সাত

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক ফাল্গুনের সন্ধ্যায় অনুপম মিত্রের সঙ্গে পারমিতা ঘোষালের বিয়ে হয়ে গেল। একটা সুবিধে ছিল যে, কোনওপক্ষেই আত্মীয়স্বজন তেমন ছিল না। দু-তরফ মিলে রিসেপশনের আয়োজন করা হয়েছিল। জগৎপুর থেকে এসেছিলেন শুধু রুমির কাকুমণি আর কল্যাণ বাড়ই।

বিয়ের আগে রুমি একদিন অনেক দোনামনার পরে পালবাড়িতেও ঢুকে পড়েছিল। জ্যাঠাইমাকে বিয়ের খবরটা তো জানানো দরকার ছিল বটেই, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল রাতুলকে জানানো।

না, বিয়ের খবরই শুধু নয়। ওর মনে হয়েছিল এই সেই সময়, যখন আর একবার...শেষবার...রাতুলকে স্পষ্ট করে বলা দরকার যে, আমি তোমাকে সত্যিকারেই ভালোবাসতাম। সেই ভালোবাসাকে গলা টিপে মারতে গিয়ে আমি যে যন্ত্রণা পেয়েছি, তুমি তার থেকে বেশি পাওনি। তবু সত্যি এটাই, সেই ভালোবাসা আজ মৃত।

বাস্তবে অবশ্য সেদিন রুমি বিয়ের কথাটুকু বাদে আর কিছুই বলে উঠতে পারেনি রাতুলকে। ওদের বাড়ির দিকে যাওয়ার সময়, নিজেদের বাড়ির গলির মুখটায় এসে পৌঁছনোমাত্র, অতর্কিতে অনেক দিন আগের এক দুপুরের স্মৃতি ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। ওর আর পা চলছিল না।

জগৎপুরের মতন এই মফস্বল শহরগুলোর বহিরঙ্গ এত কম বদলায়, দিনের পর দিন এতই একরকম থেকে যায় যে, স্মৃতির হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া বড্ড কঠিন হয়ে পড়ে। এই তো সেই গলির মুখে যামিনী মুখুজ্জেদের বাড়ির নোনা-লাগা পাঁচিল। এই তো সেই পাঁচিলের ওপাশ থেকে ছড়িয়ে-পড়া গুলঞ্চ গাছের ডালপালা। পাঁচবছর আগেও জায়গাটা ঠিক একইরকম ছিল। এখানে দাঁড়িয়েই সে রাতুলকে বলেছিল, তুমি মুখে না বললেও কিছু যায়-আসে না। মা-মরা ছেলেমেয়েরা ভালোবাসা জিনিসটা খুব ভালো চিনতে পারে, কেমন? পালাও এবার। কাল এইসময়ে এখানেই এসো।

রুমি মনে-মনে নিজেকে বলে, রাতুলের তো কোনও দোষ ছিল না, রুমি! তুমিই ওকে খেলায় ডেকেছিলে। তারপর তুমিই আবার নিজের বিবেচনায় খেলা ভেঙে দিয়েছিলে। তার সঙ্গে ভেঙে দিয়েছিলে একজন মানুষের মন। কী ভেবেছিলে তুমি? ও সবকিছু অনায়াসে ভুলে যাবে। দেখতে-দেখতে আবার ঘায়ের ওপরে নতুন চামড়া গজিয়ে উঠবে। অত সহজে সবকিছু ভোলা যায়? তুমি নিজে পেরেছ?

এই মনখারাপ নিয়েই সেদিন রুমি রাতুলের ঘরে ঢুকেছিল। তাই বিয়ের খবরটা দেওয়ার পরে আর কিছুই বলতে পারেনি। কেঁদে ফেলেছিল। কাঁদতে-কাঁদতেই ভেবেছিল, নিজের অগোচরে এত কান্নাও বুকের মধ্যে জমে থাকতে পারে!

রাতুলও ওর সামনে ঠিক ওর মতনই মুখ নীচু করে বসেছিল। একটু বাদে মুখ তুলে ওর ডানহাতের পাতাটা নিজের হাতের মধ্যে আলতো করে ধরে বলেছিল, কেঁদো না।

খুব পরিচিত সেই চওড়া হাতের চেটোটা তখন বরফের মতন ঠান্ডা। সেটা বুঝতে পেরে রুমি রাতুলের হাতটা আঁকড়ে ধরেছিল। ও চেয়েছিল নিজের সমস্ত তাপ ওকে দিয়ে দিতে। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গেই রাতুল হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খুব কেজো-গলায় বলেছিল, এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চললে কেন? তুমি যে বলেছিলে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন কিংবা ম্যানেজমেন্ট একটা কিছু করবে।

রুমি বুঝতে পেরেছিল, রাতুল ওকে স্বাভাবিকতায় ফেরাতে চাইছে। নিজেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরতে চাইছে স্বাভাবিকতায়। ওর সেই ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়ে রুমি নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে স্থিরদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, করব। আপাতত অনুপম একবছরের জন্যে একজিকিউটিভ এম.বি.এ. পড়তে ঢুকছে, জোকায়। ওকে তার জন্যে চাকরিটা ছাড়তে হবে। এই একবছর আমি ওকে সাপোর্ট দেব। তারপর ও পাশ করে বেরিয়ে চাকরিতে ঢুকলে আমি ওই একই কোর্সে পড়তে ঢুকব।

মুখে যখন এইসব কথা বলছে, মনে-মনে তখন রুমি বলছিল, ঠিকই বলেছ রাতুল। বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি না করলেই হত। কিন্তু ভাবো তো, একটা মেয়ে জীবনের পথে কতদিন একলা হাঁটতে পারে? ছোটবেলা থেকে বাবাকে দেখছি পাগল। মা তো চলেই গেল। কাকা পালিয়ে বেড়ায়। আর তুমি...আমিই তোমার সঙ্গে থাকতে চাইলাম না।

খুব একা ছিলাম বলেই বোধহয় এত তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে ফেলছি। জানি না, ঠিক করছি না ভুল করছি।

না, রাতুলকে সেদিন এসব কিছুই বলেনি রুমি। বলা যায় না। বরং যেটা বলা যায়, যেটা বলবে বলে গিয়েছিল, সেটাই বলেছিল। তুমি আমার বিয়েতে আসবে, রাতুল?

রাতুল একটু থতমত খেয়ে বলেছিল, না, আমাকে ওইসময় কয়েকদিনের জন্যে শিলিগুড়ি যেতে হবে। টিকিট কাটা হয়ে গেছে।

রাতুল কোনওদিনই খুব সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারে না। ও জিগ্যেসও করেনি রুমির বিয়ের রিসেপশন কবে। তার আগেই বলে দিল, ওর ওইসময় শিলিগুড়ি যাওয়ার টিকিট কাটা আছে। তা হোক, রুমি বুঝতে পেরেছিল রাতুলের পক্ষে ওকে বধূবেশে দেখা তখনও অসম্ভব। সেইজন্যেই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল ওকে। রুমিও আর জোর করেনি। আর কিছু না বলে সেদিন পালবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%