সৈকত মুখোপাধ্যায়

বাবাইকে কোলে নিয়ে রাতুল হেঁটে চলেছিল।
বন্ধ বেডরুমের ভেতর থেকে রুমির গলা দিয়ে যে-আওয়াজটা বেরিয়ে আসছিল সেটা ওদের দুজনের মধ্যে কেউই সহ্য করতে পারেনি। আওয়াজটার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা ছিল। তাই ওরা বেরিয়ে এসেছে।
বাবাই অবশ্য তার কাগজ আর রঙপেন্সিল সরিয়ে রেখে ওই বন্ধ দরজার দিকে ছুটে যেতে চেয়েছিল কিন্তু রাতুল বাবাইকে আটকেছিল।
একথা ঠিক যে, একটা সময় তারও মনে হয়েছিল ছুটে গিয়ে ওদের শোবার ঘরের দরজাটা ভেঙে ফেলে। কিন্তু দুটো কথা ভেবে সে নিজেকে সংবরণ করেছিল। এক, বাবাইয়ের চোখের সামনে যে-দৃশ্যের অবতারণা হবে সেটা ওকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে কিনা।
আর দুই, এটাই রাতুলকে আরো দ্বিধায় ফেলেছিল, রুমি তো তাকে ডাকেনি। রুমি নিজে তো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেনি। আসতেই পারত, কিন্তু আসেনি। ও তো সহ্য করছে। সেই সহ্যের পেছনে কোন বিনিময়ের অঙ্ক কাজ করছে, তা কি জানে রাতুল? না, জানে না। যদি ওই যন্ত্রণাটাই রুমির উচ্চাকাঙ্ক্ষার সিঁড়িতে আরেকটা ধাপ হয়? সেই অঙ্ককে মাঝপথে নষ্ট করার অধিকার কি রাতুলের আছে?
বাবাই রাতুলের কাঁধের মধ্যে মাথাটাকে গুঁজে দিয়ে কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছিল। এই যে ওকে মায়ের কাছ থেকে দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছে রাতুল, তাতে যে ও কোনও আপত্তি জানাচ্ছিল না, সেটাই বিস্ময়কর। একটা ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে রাতুল একবার বাবাইয়ের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে দেখল, ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। না, ঘুমোয়নি। জেগেই আছে। ওর চিবুকটা ছেড়ে দিতেই বাবাই আবার মুখটা রাতুলের কাঁধে গুঁজে দিল।
তার মানে ও কি চুপ করে কিছু ভাবছে? ওকে কি হন্ট করছে কিছু? একটা চার বছরের বাচ্চা কতটা পাপের দৃশ্য কল্পনা করতে পারে? রাতুল যতটা পারছে বাবাইও কি ততটাই পারছে? চিন্তাটা মনের মধ্যে আসতেই রাতুলের বুক ফাটিয়ে একটা শব্দ বেরিয়ে এল। একটু টেনে-টেনে সে উচ্চারণ করল, ঈশ্বর!
বাবাইকে কোলে নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কখন যেন একটা নির্জন রাস্তায় পৌঁছে গিয়েছিল রাতুল। এদিকের রাস্তাঘাট সে খুব ভালো চেনে না। তবে একটু আগেই আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের উঁচু পাঁচিল পেরিয়ে এসেছে। এই রাস্তাটার দুদিকে প্রাচীন গাছের সারি। সেইসব কৃষ্ণচূড়া আর মেহগনি গাছের পাতার আচ্ছাদন ভেদ করে অল্পই আলো রাস্তায় এসে পড়েছে। সেই আলো-আঁধারির মধ্যে দিয়ে অন্ধের মতন হেঁটে চলেছিল রাতুল।
কতক্ষণ হাঁটছে সে? মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। কিন্তু বাস্তবে হয়তো আধঘণ্টা বা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের বেশি নয়। কতটা পথ ইতিমধ্যে পেরিয়ে এসেছে তারা? মনে হচ্ছিল অনন্ত পথ। কিন্তু বাস্তবে নিশ্চয়ই দু-কিলোমিটারের বেশি নয়।
হঠাৎই রাতুল দেখল, তার সামনে-সামনে হেঁটে চলেছে নগ্নগাত্র গৌরবর্ণের এক মানুষ। ভীষণ পরিচিত মানুষ; সারা জীবনে ওর পিছন-পিছন ঠিক এইভাবেই সে অনেক দিন হেঁটেছে। রাতুল ডাকল, তারাপদকাকা! এবার বাড়ি ফিরতে হবে যে। আর এগিও না।
রাতুল মনে-মনে ডেকেছিল। সেই ডাকও কি শোনা যায়? যায় নিশ্চয়ই। নাহলে তার কোলের মধ্যে বাবাই অমন চমকে উঠবে কেন? চমকে উঠে সামনের দিকে তাকাবে কেন?
বাবাইয়ের দিকে খেয়াল না করেই রাতুল আবার বলল, তারাপদকাকা! কেন এইভাবে যখন-তখন বেরিয়ে যাও?
সামনের লোকটা এবার দাঁড়িয়ে পড়ে। ফিরে তাকায়। বিরক্ত-গলায় উত্তর দেয়, ওকে আটকাতে হবে না? কতবার বলব তোকে? ও যদি আত্মহত্যা করে?
‘ও যদি আত্মহত্যা করে।’
সামনের ছায়ামূর্তিটা বাতাসে মিলিয়ে যাবার পরেও তার শেষ কথাটা বাতাসে পাক খেতে থাকে। পাক খেতে-খেতে রাতুলের মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এতক্ষণ সে যেন ঘুমের ঘোরে হাঁটছিল। সেই ঘুম ভেঙে চমকে জেগে উঠল রাতুল। ভাবল, তাই তো। তারপর উল্টোদিকে ঘুরে দ্রুত পা চালাল রুমির ফ্ল্যাটবাড়িটার দিকে। সারা রাস্তাই তার মাথার মধ্যে ঝনঝন করে বাজছিল তারাপদকাকার ওই কথাগুলো—যদি আত্মহত্যা করে। যদি আত্মহত্যা করে। যদি...।
রুমি বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিস্তব্ধ রাত। কাপড় কাচা সাবানের মতন ফিকে হলুদ, হড়হড়ে একটা চাঁদ আকাশের এক কোণে হেলায় পড়েছিল।
রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই রুমির কোমরের নীচ থেকে দূষিত অংশটুকু কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। রইল তার ঘাড়ের ওপরে পড়ে-থাকা কিছু উড়োঝুরো চুল, পিলসুজ-পুতুলের মতন সরু লম্বা গলার নীচে রোগা কণ্ঠার হাড় আর তার নীচে শীর্ণ দুই স্তনের মাঝে সামান্য ক্লিভেজ। তার উদ্গ্রীব দেহকাণ্ড ঠিক একটা ব্রোঞ্জের মূর্তির মতন ক্রমশ রেলিং-এর সীমা ছাড়িয়ে রাত্রির বাতাসের বুকে ঝুঁকে পড়ছিল।
কোথাও একটা যেতে চাইছে সে, কেউ তাকে ডাকছে। কিন্তু সে কে? এই পৃথিবীতে আর কে আছে তাকে ডাকবার মতন?
রুমির পা দুটো মেঝে থেকে উঠে গেল। রেলিং পেরিয়ে তার শরীর আরো ঝুঁকে পড়ল বাইরের দিকে। এবার শুধু রেলিং-এর ওপর থেকে হাতের মুঠিদুটো ছেড়ে দিলেই...
হঠাৎই দুটো বলিষ্ঠ হাত পেছন থেকে রুমিকে জড়িয়ে ধরে, একটানে তাকে বারান্দার কিনারা থেকে দূরে টেনে এনেই বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। কে? চোখ তুলে দেখার প্রয়োজন ছিল না। রাতুলের চওড়া বুকে মাখামাখি এই মাটির গন্ধ রুমির পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। ততক্ষণে রুমি বুঝতে পেরেছে, মৃত্যুর কত কাছ থেকে সে ফিরে এসেছে। বুঝতে পারা মাত্রই একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়েছিল তার সারা শরীরে। বসন্তের অশ্বত্থ পাতার মতন তিরতির করে কাঁপছিল রুমি। সেই কাঁপুনিটা থামাবার জন্যেই সে যতটা জোরে সম্ভব রাতুলকে জড়িয়ে ধরল।
এইভাবে কতক্ষণ কেটে গেল কে জানে। হঠাৎ ওদের দুজনের একইসঙ্গে মনে পড়ল বাবাইয়ের কথা। আলিঙ্গন ছাড়িয়ে দুজনেই ঘুরে তাকাল। দেখল, বাবাই তার বড়-বড় চোখদুটোয় কিছুটা অবাক-ভাব আর অনেকটা খুশি নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করল, তুমি মাম্মিকে ভালোবাসো?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন