তিন

সৈকত মুখোপাধ্যায়

অঙ্কের খাতা থেকে চোখ তুলে অনেকক্ষণ বাদে একবার বাইরের দিকে তাকাল রুমি। ঘরের দক্ষিণদিকের দেয়ালে, জানলার কাছেই ওর শোয়ার চৌকিটা পাতা আছে। তাই এখানে বসে হাত বাড়ালেই রুমি জানলার নাগাল পায় আর চোখ তুললেই দেখতে পায় বাইরেটা।

আজ বলে নয়, সেই ক্লাস-নাইন থেকেই এই চৌকিটা তার সাধনার আসন।

মা মারা যাওয়ার পর থেকে ঘরটার বিশেষ কিছু বদলায়নি। শুধু ও পাল্টাপাল্টি করে যে বেডকভার দুটো বিছানায় পাতে সেগুলোর রঙ আরো একটু জ্বলে গেছে আর জানলার দুটো গরাদ খুলে পড়ে গেছে। ফাঁকা জায়গাটায় আড়াআড়ি করে পাড়ের দড়ি বেঁধে রেখেছে রুমি। নাহলে মাঝরাত্তিরে ভাম ঢুকে পড়ে।

চৌকির অর্ধেকটা জুড়ে তার পড়ার বই। যত উঁচু-ক্লাসে উঠছে, তত বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে। তা বাড়ুক। তারপরেও যতটা জায়গা বাকি আছে, তা ওর মতন একটা রোগা-মেয়ের শোয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সেইজন্যেই রুমি আর কষ্ট করে বইয়ের তাকে বই-টই গোছাতে যায় না। তাছাড়া কল্যাণদাও তো বলেন, একটা খুব সাজানো-গোছানো ঘর দেখলেই বুঝবি তার পেছনে একটা ওয়েস্টেড-লাইফ রয়ে গেছে। বিছানার চাদর টান-টান করে পাততে আর ফুলদানিতে ফুল সাজাতে গিয়ে যে-জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, ওসবের পেছনে একদম সময় নষ্ট করবি না।

না, সময় নষ্ট করে না রুমি। দিন আর রাতের অধিকাংশ সময়টাই সে হয় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ার বই পড়ে আর বিছানার ওপরে খাতা রেখে অঙ্ক কষে। তারমধ্যে শুধু জানলা দিয়ে মুখে রোদ এসে পড়লে একটু সরে বসে; বৃষ্টির ছাট এলে হাত বাড়িয়ে পাল্লাদুটো ভেজিয়ে দেয়।

কখনো-কখনো একটা চ্যাপ্টার শেষ করে অন্য একটা বই হাতে তুলে নেওয়ার সময় জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালে সে দেখতে পায়, অনেক দূরে, নীলকুঠির মাঠের ওপাশে, পৃথিবীটা আকাশের গায়ে মিশে গেছে।

আসলে তো মিশে যায়নি। রুমি জানে, দিগন্তের চেয়েও আরো দূরে কলকাতা বলে একটা শহর আছে। সেখানে যেতে গেলে ট্রেনে করেও তিন-ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। রুমি অনেক দিন আগে একবার কোনও আত্মীয়ের বিয়েতে মা আর কাকুমণির সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিল। এখন আর ভালো করে সব কথা মনে পড়ে না। তবে এটুকু মনে আছে যে, গরমে, ধোঁয়ায়, ধুলোয় অল্পক্ষণের মধ্যেই সে হাঁপিয়ে উঠেছিল। একটুও ভালো লাগেনি তার শহরটাকে।

কিন্তু এখন দিনরাত কলকাতা তাকে টানছে। তাকে কলকাতায় যেতে হবে। ওখানকার কোনও একটা কলেজে পড়তে হবে।

তারপর কী হবে?

সেটা এখনই ঠিক ভাবতে পারে না সতেরো বছরের রুমি। তবে কল্যাণদা তাকে বলেছেন, কলকাতা একটা নদীর মতন। তার বুকের ভেতরে নাকি অনেক রকমের স্রোত। একবার কলকাতায় পা দিলে, সেই স্রোতগুলোর কোনও একটা ঠিক তাকে টেনে নিয়ে আরো দূরে চলে যাবে।

কল্যাণদাকে সে বলেছিল, ভয় করে যে।

কল্যাণদা ঠিক কল্যাণদার স্টাইলেই বলেছিলেন, ন্যাকা! ভয় করে! তাহলে জগৎপুরেই বসে থাকো। কোনও পাটের দালালের ঘরণী হয়ে দু-বেলা উনুন ধরাও।

বড্ড বাজে মুখ কল্যাণদার। কিন্তু তা সত্ত্বেও রুমির ওঁকে দেবদূত বলে মনে হয়। এই জগৎপুরে যে ওঁর মতন একজন মানুষ কেমন করে জন্মাল, ভেবে পায় না রুমি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কল্যাণদার বাবা মহাদেব বাড়ই নিজেও কিন্তু পাটের দালাল।

কল্যাণদা অবশ্য জীবনে কোনওদিন ওঁদের গদিতে পা রাখেননি। স্টুডেন্ট হিসেবে বরাবরই ব্রিলিয়ান্ট ছিলেন। সেই একেকজন ছেলেমেয়ে থাকে না, যারা জীবনে কখনো সেকেন্ড হয় না, একেবারে তাই। প্রেসিডেন্সি থেকে ইকনমিক্সে অনার্স নিয়ে পাশ করে ব্যাঙ্ক পি.ও.-র চাকরি পেয়েছেন। এখন কল্যাণদার পোস্টিং বারাসাতে।

