সৈকত মুখোপাধ্যায়

হায়ার-সেকেন্ডারির মেরিট-লিস্টে আর পারমিতা ঘোষালের নাম উঠল না। রুমি জানত, উঠবে না। কল্যাণদা যেভাবে সায়েন্স-সাবজেক্টগুলো দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সেইভাবে যদি কেউ ইংরিজি আর বাংলাটাও দেখিয়ে দিতেন, তাহলে হয়তো রেজাল্টটা আরো একটু ভালো হতে পারত। কিন্তু সেরকম কেউ ছিলেন না।
সে নাই হোক, সায়েন্স-গ্রুপে ওর যা রেজাল্ট হল, তাতে যাদবপুরে ইলেকট্রনিকস নিয়ে ভরতি হতে পারমিতার কোনও অসুবিধে হল না। এই পুরো সময়টাই কল্যাণ বাড়ই ওর জন্যে অনেক দৌড়োদৌড়ি করলেন। উনিই পারমিতাকে বেশ কয়েকবার জগৎপুর থেকে যাদবপুরে নিয়ে যাতায়াত করলেন। তাছাড়া আর কেই বা করবে?
রুমির কাকা রমাপদ ঘোষাল ভাইঝিকে ভালোবাসে ঠিকই। কিন্তু সে তো মফস্বলের এক ছোট ব্যবসায়ী। দোকান ছেড়ে গেলে তার চলে না। তবে স্কলারশিপের টাকা হাতে পাওয়ার পরেও রুমির পড়াশোনার জন্যে বাকি যা খরচ, তার পুরো দায়িত্বই রমাপদ নিয়েছিল।
যাই হোক, তারপর একদিন রুমি একটা ছোট সুটকেস আর একটা চটের বিগ-শপার নিয়ে পড়ুয়া হিসেবে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঢুকল। আবাসিক হিসেবেও। এখন থেকে সে উইমেন্স-হস্টেলেই থাকবে।
অনেক দিন...অনেক বছর ধরে যে-মেয়েটা শীতলাবাড়ির দোতলার একটা ঘরের চার-দেয়ালের মধ্যে নিজেকে স্বেচ্ছা-নির্বাসন দিয়ে রেখেছিল, সে প্রথমে এই বিরাট মুক্তির মধ্যে এসে অস্বস্তি বোধ করল। কিন্তু সেটা মাত্রই কয়েক দিনের জন্যে। তারপরেই নতুন বন্ধুবান্ধবেরা তাকে সহজ করে নিল। অনেক সময় ঘরের জানলা খুললে বোঝা যায় ঘরটা ঠিক কতটা গুমোট হয়ে ছিল। রুমির অবস্থা হল ঠিক তাই।
মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই যে বিষণ্ণতা তার নিত্যসঙ্গী ছিল, সেই বিষণ্ণতা যেন এই প্রথম তার বুক ছেড়ে বাইরে মিলিয়ে গেল। এক-নম্বর গেটের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম দিন, প্রথম চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে পারমিতার মুখ থেকে আহ্ বলে যে তৃপ্তির আওয়াজটা বেরিয়ে এসেছিল, তার মধ্যে চায়ের স্বাদের তারিফ ততটা ছিল না, যতটা ছিল ওই মুক্তির আনন্দ।
দু-মাস বাদেই অবশ্য পুজোর ছুটি পড়ে গেল। এক সকালে জগৎপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামল রুমি। নেমেই বুঝতে পারল, এই শহরটায় ও আর থাকতে পারবে না। ওর শেকড় উপড়ে গেছে।
সেদিন ছিল পঞ্চমী। প্লাটফর্ম ধরে হাঁটতে-হাঁটতে ও দেখল, সোজাসাপ্টা দুই রেললাইন যেখানে নীল আকাশের গায়ে গিয়ে মিশেছে, ঠিক সেখানেই মায়া-পিরামিডের মতন থাকে-থাকে সাজানো রয়েছে মেঘের একটা স্তূপ। যেন লাইন ধরে হেঁটে গেলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই মেঘের পিরামিডের ভেতরে ঢুকে পড়া যাবে। বাঁদিকে, অনেকদূরে, ইটভাটার চিমনির ডগায় একটা চিল বসে আছে। ডানদিকে মাঠের মধ্যে সেজে উঠছে ওদের পাড়ার বারোয়ারি পুজোর মণ্ডপ।
নীল জলের অ্যাকোয়ারিয়ামের মতন সুন্দর আর শান্ত এই শহর। অ্যাকোয়ারিয়ামের মতনই যে-কোনও দিকে সাঁতার কেটে ছ-ইঞ্চি এগোলে অদৃশ্য কাচের দেয়ালে ধাক্কা লেগে ঠোঁট থেঁতলে যাবে। তখন আবার উল্টোদিকে ঘুরে সাঁতরাও, যতক্ষণ না অন্য-একটা দেয়ালে তোমার কানকো ঘষে যায়।
পারবে না রুমি এখানে থাকতে। পারবে না, কল্যাণদার ভাষায়, কোনও পাটের দালালের ঘরণী হয়ে দু-বেলা কয়লার উনুন ধরাতে।
ইউনিভার্সিটি-ক্যাম্পাসের কথা মনে পড়ল রুমির। অধ্যাপকদের মনে পড়ল। মৃত্তিকা, শর্মিষ্ঠা, অনুরাধা, আনোয়ার, দেবব্রত, কৌশিক, সুদেষ্ণাদের উজ্জ্বল মুখগুলো মনে পড়ল।
এই জগৎপুরে বসে হায়ার-সেকেন্ডারির রেজাল্টটা হাতে পেয়ে তার একটু অহঙ্কার হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিন বি-টেকের ক্লাস করার পরেই রুমি বুঝতে পেরেছিল, তার চারপাশে যারা বসে আছে তারা সবাই তার মতন কিম্বা তার চেয়েও ভালো স্টুডেন্ট। দুঃখ নয়, স্বস্তি পেয়েছিল রুমি। সে বুঝতে পেরেছিল, এখন থেকে পড়াশোনাটা অনেক সহজ হয়ে গেল।
তাছাড়া কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে অমন বিশাল একটা লাইব্রেরি থাকতে পারে, রুমি তাও কখনো ভাবেনি। হস্টেলের সিনিয়র দিদিরা যে এত হেল্পফুল হতে পারে তাও ভাবেনি। আর একদমই যেটা ভাবেনি, সেটা হল, পড়াশোনার বাইরে এত বড় একটা জগৎ থাকতে পারে। গত তিনমাসেই রুমি তার একটু আঁচ নিয়ে ফিরেছে। সাহিত্য, সিনেমা, থিয়েটার, রাজনীতি সবকিছু নিয়েই যেন ইউনিভার্সিটি-ক্যাম্পাসটা সারাক্ষণ টগবগ করে ফুটছে।
তবে এটাও ঠিক, একটা আঠারো বছরের মেয়ের শেকড় থাকে না, স্নায়ু থাকে। শেকড় ওপড়ালে যন্ত্রণা হয় না, স্নায়ু ওপড়ালে যন্ত্রণা হয়।
জগৎপুর স্টেশন রোডের রাস্তাটা ধরে যতই শীতলাপাড়ার দিকে এগোচ্ছিল রুমি, ততই সে বুঝতে পারছিল এই শহরের আনাচে-কানাচে তার স্নায়ু জড়িয়ে রয়েছে। ওই কাবেরী-স্টোর্স থেকে সে মায়ের হাত ধরে প্রথম স্কুল-ইউনিফর্ম কিনে নিয়ে গিয়েছিল। বীণাপাণি বুক স্টোর থেকে এই সেদিনও কিনে নিয়ে গেছে খাতা-পেন আর একটা ভালো ক্লাচ।
শুধু কি তাই? বেচা-কেনার বাইরেও কত দামি জিনিস দিয়েছে তাকে এই শহর। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ দিয়েছে, গাছের নীচ দিয়ে হাঁটবার সময় মাথায় কদমফুলের গুঁড়ি-গুঁড়ি পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছে।
আর সেই যে একটা পাখি ছিল, ক্লাস সিক্সে মা মারা যাওয়ার পর, যখন তার কিছুতেই সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করত না, পড়তে বসা তো দূরের কথা, দাঁত মাজতেও আলস্য লাগত, তখন যে-পাখিটা ওদের জানলার বাইরে রঙ্গন-গাছের পাতার আড়ালে বসে রোজ সকালে ডাকত—রুমি রুমি রুমি! ওঠো ওঠো ওঠো।
একবার ডাকত...দুবার ডাকত—ডেকেই যেত, যতক্ষণ না রুমি বিছানা ছেড়ে উঠছে। এইভাবে যতদিন না রুমির চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, মুঠি পাকিয়ে গেছে তার হাত, যতদিন না রুমি ঠিক করে নিয়েছে সে এই বিষাদ কাটিয়ে উঠবে, ততদিন রোজ সকালে পাখিটা আসত। তারপর গত ছ-সাতবছরে আর একবারও সেই পাখিটার ডাক শোনেনি ও। তাহলে কি সেদিন জগৎপুরই তার এগারো-বছরের মেয়েকে পাখির গলায় ডেকে তুলত?
বাড়ির গলিটায় ঢুকতেই রুমি দেখতে পেল, যেন মায়ার টান বাড়ানোর জন্যেই শীতলাবাড়ি নতুন-সাজে সেজে উঠেছে। দেয়ালে নতুন প্লাস্টার করা হয়েছে। গোলাপি দোপাটির মতন একটা রঙও লাগানো হয়েছে বাড়িটার গায়ে। গ্রিলে আর লোহার গেটে কচি-কলাপাতার সবুজ। মনে হল পেছনের বাগানটাও যেন পরিষ্কার করা হয়েছে।
ওখানেই কাকুমণিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীষণ অবাক হল রুমি। বলল, একি কাকুমণি! তুমি!
রমাপদ ঘোষাল তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন। বললেন, আমি তো গত এক-সপ্তাহ ধরে এখানেই রয়েছি। পুজোতেও থাকব।
রুমি একবার শুনেছিল বটে, কাকুমণি বাড়ির সংস্কার করাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যে এই-বাড়িতে এতদিন ধরে আছেন সেটা সত্যিই রুমির কাছে অভাবনীয়। এতদিন অবধি খুব প্রয়োজন পড়লে রুমিই কৃষ্ণনগরে গেছে। তাছাড়া কাকুমণি নিজেও মাসে একবার করে জগৎপুরে এসেছেন, কিন্তু তা সকালে এসে বিকেলে চলে যাওয়ার বেশি কিছু নয়। মা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম কাকুমণি একটানা এতদিন ধরে এখানে এসে রয়েছেন।
রমাপদ ঘোষাল নামে ওই মানুষটার কাছে রুমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। চিরকাল উনি যে শুধু তাদের পরিবারটাকে আর্থিক-সাহায্য জুগিয়ে গেছেন তাই-ই নয়, রুমির মনোবল জোগানোর কাজটাও উনি দূর থেকে যতটা সম্ভব করে গেছেন। এই যে ওর কলকাতায় পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, কল্যাণদার পাশাপাশি এই কাকুমণিই সে-ব্যাপারে ওকে শুরু থেকেই সাপোর্ট দিয়ে গেছে; কাকুমণি না থাকলে অন্তত ঠাম্মাকে রাজি করানো খুবই কঠিন হত। কাকুমণিই ঠাম্মাকে বলেছিল, কে বলেছে তোমরা একা হয়ে পড়বে? আমি এখন থেকে রেগুলার যাতায়াত করব। রুমিকে আটকিও না।
বাবার সঙ্গে চেহারায়, হাবেভাবে খুব মিল কাকুমণির। ওইরকমই ছোটখাটো সুন্দর চেহারা। দৃষ্টিতেও রয়েছে একইরকমের উদাসীন অন্যমনস্কতা। বৈষয়িক মানুষের দৃষ্টি নয় ওটা। বৈষয়িক দিক থেকে তো খুব একটা সফল বলাও যায় না রমাপদকে। নেহাৎ ব্যাচেলর তাই চলে যাচ্ছে।
এসব নিয়ে তাঁর কোনও আক্ষেপও নেই। শুধু দাদার উন্মাদ-রোগের সেরকম কোনও চিকিৎসা করাতে পারলেন না বলে মাঝেমধ্যে রুমির কাছে হা-হুতাশ করেন। রুমি কলকাতায় যাওয়ার আগে আশীর্বাদ করে সেই একই কথা বলেছিলেন—শিগগির বাবার উপযুক্ত-মেয়ে হয়ে ওঠ, মা। অনেক টাকা রোজগার কর। তারপর দরকার হলে বাইরের কোনও স্টেটে নিয়ে গিয়ে বাবার চিকিৎসা করা।
ব্যাগটা ওর হাত থেকে নিয়ে বললেন, ট্রেনটা লেট করল, তাই না? ইস, মুখটা একেবারে শুকিয়ে গিয়েছে। আহা, প্রণাম পরে করবি মা। আগে ঘরে ঢোক।
তারপর নিজের মনেই বললেন, আমি কি আর প্রণাম নেওয়ার মতন একটা মানুষ?
রুমি বলল, এরকম বোলো না কাকুমণি। আমি জানি তুমি কী।
গলি পেরিয়ে উঠোনে পা দিতেই পাখির মতন উড়ে এলেন ঠাম্মা। হাত দিয়ে নয়, যেন তুলসী-চন্দন আর জিরে-ধনের গন্ধমাখা দুটো পাখির ডানা দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন।
রুমি কথা বলতে গিয়ে দেখল, ঠাম্মা কথা বলতে পারছে না। শুধু চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। রুমির চোয়ালের জোড়দুটো টনটন করে উঠল, গলার কাছে পাকিয়ে উঠল কীসের যেন দলা। মনে-মনে বলল, তুমি এত কষ্ট পেয়েছ ঠাম্মা? আমার জন্যে যে এত কষ্ট পেতে পারো, সেটাই তো আমাকে বুঝতে দাওনি কখনো। আজ কেন বোঝালে? যখন অন্য একটা ছাঁচের মধ্যে আমি নিজেকে অন্যরকমভাবে ঢালাই করে ফেলেছি। আর তো আমি সেই ছাঁচ ভাঙতে পারব না ঠাম্মা।
রুমির সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল বাবাকে দেখে। প্রথম-দেখায় চিনতেই পারেনি। ঠাকুর ঘরের সামনে একটা চেয়ারে বসে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি-মুচকি হাসছিল বাবা। পরনে ফেরতা দিয়ে পরা ধবধবে পরিষ্কার ধুতি আর চাঁপাফুল-রঙের ফতুয়া। কতদিন বাদে যে আবার চুলে নাপিতের কাঁচি পড়েছে, খৌরি হয়েছে, তা রুমি মনেই করতে পারছিল না। অসম্ভব সুন্দর আর স্বাভাবিক দেখতে লাগছিল বাবাকে।
কাকুমণি পাশে দাঁড়িয়ে রুমির অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি-মুচকি হাসছিলেন। রুমি বাবার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই কাকুমণির হাতের মুঠিটা চেপে ধরে বলল, ইউ আর ওয়ান্ডারফুল কাকুমণি। শুধু বাড়িটাকেই নয়, মানুষগুলোকেও বদলে দিয়েছ।
তারপর এগিয়ে গিয়ে বাবাকে প্রণাম করল। দু-হাতের পাতা মেয়ের মাথায় চেপে ধরে বাবা বলল, তুই নেই। বাড়িটা যেন খাঁ খাঁ করে।
রুমি মাথা নীচু করেই সামনে থেকে সরে গেল। চোখের জল যেন কেউ দেখতে না পায়। মনে-মনে বলল, তুমি কি সেরে উঠলে, বাবা? কেন? কেন সেরে উঠলে? কেন আমার যাওয়ার পথে সবাই মিলে এভাবে কাঁটা বেছাচ্ছ?
ঠাম্মা একবার পেছন থেকে ডেকে বলল, ঠাকুরঘরে মাথাটা ছুঁইয়ে যা। এতদিন পরে বাড়ি ফিরলি...।
রুমি ব্যাগটা হাতে নিয়ে ঘাড় গোঁজ করে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করল—যেন ঠাম্মার কথা শুনতেই পায়নি। রুমি যে ওর মায়ের মৃত্যুর দিন থেকেই ঠাকুরঘরে পা রাখে না, সেখানকার একশো দেবদেবীর মধ্যে কাউকেই প্রণাম করতে পারে না, সেটা ঠাম্মা খুব ভালো করে জানে এবং জেনেশুনেও ওকে বারবার প্রণাম করতে বলাটা আসলে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং ছাড়া কিছুই নয়।
রুমি মনে-মনে বলল, ভালো হল। ভালোই হল। ও বুঝতে পারল, ঠাম্মার ওই একটা ডাক, ওর কিছুক্ষণ আগের উথলে-ওঠা আবেগকে ঠিক বলক-তোলা দুধের মতোই ফুঁ দিয়ে ফাটিয়ে দিল। অভিজ্ঞতা ওকে যে-শিক্ষা দিয়েছে, ওই প্রণামের ডাক সেই শিক্ষার কথা মনে পড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণের জন্যে ও ভুলে গিয়েছিল যে, এই সংসারে লাবণ্যের আয়ু দু-দিনের বেশি নয়। দু-দিন পরেই আয়নার ওপর থেকে জলের বাষ্পের মতন দ্রুত মিলিয়ে যাবে সব আদর।
রুমি নিশ্চিত হল, এখানে থাকলে আবার সে ঠাম্মা এবং অন্যান্য আত্মীয়-প্রতিবেশীদের কাছে তার মর্দানি চালের জন্যে সমালোচিত হবে। মেয়েমানুষের এত বেশি পড়াশোনা করার জন্যেও গালাগাল খাবে। আবার কেউ ইচ্ছে করে তার কানে পৌঁছে দেবে তার মায়ের আত্মহত্যা নিয়ে গসিপ। চুল-দাড়ি বেড়ে উঠবে তারাপদ ঘোষালের।
হয়তো সেই-মুহূর্তেই শান্ত এবং বিশাল এক ক্লাসরুমের মধ্যে এ.কে.বি. পরম ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে দেবেন কাকে বলে হারমোনিক ফাংশন। স্নিগ্ধাদি ব্ল্যাকবোর্ডের ওপরে চকের টানে ফুটিয়ে তুলবেন জিম্যান এফেক্ট। পি. বি.-র ব্যান্ড-থিয়োরির লেকচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে ছাত্র ইউনিয়নের প্রণবদা আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা; ছত্রিশগড়ের বক্সাইটের পাহাড় কীভাবে মাল্টিন্যাশনালের হাতে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে তাই নিয়ে আরো কিছু তথ্য ওরা দিয়ে যাবে।
সেদিনও হয়তো সন্ধে নামলে ঝিলের ধারে বসে ঋক নামে ইংলিশ-ডিপার্টমেন্টের ঝাকড়াচুলো দাদাটা গিটার বাজিয়ে গাইবে—
আই রিমেম্বার দা ব্যাকস্ট্রিটস অফ নেপলস—টু চিলড্রেন বেগিং ইন îûÄyˆ¤Ð
বোথ টাচড উইথ এ বার্নিং অ্যামবিশন, টু শেক অফ দেয়ার লোলি বর্ন ট্যাগস...ইয়েস, দে ট্রায়েড।
আর যেন সেই গানের অনুরণনেই গার্লস-হস্টেলের ঘরে জয়শ্রীদি ভীষণ নিচু স্কেলে গেয়ে উঠবে, উদাসীন থেকো না, সাড়া দাও।
ব্যাগটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে রুমি দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে চারিদিকটা দেখল। একটা সস্তার কাঠের শেলফ ঢুকেছে ঘরে। তার ওপরে পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা আছে তার সমস্ত বই-খাতা। কাকুমণিরই কাজ নিশ্চয়ই। তাছাড়া দেয়ালে চুনকাম হয়েছে আর জানলায় বসেছে নতুন গরাদ।
রুমি খুব সাবধানে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল।
জানলার ধারে দাঁড়িয়ে সে পালবাড়ির উঠোনের দিকে তাকাল। ছোটবেলা থেকে এমন কত পঞ্চমীর দুপুরে ওই উঠোনটাকে সে দেখেছে। জানে, এই দিনগুলোয় ওখানে কেমন হুলুস্থুল চলে। সেদিনও ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। রুমি দেখল, অন্তত সাতজন কারিগর প্রতিমাগুলিকে সাজানোর কাজ নিয়ে পড়ে আছে। তাদের মধ্যে রাতুলও রয়েছে।
রাজেন-জ্যাঠামশাই উঠোন থেকে রাস্তায় যাওয়ার যে বড় লোহার গেট, সেই গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা প্রতিমার কাজ কমপ্লিট হয়ে গেছে। ওই প্রতিমা দূরের কোনও শহরে যাবে; বড় রাস্তায় লরি দাঁড় করিয়ে, কুলিরা উঠোনে ঢুকেছে। জ্যাঠামশাই দেখছেন, তোলাতুলির সময় প্রতিমা যেন চোট না খায়।
যূথী-জ্যাঠাইমা একটা বড় চায়ের কেটলি আর অনেকগুলো কাগজের কাপ নিয়ে উঠোনে নামলেন। পেছনে আরেকটা বাচ্চা মেয়ের হাতে বিস্কুটের কৌটো। রুমি একবার চট করে ঘড়ি দেখল। আড়াইটে বাজে।
আড়াইটের সময় চা-বিস্কুট! ভাত খাবে কখন বেচারারা?
রাতুল উঁচু একটা কাঠের টুলের ওপরে দাঁড়িয়ে একটা প্রতিমার মাথায় তুঁতের আঠা দিয়ে নকল চুল সাজাচ্ছিল। ওকে পেছন-দিক থেকে দেখতে পাচ্ছিল রুমি। ওর ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল একবার রাতুল এদিকে মুখ ফেরাক। কতদিন দ্যাখেনি ওই মুখটা। খুব ইচ্ছে করছিল একবার দেখতে। ও মনে-মনে ডাকল—এই রাতুল, এদিকে তাকাও।
ঠিক তখনই রাতুল ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল। পূর্ণ-দৃষ্টিতে চোখ রাখল রুমির চোখে। সেই চোখে কোনও বিস্ময় নেই, আনন্দ আছে। যেন ও জানত, রুমিকে ওখানেই দেখতে পাবে।
রুমি এতটাই অবাক হল যে, রাতুলের মুখটাও ভালো করে দেখতে পেল না। মনের ডাকও এইভাবে শোনা যায় নাকি? ওদের কর্মচারীদের মধ্যে দু-একজন রাতুলের দৃষ্টি অনুসরণ করে জানলার দিকে তাকাচ্ছিল তাই রুমিকে সরে যেতে হল।
বাথরুমে বালতিভরা জলের মধ্যে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে-কাটতে রুমি বলল, তোমাকে নিয়ে আমি কী করব রাতুল? এইভাবে যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে তোমাকে আমি কেমন করে ছেড়ে যাব? ঘেন্না করতে পারো না আমাকে?
হঠাৎ বালতির জলের মধ্যে রুমির হাতটা স্থির হয়ে গেল। সে আবার মনে-মনে বলল, তাই তো! আমি যদি রাতুলকে সেই কথাটা বলি তাহলে তো খুব সহজেই বাঁধন আলগা হয়ে যায়। কেন যে এতদিন এটা মাথায় আসেনি।
সে তাড়াহুড়ো করে মাথায় দু-মগ জল ঢেলে বাথরুম থেকে বেরিয়েই রাতুলকে একটা মেসেজ পাঠাল, ‘দেখা করব।’
‘নিশ্চয়ই। আমি তো বসে আছি। আজকেই তো?’ রাতুল তার জবাবি মেসেজে বলল।
‘না। নবমীর রাতে।’
রুমি দশমীর ভোরে কলকাতায় ফিরবে। সেইজন্যেই রাতুলের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারটাকে ও একেবারে শেষ সীমায় ঠেলে দিল। যথাসম্ভব কমিয়ে দিল রাতুলের প্রতিক্রিয়ার সময়।
রাতুল তো অত কিছু বোঝে না। ও জানতে চেয়েছিল, ‘কেন রুমি? ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, এই তিনদিন তুমি কী করবে? আমি কবে থেকে আশা করে বসে আছি, পুজোর চারদিনই আমরা দেখা করব।’
রুমি বলেছিল, ‘এরকম অবুঝপনা কোরো না, রাতুল। কল্যাণদার সঙ্গে আমার কথা হয়ে আছে, এই তিনদিনে ওর কাছে আমাকে অনেকগুলো পড়া বুঝে নিতে হবে।’
রুমি পড়াশোনার কথা তুললেই রাতুল চুপ করে যায়। এবারও আর কিছু বলল না। শুধু বলল, ‘ঠিক আছে। তোমার যেরকম সুবিধে, তাই কোরো।’
এবং নবমীর বিকেলে ওরা একসঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে চলে গেল নীলকুঠির মাঠে। রুমিই বলেছিল, একটু নির্জন কোনও জায়গায় যাওয়ার কথা। নীলকুঠির মাঠের চেয়ে নির্জন কোনও জায়গার কথা রাতুলের মাথায় আসেনি।
তারপর ঘটনাগুলো এইভাবে ঘটল—
রাতুল বলল, আমি অনেকবার কল্পনার মধ্যে দেখেছি, এইখানে তুমি আর আমি পাশাপাশি বসে আছি। ঠিক এইভাবে।
রুমি অন্যমনস্কভাবে বলল, তাই?
হ্যাঁ। তারাপদকাকাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসে কতবার মনে হয়েছে, কী ক্ষতি ছিল, যদি আমিও এখানেই ওঁর পাশে বসে থাকতাম। কাজের চাপ না থাকলে থাকতামও কিছুক্ষণ, আর বসে-বসে তোমার কথাই ভাবতাম।
অনেকক্ষণ ধরে মাঠ ঘাট আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে রুমির কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল। এই নীলকুঠির কুয়োকে কেন্দ্র করে যতদূর চোখ যায়, বৃত্ত এঁকে ছড়িয়ে রয়েছে চাষের খেত। বৃত্তের পরিধি জুড়ে জগৎপুরের মতন আরো অনেক গ্রামগঞ্জ। সুপুরি-বাগানের আড়ালে তাদের দেখা না গেলেও নবমী-সন্ধ্যার এলোমেলো হাওয়ায় সেইসব জনবসতি থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে।
মাথার ওপর দিয়ে ঝুমঝুমির মতন শব্দ করে উড়ে যাচ্ছে গাঙশালিখের ঝাঁক। সাদা মেঘগুলোর গায়ে অতসীফুলের রঙ লেগেছে। ওইসব ধানখেত, পাখি, মেঘ এবং ঢাকের বোল—সবই যেন নীলকুঠির কুয়োকে ঘিরেই ধীরে...খুব ধীরে আবর্তিত হচ্ছে—এমনই মনে হচ্ছিল রুমির। রাতুলের কথায় তার সম্বিত ফিরল। পাশ ফিরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে প্রশ্ন করল, কী ভাবতে শুনি একটু।
রাতুল বলল, ভাবতাম...বলা ভালো স্বপ্ন দেখতাম...তুমি আমার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছ।
কথাটা শুনেই রুমি ওদের দুজনের মধ্যে যে ব্যবধানটুকু ছিল সেটুকু মুছে দিয়ে, রাতুলের গায়ে গা ঠেকিয়ে বসল। মাথাটাও হেলিয়ে দিল ওর কাঁধে। মনে মনে বলল, এত সামান্য তোমার চাহিদা, তাও সরাসরি চাইতে পারছ না? এত ভালো কেন হলে তুমি? আমাকে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্যে? তারপর রাতুলের একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের পিঠের ওপরে রাখল। ডাকল, রাতুল—
বলো।
আমার জন্যে মনকেমন করছিল?
খুব। মনকেমনের চোটে কি পাগলামি করেছি, জানো? শুনলে তুমি হাসবে।
রুমি চট করে মাথাটা রাতুলের কাঁধ থেকে তুলে সোজা হয়ে বসল। গল্প-কাঙাল খুকির মতন চোখ বড়-বড় করে বলল, না, হাসব না। বলো কীরকম পাগলামো!
ব্যানার্জীপাড়ার একটা ক্লাবের ছেলেরা এসে বাবাকে ধরেছিল, খুব কম বাজেটে ছোট একটা ঠাকুর বানিয়ে দেওয়ার জন্যে। নতুন ক্লাব, এই প্রথমবছরের পুজো। বলছিল, বড় ঠাকুরের অর্ডার দেওয়ার মতন পয়সা নেই। বাবা তো শুনে এককথায় না করে দিচ্ছিল। আমি বললাম, করে দেবো।
তারপর।
ওই ঠাকুরটার মধ্যে দিয়ে আমি গত তিনমাস ধরে তোমাকে গড়েছি। গড়তে-গড়তে তোমার সঙ্গে কথা বলেছি।
মানে! খুব অবাক গলায় বলল রুমি।
মানে, এখন মণ্ডপে গিয়ে শাড়ি-গয়না পরা অবস্থায় দেখলে তুমি বুঝতে পারবে না, কেউই বুঝতে পারবে না। কিন্তু ওই প্রতিমার শরীর আসলে তোমার শরীর। ওই প্রতিমার চোখ-মুখ তোমারই চোখ-মুখ।
সেকি! তোমার পাপের ভয় নেই?
রাতুল বলল, একদম নেই। সত্যিকথা বলতে কী, ঠাকুর-দেবতাতেই খুব একটা বিশ্বাস নেই। আমি শুধু সৌন্দর্য বুঝি, সৌন্দর্য। যা সুন্দর, তাই আমার কাছে ঈশ্বর।
রুমি একটু ইতস্তত করে বলল, আর আমার শরীরের আদল? সেটা কোথা থেকে পেলে? আমাকে কি তুমি দেখেছ?
রাতুল এবার নিজেই আলতো-হাতে রুমির মাথাটাকে নিজের কাঁধের ওপরে টেনে নিল। তারপর ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, কল্পনায় দেখেছি।
রুমির খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রাতুলকে জিগ্যেস করে, কী দেখেছ? কিন্তু করল না। যে-গ্রন্থি একটু বাদে মোচন করতে হবে, তাতে আর নতুন করে পাক দিয়ে লাভ নেই।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে, রাতুল বলল, অন্ধকার হয়ে আসছে। এবার উঠবে? চলো বরং ফেরার পথে কয়েকটা মণ্ডপ ঘুরে যাই। এদিকের পুজোগুলোয় আমাদের পাড়ার লোকজন বেশি আসে না। নিশ্চিন্তে ঘোরা যাবে।
রুমি গত কয়েকদিন ধরে রাতুলকে একটা কথা বলার জন্যে নিজের মনকে শক্ত করছিল। কিন্তু সেই-মুহূর্তে, রাতুলের খুশিতে জ্বলজ্বলে মুখটার দিকে তাকিয়ে, সেই কাঠিন্য ও হারিয়ে ফেলল। রাতুল আজ সেজেছে। আগে কখনো ওকে নিজের প্রতি এতটা কেয়ার নিতে দ্যাখেনি রুমি। চিরকালই কাজের পোশাকে, কেজো লোকের মতন ঘোরে। অনেকসময়েই জামা-কাপড়ে মাটি অথবা প্লাস্টারের দাগ লেগে থাকে। চুলে কদাচিৎ চিরুনি ঠেকায়।
সেই-ছেলেই আজ পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে বেরিয়েছে। দাড়িটাও ট্রিম করিয়ে এসেছে যেন কোথা থেকে। এই প্রথম ওকে জিনসের সঙ্গে কুর্তা পরতে দেখছে রুমি। গা থেকে হালকা ডিওর গন্ধ ভেসে আসছে। আর এই সবকিছুই ও করেছে তার জন্যে। তাকে ভালোবেসে।
রুমি আর পারল না। বুকের ভেতর থেকে উথলে-ওঠা কান্নার ঢেউটাকে চাপা দেওয়ার জন্যে রাতুলের মুখটা দু-হাতে নিজের দিকে টেনে নিয়ে প্রাণপণে ওর ঠোঁটের মধ্যে নিজের ঠোঁটদুটো গুঁজে দিল। রাতুল প্রথমটায় এই হঠাৎ আদরে হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর শরীরের নিয়মেই ওর শরীরও সাড়া দিল। বুকের মধ্যে রুমির শরীরটাকে সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর দুটো ঠোঁট থেকে যেন রুমির নারীত্বকেই পান করতে শুরু করল রাতুল।
অনেকক্ষণ বাদে রুমি আলতো ঠেলা দিয়ে রাতুলকে সরিয়ে দিল। রাতুল অনেকটা তৃপ্তি আর অল্প অপরাধবোধ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। রুমি ওড়নাটা বুকের ওপর গুছিয়ে নিয়ে বলল, তোমাকে একটা কথা বলব রাতুল। বলতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। জানি, শুনতে তোমার কষ্ট হবে আরো বেশি। তবু কথাটা বলা খুব প্রয়োজন। তুমি আর আমার সঙ্গে সম্পর্ক রেখো না।
মানে! এটা কী ধরনের ইয়ার্কি? রাতুল মনে হল বেশ রেগেই গেল।
রুমি বলল, না। ইয়ার্কি নয়। তুমি একটু আমার কথাটা বুঝবার চেষ্টা করো। আমাদের এই রিলেসনশিপের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আর সারাজীবনের জন্যে যখন আমরা একে-অন্যের হতে পারব না, তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পর্কটাকে শেষ করে দেওয়া যায় ততই ভালো। আমাদের দু-জনের জন্যেই ভালো।
ইউ মাস্ট বি জোকিং। কেন আমার সঙ্গে সারা-জীবন থাকতে পারবে না, রুমি? আমি অব্রাহ্মণ বলে? কুমোর বলে?
রুমি খুব কষ্ট করে হাসল। বলল, ওসব কথা মাথায় থাকলে কি তোমাকে ভালোবাসতে পারতাম? তা নয় রাতুল। অন্য কারণ আছে।
কী কারণ, বলো।
প্রথম কারণ, শরীর ছাড়া আমাদের মিলবার আর কোনও জায়গা নেই। ওই টানটা দু-দিন বাদে আর থাকবে না। তোমার প্রতিমা গড়ার হাত; আমার পুতুলের মতন শরীর দেখে তুমি হতাশ হবে।
কী যা তা বলছ! আমি কি পাগল?
উত্তেজিত রাতুলকে তার কথার মধ্যেই থামিয়ে দিয়ে রুমি বলল, শোনো। আমাদের দুজনের ফিল্ড অফ ইন্টারেস্ট আলাদা। আমরা দুজনেই নিজের-নিজের কাজের প্রতি ভীষণ ডিভোটেড। আমরা কী নিয়ে কথা বলব আর কীভাবেই বা একে-অন্যকে সময় দেব?
রাতুল মরিয়ার মতন বলল, আমি সব ছেড়ে দেব। শুধু তুমি আমার সঙ্গে থেকো। আমি তোমার সামনে লুমিসের বই পুড়িয়ে ফেলছি। ফিগারিনগুলো ভেঙে ফেলছি। চলো...। রুমির হাত ধরে টান দেয় রাতুল।
রুমি হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, আমিও একটা সময় ঠিক এইরকমই ভেবেছিলাম, জানো। ভেবেছিলাম, টি.সি. নিয়ে এখানে চলে আসি। এখানকার কলেজ থেকে বি.এস.সি পাশ করে এখানকার স্কুলেই টিচারের চাকরি নিই। তাতে আর কিছু না হোক, তোমার কাছে তো থাকতে পারব। বিশ্বাস করো, ভেবেছিলাম। কিন্তু এটাও তো জানি, তারপর সারাজীবন তোমাকে দোষারোপ করব। বলব, তোমার জন্যেই আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল।
রাতুল দু-হাতের মধ্যে দুটো রগ টিপে ধরে মাথাটা ঝাঁকাতে-ঝাঁকাতে বলল, আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছি না, কিচ্ছু না। তোমার এত শান্তগলায় যুক্তিজাল আমি সহ্য করতে পারছি না। আমি শুধু তোমাকে হাতজোড় করে রিকোয়েস্ট করছি, আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি পাগল হয়ে যাব।
রুমি বুঝতে পারছিল এই ঠান্ডা-নিষ্ঠুরতা ও আর খুব বেশিক্ষণ চালিয়ে যেতে পারবে না। মনোবলের শেষ যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটুকু কুড়িয়ে-বাড়িয়ে এনে ও বলল, যুক্তি থাক তাহলে। যেগুলো ফ্যাক্ট, সেগুলোর দিকে তাকাও। আমার বাবা পাগল। এটা বংশগত হতেই পারে।
রাতুল চোখ বড়-বড় করে বলল, কাকে এসব বোঝাচ্ছ? আমি তোমার পাড়াতেই থাকি। তোমাদের চোদ্দপুরুষে কোনওদিন আর কেউ অস্বাভাবিক ছিলেন না আর ভবিষ্যতেও হবেন না।
আমার মা সুইসাইড করেছিল।
রাতুল অবাক হয়ে বলল, সেকি! পাড়াসুদ্ধ লোক তো জানে ওটা অ্যাকসিডেন্ট। পুজোর প্রদীপ থেকে শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে...।
না। আমি বলছি শোনো, সুইসাইড। একটা জটিলতা ছিল আমার মায়ের জীবনে।
জটিলতা! কাকিমার মতো একজন হাউসওয়াইফের জীবনে...তুমি কি তারাপদকাকার অসুখটার কথা বলছ? কিন্তু তখনো তো তারাপদকাকা আজকের মতন অতটা...। রাতুল আর কথা না খুঁজে পেয়ে থেমে গেল। কিন্তু একটু পরেই আবার ঝাঁঝিয়ে উঠল। যদি সুইসাইডই করে থাকেন, তাতেই বা কী? তার জন্যে আমরা কেন একে অন্যকে ভালোবাসব না?
অন্ধকার নেমে এসেছিল। তাও রাতুলের হাতটা খুঁজে পেতে রুমির কোনও অসুবিধে হল না। রাতুলের বাঁ-হাতের খসখসে পাতাটা নিজের ডানহাতের মুঠির মধ্যে ধরে রুমি খুব স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, সুইসাইডের কারণটা শুনবে না? কাকুমণির সঙ্গে আমার মায়ের শারীরিক সম্পর্ক ছিল। আমি নিজের চোখে ওদের কপ্যুলেট করতে দেখে ফেলেছিলাম। বাবাও দেখেছিল।
রুমির পক্ষে এর চেয়ে ব্লান্টলি কথাগুলো বলা সম্ভব ছিল না। তবে তার আর দরকারও ছিল না। রাতুল বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, একঝটকায় হাতটা ওর মুঠি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে চলে গেল। সেই পাথরের ইঁদারাটার পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। বুকের ওপরে দুটো হাত আড়াআড়ি করে রেখে, স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইল জলের দিকে।
রুমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফেরার পথ ধরল...একাই।
শরৎকালের আকাশে রাত হলেও একটা গাঢ় নীল আলো থেকে যায়। যেতে-যেতে যতবারই মুখ ফিরিয়ে তাকাচ্ছিল রুমি, সেই নীল-আলোতে দেখতে পাচ্ছিল, রাতুল একইভাবে মাথা নীচু করে কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন অনেকগুলো ভাঙা পাথরের মাঝখানে আরেকটা পাথর।
নীলকুঠির মাঠ থেকে যতই জগৎপুরের দিকে এগোচ্ছিল রুমি, ততই তার চারিদিকে উৎসব ঘনিয়ে উঠছিল। প্রথমে টালির চালের কিছু বাড়ি, তার মাঝে একটা ছোট জমি, সেই জমির একপাশে কাপড়ের প্যান্ডেলের নীচে অদক্ষ শিল্পীর হাতে তৈরি ছোট প্রতিমা। আদুল গায়ের কয়েকটা ছেলেমেয়ে ক্যাপ-বন্দুক ফাটাচ্ছে। দুটি মাত্র ঢাকি ঢাকের ওপরে কনুই রেখে ঘুমে ঢুলছে। তারপর আস্তে আস্তে প্যান্ডেল আর প্রতিমার জলুস বাড়তে শুরু করল। তার সঙ্গে বাড়তে শুরু করল রাস্তার ভিড় আর কোলাহল।
এইসবের মধ্যে দিয়ে রুমি হেঁটে চলেছিল। কিছুই সে দেখতে পাচ্ছিল না, শুনতেও পাচ্ছিল না কিছু। মানুষের পেশিরও কিছু স্মৃতিশক্তি থাকে—মাসল-মেমরি; যে-স্মৃতিশক্তির কারণে সে সাইকেল কিম্বা সাঁতার ভোলে না। সেরকমই কোনও স্মৃতি হয়তো রুমিকে তার বাড়ির রাস্তায় ঠিকঠাক চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
মনে-মনে তখন সে আসলে এগারো-বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। সময় তখন মধ্যরাত পেরিয়ে আরো দু-একঘণ্টার পথ চলে গেছে। অত রাতে তার দোতলা থেকে একতলার ঠাকুরঘরে নেমে আসার কথা নয়, কিন্তু তবু সে এসেছে, কারণ তার পেটে খুব ব্যথা করছে। কিন্তু সে ঘুম ভেঙে মাকে পাশে দেখতে পাচ্ছে না। ঠাম্মার ঘরে ঠাম্মা ঘুমোচ্ছে, বিছানার অন্যপাশে বাবাও ঘুমোচ্ছে। শুধু মাঝখানে মায়ের জায়গাটাতে মা নেই।
সব আলো নেভানো থাকলেও, সিঁড়িতে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ে। তাই পা টিপে-টিপে নীচে নেমে আসতে রুমির অসুবিধে হল না। নীচে তো একটাই ঘর, ঠাকুরঘর...ঠাকুরঘর। মাকে নিশ্চয় ওই ঘরেই পেয়ে যাবে।
কিন্তু কই! নেই তো।
ঠাকুরঘরকে কখনো পুরোপুরি অন্ধকার হতে দেয় না ঠাম্মা। কেন কে জানে? ঠাকুর-দেবতাদেরও কি তার মতন ভূতের ভয় করে? একটা জিরো-ওয়াটের নাইট-ল্যাম্প প্রতিরাতে যেমন জ্বলে, জ্বলছিল। সেই আলোতে এগারো-বছরের রুমি তেল-সিঁদুরে লেপা শীতলার পাথরটা দেখতে পাচ্ছিল, দেয়ালে টাঙিয়ে-রাখা রাধাকৃষ্ণের ছবি, আরো কত ঠাকুরের ছবি দেখতে পাচ্ছিল। এমনকী শালগ্রামের ছোট্ট রুপোর সিংহাসনটাও সেই আলোয় চিকমিক করছিল; শুধু মাকেই কোথাও দেখতে পেল না সে। পেটের ব্যথা তো ছিলই, তার সঙ্গে এবার মিশল ভয়। মা কোথায় গেল? হারিয়ে গেল না তো?
আবার যখন সে দোতলায় উঠে যাবে বলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তখনই মায়ের চুড়ির শব্দ পেল। আঃ, কী শান্তি। তাহলে তো মা হারিয়ে যায়নি। রুমি চাপা-গলায় মা বলে ডেকে উঠল। কিন্তু কই, মা তো সাড়া দিল না। তাহলে কি সে ভুল শুনল? না তো। ওই তো আবার চুড়ির শব্দ হল।
শব্দটা কোনদিক থেকে আসছে, কান পেতে বুঝবার চেষ্টা করল রুমি। তারপর খুব সাবধানে ঠাকুর-টাকুর বাঁচিয়ে শীতলার আসনের পেছনের দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এদিকের খিলটা সবসময় লাগানোই থাকে, কিন্তু তখন সেটা খোলা ছিল। আবার সে চুড়ির আওয়াজ পেল। তার সঙ্গে খুব কষ্টের একটা আওয়াজ—মায়ের গলায়। রুমি দরজাটা ঠেলল। খুলল না। কাকুমণির ঘরের দিক থেকে খিল লাগানো আছে। এগারো-বছরের রুমি পুরোনো-দরজার পাল্লার আলগা কব্জার গায়ে চোখ লাগাল।
কাকুমণির ঘর অন্ধকার, কিন্তু খুব অন্ধকার নয়। ওই ঘরেও নাইট-ল্যাম্প জ্বলছে। মশারির মধ্যে মায়ের ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে কাকুমণি। মাকে দেখতে পাচ্ছে না রুমি, কিন্তু মায়ের চুড়ির আওয়াজ পাচ্ছে। মা বারবার ওরকম যন্ত্রণা পাওয়ার মতন আওয়াজ করছে কেন? কাকুমণি কি মায়ের গলা টিপে ধরে মাকে মেরে ফেলছে?
প্রচণ্ড আতঙ্কে রুমি দৌড়তে দৌড়তে ওপরে গিয়ে বাবাকে ঠেলে তুলল। বলল, বাবা! বাবা! শিগগির নীচে যাও। কাকুমণি মাকে মেরে ফেলছে। বাবা ধড়মড় করে বিছানার ওপরে উঠে বসল। তারপর দুড়দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল। রুমি বালিশে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁপতে লাগল। কী হবে এবার?
একটু বাদেই নীচের ঘরে মাঝের দরজার ওপরে দুম-দুম করে কয়েকবার আওয়াজ। ঠাম্মা কী হল রে, কী হল রে, বলে রুমিদের ঘরে ছুটে এল। তার পরেই বিশাল জোরে একটা আওয়াজ শুনে রুমি বুঝতে পারল বাবা মাঝের দরজার পাল্লাটা ভেঙে ফেলল।
পরদিন সন্ধেবেলায় ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে মায়ের গায়ে আগুন লেগে গিয়েছিল। মা ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল পেছনের বাগানে। ওখানে দৌড়োদৌড়ি করতে-করতেই একসময় শুয়ে পড়েছিল মাটিতে। পাড়ার অনেকেই জলের বালতি-টালতি নিয়ে দৌড়ে এসেছিল। কাকুমণি একটা বিছানার চাদর দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু সেই চাদরটাই দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। এখনো কাকুমণির দু-হাতের কনুইয়ের নীচে সেই পোড়া দাগ রয়েছে।
এসবের মধ্যে শুধু বাবা নির্বিকারমুখে একপাশে বসেছিল। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে পাশের বাড়ির মীরা জ্যাঠাইমা একবার বাবার কাঁধে জোরে ঠেলা দিয়ে বললেন, ঠাকুরপো, বুঝতে পারছ, কী সর্বনাশ হয়ে গেল। বাবা মীরা জ্যাঠাইমার মুখের দিকে অবোধ চোখে তাকাল। জ্যাঠাইমা চলে যাবার আগে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, নিবেদিতারও কপাল। যাক, এবার মরে বাঁচল।
সেদিনের কথা ভাবতে-ভাবতে রুমি অন্ধের মতন রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছিল। এসব কথা ভাবতে গেলে, তার মনে কোনও গ্লানি আসে না। খুব স্বাভাবিকভাবে যা-যা হবার তাই-তাই হয়েছিল। একটা মেয়ে, সেদিন যার বয়স ছিল ত্রিশ-বছরের আশেপাশে, যার বর পাগল এবং যে নিজে বর এবং মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকে দেওরের অনুগ্রহে, সে খুব স্বাভাবিকভাবেই সমবয়সি সেই দেওরকে ভালোবেসেছিল। বিশেষ করে ভালোবাসাটা যে একতরফা ছিল না, তা তো কাকুমণি আজও নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে চলেছেন।
রুমি শুধু তার মায়ের মনটা বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। ভাবে, সেদিন দরজা ভেঙে ফেলার পরে বাবা ঠিক কোন দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়েছিল? নিশ্চয়ই পাগলের আত্মভোলা উদাসীন দৃষ্টিতে নয়। নিজের স্ত্রীকে অন্যের বিছানায় নগ্ন দেখে নিশ্চয় কয়েক-মুহূর্তের জন্যে বাবার চোখে একজন স্বাভাবিক-পুরুষের মতোই অবিশ্বাস, যন্ত্রণা, ক্রোধ, সব পরপর ফুটে উঠেছিল। সে দৃষ্টি ভুলতে পারেনি বলেই মা নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
হ্যাঁ, আর সকলে ব্যাপারটাকে দুর্ঘটনা বলে ধরলেও, রুমি জানে, মা গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যাই করেছিল। কারণ সেদিন স্নান সেরে ঠাকুরঘরে যাওয়ার আগে মা তাকে অনেকক্ষণ ধরে বুকে জড়িয়ে আদর করে গিয়েছিল, যেটা এমনিতে কখনোই করত না।
না, রুমির মনে কোনও গ্লানি নেই, কোনও ঘৃণা নেই। বরং মা আর কাকুমণির জন্যে গভীর এক মায়া রয়ে গেছে। কিন্তু ও এটাও জানে যে, আর কেউ এভাবে ভাবতে পারবে না। সেইজন্যেই আর কাউকে বলেনি। আজই প্রথম রাতুলকে বলল, এবং রাতুল সহ্য করতে পারল না।
হাজার যুক্তিতে রাতুল যা মানত না, একটা সংস্কারের ধাক্কায় সেটা মেনে নিল।
রুমি জানে, মা তাকে একটা দামি জিনিস দিয়ে গেছে। স্বনির্ভর হয়ে বাঁচার ইচ্ছা। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই রুমি এমন একটা জীবন চেয়ে এসেছে, যে-জীবনে শুধু অর্থনৈতিক কারণে অত্যাচার সহ্য করতে হয় না। নিজের রোজগারে নিজেকে সাপোর্ট করা যায়। যাই হোক বা না হোক, অন্তত আত্মহত্যা করতে হয় না।
রুমি বুঝতে পারছিল, সেই ইচ্ছেটা ভালোবাসার চেয়েও অনেক বড়। আস্তে-আস্তে তার চোখে আলো ফিরে আসছিল, কানে মাইকের আওয়াজ। রুমি মনে-মনে বলল, তোমার জন্যে সারাজীবন কষ্ট পাব রাতুল, কিন্তু আগুনে পুড়ে মরার থেকে সেই কষ্টটা বেশি নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন