দুই

সৈকত মুখোপাধ্যায়

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়; বছর-পাঁচেক আগেও সারা জগৎপুরের লোক শীতলাবাড়িতে একটু শীতলতার খোঁজে আসত। শুধু কিনা তারাপদ, যে এই বাড়ির বড় ছেলে, সে বুঝতে পারত বাড়িটার ভেতরে বড় দাহ জমে আছে। বড় জ্বালা।

বাড়িতে থাকলে এখনো তার হাত-পা কোন ছার, মাথার ভেতরটা অবধি মাঝেমাঝে চিড়বিড় করে জ্বলে ওঠে। শরীরের ভেতর থেকে পোড়া গন্ধ বেরোয়। তখন তাকে বাইরে বেরিয়ে যেতেই হয়, নাহলে বাঁচবে কেমন করে? এই কথাগুলো তারাপদ নিজে বুঝলেও আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারে না। বলতে গেলে সব জড়িয়ে-মড়িয়ে মুখ দিয়ে কেমন যেন মাছের মতন বুড়বুড়ি বেরিয়ে আসে। তখনই ছেলেপুলেরা পেছনে লাগে, বলে পাগল।

তবে রাতের দিকটায় পারতপক্ষে রাস্তায় বেরোতে চায় না তারাপদ। রাতে বের হলে কিছুক্ষণ বাদেই তার মরে-যাওয়া বউ নিবেদিতা কোথা থেকে যেন এসে তার সঙ্গ ধরে। পাশে হাঁটতে-হাঁটতে ঘ্যান-ঘ্যান করে, তুমি আমাদের মেয়েটার জন্যে কিছুই করছ না। কেমন বাপ তুমি? তোমার জন্যে আমার মরেও শান্তি নেই।

বরং রাতের অন্ধকার যখন ফিকে হয়ে আসছে, ওই-সময়টায় তার বেরোতে ভালো লাগে। শুধু জগৎপুর কেন, গোটা জগতটাই তখনো ঘুমোয়। আকাশে একটা নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে, যার নাম অহনা। অহনার পথ ধরে যেহেতু ওই ব্রাহ্মমুহূর্তে দেবতারা পৃথিবীতে সঞ্চরণ করেন, সেইজন্যে নিবেদিতা তখন তার কাছে ঘেঁষতে পারে না।

মায়ের জন্যে রোজ ফুল তুলতে বেরোয় তারাপদ।

এটা ঠিক যে, তাদের বাড়ির পেছনদিকে এখনো একটুকরো ফাঁকা জমি আছে। কিন্তু নিবেদিতা মরে যাওয়ার পর থেকে ওখানে আর কেউ গাছ-টাছ লাগায় না। না-হলে আগে তো নিবেদিতাই ওখান থেকে গাঁদা, টগর, দোপাটি এসব তুলে নিয়ে আসত। তুলসী, দুব্বো এসবের জন্যেও বাজারে যেতে হয়নি কখনো। কিন্তু গত পাঁচবছরে জমিটা পুরোপুরি জঙ্গল হয়ে গেছে।

এদিকে, ফুল ছাড়া আবার মা ঠাকুরদের ভোরাই দিতে পারে না। তাই তারাপদকে জগৎপুরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে মায়ের জন্যে ফুল তুলতে হয়। এর-ওর বাগানের বেড়ার বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে সে ফুল তোলে। হাতে দাদুর আমলের একটা পেতলের সাজি। বহুকাল মাজা হয় না বলে জিনিসটাকে এখন লোহার-তৈরি বলে ভুল হয়।

সাজি ভরে উঠতে বেশি সময় লাগে না। ফুল তুলে বাড়ি ফিরে আসে তারাপদ। ততক্ষণে তার মা আশাদেবী ঘুম থেকে উঠে স্নান-টান সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়েছেন।

আশাদেবী বললে কেউ বুঝবে না। বলতে হবে শীতলাবুড়ি। শীতলা-মন্দিরের সেবায়েত, তাই শীতলাবুড়ি।

উঠোনের বালতির জলে পা ধুয়ে তারাপদ ফুলের সাজিটাতেও একটু জলের ছিটে দিয়ে নেয়। ঠাকুরঘরে ঢুকে আস্তে করে মায়ের পাশে নামিয়ে রাখে। শীতলাবুড়ি চন্দন ঘষতে-ঘষতেই বলেন, এখনই আবার বেরিয়ে পড়িস না যেন। আগে চা খেয়ে নে। তারপর কুয়োতলায় নিয়ে গিয়ে নারায়ণের সিংহাসনটা একটু ধুয়ে আন। অত ভারী জিনিস, লতুর মা নিয়ে যেতে পারবে না।

তারাপদ বলে, আচ্ছা। পরক্ষণে ভুলেও যায়। মায়ের পাশে ঠান্ডা মেঝের ওপরে বসে বাচ্চাদের মতন মন দিয়ে মায়ের চন্দন ঘষা দ্যাখে।

ঠাকুর-ঘরটা বেশ বড়, কিন্তু তাতেও মনে হয় জায়গা কম পড়ে গেছে। কারণ ওই ঘরে একখণ্ড সিঁদুর-মাখানো বড়-পাথরে অধিষ্ঠিতা মা-শীতলা ছাড়াও, শিবলিঙ্গ আছেন, শালগ্রাম রয়েছেন। তাছাড়াও আরো অনেক দেবদেবীর ছবি বা মূর্তি রয়েছে। বাকি জায়গাটা খেয়ে নিয়েছে থাকবন্দি ক’টা লোহার ট্রাঙ্ক আর সিন্দুক। ওগুলোর মধ্যে কবেকার সব মরচের দাগ লাগা গরদের কাপড়, গালচের আসন, রঙচটা সতরঞ্চি, ঝালর দেওয়া হাতপাখা আর পুজোর বাসনপত্র রাখা আছে।

ঠাকুরঘরের পেছনদিকে আরো দুটো ঘর আছে। আগে তারাপদর ভাই রমাপদ ওই দুটো ঘরের মধ্যে বড়টায় থাকত। রমাপদর ইলেক্ট্রিকাল-গুডসের ব্যবসা ছিল। ছোট ঘরটা ছিল তার গোডাউন। বড় ঘর আর ঠাকুরঘরের মাঝখানে একটা দরজা আছে, তবে পুজো-টুজোর সময় ঠাকুরঘরের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করা অসুবিধাজনক বলে, রমাপদ পেছনের বাগানের দিকেও একটা দরজা ফুটিয়ে নিয়েছিল।

শীতলাবাড়ির সদরের দিকে একখানা ইটের গলি। গলির গায়ে পাঁচিল-ঘেরা উঠোন আর সেই উঠোনের পরে দু-ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠলে লাল-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো সরু দালান। যারা পুজো দিতে আসত, তারা ওই দালানে পেতে রাখা সতরঞ্চি কিম্বা আসনেই বসত। পুজো দেখত। ওই মেঝেতেই গড় হয়ে মাথা ছোঁয়াত।

একতলার ওপরে দোতলা। আশি-বছর আগে আশাদেবীর শ্বশুরমশাই, মানে তারাপদর দাদুরই বানানো। দোতলাতে মাত্র দুখানি ঘর। এখন তারাপদ আর তার মেয়ে রুমি দোতলার দুটি ঘরে ভাগাভাগি করে থাকে আর আশাদেবী থাকেন একতলায়, রমাপদর ছেড়ে যাওয়া ঘরটায়।

আশি কি পঁচাশি-বছর আগে, অনেক দূরের এক গ্রাম থেকে আশাদেবীর শাশুড়ি, স্বর্গত বিষ্ণুপদ ঘোষালের স্ত্রী ননীবালা শীতলার শিলা এনে জগৎপুরে এই গৃহ-মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর পেছনে একটা গল্প আছে, যেরকম থাকে। সেটা এইরকম—

তখনো তাঁর বিয়ের পরে বছর ঘোরেনি। শ্বশুরবাড়িতে বসেই ননীবালা খবর পেলেন তাঁর একমাত্র ভাই গুটিবসন্তে মরোমরো। তিনি তো নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করে মা শীতলাকে ডাকতে শুরু করলেন। ভোরের দিকে চোখদুটো একটু লেগে এসেছিল। তখনই স্বপ্নে দেখলেন, সোনার বরণী মা শীতলা তাকে বলছেন, ওঠ রে উমা। নস্করবাঁধের উত্তরকোণে পাঁকের নীচে আমি শুয়ে আছি। আমাকে উঠিয়ে নিয়ে আয়। এনে পুজো কর। তোর ভাই সেরে উঠবে।

ননীবালা তখন নতুন বউ। তবু স্বপ্ন দেখে তিনি নতুন-বউয়ের লজ্জা-শরম ভুলে, সেই-মুহূর্তেই হুড়তে-পুড়তে নস্করবাঁধের দিকে দৌড়লেন। একডুবে পাথরও তুললেন। তারপর সেই পাথরখণ্ডের পুজো করে ননীবালার ভাইয়ের আরোগ্য হল।

কিন্তু তারপর ননীবালা পড়লেন মহা আতান্তরে। আর কাউকে না পেয়ে মনে-মনে মা শীতলাকেই বললেন, মা, আমি বউমানুষ। এই শ্বশুরবাড়ির ভিটেতে তোমাকে আলাদাভাবে পুজো করব কেমন করে? তখন দেবীই আবার তাকে স্বপ্নে বলেন, আমাকে জগৎপুরে নিয়ে চ। ওখানকার মানুষের বড় বসন্তরোগের জ্বালা।

তখনও ননীবালার বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। তাঁর নিজের ভাষায় ঢেঁকির খুঁটোর মতন গতর। তিনি নাকি একবস্ত্রে, একবারও না থেমে, মাঠঘাট জঙ্গল পেরিয়ে, দূর-গ্রামের শ্বশুরবাড়ি থেকে এই জগৎপুর চলে এসেছিলেন। পুরোটাই পায়ে হেঁটে—মাঠঘাট, খালনালা কিছুই মানেননি। ডাকাতের ভয় করেননি। পেছন পেছন অবশ্যই এসেছিলেন তার স্বামী বিষ্ণুপদ।

এসব গল্প ননীবালা তাঁর মন্দিরের দাওয়ায় বসে মায়ের ভক্তদের শোনাতেন। তখন মাটির ঘর ছিল। কালক্রমে দোতলা দালান ওঠে।

তাঁর কথা মেনে নিতে কারুর অসুবিধে ছিল না, কারণ প্রথমত তিনি আর বিষ্ণুপদ ঠিক কখন কীভাবে যে জগৎপুরে ঢুকেছিলেন তা তো কারুর জানা নেই। হতেও পারে, মাথায় পাথর নিয়ে তিনি হেঁটেই এসেছিলেন। আর দ্বিতীয়ত, স্বপ্নাদেশ হোক বা না হোক, ননীবালা কিন্তু গুটিবসন্তের জ্বালা আর ছোঁয়াচ দুটোকেই অনেকটাই বশ মানাতে পারতেন।

মড়কের সময় তিনি বাড়ি-বাড়ি ঘুরতেন। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে-পড়তে বসন্তের রুগিকে আপাদমস্তক নিমের পাতা দিয়ে ঝেড়ে দিয়ে তার মুখে কী যেন এক মশলাগন্ধী জলপড়া ঢেলে দিতেন। বলে যেতেন নানারকম শাকসব্জি, ঘোল, মাখনের পথ্যের কথা, মামড়ি ওঠার সময় মশারির মধ্যে শোয়ার কথা। সত্যিকারেই তাতে অনেক রুগি সেরে উঠত। আর তাই যদি হয়, তাহলে তাঁর দু-চারটে অতিশয়োক্তি মেনে নিতে লোকের বাধা কোথায়?

ননীবালার এইসব গল্পকথা নিয়ে তার ছেলে, মানে তারাপদর বাবা একখানা দু-ফর্মার পাঁচালি ছাপিয়েছিলেন। খুঁজলে ট্রাঙ্কের মধ্যে তার দু-একটা কপি এখনো পাওয়া যাবে।

তারপর বিষ্ণুপদ আর ননীবালা এক-বছরের ব্যবধানে দেহ রাখলেন। একইসঙ্গে ভ্যাকসিনের কল্যাণে দেশ থেকে স্মল পক্সও বিদায় নিল। শীতলাবাড়িরও সেই স্বর্ণযুগ আর রইল না। তবু কয়েকবছর আগে অবধিও ব্রতপার্বণের দিনে আর ফাল্গুন-চৈত্রে পানিবসন্তের ছোঁয়াচের সময়টায় অনেক লোকজন শীতলাবাড়িতে আসত। তাছাড়া সারাবছরই সন্ধের দিকে কিছু নারী-পুরুষ, বিশেষ করে বয়স্কা মহিলারা এসে ওই ঠান্ডা লাল-সিমেন্টের দালানটায় বসে থাকতেন। নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করতেন, এখানে এলে কেমন যেন প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। বড় ঠান্ডা এই শীতলামন্দিরের হাওয়া।

