পাঁচ

সৈকত মুখোপাধ্যায়

পালবাড়িতে একটা বছর ষোল-সতেরোর ছেলে আছে, নাম রতন। সারা-বছর অন্য মিস্ত্রিদের সঙ্গে হাতে-হাতে নানারকমের কাজ করলেও, রতনের একটা বাঁধা কাজ আছে, যেটা শুধু ওই করে। বছরে এক-দুদিনের কাজ। সেটা আর কিছুই নয়, দুর্গাঠাকুর জলে পড়লে, নদীতে সাঁতার কেটে গিয়ে সেই ঠাকুরকে ধরা। তারপর কোমরে গুঁজে-রাখা হাতুড়ির ঘায়ে ঠাকুরের মুখটা ভেঙে দেওয়া। বিসর্জন দিয়ে ঘাট থেকে আর সবাই চলে গেলে রতনের কাজ শুরু হয়।

রাজেনবাবু কিম্বা রাতুলের মতন প্রতিমা-শিল্পীদের কাছে কাজটা খুব জরুরি। এটা না করলে অন্য-ঘরের কুমোরদের হাতে তাদের হাতে তৈরি মুখ পড়ে যাবে। তারপর সেই মুখ থেকে প্লাস্টারের ছাঁচ বানিয়ে নিতে আর কতক্ষণ লাগে? ঠাকুরের মুখই তো সব।

জগৎপুরের পালবাড়ির বানানো কোন প্রতিমাটি কখন জলে পড়ছে, রতন সব খেয়াল রাখে।

সে-বছর দশমীর দিন একটু বেলাবেলিই ব্যানার্জীপাড়ার ছেলেরা তাদের ক্লাবের ঠাকুরটাকে ভাসান দিতে নিয়ে এল। যত রাত বাড়বে, ততই আলোর মালায় চোখ ধাঁধিয়ে, পঞ্চাশজন পালক-ঢাকির বহর সাজিয়ে, জগৎপুরের বড়-বড় ক্লাবগুলো আসতে শুরু করবে। তার মধ্যে নিজেদের ছোট্ট আড়ম্বরহীন শোভাযাত্রাটা নিয়ে আসতে ওদের বোধহয় লজ্জাই করেছিল, তাই বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ওরা একটা ভ্যান-রিকশায় ঠাকুর নিয়ে ঘাটে চলে এসেছিল।

রতন কিন্তু সেখানে মজুত ছিল। ও জানে, ছোট হলেও এই ঠাকুরের মুখটা ছোড়দা অনেক খেটেখুটে বানিয়েছে। ছাঁচের নয়, হাতে-গড়া মুখ। ভারি আশ্চর্য মুখ। বিষাদ আর আত্মবিশ্বাস যেন প্রতিমার দুই-চোখে একইসঙ্গে খেলা করছিল। রতন অনেকদিন কুমোরবাড়িতে কাজ করছে। কিন্তু অমন রোগা আর সটান শিরদাঁড়াও আর কাউকে তৈরি করতে দেখেনি সে। এই মুখ ভেঙে ফেলা খুব দরকার। পারলে সে পুরো ঠাকুরটাকেই গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিত।

ব্যানার্জীপাড়ার ছেলেরা ভাসান দিয়ে যখন চলে গেল, তখনও ভালো করে অন্ধকার হয়নি। নদীতে এখন ভাঁটার টান। ব্যানার্জীপাড়ার ঠাকুর তীরের কাছ দিয়েই খুব ধীরে-ধীরে ভেসে চলে যাচ্ছিল। গেরুয়া জলের নীচে আর সবই অদৃশ্য। শুধু মুখ আর দুটো মুঠি পাকানো হাত জলের ওপরে জেগে ছিল। রতন এতক্ষণ ঘাটের একপাশে চুপ করে বসেছিল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু জলে নামার আগেই তার কাঁধের ওপরে এসে পড়ল একটা ভারী হাত। রতন চমকে মুখ ফিরিয়ে দেখল ছোড়দা, রাতুল পাল।

ছেড়ে দে, বলল রাতুল।

রতন কোমরে গুঁজে রাখা হাতুড়িটায় হাত বোলাতে-বোলাতে অবাক গলায় বলল, মানে? ভাঙব না?

না। এই মুখটা ভাঙবার দরকার নেই। শুধু এই মুখটা।

আর কোনও কথা না বলে রাতুল সিঁড়ি ভেঙে রাস্তায় উঠে গেল। আর একবারও নদীর দিকে ফিরে তাকাল না।

তারপরেও সেই নদী দিয়ে কত জল বয়ে গেল। ভেসে গেল রাতুলের অন্যমনস্ক-হাতে গড়ে তোলা কত প্রতিমা। কেটে গেল আরও চারটে বছর।

প্রতিমার দিকে না তাকালেও রুমির দিকে তাকাতেই হত রাতুলকে। কথা বলতে হত তার সঙ্গে। এক-দুমাসের ব্যবধানে রুমি রাতুলকে কলকাতা থেকে ফোন করত, মানে, করতে বাধ্য হত। রাতুল ছাড়া আর কার কাছেই বা ও ঠাকুমার খবর, ওর বাবার খবর পাবে? কাকা তো জগৎপুরে থাকেই না। তাই ও রাতুলকে বলেই রেখেছিল, আমি কিন্তু মাসে একবার করে তোমাকে জ্বালাব, রাতুল। তুমি রাগ করতে পারবে না।

না, রাগ করব কেন? খুব স্বাভাবিক স্বরে রাতুল উত্তর দিয়েছিল।

রুমি বুঝতে পারত কাজটা অন্যায় হচ্ছে। রাতুলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে রাতুলের যেমন কষ্ট, তেমন কষ্ট ওর নিজেরও। তবু নিতান্ত আর কোনও উপায় ছিল না বলেই ওকে ফোন করতে হত। জিগ্যেস করত, বাবার শরীর কেমন আছে। কাকু এসেছিল কিনা। বাবা কি আগের মতোই ঘন-ঘন বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, না সেই খেয়ালে একটু ভাঁটা পড়েছে।

রাতুল শান্তভাবে ওর প্রতিটি কথার উত্তর দিত।

প্রতিবার ফোন রাখার আগে রুমি রাতুলকে জিগ্যেস করত, তুমি কেমন আছ রাতুল?

প্রতিবারই রাতুল খুব নিস্পৃহস্বরে জানাত যে, ও ভালো আছে।

তাছাড়াও রুমি বছরে দু-বার জগৎপুরে আসত—একবার গরমের ছুটিতে আর একবার পুজোয়। জগৎপুরে ও কখনোই সাতদিনের বেশি থাকত না। তবু সেই সাতদিনের মধ্যে অন্তত একবার ও রাতুলের সঙ্গে দেখা করতই; তবে সেটা আর নির্জনে নয়। ও সরাসরি পালবাড়িতেই চলে আসত।

রাতুলের মা যূথীদেবী এই মা-মরা মেয়েটাকে বরাবরই খুব ভালোবাসতেন। তিনি রুমি এলে খুশি হতেন। রুমির হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে তিনি রুমির কলেজের গল্প শুনতে চাইতেন।

ওরা কী খেতে দেয়? রান্নাগুলো মুখে তুলতে পারিস? ওইটুকু খাবারে পেট ভরে? এরকম রঙচটা একটা জামা পরে বেরিয়েছিস কেন? কীরকম তোদের কলকাত্তাইয়া স্টাইল বুঝি না বাপু। চুলে একটু তেল দিতে পারিস না?

ওরা একতলার দালানে বসে কথা বলত। রাতুল তখন যদি একতলায় থাকত, তাহলে মা আর রুমির কিছু কথোপকথন ওর কানে আসত। কিছুক্ষণ বাদে ও ওদের পাশ কাটিয়ে দোতলায় নিজের ঘরে উঠে যেত।

ও প্রাণপণে প্রার্থনা করত রুমি যেন না আসে। কিন্তু রুমি আসত। কিছুক্ষণ বাদেই রুমি দোতলায় উঠে আসত। বলে যেত হাবিজাবি নানান কথা। রাতুল হ্যাঁ-না করে তাল রেখে যেত। কিন্তু রুমি তো কোনওকালেই তেমন বাকপটু নয়, তাই একটু বাদেই ওর কথা ফুরিয়ে যেত। তখন ও রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। অস্বস্তি এড়াতে রাতুল চোখের সামনে যে-কোনও একটা ছবির অ্যালবাম তুলে নিত।

এরকমই একদিন, অন্য সমস্ত গতানুগতিক কথা ফুরিয়ে যাওয়ার পরে রুমি হঠাৎই মরিয়ার মতন বলে উঠল, তুমি আর কষ্ট পাও না তো, রাতুল?

রাতুল মুখের সামনে বই ধরে রেখেই বলল, নাঃ। কষ্ট পাব কেন? আমি খুব ভালো আছি।

রুমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ভুলে যেও ওই ক’দিনের কথা।

এইবার রাতুলের চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল। সে হাত থেকে বইটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, আমি কী ভুলব না ভুলব, সেটা আমাকেই ভাবতে দাও। আমি বাচ্চা ছেলে নই। আমার কথা ভেবো না; তুমি তোমার কেরিয়ার নিয়ে এগিয়ে চলো।

সঙ্গে-সঙ্গে রুমির মুখটাও কঠিন হয়ে উঠল। এতক্ষণ সে রাতুলের বিছানার কিনারায় আলগোছে বসেছিল। এবার শক লাগার মতন উঠে দাঁড়িয়ে বলে, হ্যাঁ, এগোব। ওই কেরিয়ারের জায়গাটায় কোনও কম্প্রোমাইজ করব না।

তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়েও, ওখানে দাঁড়িয়েই মুখ ঘুরিয়ে বলল, তুমি আজ আমার বিরাট একটা উপকার করলে, রাতুল। তিন-বছর ধরে বয়ে নিয়ে বেড়ানো একটা অপরাধবোধের হাত থেকে মুক্তি দিলে আমাকে।

এর পর রুমি জগৎপুরে এলেও আর কোনওদিন পালবাড়িতে যায়নি। আসা-যাওয়ার পথে দেখেছে, রাস্তার ঠিক ওপরেই ওদের যে বড় বসার ঘরটা, তার মেঝের ওপরে মাদুর পেতে বসে রাতুল একমনে একঝাঁক বাচ্চাকে আঁকা শেখাচ্ছে। প্রতিবারই রুমির চলার গতি মন্থর হয়েছে।

রাতুল এই বাড়তি কাজটা করছে কেন?

বোঝাই যায়, যেখান থেকে যেটুকু উপার্জন করতে পারে, তারই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। রুমি ভাবে, সীমান্তের নিকটবর্তী এই জনপদে রাতুলেরই বয়েসি কত ছেলে শুধু এদিকের মাল ওদিকে নিয়ে গিয়ে লাখপতি হয়ে যাচ্ছে। মাল বলতে শুধু সিমেন্ট-লোহা-বেবিফুড নয়, মেয়েছেলেও। অথচ এই ছেলেটা, যে একদিন ভাস্কর হবার স্বপ্ন দেখেছিল, সে কয়েকটা টাকার জন্যে কুঁজো হয়ে বসে বাচ্চাদের কুঁড়েঘর, পাহাড়, নদী আর সূর্য আঁকতে শেখাচ্ছে।

হায় শিল্প! হায় কারুবাসনা!

অবশ্য দৃশ্যটার মধ্যে যে একটা সুখ আছে, সে-কথা অস্বীকার করতে পারে না রুমি। ওই যে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েগুলো—কেউ রাতুলের সামনে উপুড় হয়ে শুয়ে দুই হাতের পাতায় চিবুক রেখে, কেউ ওর গলা জড়িয়ে কাঁধের ওপর দিয়ে আবার কেউ বা ওর কোলে বসেই মুগ্ধ হয়ে দেখে যাচ্ছে ওর আঁকা—এই এতগুলো দুরন্ত শিশুকে শুধু রঙের জাদুতে মুগ্ধ করে রাখা তো মুখের কথা নয়।

ঘরটা পেরিয়ে যেতে-যেতে প্রতিবারই রুমির একবার গিয়ে ওই শিশুমহলের মাঝখানে বসার প্রবল লোভ হয়েছে। জগৎপুরের এইটুকু অংশকে যদি তুলে নিয়ে যাওয়া যেত কলকাতায়—ভেবেছে সে। ওই অভিমানী আর সরল মানুষটাকে জীবনের কেন্দ্রে রেখে যদি অনেক দূরে-দূরে ঘুরতে পারত সে! তার চেয়ে সুন্দর জীবন আর কী হতে পারে ভেবে পায় না রুমি।

কিন্তু সেটা যে সম্ভব নয়, তাও ও বোঝে। আপনবেগে পাগলপারা নদী আর তার তীরের স্তব্ধ চাঁপার তরুর মধ্যে সংঘাত লাগবে। লাগবেই। তার চেয়ে ওকে ভুলে যাওয়াই ভালো। ভালো ওকেও ভুলতে সাহায্য করা। তাই রুমি আর না দাঁড়িয়ে আবার গতি বাড়িয়ে পেরিয়ে যায় পালবাড়ির সামনের রাস্তাটুকু।

রাতুলকে ফোন করাও বন্ধ করে দিল রুমি। সে জানত কাকুমণি মাসের প্রথমদিকে একবার জগৎপুরের বাড়িতে এসে সব খোঁজখবর নিয়ে যায়। ও কাকুমণিকেই ফোন করে জেনে নিত ওখানকার খবরাখবর।

তবু নিজের হস্টেলের রুমে কিংবা লাইব্রেরিতে বসে পড়তে-পড়তে রুমি কখনো-কখনো অন্যমনস্ক হয়ে পড়ত। হঠাৎই অনেক দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসত তার কানে। স্বপ্নদৃশ্যের মতন সে দেখতে পেত, যেন এক অন্ধকার মাঠ ভেঙে সে হেঁটে চলেছে। মাঝে-মাঝে পেছন ফিরে দেখছে, অন্ধকারের মধ্যে গাঢ়তর অন্ধকার দিয়ে গড়া এক মূর্তি। নীলকুঠির ঢিবির ওপরে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাতুল। সে কিছুতেই রাতুলের ওই বজ্রাহত মূর্তিকে পেরিয়ে যেতে পারত না।

ঠিক ওই সময়েই, জগৎপুর ছেড়ে আসার তিন-বছরের মাথায়, রুমির জীবনে দ্বিতীয় পুরুষ এল। তার নাম অনুপম মিত্র।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%