নয়

সৈকত মুখোপাধ্যায়

ভালো লাগছে না রাতুলের। কিছুই ভালো লাগছে না।

ছাদের আলসে ধরে দাঁড়িয়ে রাতুল ভাবছিল, প্রকৃতির বুকে মানুষের মনখারাপের ছাপ পড়ে না। আকাশ আকাশের মতন থাকে, বাতাস বাতাসের মতন বয়ে যায়। বাইরে এখন বসন্তকাল। ফাল্গুনের আজ বোধহয় পাঁচ কি ছয় তারিখ। শীতলাপাড়ার এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে-থাকা নিম, বেল, দেবদারু আর অশ্বত্থের গাছগুলো যেন কচিপাতায় রঙমশালের মতন সবুজ আলো ছড়িয়ে জ্বলছে। একটা কোকিল সেই ভোর থেকে ডেকে-ডেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রোদের তাপ এখনও তেমন বাড়েনি।

প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখবার জন্যে অবশ্য ছাদে ওঠেনি রাতুল; উঠেছিল নিতান্তই গদ্যময় একটা কারণে। ওদের ঠিকে-কাজের লোক জয়দেব আগের দিন দু-কাহন খড় শুকোতে দিয়ে গেছিল ছাদে, সেগুলোকেই নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে রাতুল এসেছিল। কিন্তু এখানে এসে সে বসন্তের ফাঁদে আটকে গেছে।

অজস্র পাখি উড়ছে, অজস্র বউল এসেছে আমগাছে। কয়েকদিন আগেও সজনেগাছগুলোতে ফুল ছিল। এখন কচি-কচি ডাঁটা এসেছে। স্বচ্ছ ঝরনার জলের নীচে যেমন খুদে মাছেদের খেলা করে বেড়াতে দেখা যায় সেরকমই টলটলে নীল আকাশের নীচে আজ কাচপোকা, ভ্রমর, বোলতা, ফলের মাছি আর প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। সেইদিকে তাকিয়ে আবারও রাতুলের মনে পড়ল, শুধু মানুষের সুখ-দুঃখই প্রকৃতির সঙ্গে সুরে মেলে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই রুপোলি তবকের নীচেই ঢাকা থাকে মানুষের দুঃখ, মানুষের যন্ত্রণা।

শীতলাবাড়ির ছাদের দিকে তাকাবে না তাকাবে না করেও তাকিয়ে ফেলে রাতুল। এই মুহূর্তে ওই বাড়ির ছাদের দড়িতে কিছু পোশাক শুকোতে দেওয়া আছে। মেয়েদের পোশাক। বছর খানেক আগেও শুধু ঠাকুমার সাদা থান মেলা থাকত ওখানে। তারপর রমাপদকাকা বিয়ে করল। তারপর থেকে রাতুল কখনো-কখনো ছাদে উঠলে দেখতে পায় নতুন বউয়ের গাঢ় রঙের তাঁতের শাড়ি।

রমাপদকাকা। এই তো আরেকজন লোক, যার মুখের দিকে তাকালে রাতুল খুব সহজেই বিষাদ দেখতে পায়। চিরকাল কি পেত? ঠিক মনে পড়ে না রাতুলের। তবে সেই নবমীর রাত্তিরে নীলকুঠির মাঠে যেদিন রুমি ওকে বলেছিল ওর কাকার সঙ্গে মায়ের অবৈধ প্রণয়ের কথা, তারপর থেকেই রাতুল নিশ্চিতভাবে রমাপদ ঘোষালের মুখে চিহ্নিত করতে পারে সেই বিষণ্ণতা, সেই অপরাধবোধ।

তারপর থেকেই রাতুলের আর সন্দেহ ছিল না যে, রমাপদকাকা বিয়ে না করে যে জীবনের প্রায় পঁয়তাল্লিশটা বছর পার করে দিল, তার পেছনে রয়েছে এক প্রায়শ্চিত্ত করার ইচ্ছা।

তবু এতবছর বাদে সেই রমাপদকাকা বিয়ে করল। বিয়ে করলেও পুরোপুরি শীতলাবাড়িতে ফিরে এল না। এ নিয়ে একদিন রাতুলের সঙ্গে কথা হয়েছিল রমাপদকাকার। কাকা সেদিন বলেছিল, কৃষ্ণনগর ছেড়ে এলে সত্যিই তার ব্যবসার কাজে অসুবিধে হবে।

তবে বিয়ের পরে কাকার এই জগৎপুরের বাড়িতে যাতায়াত অনেক বেড়েছে। সঙ্গে নতুন কাকিমাও আসেন। তার সঙ্গেও রাতুলের আলাপ হয়েছে। দিব্যি হাসিখুশি মহিলা। কৃষ্ণনগরেরই মেয়ে। রাতুল এটাও শুনেছে যে, কাকির বাবা নাকি রমাপদকাকার ব্যবসার মুরুব্বি। বিয়েটা করার একটা কারণ সেই মুরুব্বির চাপও হতে পারে।

যাই হোক, যেদিনের কথা হচ্ছে, সেদিন ছাদে কাকিমার রঙিন শাড়ি-ব্লাউজ মেলা ছিল না। রমাপদকাকা কিংবা কাকি তার মানে এখন এখানে নেই। তবুও ঠাকুমার সাদা থানের পাশে সেদিন আরো কয়েকটা মেয়েদের পোশাক রোদে শুকোচ্ছিল। স্বচ্ছ গোলাপি রাতপোশাক, সমুদ্রনীল জিনসের ট্রাউজার, চেকার্ড টি-শার্ট আর প্রবাল রঙের অন্তর্বাস।

এই গঞ্জের কোনও বাড়ির ছাদেই অমন দামি আর ব্র্যান্ডেড পোশাকের সম্ভার সচরাচর মেলা থাকে না। এখন-যে শীতলাবাড়ির ছাদে দখিনা বাতাসে অমন কিছু পোশাক ডানা ঝাপটাচ্ছে, তার কারণ রুমি এসেছে।

রুমির বাচ্চা হবে।

খবরটা রাতুল এক-সপ্তাহ আগেই পেয়েছিল, যেদিন রুমি জগৎপুরে এসে পৌঁছেছিল সেদিনই। মায়ের কাছ থেকে শুনেছিল, মাসখানেক বাদে ওর ডেলিভারি-ডেট। এখানেই বাচ্চা হবে ওর।

ওর বর পৌঁছে দিয়ে গেল? দেখলে অনুপমকে? রাতুল সেদিন এমনিই জিগ্যেস করেছিল ওর মাকে।

তার উত্তরে মা হলগল করে একগাদা কথা বলে গিয়েছিল—

নারে। কী বলব তোকে, ভরা পোয়াতি মেয়েটা অতদূর থেকে লোকাল ট্রেনে চেপে এসেছে। সঙ্গে কেউ নেই। হ্যাঁরে, রাতু, আমাদের গরিব ঘরের মেয়ে-বউদেরও তো এমন দুর্দশা হয় না।

তারপর একটু গলা নামিয়ে মা বলেছিল, মেয়েটার বিয়েটা সুখের হয়নি।

রাতুল চমকে উঠেছিল। মাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, এসব কী কথা! যা ইচ্ছে তাই বলে যেও না তো।

যা ইচ্ছে তাই নয় রে বাবু! দেখে এলাম তো ওকে। রোগা ও চিরকালই। কিন্তু তাই বলে এরকম অপুষ্টির ছাপ পড়বে শরীরে? তাহলে আর নিজে বড় চাকরি করে, বড়লোকের বউ হয়ে লাভ কী হল বল?

রাতুল ভাবছিল অন্য কথা। জগৎপুরে ঝাঁ চকচকে মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটাল তো দূরের কথা, একটা কাজ চালাবার মতন সরকারি হাসপাতালও নেই। থাকার মধ্যে আছে একটা ছোট হেলথ-সেন্টার।

সেই হেলথ-সেন্টারে নাম-কে-ওয়াস্তে একটা প্রসূতি-বিভাগ আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ডাক্তার নার্সরাই সিজারিয়ান-টিজারিয়ান করতে চান না। বলেন, ইনফেকশন হয়ে যাবে, পরিবেশ এতই নোংরা।

আর রয়েছে ডাক্তার দীপশিখা বড়ালের নার্সিং-হোম। সবাই জানে, নামের আগে ডাক্তার লিখলেও দীপশিখা মোটেই ডাক্তার নন। উনি আসলে মিডওয়াইফ...দাই। ওই কাজেই পয়সাকড়ি জমার পরে ছোট একটা দোতলা বাড়িতে নার্সিংহোম খুলেছেন। সেখানে রাতুলের পরিচিতদের মধ্যে কেউ কোনওদিন চিকিৎসা করায়নি।

ওর দুয়েকজন বন্ধুবান্ধব রিসেন্টলি বাবা হয়েছে। সেইজন্যেই রাতুল জগৎপুরের প্যাথেটিক প্রসব-ব্যবস্থার কথা কিছুটা জানে। প্রশ্ন হচ্ছে, রুমিও তো এখানকার মেয়ে; ওরও এসব বিষয় অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে কলকাতার অত ভালো-ভালো হাসপাতাল আর নার্সিংহোম ছেড়ে ও এখানে এল কেন?

একটা কারণ হতে পারে, বাড়ির যত্ন। সেটার যে অভাব হবে না, তা রাতুল জানে। রুমির মা না থাকলেও ঠাকুমা রয়েছেন। তিনি ভীষণ ভালো রুগি এবং প্রসূতির পরিচর্যা করতে পারেন। পাড়ায় কত হাম-বসন্ত-টাইফয়েডের রুগি যে ঠাকুমার রান্না করা পথ্যের জোরে সেরে উঠেছে, কত অ্যানিমিক মেয়ে যে তাঁর হাতের রান্না সেপুন্নে শাক, গুগলির ঝোল আর ডুমুরের তরকারি খেয়ে রক্ত ফিরে পেয়েছে তার হিসেব নেই। কিন্তু শুধু সেইটুকুর জন্যে রুমি কলকাতা ছেড়ে জগৎপুরে চলে আসবে?

তাহলে কি মায়ের কথাই সত্যি? রুমি কি জানে যে, সে এখানে যেটুকু কেয়ার পাবে নিজের বাড়িতে সেটুকুও পাবে না?

মনখারাপ হয় রাতুলের।

কেন হয়? না হলেও তো পারত। কবে সেই কতবছর আগে সে রুমিকে ভালোবেসেছিল, রুমি সেই ভালোবাসা অস্বীকার করে চলে গিয়েছিল। তারপরেও কি মেয়েটার সম্বন্ধে একটু উদাসীনতা আসতে পারত না তার মনে?

নিমগাছের কোকিলটা আবার ডাকতে শুরু করেছে। ফাল্গুনী হাওয়ার একটা নতুন ঝাপটায় নীল আকাশের নীচে নতুন করে উড়তে শুরু করেছে রুমির রাতপোশাক। কাম নয়, প্রেম নয়, এক ব্যাখ্যাহীন অপচয়ের শোকে ক্রমশ পাথর হয়ে যেতে থাকে রাতুল। বাতাস বয়ে যাওয়ার অবিরল শব্দের মতন কেবলই মনের মধ্যে বাজতে থাকে এই কথা—কিছুই হল না, কিছুই হল না এই জীবনে।

প্রেমের খুব কাছে পৌঁছেও প্রেম পাওয়া হল না, শুধু এক চুম্বনের কষায় স্বাদ রয়ে গেল ঠোঁটে। শিল্পের রূপ জানলাম, কিন্তু সৃষ্টি করতে পারলাম না একটিও প্রকৃত ভাস্কর্য।

হঠাৎই মায়ের ডাকে রাতুলের নিমগ্নতা ভেঙে গেল। উঠোনে দাঁড়িয়ে ওর মা ছাদের দিকে মুখ করে চিৎকার করে ডাকছিল, রাতু! রাতু! শিগগির নেমে আয়। মেয়েটা বুঝি আর বাঁচল না।

সিঁড়ির ধাপে হোঁচট খেতে-খেতে প্রায় অন্ধের মতন নেমে এল রাতুল। হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করল, কী হয়েছে?

ওর মা কোনওরকমে বলল, কাল রাতে রুমির জল ভাঙতে শুরু করেছিল। আমি আর আশাকাকিমা মিলে ওকে বড়ালের নার্সিং হোমে ভর্তি করে দিয়ে এলাম। ডাক্তারদিদির সঙ্গে কথা বলে এলাম, উনি বললেন, চিন্তার কিছু নেই। রাতের মধ্যেই ব্যথা উঠে যাবে। অথচ আজ সকালে গিয়ে দেখি কোথায় কী? মেয়ে একা-একা ওর বেডে নেতিয়ে পড়ে রয়েছে। গা বরফের মতন ঠান্ডা। আমি এসেছি বুঝতে পেরে একবার কোনওক্রমে চোখ খুলে বলল, জেঠি, বাচ্চাটা আর নড়ছে না। ওকে বাঁচাও।

তারপর ওখানে দাঁড়িয়ে জনে-জনে কত কাকুতি-মিনতি করলাম আমরা। কত হাতে পায়ে ধরলাম, ওগো, একবার ডাক্তারদিদিকে ডেকে আনো! দেখো মেয়েটা মরে যাচ্ছে। তো সবাই বলে কি, ডাক্তার সময় হলেই আসবে। তুই একবার গায়ে জামাটা গলিয়ে আয় বাবা। আমি অটোটাকে দাঁড় করিয়েই...

কাকে বলে জল ভাঙা, কাকে বলে ব্যথা ওঠা এসব কিছুই না জেনে, শুধু যূথীদেবীর আতঙ্কিত মুখের দিকে তাকিয়ে রাতুল বুঝতে পারল রুমি মরে যেতে বসেছে। তারপর ও যে ঠিক কী-কী করেছিল তা আর ওর মনে নেই। তবে লেডি ডক্টরের চেম্বারের স্যুইং-ডোরের একদিকের পাল্লা যে ওর হাতের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছিল সেটা মনে আছে।

হ্যাঁ, রুমি বেঁচে গিয়েছিল। ওর পেটের বাচ্চাটাও। অনেক দেরি করে হলেও ফরসেপ করে তাকে বাইরে এনেছিলেন নার্সিং-হোমের ডাক্তার এবং নার্সেরা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%