পনিরের কেরামতি

জেরোম কে জেরোম

আমার এক বন্ধু একবার লিভারপুল শহরে দুটো বড় বড় পনিরের টুকরো কিনেছিল। দারুণ পনির—যাকে বলে পাকা, নরম ও রসালো। আর সেই পনিরে ছিল প্রায় দুশো অশ্বশক্তির গন্ধ—যা প্রায় তিন মাইল দূর থেকে নাকে পৌঁছোয়। ওই গন্ধ একবার শুঁকলে যে-কোনও মানুষ অন্তত দুশো গজ দূরে ছিটকে পড়বে। ঘটনাচক্রে আমিও তখন লিভারপুলে। আমার বন্ধুর যেহেতু লন্ডন ফিরতে আর কয়েকদিন দেরি হবে, এবং ততদিনে পনিরটা খারাপ হয়ে যেতে পারে, ও আমাকে বলল পনিরটা ওর বাড়িতে পৌঁছে দিতে।

আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, অবশ্যই নিয়ে যাব ভাই। আনন্দের সঙ্গে।

পনিরটা ওর কাছ থেকে আনিয়ে উঠে পড়লাম একটা লজঝড়ে ঘোড়ার গাড়িতে। গাড়ির চালক জন্তুটিকে যদিও 'ঘোড়া' বলে উল্লেখ করছিল, ওর নড়বড়ে হাঁটুগুলোর ঠোকাঠুকি আর প্রায় নিদ্রিত অবস্থায় পা চালানো দেখে আমার ওটাকে ঘোড়া বলে মনে হচ্ছিল না। পনিরের টুকরো দুটো গাড়ির মাথায় রেখে আমরা স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম। রোড রোলারের থেকেও ঢিমেতালে গাড়ি চলতে শুরু করল। ঠিকই চলছিল গাড়ি বাঁক না নেওয়া অবধি। হঠাৎ একটা বাঁক নিতেই হাওয়ায় পনিরের গন্ধ ভেসে এসে লাগল ঘোড়ার নাকে। ঘোড়াটার যেন ঘুম ভেঙে গেল, এবং ভয়ে একটা চিঁহি আওয়াজ করে ও দৌড়োতে শুরু করল ঘণ্টায় প্রায় তিন মাইল বেগে। হাওয়া ঘোড়ার নাকের দিকেই বইতে থাকল আর ওই রাস্তাটুকু শেষ করতে করতে ওর গতিবেগ হয়ে গেল ঘণ্টাপিছু প্রায় চার মাইল। খোঁড়া লোকজন, বয়স্ক মানুষরা—সব এদিক-ওদিক সরে যেতে লাগল।

স্টেশনে পৌঁছোনোর পর গাড়ির চালক ও দুজন কুলি মিলে বহু কষ্টে ঘোড়াটাকে থামাল। আমার মনে হয় ওদের একজনের উপস্থিত বুদ্ধি ছাড়া ঘোড়াটাকে থামানো যেত না। সে নাকে একটা রুমাল বেঁধে খানিকটা কাগজ জ্বালিয়ে ঘোড়াটাকে কাগজপোড়ানো গন্ধ শুঁকিয়ে তবেই ওকে ধাতস্থ করল।

আমি টিকিট কিনে পনির হাতে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে চলতে লাগলাম। উপস্থিত সকলে এবং অপেক্ষারত যাত্রী সবাই প্রায় সম্ভ্রমে তাড়াতাড়ি দু'দিকে লাইন করে দাঁড়িয়ে আমার চলবার রাস্তা করে দিল। ট্রেনে ভিড় ছিল। শেষ পর্যন্ত যে কামরায় উঠলাম, সেটায় ইতিমধ্যেই সাতজন যাত্রী বসে আছে। এক খিটখিটে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের আপত্তি সত্ত্বেও আমি ওই কামরাতেই উঠে পড়লাম। পনিরটা ওপরের মাল রাখার তাকে রেখে যাত্রীদের মধ্যেই একটু জায়গা করে বসলাম। তারপর একটু হেসে সবাইকে বললাম, আজ বড্ড গরম। আলাপ জমানোর চেষ্টা আর কী! একটু পরে ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটু উশখুশ করতে শুরু করলেন। বললেন, বড্ড চাপাচাপি হচ্ছে।

ওঁর পাশের যাত্রীটি বললেন, কেমন যেন দম বন্ধ লাগছে।

তারপর ওঁরা দুজনেই শুঁকতে আরম্ভ করলেন। বার তিনেক শোঁকার পরে মনে হয় গন্ধটা ওঁদের বুকে গিয়ে সোজা ধাক্কা মারল। দুজনেই উঠে বিনা বাক্যব্যয়ে কামরার থেকে বেরিয়ে গেলেন। তারপর বড়সড়ো চেহারার একজন মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে বেশ রাগতভাবে বললেন যে, এটা খুবই আক্ষেপের বিষয় যে একজন সম্ভ্রান্ত মহিলাকেও এইখানে এইভাবে হয়রান হতে হচ্ছে। তারপর তিনি তাঁর ব্যাগটা আর আটটা পার্সেল উঠিয়ে নিয়ে কামরা ছেড়ে চলে গেলেন। বাকি চারজন যাত্রী খানিকক্ষণ বসে রইলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বেশ গম্ভীর প্রকৃতির। দেখে মনে হয় 'আন্ডারটেকার'—অর্থাৎ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করেন। উনি হঠাৎ বলে উঠলেন যে, মনে হচ্ছে যেন কামরায় একটা শিশুর মৃতদেহ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাকি তিনজন একসঙ্গে তড়িঘড়ি কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে গেলেন এবং দরজার কাছে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে ব্যথাও পেলেন।

গম্ভীর প্রকৃতির ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আমি একটু হাসলাম। বললাম যে, কামরাটায় সম্ভবত আমরা দুজনেই থাকব। উনিও হেসে বললেন যে, লোকে ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে কেন যে এত বাড়াবাড়ি করে তা বোঝা কঠিন। কিন্তু গাড়ি ছাড়ার পর দেখলাম, উনি যেন একটু ম্রিয়মান। একটা স্টেশন আসতেই তাই ওঁকে বললাম—চলুন, ডাইনিং কারে গিয়ে একটু কিছু পানীয় নেওয়া যাক।

ডাইনিং কারে প্রচণ্ড ভিড়। প্রায় পনেরো মিনিট চেঁচিয়ে, লাফালাফি করে, অবশেষে ছাতার বাঁট নেড়ে এক মহিলা কর্মীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলাম। সে জিগ্যেস করল, আপনাদের কি কিছু চাই?

আমি আমার সঙ্গীকে জিগ্যেস করলাম, কী খাবেন?

উনি বললেন, ব্র্যান্ডি।

উনি ব্র্যান্ডি খেয়ে চুপচাপ চলে গেলেন আর অন্য একটা কামরায় উঠে পড়লেন। মনে মনে ভাবলাম, এটা কি আমার আতিথেয়তার উচিত প্রতিদান হল!

ওই স্টেশন থেকে আমার কামরায় আমিই একা। যদিও ট্রেনে বেশ ভিড়। বিভিন্ন স্টেশনে যেই গাড়ি থামছে, লোকজন আমার কামরাটা খালি দেখে এদিকেই দৌড়ে আসছে। 'এসো, এসো তোমরা, এই কামরাটা খালি আছে', 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলো, এটাতেই উঠি'... ইত্যাদি কথা চলছে। তারপর কেউ হাতে ভারী ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে এসে সবাইকে ধাক্কা মেরে কামরায় আগে ঢুকতে গেল। সিঁড়িটুকু পেরিয়ে দরজা খুলে ঢুকেই প্রায় মূর্ছিতর মতো টলে পড়ল পেছনের লোকের ওপর। তারপর সবাই এসে একবার করে কামরার ঘ্রাণ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নেমে গিয়ে ভিড় সত্ত্বেও অন্য কামরায় উঠছিল কিংবা বেশি পয়সা দিয়ে প্রথম শ্রেণির কামরায় ঢুকছিল।

লন্ডনে ইউস্টন স্টেশনে নেমে পনির নিয়ে বন্ধুর বাড়ি গেলাম। বন্ধুর স্ত্রী ভেতর থেকে বসার ঘরে এসে এক মুহূর্ত কী যেন শুঁকলেন। তারপর বললেন, কী হয়েছে? যত খারাপ খবরই হোক, আমায় বলুন।

আমি বললাম, পনির! টম এগুলো লিভারপুলে কিনেছে। আমাকে বলল, আপনার কাছে পৌঁছে দিতে।

তারপরেই আবার একটু সতর্ক হয়ে বললাম, বুঝতেই পারছেন এতে আমার কোনও ভূমিকা নেই।

উনি বললেন, তা বুঝেছি। টম ফিরুক, তারপর ওর সঙ্গে বোঝাপড়া করব।

টম কিন্তু কাজের চাপে লিভারপুল থেকে নির্ধারিত দিনে ফিরতে পারল না। তিন দিন ওর জন্য অপেক্ষা করে ওর স্ত্রী আমার সঙ্গে দেখা করলেন। বললেন, পনিরের ব্যাপারে টম কী বলেছিল?

আমি উত্তর দিলাম, এগুলোকে একটু স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখতে বলেছিল। আর বলেছিল, ওগুলোতে যেন কেউ হাত না দেয়।

—কেউই ছোঁবে না ওগুলো। কিন্তু টম কি পনিরের গন্ধটা শুঁকেছিল।

—মনে হয় শুঁকেছিল। ওর তো ভীষণ পছন্দ পনিরটা।

—আচ্ছা, কাউকে যদি কিছু টাকা দিয়ে বলি দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে পনিরটাকে মাটিতে পুঁতে দিতে, তাহলে কি টমের খুব খারাপ লাগবে?

—আমার মনে হয় তাহলে টমের হাসিমুখ আর কখনও দেখা যাবে না।

মহিলার মাথায় এবার একটা নতুন বুদ্ধি এল। বললেন, আচ্ছা, পনিরটা যদি আপনার কাছে পাঠিয়ে দিই, তাহলে টমের না আসা অবধি ওটা আপনার কাছে রেখে দিতে পারেন?

আমি বললাম, দেখুন ম্যাডাম, আমার পনিরের গন্ধ ভালোই লাগে। আর এই পনিরের দৌলতেই বড় আরামে লিভারপুল থেকে ফিরেছি। ছুটি শেষ করেছি ওই মনোরম যাত্রা দিয়ে। কিন্তু অন্য সবাইয়ের কথাও তো ভাবতে হবে আমাদের। যাঁর বাড়িতে আমি থাকি, সেই বাড়িওয়ালি মহিলা বিধবা। এবং একা। তাঁর ওপর কিছু জোর করে চাপিয়ে দিলে ভীষণ আপত্তি করেন। আপনার স্বামীর পনির আমার ঘরে নিয়ে গেলে উনি মনে করবেন, একটা আপদ জোর করে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক নিঃসঙ্গ বিধবার ওপর কোনওরকম উপদ্রব করে আমি বদনাম কুড়োতে চাই না।

—ঠিক আছে। তাহলে আমার এটুকুই বলার আছে যে, যতদিন না পনিরটা খেয়ে শেষ করা হয়, ততদিন আমি আমার বাচ্চাদের নিয়ে একটা হোটেলে থাকব। ওই পনিরের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

বন্ধুর স্ত্রী তাঁর কথামতো ঠিকে ঝিকে বাড়িতে রেখে একটা হোটেলে চলে গেলেন বাচ্চাদের নিয়ে। যাওয়ার আগে উনি ঠিকে ঝিকে জিগ্যেস করেছিলেন যে ও গন্ধটা সহ্য করতে পারবে কিনা। ঝি পালটা প্রশ্ন করেছিল, কীসের গন্ধ? তখন ওকে পনিরের কাছে নিয়ে গিয়ে বেশ জোরে জোরে শুঁকতে বলায় ও বলেছিল যে তরমুজের একটা হালকা গন্ধ যেন পাচ্ছে। এর থেকে বন্ধুপত্নী এই সিদ্ধান্তে এলেন যে ওই পরিবেশে কাজের মহিলার বিশেষ কোনও ক্ষতি হবে না।

হোটেলের একটা বিশাল বিল এল। সেটা ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে পনিরের প্রকৃত দাম যা হল, বন্ধু বলল যে, সেটা ওর সাধ্যের বাইরে। পনির খেতে ভালো লাগলেও ও ঠিক করল, পনিরটা বিদায় করাই উচিত হবে। ও প্রথমে পনিরটা ফেলল খালের জলে। কিন্তু মাঝিরা ওই পনিরের প্রভাবে সকলেই প্রায় মূর্ছা যাচ্ছিল। তাই ওদের সম্মিলিত প্রতিবাদে ওটা আবার জলের থেকে তুলে নিতে হল।

বন্ধু তারপর একদিন রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি ওই অঞ্চলের মর্গের কাছে পনিরটা রেখে এল। কিন্তু ময়নাতদন্তকারী ভদ্রলোক ব্যাপারটা জানতে পেরে খুব চেঁচামেচি করলেন। তাঁর বক্তব্য, ওই পনিরের গন্ধে মড়াগুলোকে জাগিয়ে তুলে তাঁকে বেকার করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

বন্ধু শেষ পর্যন্ত অবশ্য পনিরটা বিদায় করতে পারল। সমুদ্রসৈকতের লাগোয়া এক শহরে। সেখানে বেলাভূমিতে ওটাকে পুঁতে দিল। শহরটার তারপর খ্যাতি বেড়ে গেল। পর্যটকরা বলাবলি করত যে, এখানে হাওয়ার বেশ গুণ আছে। শরীর ভালো থাকে। দুর্বল শরীরের লোকেরা অথবা যক্ষ্মারোগীরা বহু বছর ধরে ওই শহরে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য আসত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%