কথাটায় খুব ভুল ছিল না। উঠোনের দুটো শ্বেত-রঙ্গনের গাছ সারাদিন একতলার দালানে ছায়া দিত। ড্যাম্প-লাগা বারো-ইঞ্চি গাঁথনির দেয়ালগুলোকেও মনে হত যেন ইট নয়, চন্দনপিঁড়ি গেঁথে বানানো, এমন শীতল। ভিজে-ভিজে সাদা-বাতাসার টুকরো মুখে কামড়ে ধরে ডেঁয়ো পিপড়েরা হাঁটাহাঁটি করত আর বাতাসে ভেসে বেড়াত ভিজে বেলপাতা, চন্দন, গুগগুলের ঠান্ডা সৌরভ। সন্ধ্যাপুজোর শেষে আশাদেবী ভক্তদের হাতে হাতে দিয়ে যেতেন সুজি আর লুচির শীতলভোগ।

টুকটুকে ফরসা, সাদা থান পরা আশাদেবী মানুষটা নিজেও মায়াময় চোখ আর মধুর হাসি নিয়ে বরাবরই ভারি স্নিগ্ধ।

কিন্তু পাঁচবছর আগে বাড়ির বউ নিবেদিতা গায়ে আগুন লেগে যেদিন মরল, তখন থেকে শীতলাবাড়ির সব মহিমাও শেষ হয়ে গেল। লোকে বলতে শুরু করল, যেখানে ঠাকুর নিজের কাছের লোকেদেরই এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারেন না, কী হবে সেখানে পুজো দিয়ে। সেদিনের পর থেকে বলতে গেলে দু-চার জন ছাড়া কেউই শীতলাবাড়ির দালানে বসতে আসে না।

নিবেদিতা মারা গেল। তার গায়ে-গায়েই তারাপদর ছোটভাই রমাপদও এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল কৃষ্ণনগরে। ওখান থেকেই নাকি ওর ইলেক্ট্রিকাল-গুডসের ব্যবসা চালানোর সুবিধে। ওরা দুজন চলে যাওয়ার পর থেকেই তারাপদর খ্যাপামোটাও বেশ বেড়ে গেল। আগে ঘরের মধ্যেই উদাসীন ভাবে বসে থাকত। বিড়বিড় করে বকত। কখনো একবার উঠে সুইচগুলো ফটফট করে কয়েকবার অফ-অন করল কিম্বা আপনমনে হেসে উঠল—এইটুকুই। কিন্তু এখন হয়ে উঠেছে একেবারে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে-বেড়ানো পাগল। খিদে পেলে বাড়ি আসে আবার কোনও-কোনও দিন আসেও না। তখন আশাদেবী গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছেলের নাম ধরে ডাকাডাকি করেন।

দু-বছরের স্থিরতার পর, এরকমই এক ঘর-পালানোর দিনে রাতুলের ভাগ্য একটা বড় বাঁক নিল। একটা ঘটনা ঘটল, যেরকম ঘটনায় জীবন বদলে যায়।

তখন কার্তিক মাস, দুপুরবেলা। খাওয়া-দাওয়ার পরে শীতলাতলার মানুষজন যে যার ঘরের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। গাড়িঘোড়া নেই বলে রাস্তার একেবারে মধ্যিখানে বুক ফুলিয়ে শালিখ চরছে, নির্ভয়ে খেলা করছে কাঠবেড়ালি। কোথাও বুঝি কেউ রেডিওতে নাটক চালিয়েছেন। তার ক্ষীণ শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই কোথাও।

এমনই সেই ঝিমধরা দুপুরে, রাতুল তার ঘরের জানলার কাছে বসে নিবিষ্ট মনে ড্রইং-খাতার পাতায় ফিগার-ড্রইং প্র্যাকটিস করছিল। করতে-করতেই তার কানে এল শীতলাবুড়ি তাদের বাড়ির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে, নিরুদ্দেশের পানে ডাক পাঠাচ্ছে—

ও তারা! তারা রে! ঘরে আয় বাবা। বিকেল হতে চলল যে। আর কখনই বা চান করবি, কখনই বা খাবি?

মেঘের দেশ থেকে ভেসে আসা চিলের ডাকের মতন বুড়ির সেই নিস্তেজ গলা আর কারুর কানে পৌঁছক বা না পৌঁছক, রাতুল কিন্তু ঠিক শোনে। শুনে সচকিত হয়ে ওঠে। দ্রুত পাজামার ওপরে একটা শার্ট গলিয়ে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ঘণ্টাদুয়েক আগে সে ওই জানলা দিয়েই দেখে নিয়েছিল, তারাপদকাকা উত্তরে যাচ্ছে না দক্ষিণে। কোনদিকে গেলে কোথায় তাকে পাওয়া যাবে, সেটাও রাতুলের জানা। যেমন সেদিন গিয়েছিল দক্ষিণে নীলকুঠির মাঠে। আজ গেছে উত্তরে রেললাইনের ধারে।

জগৎপুর-স্টেশনের কিছুটা আগে রেললাইনটা হালকা বাঁক নিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে চলে গেছে। ওই জায়গায় লাইনের কোনওদিকেই কোনও মানুষের বসতি নেই, তাই ওখান দিয়ে কেউ লাইন পারাপারও করে না। লাইনের দু-পাশেই পুঁটুশ-গাছের ঘন ঝোপ। তারপর সরু পায়ে চলা রাস্তা। তারও পরে কয়েকটা লম্বাটে বিল—রেলের জমি উঁচু করার জন্যে কোনও এককালে ওইসব জায়গা থেকে মাটি কাটা হয়েছিল। এখন সারাবছর জল জমে থাকে।

হনহন করে পা চালিয়ে ঠিক ওই জায়গাটাতেই পৌঁছে যায় রাতুল। তার তেইশ বছরের তাজা ফুসফুসেও সামান্য হাঁপ ধরে। শার্টের হাতায় কপালের ঘাম মুছে নিয়ে সে এদিক-ওদিক তাকায়। দ্যাখে শালুকপাতার ওপরে পা ফেলে-ফেলে জলময়ূর হাঁটছে। পুঁটুশের পাকা ফলের লোভে ঝোপের ভেতরে কলকলাচ্ছে অজস্র বুলবুলি। একটা হেলেসাপ রোদের তাত থেকে বাঁচবার জন্যে শরীরটাকে ধীরে-ধীরে গুঁজে দিচ্ছে কলমি-বনের ছায়ায়।

আর এইসবের মধ্যেই রেললাইনের ধারে একটা কংক্রিটের স্ল্যাবের ওপরে চুপ করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে তারাপদকাকা। খালি গা, উপবীতহীন। একটা সাদা-ধুতি ফেরতা দিয়ে কোমরে জড়ানো। পেছনদিক থেকে তারাপদকাকার মুখ দেখতে পাচ্ছিল না রাতুল, দেখছিল শুধু অযত্নে বেড়ে-ওঠা একরাশ কাঁচাপাকা চুলে ভর্তি মাথা আর আদুল পিঠ।

রাতুল জানে, পৃথিবীর শেষ কয়েকটা ব্যাখ্যাহীন রহস্যের মধ্যে একটা হচ্ছে উন্মাদের সুস্বাস্থ্য। হাজার অত্যাচারের পরেও তারাপদকাকার শরীর এখনো যুবকের মতন সুন্দর। রাতুলের মাঝে-মাঝে লোভ হয়, তার স্কেচবুকে খুব দ্রুতহাতে এঁকে নেয় তারাপদ ঘোষালের ওই নগ্ন পিঠটুকু—তাঁর শিরদাঁড়ার দু’পাশের পেশি, চওড়া কাঁধ আর অংসফলক-দুটির মসৃণতা। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয় ওই টরসো যেন টান-টান করে বেঁধে-রাখা গিটারের কর্ডের মতন কাঁপছে। কে কাঁপাচ্ছে? অন্তর্গত উন্মাদনা কি?

তবে এখন তো ওসব ভাবনা অবান্তর। এখন রাতুল ওই লোকটাকে তার বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। তাই সে ধীরে-ধীরে তারাপদ ঘোষালের পাশে গিয়ে বসে। বলে, তারাপদকাকা! বাড়ি চলো। ঠাকুমা ভাত বেড়ে বসে আছেন।

তারাপদ চমকে উঠে রাতুলের মুখের দিকে তাকায়। চিনতে পারে নিশ্চয়, কারণ, তার মুখের ভাব নরম হয়ে আসে। আঠারো কিম্বা উনিশ বছর আগে, যখন তারাপদ ঘোষালের খ্যাপামো এত বেড়ে ওঠেনি, তখন তো রাজেনদার এই ছেলেটাকে সে কোলে নিয়ে ঘুরেছে। ওর মাথার চূড়ান্ত এলোমেলো অবস্থার মধ্যেও কোথাও হয়তো সেই স্মৃতি থেকে গিয়ে থাকবে।

নরম গলাতেই তারাপদ বলে, চলে যাব? কিন্তু ধর তারপরেই সে যদি রেললাইনে গলা দিতে আসে? বাঁচাতে হবে না তাকে?

রাতুল আগেও অনেকবার এই একই কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। সে জানে, এটাই তারাপদকাকার পাগলামি। কাকে বাঁচাবার জন্যে কে জানে, ঠায় বসে থাকে। জোর করে তুলে নিয়ে না গেলে সারাদিন, হয়তো সারারাত ধরেই কোনও কাল্পনিক প্রাণকে আগলাবে।

রাতুল কিছুটা রাগতস্বরে বলল, কেন? কোন দুঃখে কেউ আত্মহত্যা করবে? সবাই ভালো আছে। তুমি এখন চলো।

কী মুশকিল! ভারি বিপর্যস্ত মুখে এলোমেলো চুলের মধ্যে আঙুল বোলায় তারাপদ ঘোষাল। বলে, দুঃখের কী দরকার? এত সুন্দর আয়োজন দেখে এমনিতেই কারুর মরে যাওয়ার ইচ্ছে হতে পারে না? এই যে একটা খড়্গ পাতা আছে মাটির ওপরে—সেকি এমনি? দ্যাখ না, কী সুন্দর কাঁপছে। কেমন ঝিমঝিম করে শব্দ হচ্ছে।

ওটা খড়্গ নয় তারাপদকাকা, রেললাইন। সোয়া-তিনটে বাজে। আপ লালগোলা আসছে, তাই লাইন কাঁপছে। তুমি ওঠো, বাড়ি চলো।

হঠাৎ করেই তারাপদ ঘোষালের চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। পাগলের দৃষ্টি। খেপে গিয়ে বলে, আমাকে নিজের কাজটাও করতে দিবি না? এত লায়েক হয়েছিস তুই?

রাতুল মনে-মনে বলে, হায় কাজ। রমাপদকাকা শীতলাবাড়ির সংসারটাকে না টানলে মা আর মেয়ে নিয়ে উপোস দিতে যে তারাপদকাকা। মুখে ওসব কিছু বলে না অবশ্য। বরং নরম গলায় বলে, ঠিক আছে। এখন তুমি চলো। খেয়েদেয়ে আবার ফিরে আসবে।

ওদের কথার মধ্যেই সামনে দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল লালগোলা-প্যাসেঞ্জার। একটু বাদেই জগৎপুর স্টেশন থেকে শোনা গেল তার ভোঁ, মানে ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে গেল। রাতুল বলল, ব্যাস, নিশ্চিন্ত। এখন তো আর সেই রাতের আগে গাড়ি নেই। চলো তারাপদকাকা, বাড়ি চলো।

তারাপদ ঘোষালও কে জানে কেন, এবার দিব্যি ভালোমানুষের মতন রাতুলের কথাটা মেনে নিল। বলল, হ্যাঁ, আর চিন্তা নেই। চল, বাড়ি চল। তুই খেয়েছিস?

লোকটা মাঝেমাঝে এমন স্বাভাবিক একেকটা কথা বলে ওঠে যে, রাতুল অবাক না হয়ে পারে না। সে হাসতে-হাসতে জবাব দিল, অনেকক্ষণ আগে। এতক্ষণে বোধহয় হজম হয়ে গেল। তারপর লাইনের ধারের ইটের রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়ে পিচরাস্তায় পা দিল। শিরিষগাছের ছায়ায় ছায়ায় তারাপদকাকার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল শীতলাপাড়ার দিকে।

এখন বেলা সাড়ে তিনটের সময় জায়গাটা খাঁ-খাঁ করছে। নাহলে সকালে একটা বাজার বসে এখানে, বারোটা একটা অবধি ভিড় থাকে। এখন জনমানুষ নেই। রাস্তার দু-ধারে আনাজওলাদের বাঁশের বাজরাগুলো উপুড় করে রাখা আছে। প্লাস্টিকের শিটে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা আছে বাসুদার হাওয়াই চটির স্টক। খোকাদা তার চায়ের দোকান বন্ধ করে, কাঠের বেঞ্চিদুটোকে অবধি চেন-তালা দিয়ে বেঁধে রেখে গেছে। প্রতিটি মানুষের নিজেদেরই কত কিছু হারানোর চিন্তা। নেহাত পাগল ছাড়া আর কেই বা অচেনা লোকের আত্মহত্যার চিন্তায় লাইনের ধারে গিয়ে বসে থাকে? এইসব ভাবতে-ভাবতেই হাঁটছিল রাতুল।

হঠাৎ সে দেখল একটু দূরে রুমি দাঁড়িয়ে আছে।

রাতুলের হৃৎপিণ্ডটা গুম-গুম শব্দ করে বেজে উঠল। বেজেই চলল। একবার বন্ধুদের সঙ্গে লোধাশুলির জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে সে সারারাত অমন দূরাগত মাদলের শব্দে ঘুমোতে পারেনি। সেদিন রাতুল ভেবেছিল, শুধু অরণ্যের হৃৎপিণ্ডেই বোধহয় অমন শব্দ হয়। আজ জানলো, ভুল। তার নিজের হৃৎপিণ্ডেও আদিবাসী মাদলের বোল উঠতে পারে।

মনের অগোচরে পাপ নেই। রাতুল কি এই মুহূর্তটার লোভেই আজ তারাপদকাকাকে নিয়ে যেতে আসেনি? শুধু এই স্বপ্নের টানেই কি এর আগেও সে আসেনি অনেকবার? কিন্তু আজ যখন তার স্বপ্নের মুহূর্তটা রক্ত-মাংসের শরীর ধরে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন রাতুল ভেবে পাচ্ছিল না এবার সে এই ভীষণ মহার্ঘ মুহূর্তটাকে নিয়ে কী করবে! কী বলবে সে রুমিকে?

কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না রাতুল। পাথরের মতন ভারী পা দুটোকে টানতে-টানতে শুধু হেঁটে যাচ্ছিল ওইদিকে, যেখানে রুমি নামে মেয়েটা তার বাবাকে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করছে। রাতুল হাঁটছিল আর মনে-মনে একটা কথাই বার-বার বলে যাচ্ছিল—এত সুন্দর! এত সুন্দর! এত সুন্দর!

ছোটবেলা থেকে যে-মেয়েটাকে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছে রাতুল, সে যে হঠাৎ করেই একদিন এত সুন্দর হয়ে উঠল কেমন করে রাতুল জানে না।

কেমন যে সেই সৌন্দর্য, তাও কি রাতুল কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারবে?

না। তাও পারবে না।

স্মৃতি থেকে এই জগৎপুরের অনেক দোকানি, ভিখিরি, অনেক চাকুরে, সাধু এবং বেশ্যার মুখ সে নিখুঁতভাবে এঁকে দিতে পারলেও, ওই যে রোদ্দুরের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে ষোল বছরের কিশোরীটি, যাকে কিছু না হলেও দিনের মধ্যে দু-তিনবার সে দ্যাখেই, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সেই-মুখটাকে সে কিছুতেই আঁকতে পারবে না।

চেষ্টা করে দেখেছে রাতুল। রুমির ভুরু মনে করতে গেলে চোখ হারিয়ে যায়। ছোট্ট কপালটুকু ধরতে গেলে হারিয়ে যায় নাক। একমাত্র স্বপ্নের মধ্যেই সে কয়েকবার রুমিকে খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছে। তাছাড়া আর সবসময়েই রুমিকে সে দেখেছে এক আগুনের হলকার এপাশ থেকে। যেমন এখনো দেখছে। তবে এটুকু বুঝতে পারছে, রুমি ঠাকুমার ডাক শুনে যে-অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই উঠে এসেছে। নাহলে বাড়িতে পরার রঙচটা ফ্রকটা পরে থাকবে কেন?

তারাপদকাকা হঠাৎ ভারি খুশি-খুশি গলায় বলে উঠল, রুমি। আমার মেয়ে। যেন রাতুল ওকে চেনে না। তারপর যেন অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে ডাকছে, এইভাবে হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, রুমি! এই রুমি! এইযে, আমি এখানে।

রুমি তাড়াতাড়ি কয়েক-পা এগিয়ে এসে তারাপদকাকার হাতের মুঠিটা নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে বলল, আঃ, চেঁচাচ্ছ কেন? আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না, না কি?

ও! দেখতে পেয়েছিলিস? কোথায় চললি তুই এত সাজগোজ করে?

রুমি বলল, যমের বাড়ি। তারপর ওর বাবাকে একরকম টানতে-টানতেই হনহন করে হাঁটা লাগাল। রাতুল ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল। সে যে তারাপদকাকার সঙ্গে ছিল, সেটাই যেন রুমি দেখতে পেল না। রাতুলের হয়তো এতে মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আশ্চর্য-ব্যাপার, তার খুব হালকা লাগছিল। সে তো এরকমই চায়। রুমি তার সঙ্গে একটু দূর থেকে তাকে আবৃত করে থাকবে—যেভাবে হেমন্তের সন্ধ্যায় নিড়িয়ে-নেওয়া ধানখেতের একটু ওপরে স্থির হয়ে জমে থাকে সাঁজালের ধোঁয়া।

কিন্তু তা তো হল না।

শীতলাবাড়ির ভাঙাচোরা পাঁচিলটা দৃষ্টিগোচর হতেই তারাপদ ঘোষাল রুমির হাত ছাড়িয়ে হনহন করে বাড়ির দিকে পা চালাল। খিদে পেয়েছিল নিশ্চয়ই। জায়গাটা একটা গলির মতন, যে গলিটা ধরে একটু এগোলেই প্রথমে পড়বে শীতলাবাড়ি আর তারপর শীতলাবাড়িকে পাক দিয়ে আরো কিছুটা গেলেই বড় রাস্তা—যার ধারে রাতুলদের বাড়ি, পালবাড়ি।

রুমি চট করে একবার চারদিকে নজর বুলিয়ে নিল। তারপর কয়েক পা পিছিয়ে এসে একদম রাতুলের বুকের কাছে দাঁড়িয়ে ওর মুখের দিকে মুখ তুলে তাকাল। বলল, তুমি বাবার জন্যে এই কষ্টটা করো কেন? আর তো কেউ এসব নিয়ে ভাবেই না। তুমি কেন ছুটে ছুটে যাও?

রুমির মুখের দিকে তাকিয়ে রাতুলের মনটা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেল। স্বাভাবিক হয়ে এল তার হৃদয়ের ছন্দ, নিঃশ্বাসের গতি। কেন যেন তার মনে হল, গতজন্ম থেকে তারা দুজনে এভাবেই খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। যদিও প্রকৃতপ্রস্তাবে রুমি ওর সঙ্গে সেই প্রথমবার কথা বলল।

রাতুল উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, আমি যে তারাপদকাকাকে ফিরিয়ে আনতে যাই, সেটা তুমি জানতে?

রুমি বলল, জানতাম। সেইজন্যেই নিশ্চিন্ত থাকতাম। নিজে বেরোতাম না। আজও আমি বেরিয়েছি বাবার জন্যে নয়, তোমার জন্যে। তোমাকে এই কথাটা জিগ্যেস করার জন্যে। বললে না তো, কেন যাও?

রাতুল উত্তর দিল না।

রুমি বলল, করুণা করো?

রাতুল বলল, ছি-ছি। করুণা কাকে করব?

আমাকে। আমাদের।

না।

কোরো না। করুণা কোরো না। আর শোনো, তুমি মুখে না বললেও কিছু যায়-আসে না। মা-মরা ছেলেমেয়েরা ভালোবাসা জিনিসটা খুব ভালো চিনতে পারে, কেমন? পালাও এবার। কাল এইসময়ে এখানেই এসো।

রুমি আর একবারও পিছনে না তাকিয়ে সেইরকম দৃপ্তভঙ্গিতে হেঁটে চলে গেল, যেভাবে একমাত্র তখনই একজন কিশোরী হাঁটতে পারে, যখন কেউ তাকে ভালোবাসে।

রাতুল পেছন থেকে দেখল, রুমির ফ্রকের পিঠের দিকে কয়েকটা টিপকল ছিঁড়ে গেছে। একটা সেফটিপিন লাগানো আছে সেখানে। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওর শিরদাঁড়ার গভীর খাঁজ।

রাতুল ঠিক করল, আজ এখনই ও বাড়ি ফিরে রুমির ওই চলে যাওয়াটুকু আঁকবে, বিশেষ করে ছেঁড়া ফ্রকের মধ্যে দিয়ে দেখতে-পাওয়া সপাট শিরদাঁড়াটা। এবারে আর স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে না নিশ্চয়ই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%