জেরোম কে জেরোম

সন্ধে হয় হয়। আমরা নৌকাটাকে বাঁধলাম নদীর পাড়ে একটা কোনাচে মতো সুন্দর জায়গায়। একটা বড় এলম গাছের নীচে। নৌকাটা বাঁধা হল ওই গাছেরই শিকড়ে।
সবার খুব খিদে পেয়েছে। ক্লান্তিতে দু-চোখের পাতাও বুঝে আসছে। তাড়াতাড়ি ডিনার করে শুয়ে পড়ব বলে আমরা বিকেলে চা-ও খাইনি। জর্জ বলল, 'দিনের আলো থাকতে থাকতে নৌকার ওপর ত্রিপলটা টাঙিয়ে নেওয়া যাক। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়লেই হবে।'
ত্রিপল টাঙানোর ব্যাপারটা যে এতটা বিশাল ও জটিল তা ছিল আমাদের ধারণার বাইরে। দেখে মনে হয় কী সহজ কাজ! ধনুকের মতো আকৃতির পাঁচটা লোহার খিলান নৌকার ওপর পর পর সাজিয়ে রাখা এবং সেগুলোর ওপর ত্রিপলটা ফেলে নীচের দিকে বেঁধে দেওয়া। ভেবেছিলাম দশ মিনিটের কাজ।
একেবারে ভুল করেছিলাম। প্রথমে লোহার খিলানগুলোকে একে একে তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় রাখলাম। নৌকার দুই ধারে খিলানের দুই প্রান্তকে গুঁজে দেওয়ার জন্য কোটর করা আছে। খুবই সাদামাটা কাজ—বিপদের কোনো নামগন্ধ নেই। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে যে, আমরা সকলে জীবিত অবস্থায় এই ঘটনার বর্ণনা করছি সেটাই আশ্চর্যের। ওই লোহার খিলানগুলো আসলে যেন এক একটা দানব। ওদের প্রান্ত কিছুতেই কোটরের মধ্যে ঢুকবে না। ওগুলোর ওপর লাফিয়ে, লাথি মেরে, হাতুড়ি পিটিয়েও কোটরে ঢোকানো যাচ্ছিল না। অবশেষে যখন ঢুকল, তখন দেখা গেল যে, খিলান অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোটরে ঢোকেনি। সে এক প্রাণান্তকর পরিস্থিতি। কিছুতেই ওগুলোকে আর টেনে বার করা যাচ্ছে না। শেষে দুজন মিলে পাঁচ মিনিট ধরে ধস্তাধস্তি করতেই হঠাৎ একটা খিলানের অংশ কোটর থেকে বিদ্যুদবেগে বেরিয়ে এসে আমাদের ধাক্কা মেরে প্রায় জলে ফেলে ডুবিয়ে মারার উপক্রম করল। খিলানগুলোর মাঝে মাঝে ছিল লোহার কবজা। আমরা একটু অন্যমনস্ক হলেই কবজাগুলো হঠাৎ হঠাৎ আমাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করছিল। ওদিকে খিলানের এক প্রান্ত যখন আমরা কোটরে ঢোকানোর চেষ্টা করছিলাম, অন্য প্রান্ত তখন কাপুরুষের মতো পিছন থেকে আমাদের মাথায় বাড়ি মারছিল।
শেষ পর্যন্ত খিলানগুলোকে ঠিকঠাক লাগানো হল। বাকি রইল ওপরে ত্রিপলটা চড়িয়ে দেওয়া। জর্জ ত্রিপলের রোলটা খুলে তার এক প্রান্ত বেঁধে দিল নৌকার নাকের ডগায়। হ্যারিস দাঁড়াল নৌকার মাঝামাঝি জায়গায়—ত্রিপলটা জর্জের হাত থেকে নিয়ে আমাকে এগিয়ে দেবে বলে। আমি দাঁড়ালাম নৌকার অন্য প্রান্তে ত্রিপলের শেষ অংশটুকু বেঁধে দিতে।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও আমার কাছে ত্রিপলটা পৌঁছল না। জর্জ নিজের কাজটুকু ঠিক করেছিল, কিন্তু অনভিজ্ঞ হ্যারিস সবকিছু তালগোল পাকিয়ে দিল।
কী করে যে ও গন্ডগোলটা করতে পারল তা জানি না; হ্যারিস নিজেও কিছু বলতে পারল না। কোনও এক রহস্যময় পদ্ধতিতে মিনিট দশেকের অমানুষিক প্রচেষ্টায় ও ত্রিপলের মধ্যেই জড়িয়ে গিয়ে রোল হয়ে গেছল। এমনভাবে ত্রিপলের পরতে পরতে টাইট হয়ে জড়িয়ে গেছল যে কিছুতেই বেরোতে পারছিল না। হাত-পা ছুঁড়ে ও মুক্তির জন্যে খুব চেষ্টা করছিল (করবে না-ই বা কেন—স্বাধীনতা প্রত্যেক ইংরেজের জন্মগত অধিকার)। এবং ওই অবস্থায়, পরে জেনেছিলাম, ও জর্জের ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়েছিল। জর্জ-ও রেগে মেগে হ্যারিসকে দু-চার কথা শুনিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে গিয়ে ত্রিপলের রোলের মধ্যে বিচ্ছিরিভাবে ফেঁসে গেছল।
ঘটনার সময় আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি। একেবারেই না। আমার কাজ ছিল ত্রিপলটা নৌকার অন্য প্রান্তে পৌঁছনো পর্যন্ত ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকা। তাই আমি আর আমাদের কুকুর মন্টমোরেন্সি ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম—নট নড়ন চড়ন, নট কিচ্ছু। দেখতে পাচ্ছিলাম ত্রিপলের রোলটা ভীষণ ঝাঁকুনি খেতে খেতে কখনো এদিকে যাচ্ছে, কখনো ওদিকে। ভেবেছিলাম যে ত্রিপল বোধহয় এভাবেই টাঙাতে হয়—এবং তাই কোনোরকম হস্তক্ষেপ করিনি।
ত্রিপলের রোলের মধ্যে থেকে মানুষ্যকণ্ঠের চাপা আওয়াজও কানে আসছিল। মনে হয়েছিল যে কাজটা জটিল বলে জর্জ আর হ্যারিস পরস্পরের সঙ্গে হয়তো এই ব্যাপারেই আলোচনা করছে। কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই সমীচীন হবে।
আরো কিছুক্ষণ প্রতীক্ষার পর মনে হল যে কাজটা যেন প্রতি মুহূর্তে আরো জটিল হয়ে পড়ছে। এমন সময়ে নৌকার এক ধারে জর্জের মাথাটা ত্রিপলের রোল থেকে বেরিয়ে এল। ওর গলা শুনতে পেলাম ঃ
'এই যে ইডিয়ট! মিশরের মমির মতো ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে একটু হাত লাগাও না! দেখছ না আমাদের দুজনের দমবন্ধ অবস্থা?'
কেউ সাহায্য চাইলে আমি সবসময় প্রস্তুত। সুতরাং এগিয়ে গিয়ে ওদের দুজনকে উদ্ধার করলাম। ততক্ষণে হ্যারিসের মুখচোখের অবস্থাও বেশ কাহিল।
আরো আধঘণ্টার গলদঘর্ম পরিশ্রমের পর ত্রিপলটা টাঙানো হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন