সৈকত মুখোপাধ্যায়

দোসরা নভেম্বর ছিল জয়া সেনগুপ্ত আর অলোক সেনগুপ্তর পনেরোতম বিবাহবার্ষিকী। পারমিতার কাছে যারা জয়াদি আর অলোকদা।
ছ’বছর আগে পারমিতা প্রথম যখন চাকরিতে জয়েন করেছিল, জয়া সেনগুপ্ত ছিলেন সেখানে ওর সিনিয়র। জয়াদি অবশ্য বছর-দুয়েক বাদেই অন্য একটা কোম্পানিতে চেঞ্জ করেছিল। কিন্তু তার মধ্যেই কেমন করে যেন জয়াদি আর ওর হাজব্যান্ড অলোকদার সঙ্গে পারমিতার গভীর একটা বন্ডিং তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
সত্যিকথা বলতে কী, অনুপমের সঙ্গে তার সেপারেশন এবং ডিভোর্সের পুরো পর্বটাই এই দুজন মানুষ সামলেছিলেন। ডিভোর্সের পরেও তাকে অপয়া এবং অপদার্থ জেনে কত বন্ধু দূরে সরে গেল। আপদ হয়ে ঘাড়ে চাপতে পারে এই ভয়ে একসময়ের কত সুহৃদ-সহকর্মী যোগাযোগ ছিন্ন করে দিল। রয়ে গেলেন শুধু এই দুই আপনজন—বিপদে পড়লে যাদের কাছে যে-কোনও সময়ে সে ছুটে যেতে পারে।
এবছর জয়াদি আর অলোকদা একসপ্তাহ আগে থেকে ওকে বলে রেখেছিলেন, আগের দু-বছর ওইসব ঝামেলায় আসতে পারিসনি, জানি। এবার আসবি কিন্তু। বাবাইকে নিয়ে আসবি। কোনও অজুহাত শুনব না।
পারমিতা বলতে চেয়েছিল, পারব না অলোকদা। পারব না গো জয়াদি। তোমরা জানো না, আমি ভালো নেই। অফিস যেতে হয় বলে যাই। কাজ করতে হয় বলে কোনওরকমে করি। ছুটির দিনে সারাদিন জানলার পর্দা টেনে বিছানায় শুয়ে থাকি। শিখাদি আছে বলে বাবাই বেঁচে আছে, নাহলে কবেই মরে যেত।
বলেনি। এসব কিছুই বলেনি। দুটো ভালোমানুষকে আর কত দুঃখ দেবে? তবে মনে-মনে এটাও সে জানত যে, দোসরা এপ্রিল ও কিছুতেই কালীঘাট থেকে ফার্ন-রোডের সামান্য দূরত্বটুকু পেরোতে পারবে না।
কিন্তু বাস্তবে তা হল না।
দু-তারিখ সকাল থেকে ওর বহুদিনের জমাটবাঁধা অবসাদ, বসন্তের শুরুতে পাইনপাতায় জমে থাকা বরফের মতনই আপনা থেকে ঝরতে শুরু করল। হঠাৎ করেই ও ঠিক করল—না, আর শুয়ে থাকব না। আমি যাব। এবং তারপর খুব তাড়াহুড়ো করে চুলে শ্যাম্পু করল। তার আগে বাড়িতেই হলুদ, মুলতানি-মাটি আর চন্দনগুঁড়ো দিয়ে একটা ঘরোয়া রূপটান বানিয়ে মুখে মাখল। দুপুরে সামান্য ঘুমিয়ে উঠে মন দিয়ে মেক-আপ করল। এমন একটা শাড়ি পরল, যেটা কেনার পর থেকে আলমারিতেই পড়ে ছিল। অ্যাকুয়া-ব্লুয়ের ওপরে পিঙ্ক ফ্লোরাল ডিজাইনের অরগ্যাঞ্জা, সঙ্গে ব্লু স্লিভলেস ব্লাউজ। প্রথমে মুক্তোর গয়না পরতে গিয়েও আবার কী ভেবে অক্সিডাইজড সেটটাই পরে নিল—ঝুমকো, চোকার্স আর ব্যাঙ্গলস।
নিজেকে সেদিন এত খুশি লাগছিল, এত নির্ভার লাগছিল যে, ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার আগে পারমিতা অনেক দিন বাদে বাবাইকে খুব চটকে-মটকে আদর করে, পেটের মধ্যে নাক ঘষে কাতুকুতু দিয়ে হাসিয়ে, শিখাদির জিম্মা করে দিয়েছিল। বলেছিল, লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থেকো তো বেটু আমার। মাসিমণিকে জ্বালিয়ো না। আমি তোমার জন্যে বিরিয়ানি নিয়ে আসব।
বাবাই বোধহয় মায়ের চেঞ্জ দেখে একটু অবাকই হয়েছিল। হঠাৎই বলেছিল, মাম্মি, য়্যু আর লুকিং লাইক আ ফেয়ারি।
ডু আই রিয়েলি, মাই সুইটি-পি? আবার বাবাইয়ের গালে চকাম-চকাম করে দুটো হামি দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল পারমিতা। মাঝখানে লেকমার্কেটে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে, সুনীলদার দোকান থেকে তিন-রঙের টিউলিপ আর গোলাপের স্টিক কিনেছিল। তারপরেও সেই দোসরা নভেম্বর ও বেলা থাকতে-থাকতেই পৌঁছে গিয়েছিল সেনগুপ্তদের ফ্ল্যাটে।
ইদানীং পারমিতা মাঝে-মাঝেই ওই দিনটাকে নিয়ে ভাবে। কেন সেদিন হঠাৎ এত উদ্যম এসেছিল ওর মনে? যুক্তি তো বলে উল্টোটাই হবার কথা ছিল। ওর মতন একজন মেয়ে, যে সবেমাত্র ডিভোর্স-পরবর্তী মানসিক, সামাজিক, আর্থিক এবং শারীরিক পীড়নগুলোর বিষাক্ত-স্বাদ জিভে পাচ্ছে, তার তো ম্যারেজ-অ্যানিভার্সারির নাম শুনলে গুটিয়ে যাবারই কথা ছিল, তাই না? তাহলে কি ওর অবচেতন-মন সেদিন কোনওভাবে বুঝতে পেরেছিল, জয়াদির বাড়িতে ওর জন্যে বিশেষ কেউ অপেক্ষা করছে?
জয়াদি যে পারমিতাকে সেজেগুজে হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেদিন কী খুশি হয়েছিল, বলবার কথা নয়। কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে জয়াদি নিজেই দরজা খুলেছিল। যেহেতু সবে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে তাই স্বাভাবিকভাবেই জয়াদি তখনো সাজগোজ করেনি। একটা গোলাপি হাউসকোট পরেছিল, কোমরে অ্যাপ্রন। একবার ওর দিকে গোলগোল চোখ করে তাকিয়েই ওকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরেছিল জয়াদি। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, ঠিক এইটাই চাইছিলাম রে পারমিতা। কতদিন ধরে বলেছি তোকে। দুঃখিত হয়ে বসে থাকার জন্যে তো ডিভোর্সটা করিসনি, দুঃখের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে করেছিস। আয়, ভেতরে আয়।
অলোকদা ততক্ষণে একটা কিচেন-টাওয়েলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পারমিতা হাসতে-হাসতে বলল, কর্তা-গিন্নি মিলে এমন-দিনে রান্নাঘরে কী করছ বলো দেখি। সামথিং ফিশি।
অলোকদা গম্ভীরমুখে বললেন, ফিশি তো বটেই। আমরা দুজনে মিলে ফিশফ্রাই বানাচ্ছি; একটু বাদে শিভাস দিয়ে খাব। ডিস্টার্ব কোরো না।
আমার বয়েই গেছে ডিস্টার্ব করতে। ভাজা হলে একটা দেবেন। রিখিয়া কই?
জয়াদি উত্তর দিল, ওর ঘরেই আছে। তুই ওর কাছে গিয়ে বোস, আমরা এক্ষুনি আসছি।
পারমিতা বলল, যাব। আগে এই ফুলগুলো ফ্লাওয়ার-ভাসে সাজিয়ে দিয়ে আসি। এসো, দুজনে মিলে এটাকে একটু ছুঁয়ে দাও দেখি। একটা গ্রুপফি নিই।
এই ড্রেসে? জয়াদি আঁতকে উঠল।
আরে, কাম-অন জয়াদি। থোড়াই না কোনও সোশাল-মিডিয়ায় শেয়ার করছি। এসো।
অলোকদা আর জয়াদি দুজনে পারমিতার দু-গালে গাল ঠেকিয়ে ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে দাঁড়াল। তারপর ও যখন চলে যাচ্ছে, তখন পেছন থেকে অলোকদা বললেন, সেন্টার-টেবিল আর সোফা-টোফা সব কিন্তু ড্রইং-রুম থেকে টেরাসে বার করে দিয়েছি। ফুলদানিও ওখানেই পাবে।
পারমিতা বলল, কেন? বার করে দিয়েছেন কেন?
ওখানেই যে আজ আসর বসাচ্ছি। সন্ধেবেলায় হাওয়াটা ছাড়লেই দেখবে একেবারে চৈত্রপবনে মম চিত্তবনে কেস হয়ে যাবে। ভালো আইডিয়া না?
জয়াদি কপাল চাপড়ে বলল, পৌষমাসে চৈত্রপবন! দ্যাখ পারমিতা, দ্যাখ। এই আনকালচার্ড ব্রুটটাকে নিয়ে পনেরোবছর ধরে সংসার করে ফেললাম। ক্রেডিট দিবি না আমায়?
অলোকদা জিভ কেটে সিচুয়েশন ম্যানেজ দেওয়ার জন্যে বললেন, আহা, একে বলে নিপাতনে সিদ্ধ। যেহেতু আজ আমাদের মিলনরাতি, তাই আজ পৌষমাসেই বসন্তের হাওয়া বইবে। ঠিক কিনা বলো পার্মি?
পারমিতা তাড়াহুড়ো করে বলল, ঠিক ঠিক। দুজনেই ঠিক। আজকের দিনে নো ঝগড়াঝাটি। কাদের কাদের পার্টিতে ডেকেছেন অলোকদা? সবাইকে চিনব তো?
প্রশ্নটা ক্যাজুয়ালি করলেও পারমিতার মনের মধ্যে একটু উদ্বেগ ছিল। বিগত দেড়বছরের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, এই সমাজে একজন ডিভোর্সড মহিলার কাছে নিতান্ত অপরিচিত মানুষও হঠাৎ করেই খুব ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বসেন। প্রসঙ্গগুলো যে মহিলাটির কাছে যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে সেটা অনেকেই ভাবেন না।
জয়াদি ভীষণই বুদ্ধিমান মানুষ। তাছাড়া পারমিতাকে অনেক দিন ধরে দেখছে; হা করলে হাওড়া-ব্রিজ বুঝে নেয়। তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, বেশি কাউকে বলিইনি। বুড়ো-বয়সে ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি, তার আবার নেমন্তন্ন। সব মিলিয়ে দশজনও হবে না। তাই না গো?
অলোকদা বললেন, আমরা বাদে ন’জন, টু বি প্রিসাইজ।
জয়াদি বলল, আর তারা সকলেই তোর চেনা। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের শিবানীদি আর ওর ফ্যামিলি। আমাদের অফিস থেকে শুধু অমৃত আর ওর বউ হিয়াকে বলেছি। ভীষণ মিষ্টি কাপল, তুই তো চিনিস। আমার ভাশুরমশাই আর জা। ওরাও তোকে খুব ভালোবাসে, তুই জানিস। আর একজনই শুধু আসবে যাকে তুই আগে দেখিসনি। কিন্তু সেও দারুণ লোক। দীপেশ চ্যাটার্জী নামটা কি চেনা লাগছে?
পারমিতার সত্যিই চেনা-চেনা ঠেকল নামটা। একটু ভেবে বলল, একজন তো আছেন যার পলিটিকাল-অ্যানালিসিস প্রায় রোজই নিউজ-পেপারের পোস্ট এডিটোরিয়ালে দেখি। খুব ভালো লাগে পড়তে।
অলোকদা গর্বিত-স্বরে বললেন, তিনিই। প্রাবন্ধিক এবং জার্নালিস্ট দীপেশ চ্যাটার্জী। আমার স্কুলের বন্ধু।
তখন ও নিয়ে আর বেশি কথা হয়নি। শুধু পারমিতা আন্তরিকভাবেই একবার বলেছিল, আবার পণ্ডিতদের ডেকেছেন কেন বলুন তো? জানেনই তো আই.টি-র বাইরে সাহিত্য-কবিতা, হিস্ট্রি-পলিটিকাল সায়েন্স সম্বন্ধে আমার জ্ঞান জিরো।
অলোকদা হ্যা হ্যা করে হেসে বললেন, সে তো দীপেশেরও কম্পিউটারের জ্ঞান শূন্য। ভাবতে পারো, এখনো কাগজ-কলমে লেখে। ভালো করে গুগলটা অবধি সার্চ করতে পারে না। তার জন্যে কি ওর কোনও লজ্জা আছে?
ইতিমধ্যে জয়াদির মেয়ে বারো-বছরের রিখিয়া বাবাইকে না নিয়ে আসার জন্যে ওর সঙ্গে একচোট ঝগড়া করে গেল। তারপর অবশ্য ওই আবার পারমিতাকে হাতে-হাতে ফ্লাওয়ার-ভাস, জলের জাগ, কাঁচি সব এগিয়ে দিয়ে গেল। যদিও তার দরকার ছিল না। জয়াদি আর অলোকদার এই ফ্ল্যাটটা পারমিতা খুব ভালো করে চেনে। অনুপমদের বাড়ি থেকে যেদিন বেরিয়ে এসেছিল, তার পর থেকে দু-মাস—যতদিন না কালীঘাটে ওর এখনকার ফ্ল্যাটটা ভাড়ায় পেয়েছিল—ততদিন ও এখানেই ছিল। এখনো এখানেই কোথাও ওর যাবতীয় বইখাতা, ওর আর বাবাইয়ের পুরোনো ড্রেস-টেস সব রাখা আছে। কালীঘাটের ওয়ান-রুম ফ্ল্যাটটা বড্ড ছোট। ওখানে রাখার জায়গা পায়নি। যদি কখনো বড় ফ্ল্যাটে শিফট করে, তখন নিয়ে যাবে।
একা-একাই জয়াদিদের ড্রইং-রুমের লাগোয়া একফালি খোলা ছাদটায় বসে, কাটগ্লাসের ফুলদানিতে ফুল সাজাচ্ছিল পারমিতা। যত না সাজাচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। শীতের বেলা দ্রুত পড়ে আসছিল। একবার করে কলিং-বেল বেজে উঠেছিল, একবার করে জয়াদির হইহই অভ্যর্থনার রব, অতিথিদের হাসির গররা। অলোকদা স্টিরিও-প্লেয়ারে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দিয়েছেন।
একজন কেউ নিঃশব্দে ওর পাশে এসে দাঁড়ালেন। পারমিতার গায়ে তাঁর ছায়া পড়ল। পারমিতা চোখ তুলে দেখল, খুব সুন্দর একজন মানুষ। রোগা, লম্বা। তামাটে গায়ের রঙ। চুলে সামান্য পাক ধরেছে। মনে হল অলোকদার সমবয়েসি, মানে পঁয়তাল্লিশের আশেপাশে বয়স। ভদ্রলোক অচেনা বলেই পারমিতা নিঃসন্দেহ হল যে, ইনিই দীপেশ চ্যাটার্জী।
পারমিতা আবার ফুলের দিকে মুখ নামিয়ে নিল। তবে তখনো ও চোখের কোনা দিয়ে দীপেশের ডানহাতের পাতাটা দেখতে পাচ্ছিল। গোলাপ এবং টিউলিপের দিক থেকে বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল ওই আঙুলগুলোর দিকে। সরু, লম্বা। সদ্য মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা পেঁয়াজকলির চারার মতন একটু ওপরের দিকে বাঁকানো আঙুল।
উনি কি সেতার বাজান? পারমিতা ভাবল।
আমাকে একবার কাঁচিটা দেবেন? পারমিতার উত্তরের অপেক্ষা না করে দীপেশ চ্যাটার্জী ওর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে একটা-একটা করে ফুলের ডাঁটি কাঁচি দিয়ে এমন নিপুণভাবে কাটলেন যাতে সাজানোর পরে সবকটি ফুলের পাপড়ি একই সমতলে থাকে। অন্য ফুলের মাঝে হারিয়ে না যায়।
তারপর নর্তকের স্বাচ্ছন্দ্যে সটান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এবার ভাসটা হাতে তুলে নিন তো। সেন্টার-টেবিলটা এখানে রাখলে চলবে না। অলোকটার কোনও এস্থেটিক-সেন্স নেই। এটা থাকবে এই...এখানে। অবলীলায় রট-আয়রনের ভারী টেবিলটাকে নিয়ে গিয়ে যেখানে বসিয়ে দিলেন, সত্যিই সেখান থেকে অনেক গাছপালা দেখা যাচ্ছিল।
পারমিতা তখনো ফ্লাওয়ার-ভাসটা হাতে নিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসেছিল। উনি কাছে এসে বললেন, দিন, ওটা আমার হাতে দিন। তারপর কী ভেবে অন্য হাতটা পারমিতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ধরুন। উঠুন।
দীপেশের হাতের মুঠোর মধ্যে নিজের হাতটা রেখে পারমিতার আবারও মনে হল, এই হাত সেতারীর হাত। না হলে হাতটা ছোঁয়ামাত্রই তার স্নায়ুগুলো এত জোরে ঝঙ্কার দিয়ে উঠত না।
ততক্ষণে রোদ পড়ে গিয়েছিল। ওরা দুজন সেন্টার টেবিলের দু-দিকে দুটো সোফায় মুখোমুখি বসল। উনি বললেন, আমার নাম দীপেশ চ্যাটার্জী, অলোকের স্কুলের বন্ধু। গত ছ’বছর দিল্লির একটা নিউজপেপারের এডিটোরিয়াল বোর্ডে ছিলাম। আর ভালো লাগছিল না। তাই কলকাতায় ফিরে এসেছি। আপাতত বেকারই বসে আছি বলতে পারেন।
পারমিতা বলল, মোটেই বেকার নন। আপনার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। খুব ভালো লাগে। এমনিতে রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ আমি বুঝি না। আপনি অত সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন বলে বুঝতে পারি।
দীপেশ চ্যাটার্জী খুব একটা বিনয় দেখানোর ন্যাকামি করলেন না। অল্প হেসে প্রশংসাটা নিলেন। তারপর বললেন, আপনি নিশ্চয়ই পারমিতা। আপনার কথা জয়া আর অলোকের মুখে অনেক শুনেছি।
কী শুনেছেন? প্রশ্ন করল পারমিতা।
সবটাই শুনেছি। সত্যিকথা বলতে কী, একটা সময় আপনার এক্স-হাজব্যান্ড যখন বাড়াবাড়ি রকমের গোঁয়ার্তুমি করছিলেন, তখন অলোক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। ওয়েস্টবেঙ্গলেও আমার কিছু পলিটিকাল কানেকশনস আছে। মোস্টলি উইথ দা রুলিং-পার্টি। ও ভেবেছিল সেদিক দিয়ে যদি চাপ দেওয়া যায়। তবে তার দরকার পড়েনি।
এই তথ্যটা সত্যিই পারমিতা জানত না। সে যখন মাথা নিচু করে বসে ভাবছে এরপর কী উত্তর দেওয়া যায়, তখনই দীপেশ খুব আন্তরিক গলায় প্রশ্ন করল, তুমি এখন কেমন আছ, পারমিতা? সব সেটলড হয়ে গেছে তো?
পারমিতা এর আগে কাউকে এত মসৃণভাবে আপনি থেকে তুমিতে চলে যেতে দ্যাখেনি।
দীপেশের মুখের দিকে তাকিয়ে পারমিতা দেখল, শুধু গলায় নয়, ওঁর চোখেও আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে। উনি সত্যিই জানতে চাইছেন পারমিতা কেমন আছে। যেন এই উত্তরটার ওপরে ওঁর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
এমনভাবে কেউ কুশল জানতে চাইলে তাঁকে গা-বাঁচানো উত্তর দেওয়া যায় না। পারমিতা ছাদের পাঁচিলের ওপর লতিয়ে-যাওয়া মাধবীলতার দিকে তাকিয়ে বলল, না। কিছুই সেটলড হয়নি। অনেক সমস্যার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছি।
দীপেশ বললেন, আপনাকে দেখে সেরকমই মনে হল। এই যে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছেন...একলা বসে আছেন এখানে।
অনেক দিন বাদে, কী জানি কেন, পারমিতার আবার একটু প্রগলভ হবার ইচ্ছে জাগল। সে মুচকি হেসে বলল, একবার যখন তুমি বলে ফেলেছেন, তখন তুমিই বলবেন। আপনিতে ফেরার দরকার নেই।
তাই! তুমি বলেছিলাম? দীপেশও অবাক হবার ভান করলেন। তারপর বললেন, পারমিতা, আমি খুব সামান্য একজন মানুষ। কিন্তু কাজের খাতিরেই কিছু অসামান্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। জয়ার কাছে শুনছিলাম, তোমার ছেলের স্কুলিং নিয়ে খুব প্রবলেম হচ্ছে। আমি কি একটু চেষ্টা করে দেখব, যদি কোনও ভালো জায়গায় ওকে ভর্তি করা যায়?
প্লিস দেখুন। পারমিতার ইচ্ছে করছিল দীপেশের হাতদুটো জড়িয়ে ধরে। ধরল না অবশ্য। মুখেই বলল, ভীষণ উপকার হয়। তবে খুব কস্টলি জায়গার কথা বলবেন না। আপাতত একটু টানাটানির মধ্যে আছি।
দীপেশের সুন্দর মুখে খুব সহজেই বিভিন্ন অনুভূতির ছায়া পড়ে। পারমিতা পরিষ্কার বুঝতে পারল ওর কথা দীপেশকে দুঃখিত করল। উনি বললেন, ঠিক আছে। সে ব্যাপারেও কিছু করা যায় কিনা দেখছি।
পারমিতা ঠিক বুঝতে পারল না কী বলবে। একজন অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে কি এত ফেভার নেওয়া যায়? সমস্যা হচ্ছে, দীপেশকে পারমিতার এতটুকুও অপরিচিত মনে হচ্ছিল না। ওই চোখ যেন তার ভীষণ চেনা!
ঠিক তখনই ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজায় আরেকবার বেল এবং পরক্ষণেই ওর একসময়ের সহকর্মী এবং বন্ধু অমৃতলাল মুস্তাফির গমগমে গলা শুনতে পেল পারমিতা। ও লাফিয়ে উঠল। এবার একবার ওদিকে গিয়ে অমৃতকে দেখা দেওয়া দরকার। নাহলে ও যা অসভ্য ছেলে, হয়তো এখানে এসে দীপেশের সামনেই খিস্তিটিস্তি দিয়ে বসবে। ওর সঙ্গে পারমিতার সম্পর্কটা সেরকমই ছিল। এখনো আছে।
যাওয়ার আগে সে দীপেশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি একটা ট্রাবল্ড চাইল্ডহুডের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছি, তাই মানুষের সঙ্গে ভালো করে মিশতে পারি না। অনেক সময় ভুলভাল কথা বলে ফেলি। হয়তো আপনাকে আমার ধন্যবাদ জানানো উচিত ছিল। কিন্তু ইচ্ছে করছে না। বরং অন্য একটা কথা জিগ্যেস করতে ইচ্ছে করছে।
দীপেশ চ্যাটার্জী ওর দিকে প্রশ্নাতুর চোখ তুলে তাকালেন। পারমিতা বলল, আপনি কি সেতার বাজান? কিম্বা অন্য কোনও স্ট্রিং-ইনস্ট্রুমেন্ট?
কিছুক্ষণ অবাক হয়ে পারমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দীপেশ বেশ জোরেই হেসে উঠলেন। বললেন, ছোটবেলায় মেলা থেকে কেনা মাটির বেহালা ছাড়া আর কোনও স্ট্রিং-ইন্সট্রুমেন্টে জীবনে হাত দিইনি। তুমি কি চলে যাচ্ছ?
শেষ প্রশ্নটায় একটা প্রচ্ছন্ন বিষাদ ছিল, যেটা পারমিতার কান এড়াল না। সে শিশুকে প্রবোধ দেওয়ার সুরে বলল, এক্ষুনি ফিরে আসব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন