সৈকত মুখোপাধ্যায়

বিধ্বস্ত-চেহারায়, ব্যাগ-ট্যাগ সামলে, রুমি যখন কালিঘাট মেট্রো-স্টেশনে নামল, তখন প্লাটফর্মের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে সাড়ে-সাতটা। কামরার মধ্যে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। নামবার সময় একটা লোফার ওর বাঁদিকের স্তনটা মুচড়ে দিয়ে গেল। এরকম হলে প্রথম-প্রথম যতটা ব্যথা লাগত, এখনো কি ততটাই লাগে? পারমিতার কেমন যেন সন্দেহ হয়...না। প্রতিদিনের এই অত্যাচারে ব্যথা পাওয়ার নার্ভগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে বোধহয়। গেলেই ভালো।
এই নোংরামিগুলো তাকে আগে সহ্য করতে হয়নি, কারণ, শেষদিকের চরম অশান্তির সময়টুকু বাদ দিলে, বিবাহিত জীবনের বাকি বছরগুলো ও আর অনুপম ওদের নিজেদের গাড়িতেই অফিসে যাতায়াত করেছে। দাঁতে-দাঁত চিপে হলেও পারমিতা উঠে বসেছে অনুপমের পাশের সিটে। কেন বসবে না? গাড়িটা কিনবার সময় ও ফিফটি-পার্সেন্ট কন্ট্রিবিউট করেনি?
দুজনে মিলেই গাড়িটা কিনেছিল। অথচ রেজিস্ট্রেশনের সময় অনুপম ওর একার নামে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিল আর ডিভোর্সের সেটলমেন্টের সময় সেই সুযোগটাই নিল। গাড়ির বাবদে ওকে কিছুই দিল না।
গাড়ি রইল না। দু-বেলা ট্যাক্সি কিম্বা ক্যাব চাপার মতন অর্থবলও পারমিতার আর নেই। আগে দুজনের রোজগারে যা সম্ভব ছিল, একার রোজগারে তা সম্ভব নয়। তাছাড়া ছ’বছর আইটি সেক্টরে চাকরি করে ফেলার পরে এখন পারমিতা পরিষ্কার বুঝতে পারে, তার মতন শুধুমাত্র বিটেক ডিগ্রি নিয়ে যারা এখানে কাজ করছে তারা ক্রমশ এলেবেলে হয়ে যাচ্ছে। চাকরিতে লিফট নেই, স্যালারিতে হাইক নেই। পড়াশোনাটা আরো কিছুদূর চালিয়ে যেতে পারলে এভাবে ডুবে যেতে হত না।
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির মধ্যেও পারমিতার কখনো কখনো তার সেই উচ্চাশাময় দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কীভাবে মফস্বলের এক অতি-সাধারণ মেয়ে হয়েও একদিন সে প্রচণ্ড গোঁ নিয়ে লড়ে গিয়েছিল। এর-ওর কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়েছিল। দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা হু-হু করে ওঠে ওর। নিজেকে মনে হয় একটা ড্যাম্প-ধরা হাউই, যে শুরুতে তেড়েফুঁড়ে কিছুটা উঠেও তারপর মুখ থুবড়ে মাটিতে নেমে এসেছে।
তার সেভিংস থেকে মামলার খরচে অনেক টাকা বেরিয়ে গেছে। বাবাইয়ের নামে যে মেইনটেন্যান্সের টাকাটা দেওয়ার কথা ছিল, সেটাও অনুপম তিন-চারমাস পর থেকেই আর দিচ্ছে না। তার জন্যে অনুপমকে উকিলের চিঠি দেওয়াই যায়, কিন্তু পারমিতার আর কোর্ট-কাছারি করার এনার্জি নেই। একা-একা এত কিছু পারা যায় নাকি?
সবমিলিয়ে আগের তুলনায় সে বেশ গরিব হয়ে গেছে বলেই বিবাহবিচ্ছেদের পরের এই দেড়টা বছর তাকে রোজ মেট্রোতেই অফিস যাতায়াত করতে হচ্ছে চোরাগোপ্তা মলেস্টেডও হচ্ছে। ধরতে পারলে চড়-থাপ্পড় দেয় ঠিকই, তবে ক’টা শুয়োরকেই বা ধরা যায়?
পারমিতাকে যে-চিন্তাটা সেই মুহূর্তে বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল, সেটা হল, আজকেও ফিরতে দেরি হল। বাবাই বাড়িতে একা রয়েছে। ছেলেটা কী করছে কে জানে!
স্টেশনের বাইরে এসে রিকশা নিল পারমিতা। রিকশায় না গেলেও হয়, কারণ, স্টেশন থেকে ওর ফ্ল্যাট ঠিক ন-মিনিটের হাঁটা পথ। পারমিতা এমনিতে রোজ হেঁটেই ফেরে। তাতে পয়সা বাঁচানো ছাড়াও আরো একটা সুবিধে হয়, ফুটপাথের বাজার থেকে ও চিকেন, মাছ, আনাজপাতি এইসব কিনে নিয়ে বাড়ি ঢুকতে পারে। সব করেও বাড়ি পৌঁছতে কুড়ি-মিনিটের বেশি সময় লাগে না। কিন্তু আজ আর ওসব করলে হবে না। বাবাই একা আছে।
বাবাই সারাদিন যার হেফাজতে থাকে, সেই শিখাদি চাকরিতে ঢোকার সময়েই বলে দিয়েছিল, সাড়ে-ছ’টার পরে সে আর একমিনিটও থাকতে পারবে না, কারণ, ওর বরের ওইসময়ে ছুটি হয়। বরের স্কুটারেই বাড়ি ফেরে শিখাদি। আজও নিশ্চয়ই ফিরে গেছে। তাই আজ পনেরো-টাকা রিকশাভাড়া দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়ি ফিরল পারমিতা।
বাড়িটা পুরোনো আমলের ফ্ল্যাটবাড়ি; জি প্লাস ফোর-টোর নয়। একটা বহু পুরোনো তিনতলা বসত-বাড়ির এখান-ওখান থেকে খামচা মেরে কিছুটা-কিছুটা করে কেটে নিয়ে, দেয়াল-টেয়াল তুলে, একেকটা আলাদা এস্টাব্লিসমেন্ট বানানো হয়েছে। কোনওটা তিন-কামরার, কোনওটা দু-কামরার, কোনওটা এক। পারমিতা পেয়েছে বাড়িটার তিনতলায় একটা ওয়ান-রুম ফ্ল্যাট।
আরেকটু ভালো জায়গায়, আরেকটু ভালো ফ্ল্যাট ও নিতেই পারত। এমন একটা জায়গা, যেখানে অন্তত একটা বাচ্চাদের ক্রেশ থাকত। কিন্তু পায়নি। সিঙ্গল উওম্যান দেখেই বাড়িওলারা ফুটিয়ে দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মা কিম্বা দিদির মতন কোনও আত্মীয়া সঙ্গে থাকলে বাড়িভাড়া পাওয়া একটু সহজ হয়। পারমিতার সেটা নেই। অগত্যা কালিঘাটের এই ফ্ল্যাটটায় আপাতত বাবাইকে নিয়ে মাথা গুঁজেছে। চেষ্টা চালাচ্ছে আরেকটু ভালো কিছু পাবার।
কলিং বেলের ডিং-ডং আওয়াজ থামতেই, ছোট-ছোট দুটো পায়ের ছুটে আসার শব্দ শুনতে পেল পারমিতা। তারপর একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে আনার আওয়াজ। দরজার পিপ-হোলের ছোট্ট গোল আলোটা ঢেকে গেল। বাবাই চেয়ারে উঠে পিপ-হোলে চোখ রেখে দেখছে, কে বেল বাজালো।
অসম্ভব এক মায়ায় পারমিতার বুকটা টনটন করে উঠল। বাবাই নাকি হাবা? বাবাই নাকি সবকিছু দেরিতে শেখে? তাহলে কি ওর একটু-একটু করে উন্নতি হচ্ছে? হে ভগবান। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যেন ও দ্যাখে বাবাই সেরে গেছে, আর পাঁচটা বাচ্চার মতন স্বাভাবিক হয়ে গেছে!
সেই যে ডেলিভারির সময় দেরি, তার জলহীন জরায়ুর মধ্যে বাবাইয়ের দমবন্ধ ছটফটানি আর তারপর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়া, তারও পরে ওর কচি মাথায় ফরসেপের চাপ—এই সবকিছু মিলিয়েই বাবাই একটা স্পেশালি এবলড চাইল্ড হয়ে জন্মাল। বছরখানেকের মাথায় এই নিষ্ঠুর সত্য বুঝতে পেরে পারমিতা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। অনুপম আর তার মায়ের প্রতিক্রিয়াটা ছিল ভিন্ন। ওরা দুজনেই হিংস্র হয়ে উঠেছিল। কলকাতা ছেড়ে শিশুর জন্মের জন্যে জগৎপুরে চলে যাওয়াটা ছিল একা পারমিতার সিদ্ধান্ত আর ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই বাচ্চাটা এরকম অ্যাবনর্মাল হল—এই ছিল ওদের দুজনের বক্তব্য।
পারমিতা অনেকবার সেই হিংস্রতার মুখে রুখে উঠেছে। বলেছে, কলকাতায় অনুপমের বাড়িতে যদি ন্যূনতম যত্ন আর অবসর পেত, তাহলে ওকে কোথাও যেতে হত না। পায়নি বলেই জগৎপুরে গিয়েছিল।
কিন্তু শাশুড়ি আর বরের মধ্যে কেউই শোনেনি সে-কথা। বরং আরোই খেপে উঠেছে। বলেছে, তুমি মিথ্যে দুর্নাম ছড়াচ্ছ আমাদের নামে।
বাবাই ভেতর থেকে দরজার লক খুলে দিয়েছে। সেই শব্দে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এল পারমিতা।
এই লক খোলা-বন্ধ করার কাজটাও বাবাইকে অনেক সময় নিয়ে শেখাতে হয়েছে। অবশ্য যেহেতু ওটা ইয়েল-লক তাই কোনও-কারণে ও ভেতর থেকে খুলতে না পারলেও পারমিতা বাইরে থেকে নিজের চাবি দিয়ে খুলে নিতেই পারে, তবু বাবাইয়ের সাবধানতার অভ্যেসটা তৈরি করার জন্যেই ও এখন প্রতিদিন কলিং-বেল বাজায়।
ভেতরে ঢুকে দরজাটা আবার লাগিয়ে দিল পারমিতা। দরজা লাগাতে যেটুকু সময়, তারমধ্যেই বাবাই ওর দুই ঊরু দু-হাতে জাপটে ধরে নিজের ছোট্ট শরীরটাকে মায়ের পায়ের সঙ্গে লেপটে দিয়েছিল। ঘুমোনোর আগে অবধি ও ওইভাবেই মাকে জড়িয়ে ধরে থাকবে—হয় মায়ের হাত, নাহলে গলা, নাহলে পা—নাগালের মধ্যে যেটা পাবে। এমনকী ঘুমের মধ্যেও ছেলেটা হাত বাড়িয়ে মা-কে খোঁজে।
পারমিতা বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে বলল, একবারটি ছাড়ো বেটু। আমি চেয়ারটা ঠিক জায়গায় রেখে আসি।
বাবাই পা ছেড়ে দিয়ে পারমিতার কুর্তার প্রান্তটা চেপে ধরে ওর সঙ্গে সঙ্গে চলল। ওইভাবেই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে পারমিতা মোবাইলটা চার্জে বসালো। অফিসের ব্যাগ, জলের বোতল ইত্যাদি যেটা যেখানে রাখার রেখে বাড়িতে পরার পোশাক বার করল। তারপর বাবাইয়ের স্কুলব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বার করে একবার সেদিনের কমেন্টসগুলোর ওপরে চোখ বুলিয়ে, বিরক্তমুখে ছুড়ে ফেলে দিল বিছানার ওপরে। এক্ষুনি বাবাইকে একটা ভালো কোনও স্কুলে ট্র্যান্সফার করে নিয়ে যেতে হবে—যেখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা একটা স্লো-লার্নার বাচ্চার সমস্যাগুলো বুঝবেন।
এই পুরো সময়টাই বাবাই পারমিতাকে অনেক কথা বলে চলেছিল। পারমিতা কিছু শুনছিল, কিছু শুনছিল না। তবে সমানেই জবাব দিয়ে যাচ্ছিল। আসলে শুনতে ভালো লাগে না, বুকের ভেতরে প্রবল কষ্ট হয়। কারণ, বাবাই আধো-আধো গলায় যা বলে, তার মধ্যে থেকে একটা কথাই পরিষ্কার বেরিয়ে আসে—স্কুলে ও ক্লাসমেটদের কাছে বুলীড হচ্ছে আর টিচাররা ওকে বকছেন। কোন মায়ের ভালো লাগে এরকম কথা শুনতে?
বাবাইটা একটু অন্যরকম বলেই পারমিতার শ্বশুরবাড়ি থেকে ডিভোর্সের মামলাটা মিউচুয়াল করে ছেড়ে দিল। না-হলে অনুপমের মা অন্তত অনুপমকে লড়ে যেতে বলতেন। যেরকম অর্থোডক্স মহিলা, তাতে বংশের পুত্রসন্তানকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে দিতেন না।
ডিভানের একদিকে বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিল পারমিতা। এমনিই বসেছিল—বই পড়ছিল না, গান শুনছিল না, অফিসের কাজও করছিল না। ল্যাপটপটা অবহেলায় একপাশে পড়েছিল। হঠাৎ টেবিল-ক্লকটার দিকে চোখ পড়তে সে চমকে উঠল। এত তাড়াতাড়ি দশটা বেজে গেল! কত দ্রুত একেকটা দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর একটু বাদেই শিখাদির রান্না করে যাওয়া খাবারগুলো ফ্রিজ থেকে বার করে খেয়ে ওরা মা-ব্যাটায় ঘুমিয়ে পড়বে। সকাল সাতটা থেকে আবার শুরু হবে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়—ওর, বাবাইয়ের।
পারমিতার কোলের ওপরে খাতাটা রেখে, উপুড় হয়ে শুয়ে, একমনে হোমটাস্ক করে যাচ্ছিল বাবাই। পারমিতা অন্যমনস্কভাবে দেখছিল, বাবাই একটার পর একটা অ্যাডিশনের অঙ্ক ভুল করছে। নোংরা হাতের লেখায়, বড় বড় করে এক্সারসাইজ-বুকের পাতায় ভুল সংখ্যা বসিয়ে যাচ্ছে ওর দেবশিশুর মতন ছেলেটা।
পারমিতা পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, বাবাই কাল আবার টিচারের কাছে প্রচণ্ড বকুনি খাবে। আবার ওর বন্ধুরা ওকে বুলী করবে।
পারমিতা যদি ছেলের এই কষ্ট দেখতে না চায় তাহলে তাকে কী-কী করতে হবে, সেসব সাইকিয়াট্রিস্ট দেবাংশু মণ্ডল একবার ওকে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তবে, ডক্টর মণ্ডলের অ্যাডভাইস শুনতে-শুনতেই পারমিতা বুঝতে পেরেছিল, ও পেরে উঠবে না। ছেলেকে কাছে নিয়ে বসে পড়াতে গেলে, তাকে বিল্ডিং-ব্লক আর ম্যাজিক-ব্রিকস দিয়ে খেলা শেখাতে গেলে, বাঃ খুব সুন্দর হয়েছে, এই তো পেরেছ—এইসব বলে ছেলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে গেলে সে নিজে চাকরি করবে কখন?
অথচ, অনুপমের অত্যাচারের হাত থেকে ছেলেটাকে বাঁচিয়ে ওকে ঠিকঠাক মানুষ করার জন্যেই পারমিতাকে ডিভোর্সের মতন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। এখনও এমন একটাও দিন যায় না, যেদিন পারমিতাকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে সেই কালো-দিনগুলো হন্ট করে যায় না।
অফিস থেকে ফিরে দু-হাতে কপালের রগ টিপে বসে থাকত অনুপম। মাঝে-মাঝে চিৎকার করে উঠত, কী পাচ্ছি আমি সংসার থেকে? মানুষ কি এইজন্যে বিয়ে করে? বাচ্চা চায়? সারাদিনের শেষে ক্লান্ত-শরীরে বাড়ি ফিরে দেখব, তুমি ওই হারামজাদাটাকে কথা শেখানোর জন্যে লড়ে যাচ্ছ। চা-জলখাবারটাও আমাকে নিজে নিয়ে খেতে হবে?
হারামজাদা অর্থাৎ বাবাইয়ের বয়স তখন তিনবছর। হিসেবমতন কথা বলতে শিখে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ও তখনো পারত না। তাই অসম্ভব আতঙ্কে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দিয়ে থরথর করে কাঁপত আর গোঙানির মতন আওয়াজ করত। এরকম অনেকবার হয়েছে, ঘুমন্ত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে পারমিতা সারারাত খোলা বারান্দায় চেয়ারে বসে থেকেছে আর ঘরের মধ্যে অনুপম মদ খেতে খেতে কখনো হেসেছে, কখনো কেঁদেছে, কখনো ল্যামেন্ট করে গেছে।
পারমিতা ওর অত্যধিক ড্রিঙ্ক করা নিয়ে প্রশ্ন তুললে বুক ফুলিয়ে জবাব দিত, ওইটুকুই আমার রিক্রিয়েশন। তাতেও তোমার গা জ্বলছে? তার-বাইরে সারাদিনই তো তোমার আর তোমার ওই অ্যাবনর্মাল বাচ্চাটার সঙ্গে কাটাতে বাধ্য হচ্ছি।
পারমিতা খুব ভালো করেই জানত, অনুপমের সৌন্দর্যবোধ, ভদ্রতা, এককথায় যে-কোনও রকমের সূক্ষ্ম অনুভূতিরই অভাব রয়েছে। লাউড গান শোনার, ট্র্যাশ সিনেমা দেখার নেশা আছে। যখন যা চাই, তখনই তা চাই টাইপের একটা গোঁ রয়েছে। এর কোনওটাই খুব একটা প্রেমিক সুলভ হয়তো নয়, কিন্তু পারমিতা ভেবেছিল তার জন্যে লাইফ-পার্টনার হতে আটকাবে কেন? কারণ ও তো এটাও দেখেছিল যে, অনুপম কেরিয়ারিস্ট, হিসেবি এবং সাবধানী। অ্যান্ড হি ওয়স গুড অন দা বেড অলসো। স্বামী হওয়ার জন্যে এগুলোকেই সে যথেষ্ট বলে মনে করেছিল।
আর অনুপম তার মধ্যে কী দেখেছিল? নিজের মুখে তো কোনওদিন সেরকম কিছু বলেনি। ওসব বলার মতন ভাষাই জানা নেই অনুপমের। কিন্তু এখন পারমিতা একটা ব্যাপারে নিশ্চিত। ওর যে কোনও সহায় নেই, ওর যে কোনও পুলিশের বড়কর্তা মামা কিম্বা পলিটিশিয়ান কাকা নেই, এটাকে অনুপম নিশ্চয়ই পত্নী-নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটা প্লাস-পয়েট হিসেবেই দেখেছিল। ও জানত পারমিতাকে ডমিনেট করা খুব সহজ হবে।
ওদের দুজনেরই হিসেবে ভুল ছিল। অনুপমের আত্মকেন্দ্রিকতা পারমিতা হিসেবের মধ্যে ধরেনি আর পারমিতার বাৎসল্যের হদিশই বা অনুপম বিয়ের আগে পাবে কেমন করে?
নিজের ভুল ছিল বলেই হয়তো অনুপমের আক্ষেপ, অভিশাপ, গালাগালি সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছিল পারমিতা। তবে অনুপম যখন বাবাইকে মারধোর শুরু করল তখনই পারমিতা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে যাবে। কিছুদিনের মধ্যেই ও নিজের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর বাবাইকে নিয়ে অলোকদা আর জয়াদির ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেছিল।
সেই যে বেরিয়ে এসেছিল, নিউটাউনের ওই ফ্ল্যাটে আর দ্বিতীয়বার ঢোকেনি পারমিতা। জয়াদির বাড়ি থেকেই ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছিল অনুপমকে।
কিন্তু আজ দেড়বছর কেটে যাওয়ার পরে পারমিতা ভাবে, ও নিজে বাবাইকে কী দিতে পারছে? কতটুকু সময় দিতে পারছে? কী হবে বাবাইয়ের? ছেলেটা কি তাহলে একটা অস্বাভাবিক মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে যার দিকে পেছন থেকে উড়ে আসবে ঢিল আর খিস্তি?
পারমিতার চিন্তার মধ্যেই বাবাই হঠাৎ ওর তিসিফুলের মতন নীলচে চোখদুটো তুলে জিগ্যেস করল, সামস-গুলো ঠিক হচ্ছে, মাম্মি?
পারমিতা অন্যমনস্কভাবেই ঘাড় নাড়ল। বলল, জানি না, বেটু।
বাবাই মায়ের কথায় মজা পেয়ে খিল-খিল করে হেসে উঠল। বলল, তুমিও সামস জানো না? তোমাকেও টিচার বকে?
এতক্ষণ ধরে চেপে-রাখা দীর্ঘশ্বাসটা বাইরে বার করে পারমিতা বলল, সত্যিই আমি অঙ্ক জানি না সোনা। চলো, বইখাতা গুছিয়ে তুলে রাখো। এবার আমরা খেতে বসব।
বাবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরেও পারমিতা জেগে ছিল। রোজই থাকে। সহজে ঘুম আসতে চায় না। এই সময়টায় ও প্রায় রোজই অনুপমের গায়ের গন্ধ পায়। মন যাকে চরম ঘৃণা করে, শরীর এখনো তার শরীরকে ভালোবাসে, তার কথা স্মরণ করে।
শরীরের কোনও দোষ নেই।
কত...কত রাত পারমিতার এই হাত অনুপমকে পেছন থেকে জড়িয়ে রেখেছে। কত...কত রাত তার এই মুখ ডুবে থেকেছে ঘুমন্ত অনুপমের নুনের গন্ধ জড়ানো পিঠের ভেতরে। মানুষের শরীরও তো আসলে এক পিটুইটারি-তাড়িত অবোধ কুকুর।
অবশেষে রাত একটার সময় বাথরুম থেকে ঘুরে এসে পারমিতা ব্যাগ থেকে একটা ঘুমের ওষুধ বার করে জল দিয়ে গিলে নিল। রোজই প্রতিজ্ঞা করে, খাবে না, তবু রোজই এই ছোট্ট সাদা ট্যাবলেটটা তাকে গিলতে হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন