চোদ্দো

সৈকত মুখোপাধ্যায়

লেকের চারপাশে দুটো চক্কর দিয়ে দীপেশ যখন গেট দিয়ে বেরোতে যাচ্ছে, তখনই একজন কেউ উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে বলল, কী মিস্টার চ্যাটার্জী, এরমধ্যেই কমপ্লিট করে ফেললেন?

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল বলেই দীপেশ ওঁকে খেয়াল করেনি। ভদ্রলোকের নাম সুনীল সরকার। এবছর ইলেকশনে যে-দলটা রুলিং-পার্টিকে সব থেকে বেশি ফাইট দিতে চলেছে, তার বেশ বড়-মাপের নেতা। এদের বেশিরভাগ নেতাই অবশ্য ভুঁইফোঁড়। ছ’বছর আগে, দিল্লি চলে যাওয়ার আগে অবধি, দীপেশ এই কলকাতাতেই একটা পলিটিকাল-উইকলির হয়ে স্ট্রিট-রিপোর্টিং করে গেছে। তখন এদের কাউকেই প্রায় সে চিনত না। তবে এঁকে তখনও চিনত। ইনি পার্টির পুরোনো মেম্বার।

দীপেশ বাধ্য হয়ে দাঁত বের করে হাসল। বলল, আরে, সুনীলবাবু যে। আপনি রোজ আসেন নাকি? আগে কখনো দেখিনি তো।

সুনীল সরকারকে ঘিরে ছ-সাতজন চেলা-চামুন্ডা ছিল, যেমন থাকে। উনি তাদের বললেন, এই, তোরা এগো। আমি এঁর সঙ্গে একটু কথা বলে আসছি। তারপর দীপেশকে বললেন, আরেকবার ভেতরে ঢুকুন, প্লিস। আমার সঙ্গে কয়েক পা হাঁটুন। কিছু কথা আছে। জরুরি।

অগত্যা দীপেশ আবার সুনীল সরকারের সঙ্গে লেকে ঢুকল। পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার?

আপনার কলামগুলো পড়ছি। তুলনাহীন অ্যানালিসিস। অ্যাকচুয়ালি, বাংলার রাজনীতিটা আপনার মতন ভালো তো কেউ বোঝে না।

এসব খেজুরে কথা। গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। দীপেশ অপেক্ষা করছিল, কখন সুনীলবাবু আসল কথায় আসেন। উনি অবশ্য বেশি সময় নিলেন না। ইলেকশনের আর বেশি দেরি নেই, তাই এখন কারুর হাতেই বেশি সময় নেই। বললেন, কিন্তু কী জানেন, আপনার সব লেখারই আন্ডারটোন ওই একটাই। আমাদের পার্টি খুব অমানবিক। রুলিং-পার্টির কাজেকর্মে অনেক গাফিলতি রয়েছে, তবু ওরা বেশি মানবিক। এবং সেইজন্যেই বাংলার মানুষের উচিত ওদের ভোটে জিতিয়ে আনা।

সুনীলের কথা শুনে দীপেশ চমকিত হল। এই ভদ্রলোক ইংরিজি নিউজপেপারের পোস্ট এডিটোরিয়াল শুধু নিয়মিত পড়েন যে তাই নয়, দীপেশ যে-ছকে লিখে যাচ্ছে, সেই ছকটাকেও পরিষ্কার ধরে ফেলেছেন। সে বলল, আপনার সাজেশান কী সুনীলবাবু? কীভাবে লিখব?

একটা হেলে-পড়া বাদাম গাছের গুঁড়ির ওপরে ডান পাটা তুলে, রিবক-ব্র্যান্ড স্নিকারের ফিঁতেটাকে টাইট করে বাঁধতে-বাঁধতে সুনীল সরকার বললেন, সাজেশান নয়, রিকোয়েস্ট। আপনার মাপের একজন পলিটিকাল অ্যানালিস্টকে কি আমি কিছু সাজেস্ট করতে পারি? আমার রিকোয়েস্ট, আপনার প্রো-গভমেন্ট ইমেজটা যেমন আছে থাকুক। তারমধ্যেই একটু আমাদের পজিটিভ দিকগুলো নিয়েও কিছু লিখুন। গ্রামেগঞ্জে আমাদের মাস-বেস যে হু-হু করে বাড়ছে, এইসব কথা লিখুন না একটু।

এক-সেকেন্ডের জন্যে দীপেশের বিরক্ত মুখটা নিরীক্ষণ করে, আবার বললেন, দেখুন মিস্টার চ্যাটার্জী, আমাদের পার্টির পকেটে রিপোর্টার-জার্নালিস্ট কম নেই; আপনি সেটা ভালো করেই জানেন। কিন্তু তারা আমাদের হয়ে এক-দিস্তে লিখলে আমরা যে মাইলেজ পাব, তার চেয়ে অনেক বেশি মাইলেজ পাব আপনি, দীপেশ চ্যাটার্জী, আমাদের হয়ে দুটো-লাইন লিখলে। কারণ আপনার ওই প্রো-গভমেন্ট ইমেজ। সেইজন্যেই বলছিলাম আরকি।

দীপেশের কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না। সে বলল, আচ্ছা। চেষ্টা করব। তাহলে এখন চলি?

দীপেশের উত্তরের মধ্যে যে দায়সারা ভাবটা ছিল, সেটা সুনীল সরকার পরিষ্কার উপলব্ধি করলেন সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চোখদুটো একটু সরু হয়ে গেল। বললেন, যাবেন? আচ্ছা, যান।

দীপেশ যখন যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তখনই সুনীল সরকার পেছন থেকে খুব নীচু-গলায় বললেন, কালীঘাটের নবীন সেন লেনের ওই ডিভোর্সি মেয়েটি কি আপনার রিলেটিভ?

দীপেশ ভেতরে-ভেতরে কেঁপে উঠল। এই লোকটা ডেঞ্জারাস। এর সঙ্গে সে কনফ্রন্টেশনে যেতে পারবে না। তার মেরুদণ্ডের অত জোর নেই। সে সুনীল সরকারের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, না। পরিচিত। আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর বোন। নানারকম ট্রাবলের মধ্যে আছে, তাই সাহায্য চাইলে যেতে হয়। সুনীলবাবু, আপনি আমার নেক্সট লেখাটা পড়ে দেখবেন। মনে হয়, আপনার ভালো লাগবে।

থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ। আর আপনার যদি কখনো মনে হয়, ওই ভদ্রমহিলার জন্যে আমরা কিছু করতে পারি, নিঃসঙ্কোচে আমাকে জানাবেন। চলুন, বেস্ট অফ লাক।

সুনীল সরকার হালকা পায়ে জগ করতে করতে লেক-ক্লাবের দিকটায় চলে গেলেন। দীপেশ নজরুল-মঞ্চের সামনে দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে আপনমনে বলল, পারমিতা গো! প্রিয়তমা গো! আর বেশি বেইজ্জত হবার আগেই তোমার চ্যাপটারটা যে ক্লোজ করতে হবে সোনা।

দীপেশ ঘড়ি দেখল। সাড়ে-আটটা। পারমিতা কি ঘুম থেকে উঠেছে? আজ রবিবার। একটু বেলা অবধি ঘুমোতেই পারে। তবু সাড়ে-আটটা ইস ফেয়ার এনাফ। দীপেশ পারমিতাকে কল করতেই ওদিক থেকে পারমিতা ভারি মিষ্টি করে বলল, হ্যালো, কী ব্যাপার? এত সকাল সকাল?

তোমার সকাল, আমার নয়। মর্নিং-ওয়াক সেরে ফেললাম। তারপর এই লেক কালীবাড়ির উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দেখছি শর্মাজী রাশি-রাশি গুটকে কচুরি আর জিলিপি বানিয়ে বারকোশে ঢালছে। তাই ভাবলাম, তুমি যদি খাও তাহলে আজ তোমার সঙ্গে বসেই ব্রেকফাস্ট সারি।

একদম বাচ্চা-মেয়ের মতন হইহই করে উঠল পারমিতা। বলল, প্লিস প্লিস। কতদিন খাইনি। সঙ্গে কি ওই খোসাশুদ্ধু আলুর তরকারিটা দিচ্ছে?

হুঁ, দিচ্ছে। ঠিক আছে, আমি আসছি তাহলে।

ঘরে ঢুকে ওদের ছোট্ট ডিনার টেবিলটার ওপরে কচুরি-জিলিপির ঠোঙা নামিয়ে রেখে, দীপেশ শোয়ার ঘরের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, তোমার মা-সোহাগী পুত্র?

মা-সোহাগী পুত্র এখনো ঘুমোচ্ছেন। কথাটা বলবার সময় পারমিতার ঠোঁটের কোণে যে-হাসিটা ফুটে উঠল, দীপেশ জানে, সেটাকে ইংরিজিতে বলে মিসচিভাস। বাংলায় হয়তো দুষ্টু হাসি বলা যায়, কিন্তু তাতে ওই হাসির মধ্যে লুকোনও ষড়যন্ত্রের ভাবটা মোটেই ধরা পড়ে না।

দীপেশ সেই ষড়যন্ত্রে সাড়া দিয়ে পায়ে-পায়ে পারমিতার দিকে এগিয়ে গেল এবং ওর কপালের ওপরে পড়ে থাকা কিছু ঝুরো চুলকে আলতো আঙুলে সরিয়ে দেওয়া মাত্রই পারমিতা তাকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। তারপরেই দীপেশ পারমিতার চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলে চুম্বন করল ওর ঠোঁটে।

কতক্ষণ ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে ওরা দাঁড়িয়েছিল তা দুজনের কারুরই খেয়াল নেই, তবে দু-চারমিনিটের বেশি নিশ্চয় হবে না। কারণ শোয়ার ঘরের দরজার কাছ থেকে তীব্র গলায় ডাক ভেসে এল, মাম্মিইইই!

দীপেশকে দু-হাতে ঠেলে দিয়ে, নিজেও ছিটকে পেছনে সরে গেল পারমিতা। ওরা দুজনেই দেখল, বাবাই চোখ রগড়াতে রগড়াতে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসছে। একবার শুধু মুখ তুলে দেখে নিল মা কোথায়। তারপর অবিকল চুম্বকের সামনে রাখা আলপিনের মতন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল পারমিতাকে। দীর্ঘ চুম্বনের পরে পারমিতা তখনো ভালো করে দম ফিরে পায়নি।

দীপেশ বারান্দায় বেরিয়ে সেদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে চেয়ারে বসল। তার মনে হল, রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দুটো ছেলে যেন মুখ উঁচু করে ওকেই দেখছিল। ওর চোখে চোখ পড়তেই ছেলেদুটো বাইক চালিয়ে বেরিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে টেবিলে বসে কচুরি খেতে-খেতে, দীপেশ পারমিতাকে বলল, কোনও উপায়ই কি নেই?

পারমিতা একটু অসহিষ্ণু স্বরেই বলল, আমি কী উপায় করব? তোমার এত প্রতিপত্তি, তুমি কোথাও নিয়ে চলো আমাকে। অফিস আওয়ারের মধ্যে, যতক্ষণ শিখাদি বাড়িতে থাকে তার মধ্যে আমি তো যেতেই পারি।

দীপেশের চোখে সুনীল সরকারের মুখটা ভেসে উঠল। সে খুব আন্তরিক স্বরে বলল, তুমি কি হোটেলের কথা বলছ? না পারমিতা। যে বিছানায় এসকর্ট-সার্ভিসের একহাজার মেয়ে একহাজার লম্পটের সঙ্গে কেলি করে গেছে, সেখানে শুয়ে আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারব না।

পারমিতা লজ্জিত হল। সত্যিই সে দীপেশের সঙ্গে তার এই সম্পর্কের পবিত্রতার কথা কখনো ভাবেনি। শুধুই গোপনীয়তার কথা ভেবেছে। অসামাজিকতার কথা ভেবেছে। এই কথার যে কী উত্তর হবে ভেবে পেল না রুমি। কথা পালটানোর জন্যেই সে বলল, রাতে আসবে?

রাতে! কেন? কত রাতে?

ওহ, রাতে মানে সন্ধেবেলায়। আটটা নাগাদ। আজ রাতুল আসবে। ওকে ডিনার করে যেতে বলেছি। তোমাকেও বলছি।

বেসিনের কলে হাত ধুতে-ধুতে দীপেশ বলল, না। আর আসব না পারমিতা। তোমার সামনে এসে দাঁড়ালে আমি ভীষণ লোভী হয়ে পড়ি। কোনও একদিন হয় তো তোমার ওপরে জোর খাটানোর মতন অসভ্যতাও করে বসব আর তারপর জীবনের সবচেয়ে দামি উপহারটাই হারিয়ে বসব। তার চেয়ে আমি আবার দিল্লিতেই ফিরে যাব পারমিতা। তাহলে তোমার আমার সম্পর্কটা একটা বিদেহী প্লেটোনিক স্তরে স্থির থাকবে। সেটাই ভালো হবে।

দীপেশের এতগুলো কথার মধ্যে আর কিছুই পারমিতার কানে ঢুকল না; সে শুধু শুনতে পেল, দীপেশ বলছে দিল্লিতে ফিরে যাবে। পারমিতার ফ্যাকাসে ঠোঁট থেকে শুধু দুটো কথা শুকনো পাতার মতন আলতো করে ঝরে পড়ল—যেও না দীপেশ। তাহলে আমি আবার খুব একা হয়ে যাব।

দীপেশ পারমিতার কাছে এগিয়ে এসে ওর মাথায় একটা হাত রাখতেই বাবাই চিৎকার করে উঠল, না আ আ। আমার মাম্মিকে ধরবে না।

দীপেশ হাতটা নামিয়ে নিয়ে বলল, তোমাকে অনেক কিছু কমিট করেছিলাম। সেগুলো প্রায় কোনওটাই ফুলফিল করতে পারলাম না। তবে হ্যাঁ, আজ সন্ধেবেলা অবশ্যই আসব। তোমার হাতের রান্না খেয়ে যাব। আর চলে যাবার আগে রাতুলবাবুর এগজিবিশনের ব্যবস্থাটাও করে যাবার চেষ্টা করব।

পারমিতার উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করে দীপেশ মাথা নীচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ও বেরিয়ে যাওয়া-মাত্রই পারমিতা বাবাইয়ের গালে সপাটে একটা চড় কষাল। বাবাই কাঁদবার আগেই নিজে ওকে বুকে জড়িয়ে হু-হু করে কেঁদে উঠল।

ঠিক আটটাতেই পারমিতার ফ্ল্যাটে ঢুকে দীপেশ দেখল, খুশির পরিবেশ। বলিষ্ঠ চেহারার শ্যামলবরণ এক তরুণ ডাইনিং-স্পেসের মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে, বাবাইয়ের ড্রইং-খাতায় ছবি আঁকছে। বুঝতে অসুবিধে হল না, এই-ই রাতুল। প্রতিভাবান ভাস্কর এবং পারমিতার ছোটবেলার প্রেমিক। বাবাই নিজের ছোট্ট মাথাটা খাতার পাতার মধ্যে প্রায় ঢুকিয়ে দিয়ে একমনে ওর আঁকা দেখছে।

রাতুল শুধু যে ছবি আঁকছে তাই-ই নয়, তার সঙ্গে ক্রমাগত গল্পের মতন করে প্রতিটি ছবির মর্ম বুঝিয়ে চলেছে বাবাইকে।

পারমিতা কলিং-বেলের আওয়াজ শুনতে পেয়ে দরজা খুলতে গিয়েছিল। দীপেশ ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে তাকে ইশারা করল কথা না বলতে। রাতুল একবার ঘাড় ফিরিয়ে দীপেশকে দেখেই হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। দীপেশ বলল, বসুন ভাই। আঁকুন। আমিও দেখি। কথা বলার সময় তো পড়েই আছে।

তারপর সে চুপ করে ওদের পেছনে একটা সোফায় বসে ওর আঁকা দেখতে লাগল। শুনল, কেমন করে রামধনুর সিঁড়ি বেয়ে পিঁপড়েরা ডায়নোসরের মাথায় উঠে মেঘের গা থেকে মধু চেটে খায়। আর কেমন করেই বা গোঁফওলা গোয়ালা রামভরোসা সিং মহিষাসুরের মোষের পেটটাকে কাঁথা সেলাই করার সূঁচ সুতো দিয়ে সেলাই করে, তাকে আবার নিজের গোয়ালে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে বেশিক্ষণ বসতে পারল না। একটু বাদেই কিচেনের দরজার আড়াল থেকে পারমিতা তাকে ছোট্ট হাতছানি দিয়ে ডাকল। দীপেশ কিচেনে ঢোকামাত্র পারমিতা তার ঠোঁটে, গালে আর গলায় পাগলের মতন ঠোঁট ঘষে দিল। অবশ্যই নিঃশব্দে। তারপর নিজেকে একটু সরিয়ে নিয়ে বলল, খেয়ে যাবে কিন্তু।

দীপেশ বলল, কেন মায়া বাড়াচ্ছ?

চুপ করো। একবার ফিরে গিয়ে দেখো না দিল্লিতে, তোমায় কী করি। পরের ফ্লাইটে আমিও ঠিক ছেলেকে নিয়ে তোমার বাড়ি গিয়ে হাজির হব। তখন তোমার বউ তোমার কী হাল করে দেখো।

ওদের সব কথাই হচ্ছিল ফিসফিস করে। তাছাড়া গ্যাস-আভেনের ওপরে বসিয়ে রাখা প্রেসার কুকার থেকে সুগন্ধী মাংসের ভাপের সঙ্গে জোরালো ফোঁস-ফোঁস আওয়াজও বেরোচ্ছিল, যেটা ওইটুকু কথোপকথনের শব্দকে ডুবিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

দীপেশ ওর নাকে নাক ঘষে দিয়ে বলল, মনের দুঃখে চলে যাওয়ার কথা বলে ফেলেছিলাম সোনা। নাহলে আমিও কি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব নাকি? আচ্ছা, ছাড়ো ওসব কথা। তোমার কি খেতে দিতে দেরি হবে? একটা জরুরি কাজ ছিল যে।

পারমিতা বলল, আমার তো রান্না হয়েই এসেছে। কিন্তু বাবাইটাকে আজ রাতুলের সামনে থেকে নড়াতেই পারছি না। আঙ্কলের হাঁটু আঁকড়ে ধরে বসে আছে, কাছেই ঘেঁষতে দিচ্ছে না আমাকে।

তাহলে...দীপেশ চোখের ইশারায় পারমিতার শোয়ার ঘরের দিকে দেখাল। ফিসফিস করে বলল, খুব আস্তে করে যদি ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দিই?

প্রেম নয়। কামও নয়। বিনিময় শব্দটাই পারমিতার মনে এল। বাবাইয়ের চিকিৎসা, ওর একটু ভালো চাকরি, রাতুলের এগজিবিশন এবং আরো অনেক কিছুর চাবিকাঠি রয়েছে এই মানুষটার হাতে। আর মানুষটা সুন্দর। তাকে ভালোবাসে।

পারমিতা বলল, চলো।

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ওরা দুজন রাতুল আর বাবাইয়ের পাশ কাটিয়ে শোয়ার ঘরের দিকে চলে গেল। যাবার সময় পারমিতা রাতুলকে বলে গেল, একটু মিস্টার চ্যাটার্জীর সঙ্গে কথা বলে আসছি রাতুল, তোমার ব্যাপারটা নিয়েই। রাতুল কয়েক সেকেন্ড রুমির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার মুখ নামিয়ে নিল।

যাবার সময় পারমিতা গ্যাস-আভেনের নব ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিল। প্রেসার কুকারের ফোঁসফোঁসানি থেমে যেতেই ফ্ল্যাটটা নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে ওদের দরজার ছিটকিনি লাগানোর আওয়াজটা ভীষণ জোরে কানে বাজল। বাবাই আঁকার খাতার থেকে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল, মাম্মি।

কুর্তাটা মাথা গলিয়ে খুলতে গিয়েও রুমি সেই ডাক শুনে পাথর হয়ে গেল। তারপরেই শুনতে পেল রাতুল বলছে, এদিকে দ্যাখো বাবাইবাবু। সেই যে তোমাকে ঈগলপাখিটার গল্প বলছিলাম যে খাঁচাসুদ্ধু টিয়াটাকে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল, তার ছবিটা দেখবে না?

বাবাইয়ের গলা আর পাওয়া গেল না, শুধু গুনগুন করে রাতুলের গল্প বলে চলার আওয়াজ ওদের কানে আসছিল, যেন কোনও পরীক্ষার্থী মাস্টারমশাইয়ের সামনে একটানা মুখস্থ-বিদ্যার পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।

দীপেশের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। রাতুলের মন পড়া হয়ে গেছে তার। পারমিতাও কি পড়তে পেরেছে? যদি পেরেই থাকে, তাহলে এখনো এত আড়ষ্ট হয়ে আছে কেন?

দীপেশ বলল, রিল্যাক্স, সোনা। তারপর পারমিতার পিঠের দিকে হাত নিয়ে গিয়ে, অনায়াস দক্ষতায় ব্রায়ের হুক দুটো খুলে দিল।

পারমিতা টিউবলাইটটা অফ করে দিয়ে নাইটল্যাম্প জ্বেলে দিল। দীপেশ বলল, কী দরকার ছিল? ও কোনও উত্তর দিল না।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে পারমিতা দেখছিল, দীপেশ ধীরে সুস্থে পকেট থেকে রুমাল বার করে ওর কম্পিউটার টেবিলের ওপরে পাতলো। তারপর সেই রুমালের ওপরে একে-একে সাজিয়ে রাখলো নিজের রিস্ট-ওয়াচ, পেন, পার্স, লাইটার। রুমালের চারটে খুঁট চারদিক থেকে গুটিয়ে এনে একটা নিখুঁত প্যাকেটের শেপ দিল। তারপর মোবাইল ফোনটাকে অফ করল। সেটাকে ওই প্যাকেটের ওপরে চাপা দিল। তারপর চোখ থেকে চশমা খুলে ভাঁজ করে ওখানেই রাখল।

হঠাৎই নিজেকে ভীষণ নগ্ন লাগল পারমিতার। সে পায়ের দিক থেকে চাদরটা টেনে নিয়ে শরীরে ঢাকা দিল। দীপেশ অল্প হেসে শান্ত-গলায় বলল, শীত করছে? দাঁড়াও আর এক-মিনিট। পারমিতা এবারেও ওর কথার কোনও উত্তর দিল না। শুধু চোখ বড়-বড় করে দেখচ্ছিল কত দ্রুত কিন্তু নিখুঁতভাবে ও শার্ট প্যান্ট বেল্ট সবিকছু সুন্দরভাবে পাট করে, গুটিয়ে খাটের একদিকে সাজিয়ে রাখছে। এরকম কোথায় যেন দেখেছিল? কার কথা যেন মনে পড়ছে?

শেষ অবধি মনে পড়ল। হ্যাঁ, আগেরবার ও জগৎপুর গিয়ে দেখেছিল, ছোটকাকা বাড়ি রিনোভেট করাবে বলে উঠোনের রঙ্গনগাছ দুটোকে কাটাচ্ছে। মাঝবয়সি যে-কাঠুরিয়াটিকে ছোটকাকা সেদিন ডেকে এনেছিল, সে ঠিক এইভাবে সাইকেলের হ্যান্ডেলের ওপরে পাট-পাট করে সাজিয়ে রাখছিল তার সোয়েটার, শার্ট, গেঞ্জি সব। তারপর একটা লুঙ্গির আড়ালে ট্রাউজারটা খুলে সেটাকেও ধীরেসুস্থে সাইকেলের হ্যান্ডেলে ওপরে রেখে, হাতে কুড়ুল নিয়ে গাছটার খুব কাছে গিয়ে ভালো করে গাছটাকে নিরীক্ষণ করছিল।

রুমি দেখল দীপেশ তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে সেই কাঠুরের দৃষ্টি। দুই ঊরুর মাঝখানে উদ্যত কুঠার। আবেগহীন চোখে মেপে নিচ্ছে পারমিতার সমস্ত শেকড় আর শাখা-প্রশাখা।

রুমি ভয়ে কেঁপে উঠল।

দীপেশ ওর পাশে শুয়ে ফিসফিস করে বলল, এটা পরিয়ে দাও।

পারমিতা বলল, আমার কাছে আসার সময় সবসময়েই তাহলে পকেটে করে কনডোম নিয়ে আসো? গ্রেট, রিয়েলি গ্রেট। আজ সকালেই প্লেটোনিক-লাভের কথা বলছিলে না। তখনো পকেটে এটা মজুত ছিল নিশ্চয়ই?

দীপেশ বলল, কী করব? মেয়েদের বাইরে থেকে দেখলে তো বোঝা যায় না জার্ম ক্যারি করছে কিনা। ঠিক আছে, আমি নিজেই পরে নিচ্ছি।

এই কথাটা শোনার আগে অবধি পারমিতা ভেবেছিল তার হারাবার আর কিছু বাকি নেই। কিন্তু এবার সে বুঝতে পারল, ছিল...বাকি ছিল। কিছুক্ষণ আগে অবধি নিজের কাছে একজন সাধারণ মেয়ের আত্মপরিচয়টুকু তার ছিল। কিন্তু এইমাত্র সে বাজারের বেশ্যায় পর্যবসিত হল, যার সঙ্গে বিনা প্রোটেকশনে সেক্স করতে লোকে ভয় পায়।

মেট্রোরেলের লোফারগুলোকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল পারমিতা। ভাগ্যিস ওরা তার স্তনের স্নায়ুগুলোকে আগেই ছিঁড়ে দিয়ে গিয়েছিল। সেইজন্যেই এই সেতারীর আঙুল তুমুল খানাতল্লাশিতেও আর নতুন করে কোনও ব্যথার তন্তু খুঁজে পাচ্ছে না। তবু তার শিশিরবিহীন শুকনো অপরাজিতায় যখন রাগী ভিমরুল গোঁত্তা মেরে ঢুকল, তখন যন্ত্রণার চিৎকারটা আটকাতে পারলো না পারমিতা। অথচ দরজা খুলে বেরোতেও পারল না। বাবাইয়ের সামনে, রাতুলের সামনে এই-অবস্থায় বেরোনো যায় না। দরজাটা তো সে নিজেই ভেতর থেকে বন্ধ করেছিল।

না, বেরোনো যায় না। শুধু নখে-দাঁতে ক্ষতবিক্ষত হতে-হতে মুখের ওপরে হাত চাপা দিয়ে প্রাণপণে নিজের গোঙানিকে নিজেই আটকানোর চেষ্টা করা যায়। তাতেও সেই আওয়াজ আটকানো গেল কিনা, রুমি জানে না। চৈতন্য হারাবার আগে রক্তজলের ঘূর্ণির মতন তার মাথায় শেষ যে-কথাটা পাক খেয়ে গেল, সেটা হল, আবার ঠকে গেলাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%