তেরো

সৈকত মুখোপাধ্যায়

কলকাতার দিক থেকে এটাই জগৎপুরে আসার শেষ ট্রেন। ট্রেনটা যখন স্টেশনে ঢুকল তখন রাত সাড়ে-দশটা বেজে গেছে। বাবাই ঘুমিয়ে ন্যাতা। ওকে কোলে নিয়ে রুমি ট্রেন থেকে নামল। রাতুল লেডিস কম্পার্টমেন্টের সামনে ওর জন্যে অপেক্ষা করছিল; তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিল।

ফেব্রুয়ারি মাস। রুমি শিশুফুলের গন্ধ পেল। প্লাটফর্মের ওপরেই বহুদিনের পুরোনো দুটো শিশুগাছ আছে। গুঁড়ি-গুঁড়ি সবুজ শিশুফুলে গাছের নীচের প্লাটফর্মের অংশটুকু ছেয়ে রয়েছে।

ঠাম্মা কেমন আছে? কাকুমণি? কাকিমণি? রাতুলের পাশে হাঁটতে-হাঁটতেই জিগ্যেস করল রুমি।

রাতুল বলল, ঠিকই তো ছিলেন সবাই। ভালোই ছিলেন। হঠাৎ এই বিপদে, বুঝতেই পারছ, আমরা সকলেই...

রুমি বলল, আমি কিন্তু ভেঙে পড়িনি রাতুল। বাবা ঠিক ফিরে আসবে, দেখো।

রাতুল আড়চোখে রুমির মুখের দিকে একপলক তাকাল। মেয়েটা যে অন্য ধাতু দিয়ে গড়া, তা ও ছোটবেলা থেকেই জানে। কিন্তু তাই বলে এতটা! সবেমাত্র গতকাল দুপুরে রমাপদ ঘোষাল ভাইঝিকে ফোন করে জানিয়েছেন, ওর বাবাকে গত পাঁচদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন রাতুল রমাপদর পাশেই ছিল। সত্যিকথা বলতে কী, রাতুলই রমাপদ ঘোষালকে বলেছিল, রুমিকে এবার জানানো উচিত। ও এসে দেখে যাক ওদের চেষ্টায় কোনও কসুর আছে কিনা। নাহলে পরে ব্লেম করতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থাতেও মেয়েটা এত স্থির থাকতে পারে কেমন করে, এত আবেগহীন?

স্টেশন-বিল্ডিং থেকে বেরোনোর মূল-ফটকে পৌঁছিয়ে রাতুল রুমিকে বলল, তুমি এক-মিনিট দাঁড়াও। আমি দুটো রিকশা ডেকে আনি। বাবাইকে কোলে নিয়ে এতটা হাঁটতে পারবে না। এই বলে চলেই যাচ্ছিল রাতুল। কিন্তু রুমির দিক থেকে হ্যাঁ বা না কোনও উত্তর না পেয়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল এবং যা দেখল, তা দেখবে বলে সে ভাবেনি। রাতুল দেখল, রুমি একটা থামের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে ফুলে-ফুলে কাঁদছে। সেই কান্নায় কোনও শব্দ হচ্ছে না, কিন্তু ওর পিঠটা কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

রাতুল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ঘুমন্ত বাবাইকে রুমির কোল থেকে নিয়ে নিল এবং তখনই ওর চোখে পড়ল থামটার গায়ে একটা ‘সন্ধান চাই’-এর বিজ্ঞাপন সাঁটা আছে। ও আর রুমির ছোটকাকা মিলেই গতকাল একটা এজেন্সিকে দিয়ে জগৎপুর আর আশেপাশের সবকটা শহরের বাসস্ট্যান্ড আর রেল-স্টেশনে এগুলো লটকানোর ব্যবস্থা করিয়েছিল। পোস্টারটায় তারাপদকাকার হাসিমুখের ছবি, সঙ্গে বেশ কয়েক-লাইন বিবরণ, যার একদম শেষে লেখা ছিল—নিখোঁজ ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন।

ছবির মানুষটার গালে গাল ঠেকিয়ে তার মেয়ে কাঁদছিল। রাতুল বাধা দিল না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য রুমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, চোখ-টোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বাবাইকে রাতুলের কোল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল, স্যরি। চলো, স্ট্যান্ড অবধি হেঁটে যাই।

রিকশা থেকে নামার পরে রাতুল ওকে গলির মধ্যে দিয়ে শীতলাবাড়ির দরজা অবধি এগিয়ে দিল। সেখানে ওর জন্যে রমাপদ ঘোষাল আর তাঁর স্ত্রী অপেক্ষা করছিলেন।

রমাপদ ঘোষালের স্ত্রী জয়তী রুমিদের থেকে মাত্রই কয়েক বছরের বড়। লম্বা হাড়সার গড়ন। গায়ের রঙ ময়লা। মুখেও একটা কাঠিন্য রয়েছে। হয়তো এসব কারণেই বিয়ে হতে দেরি হয়েছে। তবে রুমি তার এই প্রায় সমবয়সি কাকিমাটিকে ভালোবেসে ফেলেছে। তার কারণ, জয়তী খুব মুক্তমনা, তেজীয়ান মেয়ে।

শুধু তাই নয়, কর্মঠও। বিয়ের আগে ও ওর বাবার সঙ্গে হাতে-হাতে ব্যবসার কাজ করত। কাজ মানে শুধু যে কাউন্টারে বসে হিসেব-নিকেশ করা, তা নয়। ওর মুখেই রুমি শুনেছে, মাসে একদিন করে কলকাতায় গিয়ে ও হোলসেল মার্কেটে ঘুরে-ঘুরে দু-হাতে দু-থলি ভর্তি জিনিস কিনে বাড়ি ফিরত।

কাকুমণির মতন নরম-সরম মানুষের জন্যে ঠিক এরকম একজন পার্টনারই দরকার ছিল। বিয়ের পরে এই এক-বছরের মধ্যেই জয়তী নাকি কাকুমণির ব্যবসার হাল ফিরিয়ে দিয়েছে।

শুধু কাকুমণির ব্যবসার নয়, হাল ফিরিয়ে দিয়েছে শীতলাবাড়িরও। মাসে এক-দুবার যখনই জয়তী এ-বাড়িতে আসে, সে একাই হোক কিংবা কাকুমণির সঙ্গে, বাড়িটার কিছু না কিছু ঘষামাজা করিয়ে যায়। এমনকী ঠাম্মাও আগে যেমন ছেঁড়া গিঁট দেওয়া শাড়ি পরে ঘুরত, এখন আর সেরকমটি দেখা যায় না। একজন সবসময়ের কাজের লোকও রেখে দিয়েছে জয়তী ঠাম্মাকে সাহায্য করার জন্যে।

জয়তীর চেহারায় কিংবা কথাবার্তায় হয়তো কোমলতার অভাব, কিন্তু কোমলতা রয়েছে ওর অন্তরে। সেটাও রুমি দিব্যি টের পায়। বিবাহবিচ্ছিন্না, অ্যাবনর্মাল বাচ্চা নিয়ে জেরবার ভাশুরঝিটির জন্যে জয়তীর মনে উদ্বেগ কাজ করে। প্রায়ই ও রুমিকে ফোন করে খবরাখবর নেয়।

কাকুমণির বিয়ের সময় রুমি জগৎপুরে আসতে পারেনি, কারণ ঠিক সেই সময়েই ওর ডিভোর্সের মামলার পরপর ডেট পড়ছিল; সে-কথা ও ফোনে জানিয়েছিল রাতুলকে। তবে তার কিছুদিন বাদেই জগৎপুরে এসে খুব হইহই করে কাটিয়ে গিয়েছিল কয়েকটা দিন। সেবার প্রচুর দামি-দামি গিফট নিয়ে এসেছিল নতুন কাকিমার জন্যে। সেই ওর শেষ আসা। আর তারপরে এই।

গলির মধ্যে দিয়ে এই-পথটুকু আসার সময়েও বাবাইকে কোল থেকে নামায়নি রাতুল। রাতুল বাচ্চা ভালোবাসে। প্রতিদিন অনেকটা সময় ও ড্রইং-ক্লাসের বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটায় এবং সে-সময়টায় ও খুব ভালো থাকে...আনন্দে থাকে। তখনও রাতুল কোলে ধরে-থাকা বাচ্চাটার কানে-কানে ফিসফিস করে কীসব যেন হাবিজাবি গল্প করে যাচ্ছিল। পেছন থেকে রুমি একটু অবাক হয়েই এই দৃশ্য দেখছিল। এমনিতে কোনও অচেনা লোকের পক্ষে বাবাইকে এক-মিনিটের জন্যেও কোলে নেওয়া অসম্ভব। রাতুল কীভাবে ওকে এতক্ষণ শান্ত করে রেখেছে?

বাবাই জন্মানোর পর থেকেই রাতুলের সঙ্গে আবার যোগাযোগটা ফিরিয়ে এনেছে রুমি। না ফিরিয়ে পারা যায় না। রাতুলের জন্যেই তো সেদিন ওর আর বাবাইয়ের প্রাণদুটো বেঁচে গিয়েছিল। এখন ও আবার নিয়ম করে মাসে এক-দুবার রাতুলকে ফোন করে। ওর কাছ থেকে বাবার খবর নেয়।

রুমি খুব ভালো করেই জানে, তার প্রতি দুর্বলতা থাকুক আর নাই থাকুক, তারাপদ ঘোষালকে রাতুল বরাবর আগলে বেড়াত। শান্ত সেই উন্মাদটির জন্যে অনেক দিন আগে থেকেই রাতুলের বুকের মধ্যে একটা নরম জায়গা ছিল।

সেই মানুষটাই হারিয়ে গেছে। রুমি রাতুলের চোখেও একটা দিশাহারা ভাব দেখেছে আজ। যেন ওরই দায়িত্ব ছিল বাবাকে আগলে রাখার। যেন ওর গাফিলতিতেই বাবা হারিয়ে গেছে।

সেই গ্লানি ভুলবার জন্যেই কি ও এই এখন বাবাইয়ের গালে গাল ঠেকিয়ে মজার মজার গল্প বলে যাচ্ছে?

রুমির হঠাৎ প্রবল ইচ্ছে করল, এই নির্জন গলিপথে আজ আরেকবার রাতুলের মুখটা নাগালের মধ্যে টেনে চুম্বনে-চুম্বনে ওর গালটা ভরিয়ে দেয়। বলে, তোমাকে এত কষ্ট দেওয়ার কোনও অভিসন্ধি আমার ছিল না রাতুল, বিশ্বাস করো।

কিন্তু সেরকম কিছু করল না ও। কারণ ও জানত, শত-চুম্বনেও রাতুল তার কঠিন খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসবে না। রুমি একদিন নিজের হাতে দুজনের মধ্যে যে-দূরত্ব তৈরি করেছিল, রাতুল এখনও সেই দূরত্বকে একগুঁয়ের মতন রক্ষা করে চলেছে। এখন রুমি চাইলেও ও রুমিকে স্পর্শ করবে না। শুধু মনে-মনে ভালোবাসবে। বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর আবার চুপচাপ দূরে সরে যাবে।

রুমি জানে, সে নিজেই তার কারণ। সে রাতুলের সারল্যে মুগ্ধ হতে পারে, রাতুলের মানবিকতায় কৃতজ্ঞ হতে পারে, এমনকী রাতুলের ভালোবাসায় ভেসেও যেতে পারে। কিন্তু আজও সে রাতুলের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে জড়ানোর কথা ভাবতে পারে না। এই নিয়ে একবার ওদের দুজনের মধ্যে কিছু কথাও হয়েছিল।

ঘটনাটা দেড়-বছর আগের। কাকুমণির বিয়ের পরে রুমি যখন জগৎপুরে এসেছিল, তখন রাতুল আর রুমি হঠাৎই একদিন শীতলাবাড়ির ছাদে একা হয়ে পড়েছিল।

শীতের দুপুর ছিল সেটা। বাবাইকে ছাদের একদিকে মাদুরের ওপরে কাঁথা পেতে ঘুম পাড়িয়ে রেখে, রুমি পাশে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। সেই প্রথম থেকেই রাতুল বাবাইকে চোখে হারাত। যতদিন ওরা শীতলাবাড়িতে থাকত, প্রায় প্রতিদিনই রাতুল যখন-তখন হাতে একটা খেলনা কিংবা খাবার কিংবা অন্য যা হোক কিছু নিয়ে ‘বাবাই কই’ বলে ডাক দিয়ে হাজির হত আর তারপর কিছুক্ষণ ছেলেটাকে নাড়াঘাটা করে আবার হঠাৎই উধাও হয়ে যেত। রুমির সঙ্গে কথাটথা বিশেষ বলত না।

কিন্তু নারীর স্বাভাবিক অনুভূতিতেই রুমি বুঝতে পেরেছিল, বাবাইয়ের জন্যে নয়, সেদিন ওর জন্যেই এমন চুপচাপ ছাদে উঠে এসেছিল রাতুল। ও তাই হাত দিয়ে নিজের পাশের জায়গাটা দেখিয়ে রাতুলকে বলেছিল, বোসো।

এখন ভেবে দেখলে রুমির মনে হয়, হয়তো ওর ডিভোর্সের সংবাদেই রাতুল সেদিন কিছুটা নরম হয়ে পড়েছিল। হয়তো রুমির ওই বিফল দাম্পত্যের জন্য নিজেকেই অংশত দায়ী করেছিল। কারণ কিছুক্ষণ উশখুশ করার পরে রাতুল সেদিন প্রথম যে-কথাটা বলেছিল, সেটা যেন কেমন সাফাই গাওয়ার মতন। ও বলেছিল, তখন আমারই বা কত বয়স ছিল রুমি? কতটুকুই বা অভিজ্ঞতা ছিল আমার? নিবেদিতা কাকিমা আর রমাকাকার সম্পর্কের কথা শুনে তাই সেদিন ভীষণ জোর একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। কিন্তু আরো একটু বয়স বাড়ার পরে বুঝতে পেরেছিলাম, ওঁরা যা করেছিলেন সবটাই স্বাভাবিক, ভীষণ স্বাভাবিক। আর কিছুদিন পরে হলে হয়তো তোমার পাশ থেকে উঠে যেতাম না। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই যেতাম না। তুমি আমাকে সেই সুযোগটা দিলে না।

রুমি তার উত্তরে বলেছিল, সব মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এখনো আমি মনে করি, সেদিন মাত্র আঠারো-বছর বয়সে আমি যে ডিসিশনটা নিয়েছিলাম, সেটা ঠিকই ছিল। আমার বিবাহিত জীবনটা যে সুখের হল না সেটা অন্য কথা। তার পেছনে শুধুই ভাগ্য নয়, আরো অনেক কারণ রয়েছে। আমি যে একটা মফস্বলের মেয়ে, আমার যে সহায়-সম্বল বলে কিছু নেই, সেগুলোই বড় কারণ। বাট স্টিল আই মেইনটেইন, যদি সুখী হতাম, তাহলে জগৎপুর থেকে বেরিয়ে গিয়েই হতাম। এখানে বাস করে কিছুতেই সুখী হতে পারতাম না।

আর তুমিও রাতুল, তুমিও কিন্তু আমাকে বেশিদিন সহ্য করতে পারতে না। তুমি শিল্পী। স্বপ্নের জগতে বাস করো। আমার সঙ্গে ঘর করতে গেলে দেখতে, আমি বড্ড মেটিরিয়ালিস্টিক। বিয়ের পরে খুব অশান্তি হত আমাদের মধ্যে।

তবু, সেদিন তোমাকে ছেড়ে গিয়ে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম, বিশ্বাস করো। সেদিন নীলকুঠির মাঠে আমার কথা শুনে তোমার চোখেমুখে যে কষ্ট ফুটে উঠেছিল, সেটা আজ দশবছর পরেও আমাকে প্রতিদিন হন্ট করে। মাঝেমাঝে ভাবি, কি জানি, সেই পাপেই হয় তো...

কথা শেষ করতে পারেনি রুমি; মুখ নামিয়ে নিয়েছিল।

রাতুলও আর কোনও কথা না বলে ছাদ থেকে নীচে নেমে গিয়েছিল।

সেইজন্যেই আজও বাড়ির দরজায় পৌঁছিয়ে, কোনও কথা না বলে রুমির কোলে বাবাইকে তুলে দিয়ে রাতুল চলে গেল। যাবার আগে শুধু রমাপদ ঘোষালকে বলে গেল, তোমাকে দোকান বন্ধ করে বসে থাকতে হবে না কাকা, রুমির সঙ্গে আমি থাকব। কাল সকাল ন’টায় চলে আসছি।

জগৎপুর থানার ও.সি.-র বয়স বেশি নয়, তবে দাপট দেখা গেল সাঙ্ঘাতিক। রাতুল আর রুমি ওঁর চেম্বারে ঢুকে অন্তত পাঁচমিনিট চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। ভদ্রলোক ওদের দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না। হাইওয়ে দিয়ে আজ কোনও ভি.আই.পি. মুভমেন্টের ব্যাপার রয়েছে মনে হয়। ঘরে আরও দুচারজন পুলিশের লোক ছিলেন, ইউনিফর্মে এবং প্লেন-ড্রেসে। তাদের কাকে কোথায় ডিপ্লয় করা হবে, সগর্জনে সেই প্ল্যান বানিয়ে চলেছিলেন ও.সি. সাহেব।

বাবাই এতক্ষণ রুমির আঙুলটা শক্ত করে চেপে ধরে গোল-গোল চোখে সেই তাণ্ডব দেখছিল। এবার কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, বাড়ি যাব।

বাধ্য হয়ে রুমি পায়ে-পায়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, দেখুন, আমার নাম পারমিতা ঘোষাল।

নামটা বলামাত্রই ম্যাজিক ঘটে গেল। ও.সি. তড়াক করে দাঁড়িয়ে উঠে নমস্কার করলেন। কোলিগদের বললেন, এই আপনারা বাইরে যান। আর তাড়াতাড়ি চা বিস্কুট পাঠিয়ে দিন কাউকে দিয়ে।

সহকর্মীরা হুড়মুড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর ও.সি. সাহেব রুমির দিকে তাকিয়ে বললেন, বসুন ম্যাডাম, বসুন। ভাই, আপনিও বসুন। কাল রাতেই আমাকে এস.পি. সাহেব ফোন করে বলেছিলেন, আপনি আসবেন।

এস.পি. সাহেব! রুমি এতটাও আশা করেনি। দীপেশকে একবার বলেছিল ঠিকই, যদি এদিকে কোনও কানেকশন থাকে। কিন্তু তার জের যে এস.পি. অবধি গড়াবে সেটা ওর ধারণাতেও ছিল না।

ও.সি. সাহেব চটপট আলমারি থেকে একটা ফাইল বের করে ওদের দেখাতে বসলেন। ইতিমধ্যেই তিনি ওয়েস্টবেঙ্গলের কতগুলো থানায় তারাপদবাবুর বিবরণ পাঠিয়ে মেল করেছেন, হাইওয়ের ওপরে কোন-কোন নাকা-পয়েন্টে ওঁর ছবি পাঠিয়েছেন, সবই ওদের দেখাতে শুরু করলেন। দেখতে দেখতে রাতুল একবার আড়চোখে রুমির দিকে তাকাল। বলল, তুমি একবার বাইরে যাও তো।

রুমি কড়াগলায় বলল, কেন? বাইরে যেতে হবে কেন? যা বলার আমার সামনে বলো।

রাতুল হতাশ ভঙ্গিতে কাঁধটা একবার ঝাঁকিয়ে ও.সি.-র দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি অনেক করেছেন স্যার। শুধু একটাই রিকোয়েস্ট। দুটো জায়গায় যদি জাল ফেলানোর ব্যবস্থা করতেন।

ও.সি. ভুরু কুঁচকে রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনিই সেদিন মিসিং-ডায়েরি করতে এসেছিলেন না? হ্যাঁ, বলুন, কোন-কোন স্পটের কথা বলছেন।

নীলকুঠির কুয়ো আর রেলপাড়ের ঝিল।

ও.সি. রাতুলের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে রুমির দিকে তাকালেন। রুমি কোনও কথা না বলে মাথাটা ওপর-নীচে ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল, সেও তাই চাইছে।

ঠিক আছে ম্যাডাম। ইট উইল বি ডান। তারপর পর্দা ফেলা দরজার দিকে তাকিয়ে উনি হুঙ্কার ছাড়লেন, এই ডিউটি! চায়ের কী হল?

রুমি তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে হাতজোড় করে বলল, পরে একসময় চা খেয়ে যাব, স্যার। আজ চলি, বাচ্চাটার চান-খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে।

আচ্ছা। কোনও খোঁজ পেলেই আপনাদের জানাবো। ফোন-নাম্বার তো আছেই।

জগৎপুর থানার ও.সি. ওদের দরজা অবধি এগিয়ে দিলেন।

শীতলাপাড়া থেকে থানাটা অনেক দূরে। তবে জগৎপুরে এখন টোটো চালু হয়ে গেছে। রাতুল হাত দেখিয়ে একটা টোটো দাঁড় করালো। বলল, রিজার্ভে যাবে, শীতলাপাড়া।

ড্রাইভার ছেলেটি ইশারায় ওদের উঠে বসতে বলল। কিছুটা যাওয়ার পরে রুমি বলল, তোমার কি সত্যিই মনে হয়, বাবাকে ওই কুয়োয় কিম্বা ঝিলের মধ্যে পাওয়া যাবে?

রাতুল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, উঁহু। একেবারেই না। রমাকাকা ইনসিস্ট করছিলেন বলে বললাম। তারাপদকাকাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। উনি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডিসলাইক করতেন আত্মহত্যাকে। আত্মহত্যা আটকানোর জন্যেই সারা জগৎপুরে টহল মেরে বেড়াতেন। সেই মানুষ নিজে সুইসাইড করবেন? হতেই পারে না।

রুমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যাক। আমার সঙ্গে তোমার ভাবনা একদম মিলে গেল। এবার মানুষটাকে খুঁজে পেলেই হয়।

তারপর বলল, আমি যে কি হেল্পলেস রাতুল, তোমাকে কী বলব। পাড়ার লোকে হয়তো আমাকে মনে করে স্বার্থপর...সেলফিস। ভাবে, আমি কলকাতায় গিয়ে সবাইকে ভুলে গেছি। কিন্তু তা নয়। আমার খুব ইচ্ছে করত, বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখি, একটু ভালো চিকিৎসা করাই। কিন্তু বাবাইয়ের বাবা আর বাবাইয়ের ঠাকুমার কাছে সে-কথা বললেই ওরা অকথ্য অশান্তি শুরু করত। এমনিতেই আমাকে দু-বেলা ওরা কথা শোনাত, বাবাইয়ের দাদুর পাগলামির বীজই নাকি বাবাইয়ের মধ্যে ঢুকেছে। তার ওপরে তাকে যদি বাড়িতে নিয়ে যেতাম, তাহলে যে কী হত!

এখন আমি ওসব জঞ্জাল চুকিয়ে এসেছি। এখন হয়তো বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে পারতাম, যদি বাবা এই বাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হত।

ওদের টোটো-টা বিপজ্জনকভাবে বিপরীতমুখী দুটো লরির মধ্যে দিয়ে স্পিড তুলে বেরোলো। কথা থামিয়ে অন্যমনস্কভাবে ড্রাইভারের সেই ক্যারদানি দেখল রুমি। তারপর আগের কথার সূত্র ধরে বলল, আমার মনে হয়, বাবা এখন জগৎপুর ছেড়ে যেতে রাজি হয়ে যেত। এই বাড়িটা বাবার নিশ্চয় আর পছন্দ হচ্ছিল না।

রাতুল বলল, সেকি! পছন্দ হবে না কেন?

রুমি ক্লিষ্ট হেসে বলল, পাগল-মানুষের মাথায় কখন যে কী চাপে সেকি কেউ বলতে পারে? তবে ছোটকাকার বিয়েটা হয়তো বাবাকে দুঃখ দিয়েছিল। বাবা হয়তো ভেবেছিল, মায়ের স্মৃতিকে অসম্মান করছে ছোটকাকা।

রাতুল শিউরে উঠে ধমক দিল, তুমি থামো তো রুমি। যত অদ্ভুত চিন্তা!

রুমি আবার সেইরকম ক্লান্ত একটা হাসি হেসে চুপ করে গেল।

বড়রাস্তার ওপরে রাতুলদের বাড়ির সামনে টোটো থেকে নেমে রুমি চটপট ক্লাচ থেকে টাকা বার করে ভাড়া মেটাল। তারপর ছেলের হাত ধরে হাঁটতে-হাঁটতে রাতুলকে জিগ্যেস করল, শুধু নিজের কথাই বলে গেলাম। তোমার কথা জানতে চাইলাম না। রাজেনজেঠু কেমন আছেন এখন? জ্যাঠাইমা?

বাবা ঠিকই আছে। মা ক্রমশ অচল হয়ে যাচ্ছে। তোমাকে তো বলেছিলাম, আর্থ্রাইটিসের ব্যাপারটা। মা আজকাল বেশির ভাগ সময় শুয়ে বসেই থাকে, আর বিয়ে কর, বিয়ে কর বলে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে দেয়।

তা বিয়েটা তুমি করছ নাই বা কেন? অনেক তো বয়স হল।

প্রশ্নটা করেই রুমি একবার আড়চোখে রাতুলের মুখের দিকে তাকাল। কত বয়স হল ওর? ছত্রিশ? দেখলে যেন আরেকটু বেশি মনে হয়। সেই যে বোঁচা নাক, উঁচু দাঁত, ঝিকিমিকি চোখের বেবি-ফেস, তাতে যেন গ্রহণের ছায়া পড়েছে। রুমি নিজেদের গলির দিকে না গিয়ে রাতুলদের বাড়ির গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রাতুল অবাক হয়ে বলল, কী হল?

চলো, একবার জ্যাঠাইমার সঙ্গে দেখা করে যাই। দেখি, উনি তোমার জন্যে কেমন পাত্রী খুঁজছেন। জগৎপুরের অনেক সুন্দরী মেয়েকে আমি চিনি। তাদের কাউকে তোমার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া যায় কিনা দেখি।

রাতুল আঁতকে উঠে বলল এই, একদম না। শিয়ালকে আর ভাঙা বেড়া দেখিও না। এখন আমার অনেক কাজ, বিয়ে-টিয়ে করার সময় নেই।

তাই! অনেক কাজ? চলো, তাহলে তোমার কাজটাই দেখে আসি। কী করছ এখন, সরস্বতী ঠাকুর বানাচ্ছ?

রাতুলের মুখটা খুশি খুশি হয়ে উঠল। বলল, না, ঠাকুর বানানোর কাজ এখন কমই করি। ওসব কারিগরেরাই সামলে নেয়। আমি এখন...তুমি সত্যিই দেখবে? চলো না। দেখাচ্ছি।

যূথী-জ্যাঠাইমা একতলার রান্নাঘরে ছিলেন। ওদের গলা পেয়ে বেরিয়ে এলেন। বাবাইকে কোলে নিয়ে একটু আদর করলেন। তারাপদ ঠাকুরপোর জন্যে একটু চোখের জল ফেললেন। কপালে জোড়হাত ছুঁইয়ে বললেন, চিন্তা করিস না রুমি। তোর ঠাকুমা এত ভক্তিমতী, মা শীতলাই তার বড়ছেলেকে ঠিক ফিরিয়ে আনবেন। যা তোরা ওপরে গিয়ে বোস। আমি জলমিষ্টি পাঠাচ্ছি। অনেক দিন বাদে এলি। না খেয়ে চলে যাস না। মাথায় একটু সিঁদুর পরিস না কেন? পরবি। শুধু স্বামীর জন্যে নয়, দেখবি, ওতে নিজেও ভালো থাকবি।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে রুমি রাতুলকে বলল, আমার ডিভোর্সের কথাটা বাড়িতে বলোনি?

রাতুল বলল, না। আমার কী দরকার আগ বাড়িয়ে বলবার? শুনবে একদিন ঠিকই পাড়ার কারুর মুখ থেকে।

বাবাই ইতিমধ্যে ওর সেই টিপিকাল অস্থিরতাটা দেখাতে শুরু করেছিল, মায়ের সঙ্গে কাউকে বেশিক্ষণ কথা বলতে দেখলেই যেটা দেখায়। রুমির খাদি পাঞ্জাবির খুঁট ধরে টেনে, আঁচড়ে-কামড়ে অস্থির করে তুলছিল ওকে। রুমি আঃ বলে একটা ধমক দিয়ে ওকে মারার জন্যে হাতটা তুলতেই রাতুল ওকে আটকাল। বলল, দাঁড়াও, সবকিছু কি মেরে হয়? ওকে ঠান্ডা করার উপায় আমি জানি। এসো তো বাবাইবাবু। দ্যাখো, একটা ডায়নোসর কেমন করে ব্যাঙ ধরছে দেখাই তোমাকে।

ওরা কথা বলতে-বলতে দোতলার সেই কোনার ঘরটার সামনে চলে এসেছিল, যে-ঘরটায় অনেক বছর আগে রুমি একবার রাতুলের সঙ্গে এসেছিল। রুমি চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, মাঝের বারো-বছরে রাতুলের কাজকর্ম ঘর উপচে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। চারিদিকে স্তূপাকার করে রাখা ছিল রঙ-তুলি, আর্ট-পেপার, ইজেল, গোটানো ক্যানভাস এবং আরো হাজার রকমের আঁকার সরঞ্জাম। তার মধ্যে থেকেই একটা প্যাস্টেল-কালারের বাক্স আর আর্টপেপার বেছে নিয়ে রাতুল বাবাইকে মেঝের একদিকে বসিয়ে দিল। নিজে বসল ওর উল্টোদিকে। তারপর দু-তিনরকমের রঙের দ্রুত টানে চটপট একটা বড় হ্রদ, তার ধারে একটা লম্বা-গলা ডায়নোসর আর উঁচু উঁচু কয়েকটা আদিম গাছ এঁকে কাগজটা বাবাইয়ের দিকে এগিয়ে দিল। বলল, এবার তুমি চটপট ব্যাঙগুলোকে এঁকে ফেলো তো।

বাবাই কাগজ আর রঙবাক্সটা একহাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। অন্য হাত দিয়ে রুমির হাতটা চেপে ধরে বলল, তুমি আঁকো।

রুমি বলল, দেখেছ তো। ওর এই ক্লিংগিং হ্যাবিটের জন্যে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। এক-মিনিটও আমাকে ছাড়বে না এই ছেলে।

রাতুল একটু ভেবে নিয়ে বলল, চলো বাবাই, আমরা ঘুরতে-ঘুরতে ছবি আঁকি, ঠিক আছে?

ওরা তিনজনেই বারান্দা পেরিয়ে ঘরটার মধ্যে ঢুকল। বাবাইয়ের হাতে ধরা কাগজ আর রঙপেন্সিল। একবার করে সেগুলো রাতুলের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে আর রাতুল প্যাস্টেলের কয়েকটা টানে একটা করে ছবি এঁকে দিচ্ছে। একদমই ছেলেখেলা, তবু রুমি রাতুলের আঁকা দেখে অবাক হচ্ছিল। কাগজের দিকে ভালো করে তাকাচ্ছেই না, তবু ও এত সুন্দর আঁকছে কেমন করে!

ঘরে ঢুকে আরো অবাক হল রুমি। ও দেখল ঘরটার উল্টোদিকের দেয়ালে একটা দরজা ফোটানো হয়েছে, যার ফলে বাইরের খোলা ছাদটাও এই ঘরটার সঙ্গে জুড়ে গেছে। ওটাকে অবশ্য এখন আর সাধারণ ছাদ বলা যায় না। ওটা এখন একজন ভাস্করের স্টুডিও। মাথার ওপরে শেড উঠেছে, চারিদিকে উঁচু দেয়াল। স্টুডিওর এদিকে ওদিকে অসমাপ্ত এবং অর্ধসমাপ্ত পাঁচ-ছটা মূর্তি রাখা ছিল। তাছাড়াও অনেক মেশিনপত্র ছিল, যার মধ্যে কিছু মেশিনের নাম রুমির জানা। যেমন, ড্রিল-মেশিন, শ-হুইল, লেদ-মেশিন এইসব। বাকি আরো অনেক কিছুই ও চিনতে পারল না। রুমি খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে উঠল, আরেব্বাস! এ তুমি কী করেছ রাতুল?

রাতুল লজ্জিত হেসে বলল, তোমাকে বলা হয়নি, রুমি। আমি মাঝখানে শান্তিনিকেতনে গিয়ে...তুমি কি রথীন দাসের নাম শুনেছ? বিখ্যাত স্কাল্পটর...ওঁর কাছেই হাতে-কলমে কাজ শিখেছি। এখন আমার কাজও একটু-আধটু কদর পাচ্ছে।

ইউ আর গ্রেট রাতুল, আমার খুব গর্ব হচ্ছে তোমার জন্যে। এই বলে রুমি পায়ে-পায়ে এক নারীমূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পরিচ্ছন্ন পেডেস্টালের ওপরে সেলোফেন পেপারে ঢাকা মূর্তিটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওটার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। মেয়েটির ভাঁজ করে রাখা কনুই আর কোমরের ওপর থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে-পড়া দেহরেখা দেখে রুমির বুঝতে একটুও অসুবিধে হচ্ছিল না যে, মেয়েটি কোনও বারান্দার রেলিং-এর ওপরে দুই কনুইয়ের ভর রেখে দূরে তাকিয়ে আছে; যদিও রাতুল তার ভাস্কর্যের মধ্যে কোথাও বারান্দা কিম্বা রেলিং রাখেনি।

আরো অনেক কিছুই নেই মূর্তিটার মধ্যে; এমনকী মেয়েটির কোমরের নীচ থেকে শরীরের বাকি অংশটুকুও নেই। আছে শুধু কাল্পনিক রেলিং-এর বাইরে অনেকখানি ঝুঁকে-থাকা উৎকন্ঠিত এক দেহরেখা। যেন মেয়েটি আর অপেক্ষা করতে পারছে না, উড়ে যেতে চাইছে কারুর কাছে। অন্য সব ডিটেইলস সরিয়ে রেখে, রাতুল শুধু খুব যত্ন নিয়ে মেয়েটির ওই উদ্গ্রীব ভঙ্গিটুকু বানিয়ে তুলেছিল। এতই নিখুঁত সেই কাজ যে, মেয়েটির ঘাড়ের ওপরে পড়ে থাকা উড়োঝুরো চুল, তার চোখের পল্লব, আর কণ্ঠার গর্তের নীচে অপুষ্ট দুই স্তনের সামান্য ক্লিভেজ সবকিছুই সত্যি বলে মনে হচ্ছিল রুমির। এমন মূর্তিকে ছুঁতে ভয় লাগে।

মুগ্ধ হয়ে মূর্তিটার দিকে তাকিয়েছিল রুমি। ওর ঘোর ভাঙল রাতুলের কথায়। রাতুল ওকে প্রশ্ন করছে, ভালো হয়েছে?

অপূর্ব হয়েছে। তোমার তো হাত খুলে গেছে রাতুল।

একটা কথা বলব? রাগ করবে না তো? জানি, এখন এসব কথা বলার সময় নয়। তবু বলতে ইচ্ছে করছে।

রুমি অবাক হয়ে রাতুলের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, সেকি! আমার কাছেও সঙ্কোচ? বলো। যে-কথাটা রুমি বলতে পারল না, সেটা হল, যে-মেয়ে একদিন তোমার মুখ নিজের মুখের কাছে টেনে এনে চুমু খেয়েছিল, তার কাছেও সঙ্কোচ করো কেমন করে?

রাতুল বলল, তুমি কলকাতায় চলে যাওয়ার পর থেকে চার-পাঁচটা বছর আমি তোমাকে ভোলার জন্যে, শুধু তোমাকে ভুলে থাকবার জন্যেই, নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। কী অমানুষিক পরিশ্রম যে করেছিলাম ওই কয়েকটা বছর, তা তুমি ভাবতেও পারবে না।

তারপর? ভুললে?

রুমির এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যে এমন একটা তীক্ষ্ণতা ছিল যে, রাতুল একটু থতমত খেয়ে গেল। অবশ্য পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না, ভুলিনি। তবে আস্তে আস্তে সেই অসহ্য জ্বালাটা কমে গেল। আগে সারাক্ষণ উত্তর খুঁজে বেড়াতাম, কেন তুমি ধরেই নিলে আমরা একসঙ্গে বাঁচতে পারব না, ঠিক কোথায় আমাকে তোমার মনে হল আগাপাস্তালা মিসফিট। বেশ কয়েকটা বছর কেটে যাওয়ার পরে মনে হল, সেই উত্তরগুলো আর না জানলেও চলবে। আর ওই পাঁচ-বছরের পরিশ্রমে নিজস্ব একটা রাস্তাও খুঁজে পেয়ে গেলাম।

রুমির মুখ দেখে মনে হচ্ছিল ওর এইসব আলোচনা ভালো লাগছিল না। যেন কথা ঘোরানোর জন্যেই জিগ্যেস করল, এই মূর্তিটার কী হবে?

রাতুল বলল, আই.টি.সি. গ্রুপের জন্যে বানিয়েছি। ওরা কলকাতারই কোনও হোটেলে ইনস্টল করবে বলে শুনেছি। তখন একবার কলকাতায় যেতে হবে।

রুমি শিস টানার শব্দ করল। আই.টি.সি.! তাহলে তো অনেক টাকা পাবে?

খুব অনেক না হলেও আমাদের মতন মানুষের পক্ষে যথেষ্টই।

রুমি বলল, শুধু পরিশ্রম বলছ কেন রাতুল? প্রতিভার দাম নেই? আমি তো আর্টের কিছুই বুঝি না। তবু এই মূর্তিটা দেখে মনে হচ্ছে চুরি করে নিয়ে যাই, নিজের বাগানে সাজিয়ে রাখি। অবশ্য বাগানও নেই আমার। একটামাত্র ছোট ঘরে মা-ছেলেতে থাকি।

রাতুল মুখ নীচু করে হাসল। হাসিটা কেমন যেন লাগল রুমির। তাড়াতাড়ি বলল, কী হল রাতুল?

রুমি ভেবেছিল ওর দুঃখের কথায় রাতুল দুঃখ পেয়েছে। আবারও তাই জিগ্যেস করল, আমি কি তোমাকে হার্ট করার মতন কিছু বলে ফেললাম?

না না। রাতুল তাড়াহুড়ো করে ঘাড় নাড়ল। আমি তোমাকে অন্য একটা কথা বলব বলে ভাবছিলাম।

এবার রুমি সত্যিই রেগে গেল। ঝঙ্কার দিয়ে বলল, উফ রাতুল, আফটার অল উই আর গুড ফ্রেন্ডস। আজ তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার ভাবছ কেন? আমি যে সকাল থেকে তোমাকে দৌড় করাচ্ছি, তার জন্যে কি দুবার ভেবেছি? বলো না কী বলবে।

রাতুল ওইরকম মুখ নীচু করেই বলল, দ্যাখো, এই পেইন্টিং আর স্কাল্পচারের লাইনে শুধু ব্যবসায়ীদের অর্ডার সাপ্লাই করে বেশিদিন টেকা যায় না। কনিজিওর মানে শিল্পবোদ্ধাদের চোখে পড়তে হয়। আর তার জন্যে দরকার, আমার কাজের একক-প্রদর্শনী। জগৎপুরে নয়, কলকাতার কোনও নামকরা গ্যালারিতে।

রুমি মন দিয়ে রাতুলের কথা শুনছিল। ও যেন একটু-একটু বুঝতে পারছিল, রাতুল কী বলতে চলেছে।

আমি মফস্বলের ছেলে রুমি, যেমন তুমিও মফস্বলের মেয়ে। আমাদের হার্ডলসগুলো তুমি জানো। তার ওপরে আমি কুমোরের ছেলে, নিজেও কুমোর। বংশগৌরব বলে কিছু নেই। তাই গত চারবছর ধরে চেষ্টা করেও একটা এগজিবিশনের সুযোগ পাইনি। স্পন্সরের কথা ছেড়ে দাও, নিজের টাকা দিয়ে গ্যালারি ভাড়া করতে চেয়েও পাইনি। কলকাতার গ্রুপগুলো আমায় ঢুকতে দিচ্ছে না।

এর পরেই রাতুল সরাসরি রুমির চোখে চোখ রেখে বলল, তোমার তো অনেক হাই-লেভেলে জানাশোনা রয়েছে। দ্যাখো না, কাউকে বলে যদি আমার জন্যে একটা সুযোগ করে দিতে পারো।

হাই-লেভেলে জানাশোনা! হায় রে। রুমি মনে মনে কপাল চাপড়ালো। সেই তো একটিই লোক, দীপেশ চ্যাটার্জী। ঠিক আছে, কিশোরীবেলার প্রথম প্রেমের খাতির, তাকেই নাহয় বলবে রাতুলের কথা। রুমি বলল, তুমি তো কলকাতায় আসছ। কবে আসবে?

এই তো, দিন পনেরোর মধ্যেই।

তখন একবার আমার সঙ্গে দেখা কোরো তাহলে। তোমার কাজের ছবি, সার্টিফিকেট-টার্টিফিকেট যা পেয়েছ, সবকিছু দিয়ে একটা ডসিয়ার বানিয়ে নিয়ে যেও। আমি একজনকে বলে রাখব তোমার কথা। মনে হয় কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

ঘর থেকে বেরিয়ে রুমি বলল, পেপারগুলো আঙ্কলকে দিয়ে দাও, বেটু।

বাবাই চট করে কাগজগুলো বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে ভয়ে-ভয়ে রাতুলের মুখের দিকে তাকাল। খুব আস্তে-আস্তে বলল, দেব না।

না না, দিতে হবে না। তোমার এগুলো ভালো লেগেছে? রাতুল জিগ্যেস করল।

বাবাই খুব বড় করে ঘাড় হেলিয়ে বলল, হুঁ। আরো এঁকে দেবে?

তুমি যদি মাকে ছেড়ে আমার সামনে বসে থাকো তাহলে এঁকে দেব। থাকবে তো?

বাবাই আবার ঘাড় হেলিয়ে বলল, থাকব। তারপরেই রুমিকে বলল, তুমি চলে যাও। আমি আঁকা দেখব।

রুমি বাস্তবিকই আশ্চর্য হয়ে বলল, জীবনে এই প্রথম শুনলাম, ছেলে আমাকে বলছে তুমি চলে যাও। কানটা জুড়িয়ে গেল।

রাতুল বলল, দেখো, কেমন ম্যাজিক জানি। ঠিক আছে বাবাই, তুমি এখন মায়ের সঙ্গে যাও। আমি তোমাকে বিকেলে আবার নিয়ে আসব, কেমন?

বাবাই মায়ের হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে-নামতে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, ঠিক আসবে কিন্তু।

তার দু-দিন পরে, দুপুরবেলায়, রুমি জগৎপুর স্টেশনের প্লাটফর্মের একটা সিমেন্টের বেঞ্চের ওপরে বসেছিল। কলকাতায় ফেরার ট্রেন ধরবে। ওর পাশেই বিরসমুখে বসে আছে বাবাই। বাবাইয়ের নিজের ছোট্ট ব্যাক-প্যাকে রাতুল আঙ্কলের আঁকা একতাড়া ছবি আছে। ওর খুব ইচ্ছে, সেগুলো এখন আবার বার করে দ্যাখে। কিন্তু মাম্মি বলেছে তাহলে ওকে না নিয়েই ট্রেন চলে যাবে।

কাকা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।

রাতুলও আসতে চেয়েছিল। রুমিই ওকে বারণ করেছিল। বলেছিল, একজন ডিভোর্সি-মেয়ের সঙ্গে অত মাখামাখি কোরো না। ভবিষ্যতে আর কোনও মেয়ে কাছে ঘেঁষবে না। রাতুল তাই শুনে বলেছিল, আমার মনে বোধহয় কড়া পড়ে গেছে। তাই তোমার এসব কথা শুনেও আর অপমানিত হই না।

এ-যাত্রায় কিছুই ভালো হল না। আটদিন হয়ে গেল বাবা নিখোঁজ হয়েছে। তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

রুমি নিজের কাছে কখনো স্বীকার না করলেও, এখন সে বুঝতে পারছে, রাতুলের ভালোবাসা তার কাছে বইয়ের পাতার ভাঁজে রেখে-দেওয়া শুকনো ফুলের মতন মহার্ঘ্য ছিল। সেই-ফুলটাও এবার গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে গেল। রাতুল বলল, তার মনে আর কোনও দাহ নেই। শুধু স্বার্থ নিয়ে তার সামনে মুখ নীচু করে দাঁড়াল। আবার দাঁড়াবে সাতদিন বাদে, পরের রবিবার।

হাতে কী রইল তাহলে?

রুমি অন্যমনস্কভাবেই মোবাইলের স্ক্রিনে দীপেশের হোয়াটস অ্যাপ মেসেজগুলোয় চোখ বোলালো। এইটুকুই কি তার নিজের বলে থাকল?

এই মেসেজগুলোই আজ রুমির অবলম্বন। দীপেশ যখন এগুলো পাঠায়, একমাত্র তখনই রুমির মনে হয়, সেও এই মানব-সংসারের অংশ। এলিয়েন নয়, গ্রহান্তরের জীব নয়। এখানেও তাকে কেউ চেনে। দূরে থেকেও তার কথা ভাবে।

কী লেখে দীপেশ চ্যাটার্জী?

সে লেখে, তুমি আমার নিয়তি। বহুদিন নিস্তরঙ্গ হয়ে পড়েছিল আমার জীবন। বুঝতে পারছিলাম, কোথাও একটা ঝড় ঘনাচ্ছে। ঠিক তখনই তুমি এলে। তুমিই সেই ঝড় পারমিতা। জানি না শেষ অবধি কোথায় পৌঁছব। হয়তো কোথাওই পৌঁছব না, ধ্বংস হয়ে যাব। তবু মনে হয় এই অভিজ্ঞতার স্বাদ না নিয়ে মরে গেলে বড় ব্যর্থ হয়ে যেত আমার জীবন।

সে লেখে, আমিও রাত জেগে তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি পারমিতা। রক্ত-মাংসের মানুষ আমি। স্বপ্নে তোমার শরীরের অদেখা সৌন্দর্যগুলোকেই ভীষণ স্পষ্টভাবে দেখি। তোমার স্তনবৃন্তের রঙ দেখি, পিঙ্গল মুথাঘাসে ছাওয়া বদ্বীপে মেশার ঠিক আগে তোমার তলপেটের বিপজ্জনক ঢাল দেখি, তোমার ঊরুর মসৃণতা দেখি। শুধু দেখি না...স্পর্শ করি, স্বাদ নিই। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও জেনে রাখো পারমিতা, যদি কোনওদিনই তুমি আমাকে তোমার শরীর ছুঁতে না দাও, তাহলেও আমার কোনও আক্ষেপ থাকবে না।

যেদিন কেয়াতলা রোডের নির্জনতায় তুমি নিজে থেকেই আমার হাত ধরেছিলে, সেদিনই আমার সব পাওয়া হয়ে গেছে। একজন অনাত্মীয় অসমবয়সি ভীতু পুরুষমানুষ, হাজার সামাজিক অনুশাসন যাকে জড়িয়ে রেখেছে, যে তোমাকে কোনওদিনই ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না, তাকেই তুমি তোমার সবচেয়ে দামি জিনিসটা দিয়েছ—তোমার মন।

দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে পারমিতা ভাবল, কেন দেব না, দীপেশ? শুধু মন নয়, তুমি স্বপ্নে যা-যা দেখছ, সবই তোমার সামনে খুলে দেব। মন দেওয়ার পরে ওটা আর তেমন কঠিন কিছু নয়। বরং তখন দিতেই ইচ্ছে করে। আমার মা-ও তো দিয়েছিল।

আশা করি তার জন্যে আমাকে মায়ের মতন আত্মহত্যা করতে হবে না, কারণ সেই দৃশ্য দেখে বাবা যেমন চিৎকার করে উঠেছিল, সেরকম চিৎকার করে ওঠার মতন কেউ নেই আমার।

রুমির চিন্তার ঘোর কাটিয়ে দিয়ে ছোটকাকা ডাকল, ট্রেন ঢুকছে রুমি। উঠে আয়। রুমি সেলফোনটা হ্যান্ডব্যাগের মধ্যে ভরে, বাবাইয়ের হাত ধরে প্লাটফর্মের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। এই দফায় এখানে মোট চারদিন রইল রুমি।

এই চারদিনে কাকা যে-কথা বলেনি এখন একদম শেষ মুহূর্তে সেটাই বলল। বলল, দাদা বোধহয় আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্যেই চলে গেল রে রুমি। সঙ্গে নিয়ে গেল আমার সমস্ত পাপের কথা। আর আমার কোনও ভয় রইল না।

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, সারাজীবন মানুষটাকে যম-যন্ত্রণা দিয়ে গেলাম। ভগবান যেন আমার বিচার করেন। কাকার কথাগুলো হাহাকারের মতন শোনাচ্ছিল। রুমি কোনওরকমে বলল, ওভাবে বোলো না ছোটকাকা। তুমি কী করবে?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%