সৈকত মুখোপাধ্যায়

দীপেশ বিবাহিত।
স্বাভাবিক। চল্লিশের ওপরে ক’টা পুরুষমানুষই বা বিয়ে না করে বসে থাকে?
ওঁর ফ্যামিলি এখনো দিল্লিতে রয়ে গেছে। যদি কলকাতায় পার্মানেন্টলি সেটল করার ডিসিশন নেন, তাহলেই ওদের নিয়ে আসবেন। নাও আনতে পারেন। কারণ ওর ছেলে দিল্লিরই একটা নামী কলেজে সবেমাত্র অ্যাডমিশন নিয়েছে।
আপাতত স্বস্তি। তবে এই স্বস্তি কতদিন থাকবে পারমিতা জানে না।
উনি যোধপুর পার্কে পৈতৃক বাড়িতে এসে উঠেছেন। সেই বাড়িতেই ওঁর দুই দাদা পরিবার নিয়ে থাকেন, তাই থাকার জন্যে উনি একটাই মাত্র ঘর পেয়েছেন। সেই ঘরে কোনও প্রিভেসি নেই।
এটা খুব খারাপ খবর।
তবে উনি শিগগিরই নিউ-টাউনের দিকে একটা ফ্ল্যাট কিনবেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন।
এটা খুব ভালো খবর। একটা ফাঁকা ফ্ল্যাটের মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
উনি ভীষণ সুন্দর কথা বলেন। কিন্তু বাচাল নন। কেয়ারিং, কিন্তু পারমিতা নিজে থেকে যতটুকু বলেছে তার বাইরে আর কিছুই খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জানতে চাননি। ফালতু ফ্ল্যাটারিও করেননি।
শুধু একবার, তখন ওরা সকলেই একটু টিপসি হয়ে পড়েছিল, কে কার সঙ্গে কী কথা বলছে কেউই খেয়াল করছিল না, উনি পারমিতার কানে-কানে বলেছিলেন, তোমার মতন এত সুন্দর গলা আমি কোনও মেয়ের দেখিনি। পিলসুজ-পুতুলের মতন নিটোল আর দীর্ঘ তোমার গ্রীবা।
পারমিতা তার এই ত্রিশ-বছর বয়সের মধ্যে ভিন্ন-ভিন্ন পুরুষের মুখে নিজের ভিন্ন-ভিন্ন অঙ্গের প্রশংসা শুনেছে। চোখ থেকে স্তন থেকে উরু—কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু তার গলারও যে কোনও সৌন্দর্য থাকতে পারে এবং সেই সৌন্দর্যও যে কারুর চোখ টানতে পারে, সে-কথা তো ও কোনওদিন ভাবেইনি। খুব অবাক হয়ে দীপেশকে প্রশ্ন করেছিল, পিলসুজ-পুতুল মানে কী?
সেকি! পিলসুজ-পুতুল জানো না! মনসা পুজোর আগে-পরে ক’দিন ওই গড়িয়াহাটের মোড়েই ঝাঁকা ভর্তি করে বিক্রি হয়। মাটির তৈরি একরঙা পুতুলগুলো, মাথায় প্রদীপ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের দীঘল গলার দু-পাশ দিয়ে লীলায়িত দুই হাত মাথার ওপরে উঠে যায়, দ্যাখোনি তুমি?
গ্রীবা, দীঘল, লীলায়িত! উনি কথার মধ্যে অনর্গল এইসব শব্দ ব্যবহার করে যান। আর সেইজন্যেই চুপ করে ওঁর কথা শুনে যেতে ইচ্ছে করে। শ্যাম্পেন-গ্লাসের গভীরতা থেকে উঠে-আসা সোনালি বুদ্বুদের মতন শব্দগুলো যেন ধীরে-ধীরে সমস্ত উত্তেজিত স্নায়ুকে শান্ত করে দেয়। মুখোমুখি বসে নয়, তখন ইচ্ছে করে ওঁর কাঁধে মাথা রেখে কথা শুনতে। পারমিতার তো অন্তত সেরকমই ইচ্ছে করছিল।
এবং পারমিতা জানে, আজই তা শোনা যেত। পার্টি শেষ হওয়ার পরে উনি বলেছিলেন, মাত্র সাড়ে-ন’টা বাজে। রাজা বসন্ত রায় রোড ধরে ধরে একটু হেঁটে আসবে নাকি?
পারমিতা জিগ্যেস করেছিল, হঠাৎ বসন্ত রায় রোড কেন?
কারণ ওটা কোনও রাস্তা নয়। ওটা একটা নদীর ফেলে যাওয়া খাত, যেটার কথা সবাই ভুলে গেছে। এখন ওই নদীখাত ধরে হাঁটলে তুমি দেখতে পাবে, পুরোনো-বাড়ির রেইন-ওয়াটার পাইপ বেয়ে নেমে আসছে ভাম। তোমার দু-হাত সামনে দিয়ে রাস্তা পেরোবে বেজি-দম্পতি। খেয়াল করলে তেতাল্লিশ-নম্বর বাড়ির সামনের মুচকুন্দগাছটার কোটর থেকে দুটো ফিশিং-আউলকে মুখ বাড়াতে দেখবে; এগারোটা নাগাদ ওরা রবীন্দ্র সরোবরে মাছ ধরতে যায়। দেখতে হলে আমার সঙ্গে চলো।
পারমিতা করুণ-স্বরে বলেছিল, ভীষণ লোভ লাগছে, জানেন। কিন্তু কী করি বলুন। বাবাই যে না খেয়ে বসে থাকবে। ও জানে রিখিয়াদিদি ওর জন্যে বিরিয়ানি প্যাক করে পাঠাচ্ছে।
স্যরি স্যরি। আমারই ভাবা উচিত ছিল। তুমি তাহলে ক্যাব ডেকে নাও। আবার দেখা হবে। গুডনাইট।
পারমিতা জয়াদিদের ফ্ল্যাটের নীচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখল, দীপেশের দীর্ঘ শরীরটা ফার্ন রোডের বাঁকে হারিয়ে গেল।
নারীর তৃষ্ণা এ-জীবনে আর যাবার নয়। ফার্ন-রোড থেকে বেরিয়ে গোলপার্কের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে পরিষ্কার উচ্চারণে বললেন দীপেশ চ্যাটার্জী। তারপর মনে-মনে বললেন—
এখনো, এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছেও, যে-কোনও মেয়ের একটা আঙুল ছুঁলে মনে পড়ে যায়, ওই আঙুলের প্রতিটি কোষ আমার কোষের থেকে আলাদা। ওই আঙুলের কোনও কোষে ওয়াই-ক্রোমোজোম নেই। আমার প্রতিটি কোষে আছে। তখন সেই আঙুলটাকে এক অচেনা পাখি বলে মনে হয়। মনে পড়ে আলোর অপেরা—আমার যা কিছু নেই, তারই জন্যে মোহগ্রস্ত আমি, পুজো করব প্রিয় অজানার ক্ষত।
মন নয়। নারীর মন ঘেঁটে দেখেছি, মনের দিক থেকে সে আমার থেকে খুব আলাদা কিছু নয়। আমারই মতন স্বর্গ-নরকের সমাহার। সতর্ক নারী দেখেছি। মতলববাজ নারী দেখেছি। হিংস্র নারী দেখেছি। কার্যসিদ্ধির জন্যে শরীরকে পাল্লায় চাপানো মেয়ে তো দু-বেলাই দেখছি। আবার শিয়ালদা-প্লাটফর্মের একপ্রান্তে বসে প্রতিদিন ফুটপাথের বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছেন, লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, এরকম মহিলাও তো কম নেই।
কিন্তু নারীর শরীর? আহা! সে এক অন্য অভিজ্ঞতা!
স্টেট ব্যাঙ্কের সামনের দোকানটা থেকে একটা কিং-সাইজ সিগারেট কিনে ঠোঁটে লাগালেন দীপেশ চ্যাটার্জী। দোকানদারের থেকে লাইটার চেয়ে নিয়ে সিগারেটটা ধরানোর পরে মনে পড়ল, পকেটেই দেশলাই ছিল। আজ লিমিটের থেকে দু-পেগ বেশি খাওয়া হয়ে গেছে। যাগগে। আজ একটা বিশেষ দিন। আজ পারমিতার সঙ্গে আলাপ হল।
মেয়েটার গলাটা কী সুন্দর! গলা বলতে গ্রীবা...কণ্ঠস্বর নয়। ওর কণ্ঠস্বর ভালো নয়, একটু হাস্কি। কিন্তু শ্যামলা মেয়েটির লম্বা গ্রীবাখানি যেন গঙ্গার পলিমাটি দিয়ে গড়া। সেরকমই ভিজে-ভিজে, নরম। ঠোঁট দিয়ে ছুঁলে নিশ্চয় দেখব গঙ্গামাটির মতনই ঠান্ডা।
সিগারেটে একটা টান দিয়ে দীপেশ মন দিয়ে ভাববার চেষ্টা করলেন, কী যেন কমিট করেছিলাম পারমিতাকে। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ওর ছেলেটাকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করে দেব বলেছি। হ্যাঁ, দেব তো। সত্যিই দেব। ওটা তেমন কঠিন কিছু নয়। রাজেশ বনশালের একটা ওইরকম স্কুল আছে। অটিস্টিক, স্লো-লার্নার, হাইপার-অ্যাকটিভ এইরকম বাচ্চাদের জন্যে। স্কুলটা খুব ভালো।
আর একটা চাকরি। না, এটাও কথার কথা নয়। দেব। সত্যিই দেব। অ্যান্ড শি ডিজার্ভস ইট। অমন ভালো অ্যাকাডেমিক-কেরিয়ার, কেন ছোট একটা কোম্পানিতে পড়ে থেকে রট করবে? কাল সকালে ভেবে দেখব, ওর চাকরির জন্যে কাকে বলা যায়।
মেয়েটার চোখে আজ মুগ্ধতা দেখেছি। সে তো প্রায়ই দেখে থাকি। নারীর মুগ্ধতা অর্জন করারও কিছু রীতিপদ্ধতি আছে; সেগুলো জানা থাকলে কাজটা মোটেই কঠিন নয়। শরীরই হোক কিম্বা মন—পুরুষের হাতে তুলে দেওয়ার আগে মেয়েরা তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাতে চায়। খুব শান্তভাবে ওই অপেক্ষাটুকু করতে হবে তোমাকে।
করব, পারমিতা। তোমার জন্যেই কলকাতা-বাসের দিনগুলো বোরিং হবে না মনে হচ্ছে।
ক’টা বাজল? ওরে বাবা, সাড়ে দশটা! এবার বাড়ি ঢুকতে হবে। ওয়েস্টবেঙ্গলের ইলেকশনে অবাঙালিদের গুরুত্ব নিয়ে যে-লেখাটা আর একটুখানি বাকি রয়েছে, পারলে ওটা আজ রাতেই শেষ করে ফেলব। পারব কি? ভাবনাগুলো একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কে এলোমেলো করে দিচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। পারমিতা না হুইস্কি? মেয়েটা সত্যিই বড্ড টানছে। মাথার মধ্যে একটা কবিতা জন্ম নিচ্ছে।
বড়-রাস্তা পার হয়ে যোধপুর-পার্কের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে দীপেশ প্রতি পর্বের শুরুতে তুড়ি বাজিয়ে আবৃত্তি করলেন,
ভীষণ টানছো...এই রোমাঞ্চ...সহজ নয়।
কিছুটা ভুল আর...কিছুটা উল্কার...সমন্বয়।
না, আর কিছু আপাতত মাথায় আসছে না। তবে এই দুটো লাইনকেও তাই বলে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। দীপেশ একটা ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে, মোবাইল ফোনে ওই দুটো-লাইন টাইপ করে পারমিতাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলেন।
কাজটা কি ঠিক হল? যাঃ, এখন ভেবে আর লাভ নেই। এর অভিঘাত কাল সকালে বোঝা যাবে।
বেল বাজাতেই শিখাদি দরজা খুলে দিল। শিখাদি আজ রাতে পারমিতার ফ্ল্যাটেই থাকবে; নাহলে এত রাতে আর ফিরবেই বা কেমন করে? এসব আপৎকালীন বন্দোবস্ত, মাসে এক-দুবারই বলে কয়ে ওকে রাজি করানো যায়। নিউটাউনের ফ্ল্যাটেও শিখাদিই বাবাইয়ের দেখাশোনা করত। জন্ম থেকেই বাবাই ওর কোলেপিঠে মানুষ। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরেও পারমিতা শিখাদিকে ছাড়েনি। মনে হয়, শিখাদিরও ছাড়বার ইচ্ছে ছিল না। বাবাইয়ের ওপর প্রবল মায়া আছে ভদ্রমহিলার।
কিন্তু শিখাদির একি হাল হয়েছে? চুল-টুল উস্কোখুস্কো। মুখ থমথমে। পারমিতা দরজাটা বন্ধ করতে-করতেই জিগ্যেস করল, কী হয়েছে শিখাদি?
শিখাদি রাগী গলায় বলল, আমি আর বাবুসোনাকে রাখতে পারব না, দিদি। দেখুন আমার কী অবস্থা করেছে। হাতদুটো পারমিতার দিকে বাড়িয়ে ধরল শিখাদি। পারমিতা দেখল সারা হাতে আঁচড়ের দাগ। দেখে আঁতকে উঠল।
শিখাদি প্রায় ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে চলল, আপনাকে এসব কথা বলি না দিদি, মায়া হয় বলতে, কিন্তু আপনি চোখের আড়াল হলেই বাবুসোনা আজকাল খ্যাপামি শুরু করে দিচ্ছে। আপনি অফিসে থাকার সময়টা তবু একটু কম পাগলাপনা করে, ওটা বোধহয় অভ্যেস হয়ে গেছে। কিন্তু সন্ধেবেলাটায় যদি আপনাকে না পায়, তাহলে সাংঘাতিক রেগে যায়।
পারমিতা যে ঠিক কার ওপরে রাগ দেখাবে বুঝতে না পেরে শিখাদিকেই খেঁকিয়ে উঠল, তাহলে কী করব আমি? সারাদিন ছেলে কোলে করে বাড়িতে বসে থাকব? তোমাকে তাহলে রেখেছি কী করতে? শিখাদি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। তারপর রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ঠিক তখনই শোয়ার ঘরের পর্দার আড়াল সরিয়ে বাবাই ঠিক সেইভাবে ছুটে এল, যেভাবে চা-গাছের আড়াল থেকে ছুটে আসে চিতাবাঘ। চিতাবাঘ যেভাবে চা-বাগানের পাতা-তুলুনি মেয়েকে কামড়ে ধরে, সেইভাবেই পারমিতার একটা পা জড়িয়ে ধরে বাবাই প্রাণপণে ওর ঊরুতে দাঁত বসিয়ে দিল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় পারমিতা বাবাইয়ের কাঁধটা ধরে ওকে ঠেলে দিল। বাবাই ছিটকে মেঝের ওপরে গিয়ে পড়ল। তারপর মেঝের ওপরেই চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে, মুখটা নীচের দিকে নামিয়ে, অদ্ভুত এক আওয়াজ করতে শুরু করল, যেটাকে কান্নাও বলা যায়, গর্জনও বলা যায়।
ওর পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে শিখাদি বাবাইকে কোলে তুলে নিল। তারপর খুব কড়া গলায় পারমিতাকে বলল, ছিঃ দিদি! ওর মনের কষ্ট বুঝতে পারো না? হঠাৎ করে যে বাবা বলে লোকটাকে দেখতে পাচ্ছে না, তার জন্যে বাচ্চা মানুষের মনটা শুলোবে না? চলো বাবুসোনা, কেঁদো না। তোমাকে আমি হাঁকাবুড়োর গল্প বলে দেব।
আর কোনও কথা না বলে পারমিতা শোয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। যে-অবস্থাতে ছিল, সেই অবস্থাতেই চোখের ওপরে হাত চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়।
ওর ভয় করছিল। বাবাই যে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে সেটা ও নিজেও বুঝতে পারছে। নতুন নতুন জটিলতা তৈরি হচ্ছে ছেলেটার মনে। শিখাদি ঠিক বলেছে। আজকাল মাঝেমাঝেই ও বাবার খোঁজ করে, বাবাকে দেখতে চায়। কেন? ওরও কি খুব একা লাগে, অসহায় মনে হয় নিজেকে? বাবাইও কি সারাক্ষণ ওর মায়ের মতোই আতঙ্কে ভোগে? কাকে এসব কথা জিগ্যেস করবে পারমিতা? কার কাছে যাবে?
জয়াদি আর অলোকদার কাছে? ওরা পারবে না, পারমিতা জানে। অ্যাবনরমাল সাইকোলজি সম্বন্ধে ওদের কোনও জ্ঞান নেই, কোনওদিন দরকার পড়েনি। দে আর হ্যাপি ইন দেয়ার ওন ওয়ে। আর আজকের দিনে তো পারমিতা ওদের এসব কথা বলবেই না।
কিছুদিন আগে হলেও হয়তো পারমিতা এরকম ক্রাইসিসে কল্যাণদার সাহায্য চাইত। কিন্তু গত সপ্তাহের পর থেকে সেই রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য একটা প্রয়োজনে সে গত সপ্তাহে কল্যাণদাকে ফোন করে জিগ্যেস করেছিল, তিনি ওকে কিছুক্ষণ সময় দিতে পারবেন কিনা। কল্যাণদা পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, আসিস না। তোর ডিভোর্সের পর থেকে মলি তোকে পছন্দ করছে না। তুই আমার বাড়িতে এসে অপমানিত হোস সেটা আমি চাই না।
কল্যাণদার কথা শুনে পারমিতা একজন শুভার্থীকে হারানোর কষ্ট পেয়েছিল। তার বেশি কিছু নয়। বাকিটা ওর অভ্যেস হয়ে গেছে। ও জানে, ও এখন সেই শ্রেণীতে অবস্থান করে, ভদ্রসমাজ যাদের গলায় নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়—নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। মলিবউদি অন্যরকম নন।
ফোনটা নিয়ে যখন ও নাড়াচাড়া করছিল, তখনই হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ ঢুকল। দীপেশ পাঠিয়েছেন। কী লিখেছেন উনি?
পারমিতা ফোনটা নিয়ে বাইরের একচিলতে বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াল। নীচের রাস্তায় মাতালের গান, কুকুরের চিৎকার। উত্তুরে হাওয়ায় পাশের বস্তি থেকে হিংস্র কলহের শব্দ ভেসে আসছে। অথচ মাথার ওপরে অসামান্য এক তারা-গাঁথা আকাশ। যেন কান পাতলে সান্তা ক্লজের স্লেজগাড়ির ঘণ্টার টুং টাং শব্দ শোনা যাবে।
পারমিতা দীপেশের পাঠানো মেসেজটা এক-দুবার পড়ে মানে বুঝবার চেষ্টা করল। কবিতার লাইন বলেই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু এখন কবিতা পড়ার মতন মন নেই তার। সে আর কিছু না ভেবে দীপেশকে ফোন করল। কোনও ভূমিকা ছাড়াই বলল, আপনার পরিচিত কোনও সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন? বাবাইকে একবার দেখাতাম।
এক-মুহূর্তও না ভেবে দীপেশ বললেন, কাল তো হবে না। কাল আমার একটা জরুরি কাজ আছে। পরশু ছুটি নাও। আমি তোমাকে আর বাবাইকে তোমাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাব। দুপুর দেড়টায়। ঠিক আছে? চিন্তা কোরো না।
পারমিতা ওকে শুভরাত্রি জানিয়ে ফোনটা কেটে দেওয়ার পরে দীপেশ মনে-মনে বললেন, এই যে তুমি এত অসংকোচে আমার কাছে এত কিছু চাইছ পারমিতা, এর মানে, তুমি আমাকে এই সবকিছুর জন্যেই মূল্য ধরে দেবে। সে-ব্যাপারে তুমি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছ, তাই না? প্রশ্ন হচ্ছে কবে দেবে এবং কোথায় দেবে। এইতো এজমালি বাড়িতে একখানা মাত্র ঘর আমার। এখানে তো তোমার সঙ্গে শোওয়া যাবে না। হোটেলে? না। রিস্কি হয়ে যাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন