সৈকত মুখোপাধ্যায়

বিয়ের পরে, অনুপম যে-সময়টায় চাকরি ছেড়ে এম.বি.এ. পড়তে গিয়েছিল, সেই-সময়টায় ওদের সংসারের পুরো খরচটাই চালিয়েছিল রুমি। সংসার বলতে তো শুধুই অনুপমের মা আর ওরা দুজন। তাই ও নিয়ে কিছুই ভাবেনি রুমি। তবে ম্যানেজমেন্ট পাশ করে যখন অনুপম মাসে আড়াই-লাখ টাকা মাইনের একটা চাকরি পেল এবং তারপরেও রুমিকে বলল, আগামী একটা বছর একটু এইভাবে তোমার মাইনে থেকে চালিয়ে নাও, আমি এডুকেশন-লোনটা শোধ করি, তখন রুমি বেশ চমকে গিয়েছিল।
ইতিমধ্যে রুমি নিজে এম.বি.এ.-র এন্ট্র্যান্স-এগজাম ক্র্যাক করে ফেলেছিল। ও সরল-মনেই অনুপমকে বলেছিল, সে কি! আমি যে এবারে চাকরিটা ছাড়ব ভাবছিলাম।
কেন? শিশুর মতন সরল মুখে অনুপম প্রশ্ন করেছিল।
আমি ম্যানেজমেন্ট পড়ব না?
প্লিজ রুমি। অনুপম ওর হাতের পাতাটা মুঠোর মধ্যে ধরে বলেছিল, প্লিজ, একটা বছর ওয়েট করো। আমি লোনটা শোধ করে নিই। তারপরে তুমি...আরে, তুমি তো ব্রিলিয়ান্ট। আরেকবার ক্যাট ক্র্যাক করা তোমার পক্ষে কোনও ব্যাপারই নয়।
ব্যাপার নয়? অনুপমের মুঠির মধ্যে থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রুমি ঘরের অন্য কোনায় জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভাবছিল, অনুপম কি জানে না ওর ‘পড়াশোনার সময়’ বলে বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। জানে না, এখন অফিস থেকে ফিরে ওকে তিনজনের রাতের খাবার বানাতে হয়—নিজের, অনুপমের আর শাশুড়িমায়ের। ওকেই যেতে হয় ছুটির দিনে লন্ড্রিতে, ওকেই বাজার করে আনতে হয়। যখন অনুপম হস্টেলে ছিল তখন যে নিয়মগুলো চালু হয়েছিল, তার কোনওটাই এখনো বন্ধ হয়নি। অনুপম কি বুঝতে পারছে না, সারাদিন অফিস করার পরেও সংসারের এইসব কাজ করে কেউ ক্যাট ক্র্যাক করতে পারে না, তা সে যত ব্রিলিয়ান্টই হোক।
রুমির চোয়ালদুটো কঠিন হয়ে উঠল। ও বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল ভেতরে। অনুপমের চোখে চোখ রেখে বলল, বেশ। তাহলে রান্নার লোক রাখব। নাহলে আমি পড়ার সময় পাব না। আর তাছাড়া অফিস থেকে ফিরে রান্না করতে আমার ভালোও লাগে না। খুব টায়ার্ড লাগে।
অনুপম সবে মাত্র নীচু গলায়, সেটা আবার একটা বাড়তি খরচার বোঝা নয়, এরকম কী যেন বলতে শুরু করেছিল, তার মধ্যেই অনুপমের মা পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে এসেছিলেন। কঠিন স্বরে বলেছিলেন, তার দরকার নেই বউমা। আমিই আবার সব করব, যেমন চিরকাল করেছি। ভেবেছিলাম ছেলের বিয়ের পরে হেঁসেল থেকে মুক্তি পাব, কিন্তু তা আর হবে না।
রুমি বলেছিল, কেন? রান্নার লোক রাখতে অসুবিধে কোথায়?
শাশুড়ি বলেছিলেন, তুমি যেরকম পরিবেশ থেকে এসেছ তাতে অসুবিধেগুলো ঠিক বুঝতে পারবে না। রান্নার লোক দেখেছ কখনো?
না। দেখেনি রুমি। তাদের জগৎপুরের বাড়িতে মা-ঠাকুমাই রান্না করত। পরে একা ঠাকুমা। তাই সে অবাক হয়ে শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়েছিল।
উনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে বলে গিয়েছিলেন, রান্নার লোক রাখা মানে গ্যাস আর তেল-মশলার শ্রাদ্ধ। পয়সা যাবে, শরীরগুলোও নষ্ট হবে। ও আমি পারব না। তার চেয়ে বাকি জীবনটাও না হয় পিন্ডি রেঁধে কাটালাম।
না, শাশুড়ি ঢোকেননি রান্নাঘরে। রুমিই ঢুকেছিল। কারণ, অনুপম ছিল তার মায়ের পক্ষে। রুমি তখনও আশায়-আশায় ছিল একবছর বাদে অনুপম তাকে চাকরি ছাড়তে বলবে। তখন সে আবার হাতে অনেকটা সময় পাবে, যে-সময়টায় সে এন্ট্রান্স-এগজামের প্রস্তুতি নিতে পারবে।
তা হয়নি।
হয়নি যে, তার কিছুটা দায় রুমিরও। অনুপমের সঙ্গে শারীরিক মিলনের সময় সে যথেষ্ট সাবধানতা নেয়নি। আসলে কীভাবে নিতে হয় তা সে জানত না। পরে তার অনেকবার মনে হয়েছে, অনুপমও কি পারত না সাবধান হতে। না-হয় দুজনে মিলেই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিত। ওর উদাসীনতার পেছনে কি রুমিকে গেঁথে ফেলার...বেঁধে ফেলার অভিসন্ধিই কাজ করেছিল?
রুমি যখন বুঝতে পারল ও উদ্ধারহীন ভাবে গর্ভবতী, যে গর্ভকাল এতদূরই এগিয়ে গিয়েছে যে তাকে নষ্ট করাও অসম্ভব, তখন ও হাল ছেড়ে দিল। ও ভাবল, এখন থেকে আমি বড়জোর যে-চাকরিটা করছি, সেটাকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারি।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এডুকেশন-লোন শোধ হওয়া মাত্রই আরেকটা বড়সড় লোন নিল অনুপম। লোন নিয়ে নিউটাউনে একটা থ্রি বি এইচ কে ফ্ল্যাট কিনল।
রুমি খবরটা শুনে খুব অবাক হয়ে অনুপমকে বলেছিল, আমাকে একবার জিগ্যেস করলে না?
অনুপম উত্তর দিয়েছিল, জিগ্যেস করার কী আছে? যদি একটা পছন্দসই ফ্ল্যাটই না কিনতে পারি, তাহলে দুজনে ইনকাম করছি কেন? কথাটা এতদিন বাদেও রুমির মনে আছে। কথা নয়...কথা বলার ভঙ্গি। সেদিনই অনুপম প্রথম তার এতদিনের চর্চিত ভদ্রতা সরিয়ে রেখে, খুব রুক্ষ গলায় বলেছিল কথাগুলো। তারপর থেকে রুমির সঙ্গে ওই-সুরেই কথা বলতে শুরু করল অনুপম—দাপট দেখিয়ে, ঝাঁঝিয়ে।
সেটা ছিল এক বুধবারের সকাল। সাতমাস পূর্ণ হয়ে রুমির প্রেগন্যান্সির অষ্টম মাস চলছিল তখন। তখনো সে অতিকষ্টে অফিস করে চলেছিল। মেটারনিটি-লিভটা বাচ্চা হওয়ার পরেই নেবে বলে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তবে তার কিছুদিন আগে থেকেই সে খেতে পারছিল না প্রায় কিছুই। খেলেই গা গুলিয়ে উঠছিল। ওদিকে যে ডাক্তারবাবু তাকে দেখছিলেন, তিনি বলে দিয়েছিলেন, পেটের বাচ্চাটার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। রুমিকে খেতে হবে, ফল, দুধ, সিরিয়ালস। বিশ্রাম নিতে হবে আরো বেশি করে।
রুমি কিছুই করেনি। খায়নি, বিশ্রামও নেয়নি। কেউ তাকে বলেনি, কেন পাতে ভাত ফেলে রেখে উঠে যাচ্ছ প্রতিদিন। কেউ তার জন্যে হাতে করে একটা ফল বা মিষ্টি নিয়ে আসেনি। না অনুপম না তার মা।
পেটের ভেতরে বাচ্চাটা নড়ে উঠলে রুমি মনে-মনে বলত, আসিস না, ফিরে যা। এখানে এলে তোর খুব কষ্ট হবে। ভালোবাসা পাবি না। তার চেয়ে মরে যা সোনা।
সেদিনও রুমি প্রায় কিছুই না খেয়ে উঠে গিয়েছিল। অফিসের পোশাক পরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি টানতে-টানতে তার চোখে পড়েছিল অনুপমের ব্রিফকেসের নীচ থেকে বেরিয়ে থাকা ব্যঙ্কের সঙ্গে লোন-এগ্রিমেন্টের কাগজটা। ওটা দেখেই সে অনুপমকে প্রশ্ন করেছিল, ফ্ল্যাট কিনছ যে সেটা আমাকে একবার জানাবে না আর অনুপম তার উত্তরে ওদের দুজনের রোজগার দেখিয়েছিল।
রুমি বলেছিল, তার মানে আমি শুধু টাকা রোজগারের মেশিন? জীবনে আমার আর কিছুই থাকবে না?
টাইয়ের নট ঠিক করতে-করতে অনুপম মুচকি হেসে আয়নার মধ্যে রুমির প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েছিল। চোখ দিয়ে ওর ফুলে-ওঠা তলপেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিল, জীবনের সেরা প্রাপ্তিটা তো আমিই তোমাকে গিফট করেছি। তাকে নিয়ে জীবন কাটাতে পারবে না?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন