প্যাকিং-এর সাতকাহন

জেরোম কে জেরোম

শনিবার সকালে আমাদের নৌকাবিহার শুরু হবে। অতএব বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলায় আমরা তিনজন অর্থাৎ হ্যারিস, জর্জ আর আমি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটা তালিকা প্রস্তুত করলাম। বেশ লম্বা লিস্ট! পরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার সমস্ত জিনিস জোগাড় করে সন্ধেবেলায় আমরা একত্র হলাম প্যাকিং করার জন্য। জামাকাপড় রাখার জন্য একটা বড় চামড়ার ব্যাগ ছিল আর ছিল দু-তিনটে বেতের ঝুড়ি, যেগুলিতে থাকবে রান্নার বাসনপত্র, খাবারদাবার, পানীয় ইত্যাদি। ঘরের মাঝখান থেকে টেবিলটাকে আমরা টেনে নিয়ে গেলাম জানলার কাছে আর মেঝের ওপর ডাঁই করে রাখলাম সমস্ত জিনিস। তারপর স্তূপাকার লটবহরের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম—'আমি প্যাক করব।'

ভালো প্যাকিং করতে পারি বলে আমার একটু গর্ব ছিল। যে যে বিষয়ে আমি আর সকলের থেকে বেশি পারদর্শী, তার মধ্যে প্যাকিং অবশ্যই একটা বিষয়। মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই বহুবিধ বিষয়ে আমার দক্ষতার কথা ভেবে। তাই জর্জ আর হ্যারিসকে আমার এই সহজাত দক্ষতার কথা জানিয়ে ওদেরকে বললাম যে, প্যাকিং ব্যাপারটা পুরোপুরি আমার ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক। ওরা দুজনেই আমার এই প্রস্তাবটা এত সহজে ও এত ব্যগ্রভাবে মেনে নিল যে, আমার একটু অস্বস্তি লাগল। জর্জ একটা পাইপ ধরিয়ে আধশোয়া অবস্থায় একটা আরামকেদারার দখল নিল আর হ্যারিস টেবিলে বসে দু-পা ঝুলিয়ে একটা চুরুট ধরাল।

এমনটা হবে ভেবে কিন্তু আমি প্রস্তাবটা করিনি। আমি চেয়েছিলাম আমার অর্ডারমতো ওরা দুজনে জিনিসগুলো একে একে নির্দিষ্ট ব্যাগে ভরবে। অর্থাৎ আমি হব বস আর ওরা দুজনে আমার হুকুম তামিল করবে। মাঝে মাঝেই ওদেরকে বলব—'এখানে নয়, ওখানে,' বা 'আচ্ছা, এটা আমাকেই করতে দাও', কিংবা 'এই দেখো, কত সহজে কাজটা করা যায়।' ইত্যাদি। অর্থাৎ প্যাকিং ব্যাপারটা ওদের শিখিয়ে দেওয়া। কিন্তু ওদের হাবভাবে আমি অত্যন্ত বিরক্ত হলাম। আমি নিজে খেটে মরব আর ওরা দুজনে চুপচাপ বসে সেটা দেখবে—এর থেকে বিরক্তিকর আর কিছু হয় না।

আমার মনে পড়ল পুরোনো দিনের আমার এক রুমমেটের কথা। সে সোফায় গা-হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু দেখত আমি কী করছি। ঘরের মধ্যে আমার চলাফেরাটাও অনুসরণ করত ওর চোখ দুটো। ও আবার বলত যে, কাজ করতে করতে আমি কখনও তালগোল পাকালে সেটা দেখে ওর মজা লাগে। আমাকে দেখে নাকি ওর মনে হতো যে, জীবন কোনও অলস স্বপ্ন নয়, সুকঠিন পরিশ্রমে ভরা একটা মহান কর্তব্য। যদি কাউকে কর্মরত অবস্থায় না দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে নাকি জীবন অতিবাহিত করা কঠিন। আমাকে কর্মরত অবস্থায় না দেখলে ওর পক্ষে সময় কাটানোই নাকি দুষ্কর হতো।

আমি কিন্তু আমার এই রুমমেটের মতো নই। একজন গাধার মতো খাটবে আর আমি বসে বসে তা দেখব—এ ব্যাপারটা আমার স্বভাবে নেই। আমি প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে চলাফেরা করতে করতে কোনও কাজ পরিচালনা করতে ভালোবাসি। এই সক্রিয় মনোভাব আমার রক্তে। এ ছাড়া আমি থাকতেই পারি না।

যা হোক, আমি কথা না বাড়িয়ে প্যাকিং শুরু করলাম। কাজটা যত তাড়াতাড়ি হবে ভেবেছিলাম, তা কিন্তু হল না। বহুক্ষণ লাগল জামাকাপড়ের ব্যাগটা ভরতে। তারপর আমি ব্যাগটার ওপর বসে একটা দড়ি দিয়ে ওটাকে বাঁধলাম।

'জুতোগুলো ব্যাগে ভরবে না?' হ্যারিস জিগ্যেস করল।

আরে! সত্যিই তো জুতোগুলো ভরতে ভুলে গেছি! হ্যারিসটা এমন পাজি যে ব্যাগটা বন্ধ করে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবধি একবারও মুখ খোলেনি। আর জর্জ? খ্যাঁকখ্যাঁক করে উজবুকের মতো হাসতে লাগল—পিত্তি জ্বালিয়ে দেওয়া হাসি।

ব্যাগ খুলে জুতোগুলো ভরলাম। তারপর ব্যাগটা বন্ধ করতে যাচ্ছি, এমন সময় ভয়ংকর আশঙ্কা মাথায় এল—টুথব্রাশটা ভরেছি তো? এটা কীভাবে হয় জানি না, কিন্তু টুথব্রাশ প্যাক করেছি কিনা, তা আমার কিছুতেই মনে থাকে না।

যখনই বেড়াতে যাই, তখনই টুথব্রাশ আমাকে ভূতের মতো তাড়া করে, জীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। স্বপ্ন দেখি, ওটা প্যাক করা হয়নি। তক্ষুনি ঘুম ভেঙে যায়। আশঙ্কায় ঘেমে-নেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে ওটা খুঁজতে থাকি। যাতে ভুলে না যাই, সকালে মুখ ধোওয়ার আগেই ওটা প্যাক করে দিই। তারপর মুখ ধোওয়ার সময় প্যাকিং খুলে ওটাকে আবার বার করতে হয়। এবং ব্যাগের সব কিছু বাইরে বার করার পরই ওটা পাওয়া যায়। তারপর মুখ ধুয়ে ওটাকে আবার ব্যাগে ঢোকাতে ভুলে যাই। অবশেষে রুমালে মুড়ে ওটাকে পকেটে ভরে স্টেশন রওনা হই—গাড়ি ছাড়ার আর দেরি নেই তখন।

এক্ষেত্রেও কোনও ব্যতিক্রম হল না। ব্যাগের প্রত্যেকটি জিনিস একে একে বার করলাম, কিন্তু কোথায় আমার টুথব্রাশ? পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার আগে যে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার কথা আমরা পড়েছি, ঠিক সেই অবস্থাই হল সমস্ত জিনিসপত্রের। অবশ্যই জর্জ ও হ্যারিসের টুথব্রাশ দুটো দেখতে পেলাম অন্তত আঠারোবার, শুধু আমারটাই পাচ্ছি না। এবার প্রত্যেকটা জিনিস একে একে তুলে ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগলাম। অবশেষে এক পাটি জুতোর থেকে বেরিয়ে এল আমার টুথব্রাশ। সমস্ত জিনিস আবার নতুন করে প্যাক করতে হল।

ব্যাগটা যেই ভরে গেল, তখন জর্জ জিগ্যেস করল—সাবান ঢোকানো হয়েছে কিনা। আমি উত্তর দিলাম যে, সাবান ঢুকেছে কি ঢোকেনি, সে ব্যাপারে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। এই বলে ব্যাগটা বন্ধ করে দড়ি দিয়ে বাঁধলাম। তক্ষুনি মনে পড়ল, আমার তামাকের বটুয়াটা ব্যাগের ভেতর রয়ে গেছে। অতএব ব্যাগ আবার খোলা হল। ব্যাগটা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হল রাত সাড়ে দশটায়।

এবার ভরতে হবে ঝুড়িগুলো। হ্যারিস বলল যে, আর মাত্র বারো ঘণ্টা পরেই আমাদের রওনা দিতে হবে। সুতরাং জর্জ আর ও, দুজনে মিলে বাকি প্যাকিংটা সেরে ফেলবে। আমি রাজি হয়ে বসে পড়লাম। ওরা কাজ শুরু করল।

ওরা বেশ হালকা চালে আরম্ভ করল—যেন আমাকে বোঝাতে চাইছিল প্যাকিং কীভাবে করতে হয়। আমি চুপচাপ শুধু অপেক্ষা করতে থাকলাম। কোনও অপরাধে জর্জের যদি কখনও ফাঁসি হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত যে পৃথিবীর জঘন্যতম প্যাকার হিসেবে বেঁচে থাকবে হ্যারিস। কাপ, প্লেট, কেটলি, বোতল, বয়াম, স্টোভ, কেক, পাই, টম্যাটো ইত্যাদির স্তূপের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল, এবার খেলাটা বেশ জমে যাবে।

সত্যিই জমে গেল। ওরা কাজ শুরুই করল একটা কাপ ভেঙে। ওটাই ওদের প্রথম কাজ। এর মাধ্যমে ওরা যেন বুঝিয়ে দিল যে ওরা কী কী করতে পারে, যা দেখে তুমি মজা পাবে।

তারপর হ্যারিস জ্যামের বোতলটা একটা টম্যাটোর ওপর রাখল, টম্যাটোটা গেল ফেটে। তখন ওরা দুজনে মিলে একটা চা-চামচ দিয়ে ফাটা টম্যাটোর মালমশলা চেঁচে চেঁচে তুলল।

এবার জর্জের পালা। ও না দেখে মাখনের প্যাকেটার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি একটা কথাও না বলে টেবিলের কোনায় বসে নিবিষ্টচিত্তে ওদের লক্ষ করতে লাগলাম। বোঝাই যাচ্ছিল, আমার নৈঃশব্দ্য ওদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওরা যেন একটু নার্ভাস হয়ে পড়ল। আবার সেটা কাটানোর জন্যই হয়তো যেন একটু চটপটে হয়ে উঠল। অনেক জিনিসই ওরা না দেখে পায়ে মাড়াল, আবার কিছু জিনিস পিছন দিকে এমনভাবে রেখে দিল যে প্যাকিং-এর সময় ওগুলো চোখে পড়ল না। পাই অর্থাৎ নরম মিষ্টিগুলো রাখল ঝুড়ির তলার দিকে আর তার ওপরে চাপিয়ে দিল ভারী ভারী জিনিস। পাইয়ের পিণ্ডি গেল চটকে।

কৌটো খুলে গিয়ে চতুর্দিকে নুন ছড়িয়ে পড়ল। আর মাখন নিয়ে যা হল, সেরকম কাণ্ড আমি জীবনে দেখিনি—দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্বল্প মূল্যের এই বস্তুটি নিয়ে কী কাণ্ডই না করল! জর্জের চটির তলা থেকে মাখনটা ছাড়িয়ে ওরা চেষ্টা করল মাখনটাকে কেটলিতে ঢোকাতে। পুরোটা কেটলিতে ঢুকল না, আবার যতটা ঢুকেছে, সেটুকু কেটলি থেকে বার করা যাচ্ছিল না। তখন ওরা কেটলির ভেতরের মাখনটুকু চেঁচে বার করে একটা চেয়ারের ওপর রাখল। হ্যারিস ওই চেয়ারটায় বসতেই মাখনটা ওর প্যান্টে গেল লেপটে। তারপর ওরা দুজনে মাখনের খোঁজে সারা ঘর চষে ফেলল।

জর্জ খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি শপথ করে বলতে পারি, মাখনটা ওই চেয়ারের ওপর রেখেছিলাম।'

'আমিও এক মিনিট আগেই দেখেছি তোমাকে মাখনটা ওখানে রাখতে।' বলল হ্যারিস।

মাখনের খোঁজে সারা ঘরে ঘুরপাক খেতে খেতে একবার দুজন মুখোমুখি হল।

'এমন বিচিত্র ব্যাপার কখনও দেখিনি।' বলল জর্জ।

'রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।'—হ্যারিসের মন্তব্য।

তারপর জর্জ ঘুরে গিয়ে হ্যারিসের পিছনে যেতেই দেখতে পেল মাখনটা।

'এই তো! এখানেই আছে মাখনটা।' রেগে গিয়ে বলে উঠল জর্জ।

হ্যারিস এক পাক ঘুরে গিয়ে জিগ্যেস করল, 'কোথায়?'

'স্থির হয়ে একটু দাঁড়াতে পারো না?' হ্যারিসকে পাকড়াও করে চেঁচিয়ে উঠল জর্জ।

তারপর মাখনটাও ঢোকাল টিপটের মধ্যে।

এতসব কাণ্ডকারখানার মধ্যে অবশ্যই আর একজন যোগ দিয়েছিল—সেটা হল মন্টমোরেন্সি, আমাদের কুকুরটা। ওর জীবনের একমাত্র উচ্চাশা হল আমাদের কাজকর্মের মধ্যে এসে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং আমাদের বকুনি খাওয়া। যেখানে ওর কোনও দরকার নেই, সেখানে কোনওক্রমে ঢুকে পড়ে অসুবিধার সৃষ্টি করে ও যদি কাউকে পাগল করে দিতে পারে এবং এর প্রতিদানস্বরূপ ও যদি মার খায়, তাহলে ওর ধারণা ওর দিনটা ভালোই কাটল। এরকম কিছু হলেই ও গর্বে ডগমগ করে ওঠে।

যে যে জিনিস প্যাক করা হবে মন্টমোরেন্সি সেগুলোর ওপর বসে পড়তে থাকল। যখনই জর্জ আর হ্যারিস কোনও জিনিস প্যাক করার জন্য হাত বাড়াচ্ছিল, প্রতিবারই ওদের হাত ঠেকে যাচ্ছিল কুকুরটার ভেজা নাকে। যেন ওর নাকটাই সকলের দরকার। ও জ্যামের বোতলে একটা পা ঢুকিয়ে দিল, চামচগুলো তছনছ করল আর লেবুগুলোকে ইঁদুর ভেবে ঝুড়িতে ঢুকে তিনটে ইঁদুর, থুড়ি, তিনটে লেবু থেঁতো করে দিল। অবশেষে, হ্যারিস ফ্রায়িং প্যানের এক ঘায়ে কুকুরটাকে ঠান্ডা করল।

হ্যারিস বলল যে কুকুরটাকে আমিই নাকি উসকে দিয়েছি। আমি কিন্তু ওকে কোনওভাবেই উসকানি দিইনি। এইরকম একটা কুকুরের কোনও উসকানির প্রয়োজন নেই। এই ধরনের বজ্জাতি করার প্রবণতা ওর সহজাত।

প্রায় রাত একটায় প্যাকিং শেষ হল। হ্যারিস বড় ঝুড়িটার ওপর বসে পড়ে বলল যে, আশা করা যায় কোনও কিছু ভাঙেনি। জর্জ বলল যে, কিছু ভেঙে গেলে ভাঙবে। মনে হয় এই উদাসীনতা দেখিয়ে ও একটু স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করল।

এর পর আমরা সবাই শুতে গেলাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%