌকা থেকে আমি উল্টে পড়লাম দু-ফুট গভীর কাদাজলে। আর কৌটোটা সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় গড়িয়ে গিয়ে ঠোক্কর মারল একটা কাপে। কাপটা, বলা বাহুল্য, দু'টুকরো হয়ে গেল।

এবার আমরা তিনজনেই প্রায় খেপে গেলাম। কৌটোটা নিয়ে গেলাম নদীর পাড়ে। হ্যারিস মাঠ থেকে কুড়িয়ে আনল একটা বড় ধারালো পাথরের টুকরো। আমি নৌকো থেকে মাস্তুলটা নিয়ে এলাম। জর্জ কৌটোটা শক্ত করে ধরে রইল আর হ্যারিস পাথরের ছুঁচলো দিকটা ঠেকিয়ে রাখল কৌটোর মাথায়। আর আমি মাস্তুলটা দু-হাতে উঁচু করে ধরে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে জোরে নামিয়ে আনলাম পাথরের ওপর।

জর্জের সেদিন প্রাণরক্ষা হল ওর টুপির দৌলতে। ও টুপিটা (অর্থাৎ সেটার যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকু) এখনো রেখে দিয়েছে। কোনো শীতের সন্ধ্যায় পাইপ খেতে খেতে যখন আড্ডা শুরু হয় আর সকলে জীবনে যে যে বিপদের সামনে পড়েছে সেই গল্প বলে, তখন জর্জ হয়তো ওই টুপিটা সবাইকে দেখিকে কৌটো খোলার রোমাঞ্চকর গল্পটা নতুন করে বলে, অবশ্য প্রত্যেক বারই একটু একটু করে রঙ চড়িয়ে।

হ্যারিসের ফাঁড়াটা অবশ্য একটু কাটা ছেঁড়ার ওপর দিয়েই গেল।

তারপর আমি মাস্তুলটা দিয়ে হাতুড়ির স্টাইলে টিনটাকে পেটাতে লাগলাম—ক্লান্ত ও অবসন্ন না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। তারপর হ্যারিস আরম্ভ করল একই ব্যাপার। পিটিয়ে পিটিয়ে টিনটাকে আমরা প্রায় তক্তা করে ফেললাম। আবার পিটিয়ে চৌকো করে নিলাম। জ্যামিতিতে যতরকম আকৃতির কথা আছে, টিনটাকে সবরকম আকৃতিতে পরিণত করেও কোনো লাভ হল না—ওতে একটাও ফুটো করা গেল না। এরপর জর্জের পালা। ও কৌটোটাকে পিটিয়ে পিটিয়ে এমন বিচিত্র, বিদঘুটে ও অস্বাভাবিকভাবে কুৎসিত একটা আকৃতিতে পরিণত করল যে, নিজেই ভয় পেয়ে মাস্তুলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। অবশেষে আমরা এই বিচিত্র বস্তুটিকে ঘিরে বসে ওটির দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম।

টিনটার ওপর দিকটা থেঁতলে গিয়ে এমন একটা চেহারা হয়েছে যে মনে হচ্ছে যেন কেউ আমাদের দিকে ব্যঙ্গ করে দাঁত বার করে হাসছে। তিনজনেই প্রচণ্ড খেপে গেলাম। হ্যারিস টিনটাকে ধরে ছুড়ে দিল নদীর মাঝখানে। টিনটা যখন ডুবছে, তখন আমাদের মুখ থেকে বেরোচ্ছে গালিগালাজের ফোয়ারা। তারপর আমরা নৌকায় উঠে দাঁড় বেয়ে দ্রুত ওই তল্লাট ছেড়ে চলে গেলাম। থামলাম একেবারে মেইডেনহেড বলে একটা জায়গায় পৌঁছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%