সৈকত মুখোপাধ্যায়

বি.ই. পরীক্ষার শেষ সেমিস্টারের রেজাল্ট বেরোতে তখনো কিছুদিন দেরি ছিল। তবে ক্যাম্পাসিং শুরু হয়ে গিয়েছিল। আগের সেমিস্টারগুলোর পার্সেন্টাইল-মার্কসের দৌলতে সেই-ক্যাম্পাসিং-এর একদম প্রথমদিনেই রুমি আই.টি. সেক্টরের বিগ ফোরের মধ্যে একটিতে চাকরি পেয়ে গেল।
আনন্দ তো হচ্ছিলই রুমির, একইসঙ্গে একটু দিশাহারাও লাগছিল। এরপর সে কোথায় যাবে? কাদের সঙ্গে থাকবে?
হয়তো আরও বছরখানেক গড়িমসি করে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির উইমেন্স-হস্টেলেই সে কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু রুমির ইচ্ছে করছিল না আর ওখানে থাকতে। তার ক্লাসমেটরা প্রায় সকলেই ইতিমধ্যেই হস্টেল ছেড়ে চলে গেছে। আড্ডা ভেঙে গেছে। এখন হাতে গোনা যে-কয়েকজন বন্ধু রয়েছে, তাদের সঙ্গে সন্ধের দিকে একবার ঝিলপাড়ে গিয়ে বসা হয় ঠিকই, তবে এখন সেই আড্ডায় হুল্লোড়ের চেয়ে দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে বেশি। খেলা ভাঙার খেলা যে শুরু হয়ে গেছে সেটা ওরা সকলেই বুঝতে পারে।
তাছাড়া প্রতিদিন যাদবপুর থেকে সল্টলেক সেক্টর ফাইভ অবধি যাতায়াত করাটা বেশ কঠিন। যাতায়াত করতে গেলে একেক পিঠে অনেকটা সময় লেগে যায়।
একটু দিশেহারা হয়েই রুমি অফিসের প্রথমদিনে যে টিম-লিডারের সঙ্গে আলাপ হল, তাকেই নিজের সমস্যার কথা বলে ফেলল। পরামর্শ চাইল, কী করি বলুন তো।
সেই টিম-লিডারের নামই অনুপম মিত্র। রুমিদের থেকে বছর পাঁচেকের সিনিয়র। অ্যাকাডেমিক রেকর্ড ভালো। কথাবার্তায় চৌকস। ছোটখাটো চেহারা, গায়ের রঙ ফরসা। পিনস্ট্রাইপ শার্ট, কালো ট্রাউজার আর দামি জুতোয় আগাপাস্তালা কর্পোরেট লুক।
রুমির কথা শুনে তাকে সেদিন নিজের কিউবিকলে ডেকে নিয়েছিল অনুপম। তার মুখেচোখে সহানুভূতি ফুটে উঠেছিল। একদিন নয়, পরপর বেশ কয়েকদিন ও হয় অফিস-আওয়ারের মধ্যে রুমির সঙ্গে নিজের কিউবিকলে বসে কথা বলত আর না-হলে অফিসের শেষে রুমির সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে চলে যেত টেকনোপলিসের সামনের বাসস্ট্যান্ড অবধি।
প্রায় সাতটা কাজের দিনে এরকমই চলল। অনুপম খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জানতে চাইত রুমির বাড়ির কথা, ওর পড়াশনার কথা। রুমি খুব বেশি সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলতে পারত না কোনওদিনই। তাই অনুপমের প্রশ্নের উত্তরে মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তার কারণটুকু বাদ দিয়ে আর সবটাই বলে দিয়েছিল অনুপমকে।
বয়ফ্রেন্ড আছে তো? বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎই একদিন প্রশ্ন করে বসেছিল অনুপম।
উঁহু। নেই। একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিল রুমি।
সেকি রে! বাস্তবিকই অবাক হয়েছিল অনুপম। ফুটপাথের ওপরে দাঁড়িয়েই পড়েছিল ওর মুখের দিকে চেয়ে। তারপর চোখ গোলগোল করে বলেছিল, ভালোবাসিসনি কাউকে? এতদিন যাদবপুর ইউনিভার্সিটির হস্টেলে থেকে এলি, প্রেম করলি না? কেন?
কাউকে ভালোবাসতে পারিনি বলে।
যা সত্যি সেটাই বলেছিল রুমি। স্টুডেন্ট-লাইফের ওই তিনবছরে কাউকে ভালোবাসতে পারেনি ও। ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার আগেই খুব তীব্র এক ভালোবাসার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়ে গিয়েছিল বলেই হয়ত। নতুন প্রেমিকদের চোখের দিকে তাকালে ওর রাতুলের কথা মনে পড়ে যেত। ও ভাবত, কী করছে এখন রাতুল। এই যে ছেলেগুলো পড়াশোনা করে সাফল্যের সিঁড়ি বানাচ্ছে, অর্থ চাইছে, সুখ চাইছে, শরীর চাইছে...সেই ছেলে এখন কী করছে? সে কি এই মুহূর্তে তার বাবাকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে জগৎপুরের রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছে নীলকুঠির মাঠের দিকে?
ভাবতে-ভাবতে রুমি অন্যমনস্ক হয়ে যেত আর তার চোখে অন্যমনস্কতা দেখে সেই নতুন প্রেমিকেরা চলে যেত অন্য কোনও মেয়ের কাছে; পারমিতারই অন্য কোনও সহপাঠিনীর কাছে। তাতে পারমিতার কিছু এসে যায়নি।
না। রাতুলের কথাও কোনওদিন রুমি অনুপমকে বলেনি। সেদিনও নয়, তার পরেও কখনো নয়। মুখের কথায় ধরা যায় না এমন একটা বিষয় বলে মনে হত তার ওই সম্পর্কটাকে। তাকে শুধু ভুলে থাকার চেষ্টা করা যায়।
অনুপমও ওর চোখে সেই অন্যমনস্কতা লক্ষ করেছিল কিনা তা জানে না রুমি। তবে ঠিক এক-সপ্তাহের মাথায় সে এক জাদুকরের মতন রুমির জন্যে ওদের অফিসের প্রায় গায়েই অপূর্ব একটা দুই-কামরার ফ্ল্যাট জোগাড় করে দিয়েছিল; ফার্নিশড ফ্ল্যাট। খাট, কাবার্ড, ফ্রিজ থেকে শুরু করে গ্যাস-আভেন দিয়ে চমৎকারভাবে সাজানো সেই ফ্ল্যাটের ভাড়াটাও ছিল আশ্চর্য হওয়ার মতন কম।
নতুন ফ্ল্যাটের সাত-তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রুমি দেখল, নিউটাউনের বহুতল বাড়ির ঢেউ বহুদূরে যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে ঘষা-কাচের আয়নার মতন ভেড়ির জলাভূমি আর কৃষিখেতের সবুজ। তারপর সে তাকাল পাশের দিকে।
এতদিন অবধি রুমি যে-ক’জন পুরুষকে চিনত তারা হয় তারাপদ ঘোষালের মতন অর্ধোন্মাদ কিংবা রমাপদ ঘোষালের মতন সঙ্কুচিত। হয় রাতুলের মতন আত্মমগ্ন কিংবা তার কলেজের অধিকাংশ বন্ধুর মতন কবিতা, সমাজবিপ্লব ইত্যাদি নিয়ে কথা বলা রোমান্টিক-বাচাল।
কিন্তু এই যে অনুপম মিত্র নামে যুবকটি এই-মুহূর্তে তার পাশে দাঁড়িয়ে তারই মতন দূরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, সেই-দৃষ্টিতে কোনও পাগলামি নেই, অস্থিরতা নেই, সঙ্কোচ নেই, অলীক-কল্পনাও নেই। বরং তার কঠিন চোয়াল আর বারান্দার রেলিঙটাকে শক্ত করে ধরে থাকা দুই-মুঠির মধ্যে যেটা রয়েছে, সেটাকে ইংরিজিতে বলে ডিটারমিনেশন।
রুমি মনে-মনে বলল, এইরকম একজন পার্টনার পেলে বড় ভালো হত। এরও চোখ আমার মতন দিগন্ত দেখে।
ঠিক তখনই অনুপম হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে রুমির চোখে চোখ রেখেছিল। বলেছিল, কী দেখছিস অমন করে?
না, কিছু না। রুমি মুচকি হেসে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
ওকে অবাক করে দিয়ে অনুপম বলেছিল, একটা কথা ভাবছিলাম, জানিস, উই কুড বি ভেরি গুড পার্টনারস।
এ তো ঠিক সেই কথাটাই, যেটা রুমি একটু আগে ভেবেছিল। মনের বিস্ময় মনেই লুকিয়ে রেখে ও জিগ্যেস করেছিল, কেন? তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন?
ও বলেছিল, আমি মনে-মনে একটা ট্রায়াল-ব্যালেন্স বানাচ্ছিলাম—আমার কী আছে আর কী নেই। তোর কী আছে আর কী নেই। দেখলাম, আমরা একে অন্যকে খুব সুন্দরভাবে কমপ্লিমেন্ট করতে পারি।
রুমির খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। এগুলো কি প্রেমের ভাষা? নাকি বিজনেস-ডিল? যাই হোক, ওর কথাগুলো শোনা দরকার।
সেদিন সন্ধের পরে খুব জোরালো একটা বাতাস ছেড়েছিল। ঠোঁটের ডগা থেকে কথা ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার মতন বাতাস। তাই রুমি বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। পিছন-পিছন অনুপম।
ঘরে ঢুকে রুমি অনুপমকে জিগ্যেস করল, একটু এক্সপ্লেন করবে?
এক্সপ্লেন করেছিল অনুপম। বলেছিল, আমি এই ইন্ডাস্ট্রিতে তোর চেয়ে অনেক সিনিয়র। ন্যাচরালি, আমার কাছে নলেজ আছে, ইনফর্মেশন আছে। এগুলো তোর কাজে লাগবে।
রুমি তখনো জিজ্ঞাসু চোখে অনুপমের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। ও জানতে চাইছিল, ওর কাছ থেকে অনুপম কী প্রত্যাশা করছিল।
সেই উত্তরটাই অনুপমের মুখ থেকে বেরিয়ে এল। ও বলল, দেখ, আমি চিরকাল খুব সিকিওরড একটা লাইফ কাটিয়েছি। মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে বাবা-মা ছেলেকে যেভাবে আগলে-আগলে বড় করে সেইভাবেই বড় করেছে আমাকে। ফলে আমি খুব অল্পে ভেঙে পড়ি।
তারপর রুমির দিকে দু-পা এগিয়ে এসে বলেছিল, তোর লাইফ-হিস্ট্রি শুনে বুঝলাম, তোর ভেতরে একটা স্টিল আছে...ইস্পাত। তুই পাশে থাকলে ওইসব দুর্বল-মুহূর্তগুলোয় আমাকে একটু খাড়া রাখতে পারিস।
রুমির ভীষণ অবাক লাগছিল। এই আপাতদৃষ্টিতে স্মার্ট এবং পারফেকশনিস্ট যুবকটি নিজেকে বলছে দুর্বল! বলছে মেন্টাল সাপোর্ট চাই!
সেদিন ওই অবধিই কথা হয়েছিল। কিন্তু তারপরে কথা থেমে থাকেনি। প্রায়ই অফিসের পরে রুমি আর অনুপম দুজনে মিলে রুমির ফ্ল্যাটে চলে যেত। দু-বার অনুপমের গাড়িতে কলকাতার একটু বাইরে, নদীর ধারে সারাদিন কাটিয়ে এসেছে।
অনুপমের সান্নিধ্যে রুমি একটা স্বস্তি পেত, যেরকম স্বস্তি ও যাদবপুরে নিজের ঘনিষ্ট বন্ধুদের মধ্যে থেকেও পায়নি। এখন ভাবতে বসলে রুমি তার কারণটা বুঝতে পারে। অনুপমের দর্শন ছিল না, রাজনীতি ছিল না, কবিতা ছিল না, সাহিত্য ছিল না। ও যে বেড়াতে ভালোবাসত কিংবা ছবি তুলতে, তাও না। হিন্দি সিনেমার গান, বিশেষত কিশোর ও আশাজির গান ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে ওর কোনও প্যাশনের পরিচয় পায়নি পারমিতা।
সেটাই ছিল পারমিতার স্বস্তির কারণ। ওর নিজের সারা বাল্য এবং কৈশোরের সাংস্কৃতিক শূন্যতা, ইউনিভার্সিটির তিনটি-মাত্র বছর যে তেমন করে পূর্ণ করতে পারেনি, সেটা ও নিজেও বুঝতে পারত। অনুপম যদি ওর সঙ্গে বার্গম্যানের সিনেমা কিংবা মিলান কুন্দেরার উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে চাইত তাহলে ওর পক্ষে দূরে সরে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকত না।
না, অনুপম সেরকম কিছু করেনি। বরং ও যেটা চেয়েছিল সেটাই ছিল পারমিতার পক্ষে সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। কেরিয়ার।
মাঝে-মাঝে পারমিতার সন্দেহ হয়, অনুপমের ওকে পছন্দ করার কারণটাও কি একই ছিল? ও-ও কি চেয়েছিল এমন একজন প্রেমিকা যে ওকে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে বিব্রত করবে না?
তাই হবে। ওদের মধ্যে কথা হত অন্য আই.টি. কোম্পানিতে স্যুইচ ওভার এবং বিদেশে ম্যানেজমেন্ট পড়তে যাওয়া নিয়ে। গাড়ি এবং ফ্ল্যাট কেনা নিয়ে।
এসবের মধ্যেই কখনো-কখনো রুমির মনে পড়ত, অনেক দিন আগে রাতুল নামে একটি ছেলে তাকে প্রশ্ন করেছিল, আমাকে তুমি ভালোবাসো কেন? সে উত্তর দিয়েছিল, তুমি আমাকে ভালোবাসো বলে। বলেছিল, তাছাড়া তোমার গায়ের ঘাম আর মাটি মেশানো গন্ধটা আমার খুব ভালো লাগে।
ঠিক একই প্রশ্ন যদি ওকে অনুপম করত? রুমি জানে না ও কী উত্তর দিত, কারণ, বিয়ের আগে ও কোনওদিন অনুপমের গায়ের গন্ধ পায়নি। বিয়ের পরেও না। অনুপম অসম্ভব সুগন্ধ-বিলাসী পুরুষ। ওর শরীরে চব্বিশ-ঘণ্টাই নানান দামি ব্র্যান্ডের ডিওড্রেন্টের গন্ধ লেগে থাকে—বাইরে থেকে ফিরে চান করার পরেও যে-গন্ধ ওর শরীর থেকে যায় না।
অনুপম ওকে ভালোবাসে কিনা সে-ব্যাপারেও নিশ্চিত নয় রুমি, যেমনটা ছিল রাতুলের ক্ষেত্রে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন