এক

সৈকত মুখোপাধ্যায়

ভাদ্রমাসের বৃষ্টিথামা দুপুর। চড়া রোদ্দুর উঠেছে। সেই রোদ এতই তীব্র যে, রাতুল মাথার ওপরে উড়তে-থাকা লাল-ফড়িংদের ডানার শিরা-উপশিরাগুলো অবধি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল।

রাতুলের কয়েক-পা আগে আগে হাঁটছিল তারাপদ ঘোষাল। ঘামে চিকচিক করছিল ফরসা-মানুষটার পিঠ। লোকটা আজকেও নীলকুঠির কুয়োর ধারে গিয়ে বসেছিল; রাতুল ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝেই এই কাজটা ওকে করতে হয়; বাড়ি থেকে পালানো পাগল লোকটাকে খুঁজেপেতে আবার বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। নাহলে তারাপদকাকার বুড়ি-মা না খেয়ে বসে থাকেন। কিছুক্ষণ বাদে-বাদেই বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চৈস্বরে ডাকেন, ও তারা! তারা রে! কোথায় গেলি বাবা? ভাতগুলো যে ঠান্ডা জল হয়ে গেল।

তারাপদ ঘোষাল হচ্ছে শীতলাবাড়ির বড় ছেলে। ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িটা রাতুলদের বাড়ির উত্তরে। দুটো বাড়ির মধ্যে যাতায়াতের গলিটা লম্বা হলেও আসলে বাড়িদুটোর মধ্যে পাখি-ওড়া দূরত্ব সামান্যই। তাই তারাপদকাকার মায়ের আকুল ডাকটা পরিষ্কার ওর কানে বাজে। তখন আর স্থির থাকতে পারে না রাতুল, তারাপদকাকাকে খুঁজতে বের হয়।

নীলকুঠির কুয়োটা গঞ্জ-জগৎপুরের সীমানার বাইরে বলা চলে। ওদের শীতলাপাড়া থেকে প্রায় আধঘণ্টার হাঁটা পথ। তারাপদকাকার প্রিয় কয়েকটা পালানোর জায়গার মধ্যে ওটা একটা। মনে হয় সত্যিই এককালে ওখানে একটা নীলকুঠি ছিল। এখন শুধু কয়েকটা ভাঙাচোরা ইটের দেয়াল রয়েছে, আর পাথুরে-ইট দিয়ে বাঁধানো গভীর একটা কুয়ো।

রাতুল একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ওদিকে তাকাল। তারাপদকাকাকে নিয়ে সে ইতিমধ্যে অনেকটা পথ চলে এসেছে, তবু উজ্জ্বল রোদের কারণেই এত দূর থেকেও জায়গাটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উল্টোনো সরার মতন একটুকরো উঁচু জমি, লোকে বলে ওই ঢিবিটার নীচেই চাপা পড়ে আছে বৃটিশ আমলের নীলকুঠি। আর ওই যে কয়েকটা বাবলাগাছের গাঢ় সবুজ একটা গণ্ডি দেখা যাচ্ছে, ওরই মাঝখানে রয়েছে কুয়োটা। আজকেও রাতুল উঁকি দিয়ে দেখে এসেছে—কুয়োর নীচে জল আছে। তবে ওই জল কেউ ব্যবহার করে না। কে করবে? চারিদিকে লোকবসতিই তো নেই। শুধু ধানখেত আর তার ফাঁকে-ফাঁকে কিছু পতিত জমি আর জলা। পাগল ছাড়া কে যাবে ওখানে? পাগল বলেই তারাপদ ঘোষাল যায়। ওখানে গিয়ে কুয়োর পাড়ে হাঁটুর ওপরে থুঁতনি রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে।

রোদের তাপে রাস্তার ভিজে মোরাম আর কলমিলতায় ঠাসা নয়ানজুলির পেট থেকে গলগল করে গরম ভাপ উঠছিল। ঝিলমিল করে কাঁপছিল চারিদিকের আকাশ-মাটি-গাছ।

রাস্তার মধ্যে একজায়গায় মোরাম সরে যাওয়ার ফলে কিছুটা বৃষ্টির জল জমেছিল। তারাপদকাকা চলতে-চলতে ওই জলজমা খন্দটার সামনে ভয়-ভয় মুখ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মুখ ফিরিয়ে রাতুলের দিকে তাকাল।

রাতুল বলল, কী হল? দাঁড়ালে কেন? চলো।

জমা জলটুকুর দিকে তাকিয়ে ওইরকম ভয়-পাওয়া গলাতেই তারাপদকাকা বলল, পেরোব কেমন করে? আকাশটা যদি টেনে নেয়। যদি আর উঠতে না পারি।

রাতুল ওর পাশে দাঁড়িয়ে খানাটার দিকে তাকাল। জমা-জলের বুকে নীল আকাশের ছায়া পড়েছে সত্যি, কিন্তু ওই ছায়া একজন মানুষকে টেনে নেবে? এরকম চিন্তা কেমন করে যে তারাপদকাকার মাথায় আসে! তবে অভিজ্ঞতা থেকে রাতুল জানে, বুঝিয়ে বা তর্ক করে লাভ নেই। তাই তারাপদকাকার হাতের ওপরের দিকটা চেপে ধরে বলল, দরকার নেই ডিঙোনোর। চলো, আমরা পাশ কাটিয়ে চলে যাই।

বাকি রাস্তাটা অবশ্য আর কোনও ঝামেলা না করেই চলে এল তারাপদকাকা।

ইদানীং তারাপদকাকার কল্যাণে এরকম কিছু-কিছু জায়গায় আবার আসা হচ্ছে রাতুলের। এখন ওর বয়েস তেইশ। বছর পাঁচেক আগে, যখন কাজের চাপ এতটা বাড়েনি, তখন সে মাঝে-মাঝে স্কেচ করার জন্যে ওই নীলকুঠির মাঠে যেত। বোর্ডের ওপরে ড্রইং-শিট লাগিয়ে, পেন্সিলের সরু মোটা আঁচড়ে এঁকে নিত ভাঙা ইটের অমসৃণ টেক্সচার কিংবা বাবলাগাছের নীচে পড়ে থাকা আলোছায়ার আঁকিবুঁকি। কিন্তু সে কখনো তারাপদকাকার চোখ দিয়ে পথের ওপরে আকাশকে পড়ে থাকতে দেখেনি। ওভাবে কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব
নয়।

আজকেও ওকে আসতে দেখেই তারাপদকাকা হাত-পা নেড়ে চেঁচাতে শুরু করেছিল, না, আমি এখন ফিরতে পারব না।

কেন তারাপদকাকা? প্রশ্ন করেছিল রাতুল। ঠাকুমা কতক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করছেন যে।

আমি চলে গেলেই যদি সে আসে? যদি ওই ইঁদারায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে? আটকাতে হবে না?

রাতুল বলেছিল, না। কেউ আত্মহত্যা করতে আসবে না। সবাই দিব্যি সুখে আছে। তুমি চলো।

সুখে থাকলেই আত্মহত্যা করবে না? আশ্চর্য কথা বলিস তো তুই। দ্যাখ না। একবার উঁকি মেরে দ্যাখ। তোরও মনে হবে লাফিয়ে পড়ি। সত্যি সত্যি লাফাস না যেন।

এই হচ্ছে তারাপদকাকার রোগ। নিজেকে মনে করে প্রাণের প্রহরী। কার প্রাণ কে জানে? রাতুলের ভীষণ ভয় করে এসব কথা শুনে। কোনদিন তো এই লোকটা নিজেই কুয়োর মধ্যে ঝাঁপ দেবে। কিম্বা গলা দিয়ে দেবে রেললাইনে। সে তাই তাড়াহুড়ো করে তারাপদকাকার দুই বগলের নীচে হাত দিয়ে তাকে টেনে তুলে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগিয়েছিল।

এখনো প্রায় দশ-মিনিট হাঁটলে ওরা পৌঁছবে নিজেদের পাড়ায়, যার নাম শীতলাপাড়া। রাজ্য সড়কের পাশে সে খুব জমজমাট এলাকা। পাকা বাড়ি, বাজারহাট, দোকান-পাট। ওদের পাড়ার প্রায় গা দিয়েই ঘন-ঘন দশ-চাকার মালবোঝাই লরি দৌড়য়। সব মিলিয়ে ভীষণ ওজনদার জায়গা। পাটের গাঁটরি, ইট, লোহা, সিমেন্ট ছাড়াও ওখানকার মাটিতে কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপুর পিণ্ড চাক বেঁধে জমে থাকে। সেই গুরুভারের নীচে পড়ে নরম মাটি হাঁসফাঁস করে। রাতুল মাটির কষ্ট বোঝে। মাটি নিয়েই কাজ তো তার।

অথচ এখন এই নীলকুঠি থেকে ফেরার পথের দু-পাশে সবকিছুই কী হালকা, কী রোগা! লিকলিকে কয়েকটা সজনেগাছ ছাড়া আর কোনও গাছ নেই। গাছের নীচে জমে থাকা ঝরাপাতার স্তূপ ঘেঁটে কটা ছাতারে-পাখি পোকা খুঁজছে। এমনকী দরমার দেয়াল আর টিনের চালের ঘরগুলোও এমন, যেন এখানে মন না বসলে, সেগুলোকে মাথায় তুলে নিয়ে বাসিন্দারা অন্য কোথাও চলে যেতেই পারে। রাতুল ভাবে, আবার একদিন সে স্কেচবুক নিয়ে এখানে আসবে। এই হালকা পৃথিবীর ছবি এঁকে নিয়ে যাবে।

ওর আরেকটা মন বলে, পারবে না রাতুল। গত চার-পাঁচ বছরে তুমি বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। আর কখনোই স্কেচবুক নিয়ে মাঠেঘাটে রেললাইনের ধারে গিয়ে বসে থাকতে পারবে না; পালবাড়ির উঠোনেই ঠাকুর বানিয়ে তোমার জীবন কেটে যাবে, যেমন কাটছে তোমার বাবা রাজেন পালের, যেমন কেটেছিল তোমার দাদু রাধানাথ পালের। তুমি শুধু মাঝে-মাঝে তোমার এই পাগল প্রতিবেশীর কল্যাণে দু-এক ঘণ্টার জন্যে ওরকম কোনও নিরালায় ঘুরে আসতে পারো।

এই অঞ্চলের বিখ্যাত প্রতিমা-শিল্পী স্বর্গত রাধানাথ পালের একমাত্র ছেলে রাজেন পাল। রাজেন পালেরও এই একটিই সন্তান—রাতুল, যার ডাক নাম রাতু।

রাতুলের গায়ের রঙ শ্যামলা। তেইশ-বছর বয়সেই দিব্যি চওড়া কাঠামোর শরীর। হনুর হাড় আর ভুরুর ওপরের অংশটা উঁচু হওয়ার ফলে মুখটা চোয়াড়ে হয়ে যেতেই পারত। কিন্তু ওগুলোকে ভারসাম্য দিয়েছে ওর চাপা নাক, সামান্য উঁচু দাঁতের সারি আর ভাসা-ভাসা দুটো চোখ। সব মিলিয়ে রাতুলের মুখের মধ্যে এখনো বালকের সারল্য রয়ে গেছে।

মিষ্টত্ব আছে রাতুলের স্বভাবেও। শান্ত, মায়াবি। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই বাবা-মাকে আগলে-আগলে রাখে। কখনো উঠোনের টিউবওয়েল থেকে মায়ের জন্যে রান্নাঘরের বালতিতে জল তুলে দিয়ে যাচ্ছে। কখনো দুপুরবেলায় অসময়ের বৃষ্টি নামার শব্দ শুনে দৌড়ে চলে যাচ্ছে ছাদে—মা কিছু বলার আগেই শুকনো জামাকাপড়গুলো তুলে নিয়ে আসছে।

রাতুল জগৎপুর-কলেজ থেকে বি.এ. পরীক্ষা দিয়েছিল। রেজাল্ট ভালো হয়নি। হবার কথাও নয়। সে চির-অন্যমনস্ক ছেলে।

কয়েক বছর হল, রাতুল বাবার সঙ্গে ঠাকুর গড়ার কাজেও হাত লাগিয়েছে। এবং দেখা যাচ্ছে মূর্তি-গড়ার কাজটা সে ভালোই পারে।

তাহলে কি ওর প্রতিমা বানাতে ভালো লাগে?

না, তাও না। প্রতিমা গড়ার কাজটাও ও অনিচ্ছা নিয়েই করে। নেহাৎ কাজটা আক্ষরিক-অর্থে ছাঁচে ফেলা কাজ, তাই হয়ে যায়।

তাহলে রাতুলের কী ভালো লাগে? পড়াশোনা ভালো লাগে না, বাবার সঙ্গে মূর্তি তৈরি করতেও ভালো লাগে না। তাহলে কী করতে চায় ও?

রাতুল ভাস্কর হতে চায়। প্রতিমা নয়; ও চায় ভাস্কর্য সৃষ্টি করতে।

ওর এই ইচ্ছার পেছনে একটা গল্প আছে।

যে-বছর রাতুল মাধ্যমিক পরীক্ষা দিল, সেই-বছরেই ওদের ক্লাব থেকে পাড়ার লোকেদের বাসে করে বীরভূম বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। দক্ষিণা ছিল সামান্য। দ্রষ্টব্যের মধ্যে ছিল শান্তিনিকেতন, বক্রেশ্বর, তিলপাড়া ব্যারেজ, তারাপীঠ এইসব। রাতুল সেই ট্রিপে গিয়েছিল।

শান্তিনিকেতনে গিয়েই রাতুলের চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গেল। বিশ্বভারতীর চত্বরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছটিয়ে থাকা রামকিঙ্করের কলের বাঁশি, সুজাতা, এইসব স্কাল্পচার দেখে ওর মনে হল, যদি গড়তে হয় তো এইরকম কিছুই গড়তে হবে—আমার আগে যেমন মূর্তির কথা আর কেউ ভাবেনি—আমার পরেও আর কেউ ভাববে না।

পরের দু-বছরে রাতুল আরো কয়েকবার একা-একাই কলাভবনে ঘুরে এল। মেহেদির বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখল ওখানকার ছেলে-মেয়েরা কীভাবে কাজ শিখছে। সাহসে ভর করে তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথাও বলল। জানতে চাইল, ওখানে ভর্তি হতে চাইলে কবে, কোথা থেকে ফর্ম তুলতে হবে, খরচ কেমন, ইত্যাদি।

হায়ার-সেকেন্ডারি পাশ করার পরে সবে যখন রাতুল ভাবছে এবার বাবার কাছে গিয়ে বলবে, আমাকে কলাভবনে ভর্তি করে দাও, তখনই রাজেনবাবুর একটা ছোটখাটো সেরিব্রাল-স্ট্রোক হল। প্রাণে বেঁচে গেলেন ঠিকই, তবে শরীরের ডানদিকটা আর আগের মতন সচল রইল না। মাস-ছয়েক ওষুধ-বিষুধ, ফিজিওথেরাপি ইত্যাদি করার পরে যেদিন আবার ঠাকুরের কাঠামো বাঁধতে নামলেন, সেদিন কিছুক্ষণ একা-একা কাজ করার পরেই গলা তুলে ডাকলেন, রাতু! একবার এদিকে আয় তো বাপ!

উনি এক-হাতে সুতলি দড়িটা টাইট করে খড়ের গায়ে জড়াতে পারছিলেন না।

রাতুল বাবার হাত থেকে সুতলির লাচিটা নিয়ে কাঠামোটা বেঁধে ফেলল, তারপর নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে কলাভবনে ভর্তি হওয়ার ফর্মটা কুঁচি-কুঁচি করে ছিঁড়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল।

তারপর থেকে এইভাবেই দিন কাটছে রাতুলের। প্রতিমা গড়ার কাজে পরিশ্রমের তুলনায় উপার্জন খুবই কম। টিঁকে থাকতে হলে সারাবছরই কাজ করে যেতে হয়। তাই করে রাতুল। তার মধ্যেই সামান্য প্রিপারেশনে বি.এ. পরীক্ষাটা দিয়েছিল। পাশ করেছে, এই অবধিই।

তবে কেউ জানে না এমন দুটো কথা আছে রাতুলের জীবনে। এক, ভাস্কর হওয়ার স্বপ্নটা তাকে এখনো ছেড়ে যায়নি। নানান দেশি-বিদেশি শিল্পের অ্যালবাম তার নিত্যসঙ্গী। খুব কষ্ট করে হলেও সে মাসে অন্তত একবার কলকাতায় যায়। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস এবং অন্যান্য গ্যালারিতে ঘুরে ঘুরে সময় কাটায়।

আর দুই, সে একটি মেয়েকে ভালোবেসেছে।

হ্যাঁ, তরুণী কিংবা যুবতী বললে বেশি বলা হয়ে যাবে। ক্লাস ইলেভেনে পড়া একটা রোগা মেয়েকেই ভালোবেসেছিল রাতুল, যার তখন বয়স ছিল ষোল আর রাতুলের একুশ। এখন রাতুলের তেইশ। এখনও সে মেয়েটিকে ভালোবাসার কথা বলেনি। বলার ইচ্ছেও নেই।

তার এই দুটো ভালোবাসা কিছুদিন পর থেকেই একটা বিন্দুতে এসে মিশে গেছে। মেয়েটিকে ভালোবাসার পর থেকে সে ওই ভালোবাসাকেই নানাভাবে তার শিল্পের মধ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

পালবাড়ির দোতলায় রাতুলের নিজের ঘরে ঢুকলে দেখা যাবে, সেই ঘরের চারিদিকে স্তূপাকার ছবির বইয়ের সঙ্গেই সহাবস্থান করছে রাশি-রাশি পেনসিলে আঁকা খসড়া আর মাটি কিংবা প্লাস্টারে তৈরি ছোট-ছোট মডেল।

সারাদিনের সমস্ত কাজের শেষে রাতুল অনেক রাত অবধি ঘরের দরজা বন্ধ করে ওরকম একেকটা মূর্তিকে মনের মতন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। কখনো কাজটা তার মনোমতন হয়। বেশিরভাগ সময়েই হয় না। সে বুঝতে পারে, নিজের ভেতরের কষ্টটাকে ধরতে আরো একবার ব্যর্থ হল সে। তখন রাতুল হাতের চাপে নরম প্লাস্টারের মূর্তিটাকে দলা পাকিয়ে একদিকে ফেলে দেয়। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

অত রাতে সারা জগৎপুর অন্ধকারে ডুবে থাকে। শুধু রাতুলের ঘরের জানলার অদূরে দেখা যায় একটা আলোর চতুষ্কোণ...আরো একটা জানলা। রাতুল জানে, ওই জানলার নীচে একটা তক্তপোষের ওপরে বসে মেয়েটা রাত জেগে পড়ছে। তাকে দেখা যায় না। শুধু কখনো সে কুঁজো থেকে সোজা হয়ে বসলে জানলার উল্টোদিকের দেয়ালে এক লহমার জন্যে তার ছায়া ভেসে যায়।

ওই ছায়াটুকু দেখবার জন্যে রাতুল আরো অনেকক্ষণ তৃষ্ণার্তের মতন অপেক্ষা করে। তারপর বিছানায় এসে চোখের ওপরে হাত চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ে। ভাবে, কত কাছে...তবু কত দূরে...কী অসম্ভব দূরে ওই ঘরটা।

ঘুম আর জাগরণের মধ্যে রাতুলের মনে ওই দেয়ালের ছায়াটার মতনই দ্রুতগতিতে কিছু ছবি ভেসে উঠেই আবার মিলিয়ে যায়। কখনো এক দগ্ধ ডানার পাখি। কখনো শূন্যে ভাসমান এক শিকড়বিহীন গাছ? কখনো এক ট্রাপিজ-জোকার, যে এক দোলনা ছেড়ে ঝাঁপ দিয়েছে অন্য এক দোলনার দিকে। কিন্তু সেখানে দোলনার বদলে হাওয়ায় দুলছে ধারালো এক তলোয়ার।

এইসব ছবির মধ্যে যেটুকু তার মনে থাকে, সেটুকুই রাতুল প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তির মধ্যে ধরবার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। বিমূর্ত মূর্তি তৈরিরও একটা ব্যকরণ থাকে। সেটা তার শেখা হয়নি। ক্রমশ তার তেইশ-বছরের সুশ্রী মুখটায় বিষণ্ণতার কিছু রেখা স্থায়ী হয়ে বসে যায়।

ছেলের এই অন্যমনস্কতা এবং অস্থিরতা রাজেনবাবুর চোখ এড়ায় না। একদিন, তিনি আর রাতুল যখন কাজের ফাঁকে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছিলেন, তখন তিনি ছেলেকে বললেন, বুঝলি রাতু! যদি চাকরি-বাকরির সুযোগ পাস, ছেড়ে দিস না যেন। তোদের জেনারেশনের অনেকেই তো আর বাপ-দাদার লাইনে এল না। তুইও না হয় না-ই এলি।

রাতুল বলেছিল, এই রেজাল্টে চাকরি হয় না, বাবা। আর তাছাড়া আমার এই কাজই ভালো লাগে।

ভালো লাগার কথাটা মিথ্যে করেই বলল রাতুল। সে বাবার মন বোঝে।

ছেলের কথা শুনে রাজেন পাল মুখে কোনও উচ্ছ্বাস দেখালেন না। সেটা তিনি কোনওকালেই পারেন না। তবে খুশি হলেন খুবই। ছেলের কাঁধে আলতো করে একটা হাত রেখে বলেছিলেন, তাহলে সারাক্ষণ এমন মুখ গোমড়া করে ঘুরিস কেন?

রাতুল উত্তর দিল না।

রাজেনবাবু নিজের মতন করে একটা কারণ খুঁজে নিলেন। বললেন, বলা উচিত নয়, তবু বলছি। তোর যা হাতের গুণ তাতে এইসব আজামৌজা কাজে তোর মন ভরার কথাও নয়। একটা অন্যরকমের কাজ করবি?

অন্যরকমের কাজ মানে? রাতুল বাবার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।

রাজেনবাবু বললেন, বেথুয়াডহরির চকবাজার-ব্যবসায়ী-সমিতির পুজোকর্তারা ক’দিন ধরে ঘোরাঘুরি করছেন। ওদের এবার গোল্ডেন-জুবিলি। বলছেন অন্তত ষোলো-ফুটের আর্টের প্রতিমা চাই। আমার এই শরীরে কুলোবে না বলেই ভেবেছিলাম ফিরিয়ে দেব। তবে এখন মনে হচ্ছে, ওদের বায়নাটা নিলে তুই একটা বলবার মতন কাজ করতে পারবি। হ্যাঁ করে দিই, না কী বলিস?

রাতুল এক-মুহূর্ত চিন্তা করল। কাজ নয়। টাকাটা দরকার। এ-বছর ওদের ঘরে মাত্র চারটি প্রতিমার অর্ডার এসেছে। তাতে সারা-বছর সংসার চালানো মুশকিল।

তো, সেইবছর চকবাজারের গোল্ডেন-জুবিলির ওই প্রতিমা রাতুল একেবারেই নিজের নকশায় এবং নিজের হাতে বানাল। বানানোর সময় শুধু দুজন জোগাড়েকে সঙ্গে নিয়েছিল। ওই একটা প্রতিমা নিয়েই নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়ে রইল আড়াই-মাস। বাকি চারটে প্রতিমা রাজেনবাবু তাঁর কারিগরদের সাহায্যে গড়ে নিলেন।

ষোলো ফুটের আলিসান কাঠামোটাকে উঠোনের টিনের ছাউনির নীচে আঁটানো গেল না; একপাশে আলাদা করে কিছুটা জায়গা শালবল্লা আর নীল-প্লাস্টিক দিয়ে ঘিরে উঁচু ছাউনি বানাতে হল। পরের আড়াইটে মাস রাতুল তার ওই নীল-গুহার মধ্যেই হারিয়ে গেল। রাজেনবাবু পাকা-ছাউনির নীচে নিজের কাজ করতে-করতে দেখতেন সবই। বুঝতেনও ওর একাগ্রতার ধরনটা। সেইজন্যেই সবাইকে বলে দিয়েছিলেন রাতুকে ডিস্টার্ব না করতে।

এসব দু-বছর আগের কথা। সেবার চকবাজার ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিমা দেখে বেথুয়াডহরি আর জগৎপুর তো বটেই, আশেপাশের আরো চার-পাঁচটা শহরে ধন্য-ধন্য পড়ে গিয়েছিল।

যদিও রাধানাথ পালের ঘরানা আদতে কলকাতার কুমোরটুলির ঘরানা, তবু সে-বছর রাতুল ওই প্রতিমাটি বানিয়েছিল কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের কায়দায়। অর্থাৎ প্রতিমার বসন, অলঙ্কার, অস্ত্র থেকে শুরু করে কেশ অবধি সবই সে মাটি দিয়ে বানিয়েছিল। মাটি ছাড়া আর কোনও উপাদান ছিল না—শোলা নয়, জরি নয়, পরচুল নয়। তাছাড়া প্রতিমার মুখে ছাঁচের মুখ বসায়নি। প্রতিটি মুখ মাটি কেটে নিজের হাতে বানিয়েছিল।

পুজোর দিনগুলোয় সামনে দাঁড়িয়ে যারা সেই প্রতিমা দেখেছিলেন, তাঁদের মনে হয়েছিল, মণ্ডপের বাঁদিক থেকে ডানদিকে, গণেশের শুঁড় থেকে শুরু করে কার্তিকের ধনুক অবধি, আশ্চর্য এক ঢেউ যেন ছড়িয়ে পড়ছে। সেটা আশ্চর্য কিছু নয়। কারণ, প্রতিটি প্রতিমার হাত-পায়ের ভঙ্গিমা থেকে শুরু করে কেশদাম অবধি একই ছন্দে দুলিয়ে দিয়েছিল রাতুল।

সর্বোপরি সবক’টি প্রতিমাকে সে আগাপাস্তালা উজ্জ্বল পার্ল-হোয়াইট কালারের আস্তরণে মুড়ে দিয়েছিল। তারই মধ্যে কোথাও সামান্য মেরিন-ব্লু, কোথাও একটু ওসান-গ্রিনের ছোঁয়া। সব মিলিয়ে দর্শনার্থীদের মনে হয়েছিল, যেন বিশাল এক মুক্তো খোদাই করেই পুরো প্রতিমা বানানো হয়েছে, যার গায়ে তখনো লেগে রয়েছে কিছু সমুদ্রের জল, শ্যাওলার রঙ, আর অনেক ঢেউয়ের দোলা।

কিন্তু আসলে তো ওই ষোল ফুট উচ্চতার, পঞ্চাশ ফুট ওসারের প্রতিমার প্রতিটি ইঞ্চিই প্রাণ পেয়েছিল রাতুল পালের আঙুলের ছোঁয়ায়। মাটি...শুধু ভাগীরথীর বুকের নরম মাটি আর দশটা নমনীয় আঙুল। তার থেকেই জন্ম নিয়েছিল সেই কান্তি, যাকে বলা হয় দেবদুর্লভ।

সপ্তমীর দিন সন্ধেবেলায় বেথুয়াডহরির সেই মণ্ডপে প্রতিমা-দর্শনে এলেন সস্ত্রীক রাজেন পাল। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি। ছ’ফুট লম্বা, আপাতদৃষ্টিতে শক্তপোক্ত মানুষটা সেরিব্রাল-স্ট্রোকের ছোবলে ভেতরে-ভেতরে একটু কমজোরি। একটা মোটা লাঠিতে ভর দিয়ে, জখম ডান-পাটা সামান্য টানতে-টানতে তিনি মণ্ডপের দিকে এগিয়ে চললেন। তাঁকে দেখতে পেয়েই কর্মকর্তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। আসুন আসুন পালমশাই, এদিক দিয়ে আসুন। আমাদের ছোট মাস্টার এল না? রাতুল?

রাজেন পাল গম্ভীরমুখে উত্তর দিলেন, এসেছে। মাঠের বাইরে গাড়িতে বসে আছে। সঙ্গে আসতে বললাম, এল না।

তারপর আর কোনও কথা না বলে তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন উঁচু মঞ্চের নীচে, দর্শকদের দাঁড়াবার জায়গায়। পাশে তাঁর স্ত্রী যূথী পাল। যূথীদেবীর পরনের করিয়াল শাড়ির চওড়া লালপাড়ের সঙ্গে সেদিন তাঁর সিঁথির চওড়া সিঁদুরের রেখাটি ভারি মানিয়ে গিয়েছিল। গলায় সোনার মফচেন, হাতে দুটো মকরমুখী বালা আর শাঁখা-পলা। আর কিছু নয়। তাতেই যেন ছোটখাটো ক্ষীরের-পুতুলের মতন মহিলাটির দিক থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না।

দুজন কমবয়সি ভলান্টিয়ার রাতুলের জন্যে কোল্ড-ড্রিঙ্কসের বোতল আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে পার্কিং-এর দিকে ছুটল। দুজনেরই মুখ চিনতে পারলেন রাজেনবাবু। এই ছেলেদুটিই বেথুয়া থেকে দৌড়ে-দৌড়ে জগৎপুর গিয়ে দেখে আসত, তাদের প্রতিমার অগ্রগতি কেমন হচ্ছে। সম্ভবত শুধু ওরাই জানে যে, এই প্রতিমায় রাজেন পালের হাত লাগেনি। আসলে রাজেনবাবু নিজেই চাননি কথাটা বেশি কেউ জানুক। যদি শেষ বিচারে মন্দ কিছু হয়েই যায়, তার দায়টা যেন রাতুলের ওপরে না পড়ে তাঁর নিজের ঘাড়ে পড়ে, এটাই ছিল তাঁর মনোগত বাসনা।

কর্মকর্তারা ততক্ষণে পাল-দম্পতিকে ঘিরে ধরে মহোৎসাহে শোনাতে শুরু করেছেন, তাঁরা ক’টা শ্রেষ্ঠ প্রতিমার সম্মান ঝোলায় পুরেছেন। সেইসব শারদ সম্মান যে শুধু নদীয়া ডিস্ট্রিক্টের জন্যে নয়, সারা বাংলার বিচারেই যে চকবাজার ব্যবসায়ী সমিতির ওই ঠাকুর চার-চারটে প্রাইজ জিতে নিয়েছে সেটাও তাঁরা শোনাতে ভুলছিলেন না।

কিন্তু যাকে শোনাচ্ছিলেন, তিনি শুনছিলেন কি? মনে হয় না।

রাজেন পাল যেখানে গিয়ে প্রথমে দাঁড়িয়েছিলেন, সেখান থেকে কয়েক-পা পিছিয়ে এলেন। তারপর তীক্ষ্ণ-দৃষ্টিতে বিচার করলেন, পুরো মণ্ডপের মাপের অনুপাতে ঠাকুরের মাপ মানানসই হয়েছে কিনা; পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ওপরদিকে মুখ তুলে দেখার জন্যে যে-কোনও মূর্তির শরীরের ওপরের দিকে যে বামনত্ব দেখা দেয়, সেটাকে হিসেবের মধ্যে ধরে প্রতিমা বানানো হয়েছে কিনা তাও দেখলেন। শেষকালে খুব মৃদুস্বরে দুয়েকটা স্পট-লাইটকে একটু এদিক থেকে ওদিক সরানোর উপদেশ দিয়ে, আরেকবার করজোড়ে মাকে প্রণাম করে, মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে যখন তাঁরা গাড়ির দিকে হাঁটছিলেন তখন যূথীদেবী একবার ভয়ে-ভয়ে স্বামীকে জিগ্যেস করলেন, কী গো। ছেলেটা কিছু ভুলচুক করল নাকি?

রাজেন পাল এককথায় উত্তর দিলেন, নাঃ।

আমার তো অপূর্ব লাগল। এমন জমকালো কাজ তোমার হাতেও...। কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলেন যূথীদেবী। পরিষ্কার বোঝা গেল, মনে-মনে জিভ কাটলেন।

তখন ওঁরা দুজনে মণ্ডপ আর কার-পার্কিং-এর মাঝামাঝি একটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গা দিয়ে হাঁটছিলেন। হাঁটতে-হাঁটতেই রাজেন পাল বললেন, থামলে কেন? বলো। অমন কাজ আমার হাত দিয়ে বেরোবে না, তাই তো? তুমি ঠিকই বলেছ, যূথী। আমি আর্টিস্ট নই, আমি আর্টিজান। বহুবছর ধরে চলে-আসা একেকটা দেবীরূপকে কপি করি মাত্র। কিন্তু রাতু হচ্ছে আর্টিস্ট। এই যে ঠাকুরটা দেখে এলে, এটা একটা আর্ট-ওয়ার্ক। আর সেইজন্যেই ওকে নিয়ে আমার চিন্তা হয়।

ছেলের প্রশংসা শুনতে-শুনতে স্বাভাবিকভাবেই যূথীদেবীর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। রাজেনবাবুর শেষ-কথাটায় সেই মুখের আলো দপ করে নিভে গেল। তিনি বললেন, কেন গো? চিন্তা কেন?

রাজেন পাল বললেন, এই চকবাজারের প্রতিমার মতন কাজ তো ওকে আমি প্রতিদিন দিতে পারব না। ও গতানুগতিক স্টাইলের ঠাকুর বানাবে। চোখ বন্ধ করেও গণেশের শুঁড়ের ডগাটা যেটুকু বাঁকিয়ে দেওয়ার বাঁকিয়ে দিতে পারবে। লোকে বলবে সুন্দর কিন্তু ওর ভেতরের শিল্পীটা ছটফট করবে। শান্তি পাবে না ছেলেটা—এটাই আমার চিন্তা।

যূথীদেবী আকুল স্বরে বললেন, তা সে-ব্যাপারে কিছু করা যায় না গো? ও যদি শিল্পীই হতে চায় তো হোক না। কত টাকা লাগবে তার জন্যে? আমার গয়নাগুলো বিক্রি করলে হবে না?

রাজেন পাল তাঁর সামনে ছড়িয়ে-থাকা অন্ধকার মাঠটার দিকে তাকিয়ে বললেন, টাকা নয়, সময় লাগবে। শিখবার সময়। প্র্যাকটিসের সময়। নিশ্চিন্ত অবকাশ, যখন ওকে কেউ অন্য কোনও কাজের জন্যে ডাকবে না। সেই-সময়টা তুমি গয়না বিক্রি করে ওকে দিতে পারবে না। দিতে পারতাম আমি, যদি অথর্ব হয়ে না যেতাম। কিন্তু ভগবান আমাকে মেরে দিলেন।

কথা বলতে-বলতে ওঁরা দুজনে পার্কিং-প্লেসে দাঁড় করিয়ে রাখা ভাড়ার গাড়িটার কাছে চলে এসেছিলেন। জানলার কাচের মধ্যে দিয়ে ওঁরা দেখতে পেলেন, রাতুল পাথরের মূর্তির মতন বসে আছে। তার মুখ মণ্ডপের বিপরীত দিকে ফেরানো। ওর কর্তব্য ছিল বাবা-মাকে ঠাকুরটা দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া; সেই কর্তব্য ও পালন করেছে। ব্যাস। আর ওই দুর্গামূর্তির প্রতি তার কোনও আকর্ষণ নেই।

রাতুল জানে, ওই মণ্ডপ-জোড়া মাটির প্রতিমা আর চারদিন বাদে জলে ভেসে যাবে। কিন্তু একটা ছোট্ট ব্রোঞ্জ, সিমেন্ট কিংবা পাথরের মূর্তি, যদি তা সুন্দর করে বানানো হয়, যদি তার মধ্যে শিল্পের ছোঁয়া থাকে, থেকে যাবে অনেক দিন।

এসব দু-বছর আগের কথা। মাঝের দু-বছরে আর কিছুই তেমন বদলায়নি। রাতুল এখনও সারাবছর ধরে সরস্বতী, বিশ্বকর্মা, কালী, দুর্গা ইত্যাদি বানিয়ে চলেছে। এমনকী অফ-সিজনে মনসা কিংবা গন্ধেশ্বরীর মতন কোনও প্রতিমার অর্ডার এলেও ছাড়ছে না। রাজেনবাবু আরো একটু অথর্ব হয়েছেন, তাঁর চিকিৎসার খরচ আকাশ ছুঁয়েছে।

ওর সেই ভালোবাসার মেয়েটিও প্রায় একইরকম রয়েছে। যদিও ষোল থেকে আঠারোয় পৌঁছনোর পথে শতকরা নিরানব্বইটি মেয়ে শরীরে-মনে অনেক বড় হয়ে ওঠে, কিন্তু এই মেয়েটি যেন একটুও বদলাল না। হয়তো অপুষ্টির কারণেই সে একইরকমের রোগা রয়ে গেল। একইরকমের পড়াশোনা করা ভালো মেয়ে, যে বইয়ের দিক থেকে মুখ তোলে না।

ও তারাপদকাকার মেয়ে, রুমি। ভালো নাম পারমিতা ঘোষাল। রাতুল কাউকে বলতে পারে না, আজন্ম পরিচিত ওই মেয়েটিকেই সে বছর-দুয়েক আগে হঠাৎ করেই নতুন এক আলোয় দেখেছে।

শুধু কি রুমি? ওদের বাড়িটাই তো রাতুলের আজন্ম পরিচিত।

বাড়ি নয়। আসলে এক গৃহমন্দির—শীতলামায়ের মন্দির। লোকের মুখে-মুখে যা শীতলাবাড়ি। ছোটবেলায় নিজের ঠাকুমার সঙ্গে বহুবার ওই বাড়িতে গিয়েছে রাতুল। সকালে পুজো দিতে গেছে, দুপুরে প্রসাদ আনতে গেছে। লাল-সিমেন্টের দালানে বসে-বসে শীতলাবুড়িকে, মানে তারাপদকাকার মাকে পুজো করতেও দেখেছে কত।

তখন কি কখনও রুমি এসে ওর পাশে বসেছিল? রুমি কি কখনও ওর হাতে প্রসাদের ছোট রেকাবিটা তুলে দিয়েছিল? মনে পড়ে না রাতুলের। তখন তার কাছে রুমির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল শীতলাবাড়ির একতলার দেয়ালে টাঙিয়ে-রাখা লিথো-প্রিন্টের পুরোনো ছবিগুলো। বিলেতে ছাপা সেইসব ছবিতে দেবদেবীদের মুখশ্রী আর গায়ের রঙ সাহেব-মেমের মতন।

তাছাড়া ঠাকুরঘরের দরজার পাশে একটা বিরাট তবলার মতন বাজনা ছিল। সেটার নাম ধামসা হবে বোধহয়। আরতির সময় তারাপদকাকার ভাই রমাপদকাকা দুটো স্টিক দিয়ে সেই বাজনাটা বাজাত। বেশ গুমগুম করে শব্দ হত। দড়ির টানে ছাদ থেকে ঝোলানো ঘণ্টাটা বাজাতেন তারাপদকাকার স্ত্রী, মানে রুমির মা। অনেক সময় পাড়ার অন্য কোনও মহিলাই সেই কাজটা করে দিতেন।

বালক রাতুল এইসবই দেখত অবাক হয়ে। রুমির দিকে চেয়েও দেখত না।

রুমিকে সে প্রথম খেয়াল করে দেখল ওর মাধ্যমিক পরীক্ষার পর, যখন সারা জগৎপুরেই রুমির ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্টের খবর ছড়িয়ে পড়ল। তারপর আবার দেখল...আবার। আস্তে আস্তে রাতুলের দেখার নেশা লেগে গেল। ওর মুখস্থ হয়ে গেল রুমির স্কুলে যাওয়ার আর স্কুল থেকে ফিরবার রুটিন। তাছাড়াও সারা দিনের মধ্যে আরো দু-একবার রুমিকে দেখা যায়—যখন সে ছাদে জামাকাপড় মেলতে ওঠে কিম্বা রাতুলদের বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে ট্যুইশনে যায়।

এইসব সুযোগ রাতুল হারায় না। সে রুমিকে দেখে। দেখে এবং একইসঙ্গে মুগ্ধ এবং বিষণ্ণ হয়।

মুগ্ধ হয়, কারণ, তার শিল্পীর চোখে ধরা পড়ে রুমির চোখের পল্লবগুলো মিশরীয় রমণীদের মতন দীর্ঘ এবং ভারী। চোখ তুলে তাকাতেই তাই যেন ওর ভীষণ পরিশ্রম হয়। তার চোখে ধরা পড়ে রুমির গায়ের রঙ পদ্মপাতার মতন, নাক তিলফুলের মতন এবং একটা বিষের আংটির মধ্যে এঁটে যাবে এমনই ছোট ওর ঠোঁট। সেই অলৌকিক আংটি মুখে ভরে নিতে ইচ্ছে করে রাতুলের।

আরও বিষণ্ণ হয় কারণ ও রুমিকে দেখলেই বুঝতে পারে রুমির কাছে চারপাশের এই জগতের, এই জগৎপুরেরই কোনও অস্তিত্ত্ব নেই; রাতুল তো অনেক দূরের কথা। ওর কাছে ভালোবাসা শব্দটারই কোনও মানে হয় না।

আর সেইজন্যেই, বলেছিলাম না, রাতুলের কোনও ইচ্ছেই নেই রুমিকে ওর ভালোবাসার কথা জানানোর।

অধ্যায় ১ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%