সারমেয়-মার্জার সংবাদ

জেরোম কে জেরোম

আমার কুকুর মন্টমোরেন্সি এবং আমার মধ্যে কোনো ব্যাপারেই বিশেষ মতপার্থক্য নেই— একটি বিষয় ছাড়া। বিষয়টি হল, বেড়াল। আমি বেড়াল ভালোবাসি, আর মন্টমোরেন্সি বেড়াল দু-চক্ষে দেখতে পারে না।

কোনো বেড়ালের সঙ্গে দেখা হলে আমি একটু ঝুঁকে 'আহা, বেচারা!' বলে তার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিই, আর বেড়ালটা ল্যাজ লোহার শিকের মতো খাড়া করে দেয় এবং পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকিয়ে আমার প্যান্টে নাক ঘষতে থাকে। অতি শান্তিপূর্ণ, অতীব ভদ্র সাক্ষাৎকার।

অথচ মন্টমোরেন্সির সঙ্গে কোনো বেড়ালের দেখা হলে রাস্তাঘাটের সবাই ব্যাপারটা জানতে পেরে যায়। দশ সেকেন্ডের মধ্যেই মন্টমোরেন্সি যা কটুকাটব্য করে, তা একজন সাধারণ মানুষ বুঝে শুনে খরচ করলে তার সারাজীবন কেটে যেতে পারে।

অবশ্য আমি কুকুরটাকে দোষ দিই না, কেন না এটাই ওদের স্বভাব।

বড়জোর ওর মাথায় একটা গাঁট্টা মারি কিংবা একটা ইটের টুকরো ওর দিকে ছুড়ে দিই। আমার কুকুর মন্টমোরেন্সি জাতে ফক্স টেরিয়ার। ওদের সহজাত যা বদস্বভাব তা পাল্টানো ধর্মযাজকেরও অসাধ্য।

এই প্রসঙ্গে একদিনের কথা বলি। ঘটনাটা ঘটে হে-মার্কেট নামের বাজারের লবিতে। লবিতে চারদিকে খালি কুকুর আর কুকুর। মালিকেরা সব বাজার করতে ভেতরে ঢুকেছে। আর কুকুরগুলো মালিকদের ফেরার জন্য অপেক্ষারত। বিভিন্ন জাতের কুকুর—একটা পাহারাদার ম্যস্টিফ, দুটো লোমওয়ালা বড় সাইজের কোলি, একটা সেন্ট বার্নার্ড, কয়েকটা রিট্রিভার, একটা ডালকুত্তা, মাথায় লোমওয়ালা একটা পুডল, (গায়ে তেমন লোম নেই), একটা বুলডগ, কয়েকটা ইঁদুর সাইজের ছোট কুকুর আর গোটাদুয়েক খেঁকি কুকুর।

সবক'টা কুকুর ভদ্রভাবে ধৈর্যভরে মালিকের আগমনের জন্যে প্রতীক্ষারত। তারা যেন একটু চিন্তামগ্ন, একটা মধুর বিষাদে আচ্ছন্ন। সব মিলিয়ে লবিতে শান্তির বাতাবরণ।

এমন সময় এক কমবয়সি মহিলা বাজারে ঢুকলেন, তাঁর পিছনে পিছনে শান্তশিষ্ট দেখতে একটা ফক্সটেরিয়ার। কুকুরটাকে বুলডগ আর পুডলটার মাঝখানে খালি জায়গায় চেন দিয়ে বেঁধে মহিলা বাজার করতে চলে গেলেন। কুকুরটা বসে মিনিটখানেক ধরে চারপাশটা জরিপ করল। তারপর মুখটা তুলে উদাসভাবে তাদের দিকে তাকাল। ওর হাবভাব দেখে মনে হল, যেন ও হারিয়ে যাওয়া মায়ের কথা ভাবছে। তারপর একটা হাই তুলে অন্য কুকুরগুলোকে দেখল—সবক'টা কুকুর-ই শান্ত, গম্ভীর। বুলডগটা ডানদিকে শান্তিতে নিদ্রামগ্ন। বাঁদিকে পুডলটা শক্ত হয়ে বসে, যেন একটু উদ্ধত।

তারপর বিন্দুমাত্র সংকেত না দিয়ে, কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই, হঠাৎ ফক্সটেরিয়ারটা পুডল-এর সামনের একটা পা কামড়ে দিল। আর বেচারা পুডল-এর আর্তনাদে লবির নিস্তব্ধতা গেল ভেঙে।

নিজের প্রাথমিক সাফল্যে বিশেষ পরিতৃপ্ত হয়েই সম্ভবত ফক্সটেরিয়ার পুরো পরিবেশটাকেই একটু মজাদার করে তুলতে চাইল। পুডলটাকে ডিঙিয়ে ও এবার একটা বড় লোমওয়ালা কুকুরকে আক্রমণ করল। সেটাও তক্ষুনি ঘুম থেকে জেগে উঠে পুডল-এর সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারস্বরে চেঁচানোর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিল। এবার ফক্স টেরিয়ারটা নিজের জায়গায় ফিরে বুলডগের কানটা কামড়ে ধরে ওটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করল। আর বুলডগটা? সে তো তার নিরপেক্ষতার জন্যে বিখ্যাত। সে সামনে যাকে পেল তাকেই আক্রমণ করল, এমনকী লবির প্রহরীটাকেও ছেড়ে কথা কইল না। এই সুযোগ ফক্সটেরিয়ারটা বিনা বাধায় একটা লড়াকু খেঁকি কুকুরের সঙ্গে লড়তে লাগল।

যারা কুকুরদের স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তাদেরকে বলার দরকার নেই যে ততক্ষণে সব ক'টা কুকুর পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে লড়াই শুরু করল যে তাদের ঘরবাড়ি খাবারদাবার ইত্যাদির নিরাপত্তা যেন এই লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করছে। বড় কুকুরগুলো নিজেদের মধ্যেই প্রাণপণে লড়াই করছিল। ছোট কুকুরগুলোও নিজেদের মধ্যে লড়তে লড়তে সুযোগ পেলেই বড় কুকুরগুলোর পায়ে কামড় দিতে লাগল।

পুরো লবিতে ততক্ষণে দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। সারমেয়কুলের চিৎকারে কান পাতাই দায়। আশেপাশের লোকজন লবির গেটের বাইরে জড়ো হয়ে গেছে। তারা জানতে চাইল কী হচ্ছে। রাজনৈতিক তরজা? না কি কেউ খুন হয়েছে? কী কারণে খুনোখুনি? তারপর লোকজন লাঠি দড়ি ইত্যাদি এনে কুকুরগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু না—পুলিশকেই ডাকতে হল শেষমেশ।

আর এই দাঙ্গার মধ্যে সেই অল্পবয়সি মহিলা এসে নিজের কুকুরটিকে ছিনিয়ে নিয়ে কোলে তুলে নিলেন। কুকুরটা ইতিমধ্যে একটা খেঁকি কুকুরের যা হাল করেছে, অন্তত মাসখানেক লাগবে তার সেরে উঠতে। কিন্তু মালকিনের কোলে ওঠার পর তার মুখের অভিব্যক্তি একটি সদ্যোজাত মেষশাবকের মতো—যেন ভাজা মাছটি সে উল্টে খেতে জানে না।

মহিলা পরম স্নেহে তাকে চুমু খেয়ে জিগ্যেস করলেন। 'সোনা, তুমি বেঁচে আছ তো? ওই গুন্ডা বদমাইশ কুকুরগুলো তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে তাই না?'

কুকুরটা প্রত্যুত্তরে মালকিনের কোলে আরও একটু সেঁধিয়ে গিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করল যার মানে হয়, 'এই বিচ্ছিরি পরিবেশ থেকে বের করে তুমি আমায় বাঁচালে মামণি!'

মহিলা জানতে চাইলেন যে কোন আক্কেলে বাজারের কর্মচারীরা বড় বড় বুনো কুকুরের সঙ্গে অভিজাত মানুষের নিরীহ কুকুর একসঙ্গে রাখে! তিনি এই বলে ধমকিও দিলেন যে, উপযুক্ত জায়গায় এই ব্যাপারে অভিযোগ করবেন।

এই হল ফক্স টেরিয়ারের স্বভাব। যেহেতু আমার মন্টমোরেন্সিও এই জাতের কুকুর তাই বেড়ালের সঙ্গে ঝগড়া করার ব্যাপারে তাকে আমি ঠিক দোষ দিতে পারি না। তবে একদিন সকালে একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটেছিল। সেটার কথা বলি।

আমি মন্টমোরেন্সিকে নিয়ে ফিরছিলাম বড় রাস্তা দিয়ে। হঠাৎ একটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল একটা বেড়াল এবং সে ধীরেসুস্থে রাস্তা পার হতে লাগল। মন্টমোরেন্সির মুখ থেকে বেরিয়ে এল উল্লাসের যুদ্ধনাদ, যেন একজন বীর যোদ্ধার হাতের মুঠোয় এসে গেছে শত্রুপক্ষ—এবং ও দৌড়ল ওর শিকারের দিকে।

বেড়ালটা কালো রঙের হুলো। আমি এত কালো এবং এত বিচ্ছিরি বেড়াল আগে কখনো দেখিনি। বেড়ালটার ল্যাজের অর্ধেকটা, একটা কান এবং নাকের বেশ কিছুটা অংশ নেই। শরীরটা লম্বা, চেহারাটা পেটানো। মুখের ভাবে পরম শান্তি ও সন্তোষ।

ঘণ্টায় কুড়ি মাইল বেগে আমার কুকুরটা দৌড়ে গেল বেচারা বেড়ালটার দিকে। কিন্তু বেড়ালটার কোনো হেলদোল নেই—নিজের জীবনের ঝুঁকির ব্যাপারে ও সম্পূর্ণ উদাসীন। হবু আততায়ী এক গজ দূরত্বে আসা পর্যন্ত ও চুপচাপ হাঁটছিল। তারপর ও রাস্তার মাঝখানে বসে পড়ে মন্টমোরেন্সির দিকে শান্তভাবে প্রশ্নবাচক দৃষ্টিতে তাকাল। যেন বলতে চাইল, কী ভাই? তুমি কি আমাকে চাইছ?

আমার কুকুরটা এমনিতে খুব সাহসী, কিন্তু বেড়ালটার হাবভাবে এমন কিছু ছিল যাতে অতি সাহসী কুকুরেরও হাড় হিম হয়ে যায়। মন্টমোরেন্সি হঠাৎ থমকে গিয়ে হুলোটার দিকে তাকাল।

দু'জনে কোনো কথাই বলল না, তবে ওদের নীরব কথোপকথনটা অনেকটা ওইরকম ছিল বলে আমার মনে হয়ঃ

বেড়ালঃ তোমাকে কি কোনো ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি?

কুকুরঃ না...মানে...না। ধন্যবাদ।

বেড়ালঃ সংকোচ করছ কেন? বলেই ফ্যালো না কী চাই।

কুকুর (একটু পেছিয়ে এসে): আরে না, না, কিছু না। ব্যস্ত হতে হবে না তোমাকে। মনে হচ্ছে একটা ভুল করে ফেলেছি। ভেবেছিলাম, তুমি আমার চেনা। সরি, তোমাকে বিনা কারণে ব্যস্ত করলাম।

বেড়ালঃ একদম নয়। ভালো লাগল তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে। এখন তো বলতে পারো কিছু চাই কিনা?

কুকুর (আরও পেছোতে পেছোতে): সত্যিই কিছু চাই না। অনেক ধন্যবাদ তোমার ব্যবহারের জন্যে। সুপ্রভাত।

বেড়ালঃ সুপ্রভাত।

তারপর বেড়ালটা উঠে দাঁড়িয়ে আবার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। আর মন্টমোরেন্সি আমার পিছনে এসে প্রায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলল।

তারপর থেকে এখনো পর্যন্ত 'বেড়াল' শব্দটা উচ্চারিত হলেই মন্টমোরেন্সি প্রায় কুঁকড়ে যায়। দয়া ভিক্ষার ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন বলে, 'ও কথা থাক।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%