যখন পড়াশোনা করছিলেন, তখনো নিজের হাতখরচ চালানোর জন্যে উইক-এন্ডে জগৎপুরে এসে কল্যাণদা এখানকার কিছু ছেলেমেয়েকে পড়াতেন। এমনিতে ওঁর বাবার যা পয়সা, তাতে ট্যুইশনি করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু নিজের বাবার সঙ্গে কল্যাণদার সম্পর্কটা তো কোনওদিনই ভালো নয়। পারিবারিক ব্যবসাটায় ঢোকেননি, সেটাই তার একটা বড় কারণ। তো সে যাই হোক, তখনই রুমি কল্যাণদার চোখে পড়ে যায়। মেধার জন্যে নয়, খাটুনির জন্যে। ক্লাস-এইটের বাচ্চা মেয়েটার মধ্যে কল্যাণ বাড়ই একটা দাঁতে-দাঁত চেপা জেদ দেখতে পেয়েছিলেন।
ওদের আর্থিক দুরবস্থার কথা পাড়ার কে না জানে! তাই দু-দিন বাদে নিজেই রুমিকে বলেছিলেন, তোকে মাইনে দিতে হবে না। এমনিই পড়ে যাবি।

এরপর মাধ্যমিকে রুমি যে রেজাল্টটা করল, সেটা বোধহয় কল্যাণ বাড়ইয়ের কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। রাজ্যের মেরিট-লিস্টে ষোল নাম্বারে পারমিতা ঘোষালের নাম ছিল। মেয়েদের মধ্যে সপ্তম।

এখনও কল্যাণদা প্রতি উইক-এন্ডে বাড়ি আসেন। কিন্তু সে শুধুই রুমিকে পড়ানোর জন্যে। নিজেই বলেন, তুই হায়ার-সেকেন্ডারিটা পাশ করে গেলে আর এত যাতায়াত করব না। নিজে আবার একটু পড়াশোনা শুরু করব।

আপাতত শুক্রবার সন্ধে থেকে রবিবার দুপুর অবধি রুমির অনেকটা সময় মহাদেব বাড়ইয়ের বাড়ির একতলার একটা ঘরে কেটে যায়। কল্যাণদা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওকে পড়িয়ে যান। কলকাতা থেকে আসার সময় প্রতিবারই ওর জন্যে কিছু না কিছু রেফারেন্স বই নিয়ে আসেন। বইগুলো ভীষণ আগ্রহের সঙ্গেই হাত পেতে নেয় রুমি, কিন্তু আর যেটা নিয়ে আসেন কল্যাণদা, সেটা নিতে ওর খুব সঙ্কোচ হয়। উনি প্রতি সপ্তাহেই ওর জন্যে কাজু, কিশমিশ আর খেজুরের তিনটে প্যাকেট নিয়ে আসেন। এটা উনি শুরু করেছেন রুমি মাধ্যমিক পাশ করার পর থেকেই।

রুমি প্রথমদিনেই প্রবল আপত্তি করেছিল। কল্যাণদা তো কোনওদিনই খুব গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারেন না। তবু সেদিনই প্রথম একটু নরম-গলায় বলেছিলেন, তোর এই লজ্জাটাকে আমি অ্যাপ্রিসিয়েট করছি। কারুর কাছ থেকে অনুগ্রহ নেবার ব্যাপারে মানুষের একটা লজ্জা থাকাই উচিত। তবে এবারের মতন আমাকে তোর দাদা ভেবে এটা নিয়ে নে। ব্যাপারটা কী জানিস, পেটে খিদে নিয়ে কোনও কাজই ভালো করে করা যায় না, পড়াশোনাও নয়। রাত জেগে যখন পড়বি, খিদে পেলে একটা-দুটো করে মুখে ফেলে দিবি।

তারপর থেকে বইখাতার সঙ্গে ড্রাই-ফ্রুটসগুলোও রুমি বিনা আপত্তিতেই নিয়ে নেয়। কারণ, রুমিও অস্বীকার করতে পারে না, ওর পেটে খিদে থাকে।

ওদের বাড়িতে জলখাবারের পাট নেই। কে করবে? ও নিজে ঠাম্মাকে বলে দিয়েছে পারবে না। ঠাম্মা ওকে বলেছে স্বার্থপর। ও বলেছে, হ্যাঁ, আমি স্বার্থপর। বলতে ওর দ্বিধা হয়নি, কারণ কল্যাণদা তার আগেই একদিন ওকে বলেছিলেন, সবার কাছে ভালোমানুষ সাজতে গেলে জীবনে কিছুই হবে না। তবে সেইজন্যেই অবরে-সবরে প্রসাদের দু-এক কুচি শসা কলা ছাড়া, দুবেলার ভাতের বাইরে আর কিছু জুটত না রুমির। সেই সমস্যাটা কল্যাণদা কিছুটা মিটিয়ে দিয়েছেন।

মনকে আবার অঙ্কের খাতায় ফিরিয়ে আনল রুমি। এটা ও দেখেছে যে, পারে। বেশ সহজেই এক চিন্তাকে অফ করে দিয়ে আরেক চিন্তাকে অন করে দিতে পারে।

আজ বৃহস্পতিবার। তার মানে কাল আবার কল্যাণদার কাছে গত পাঁচদিনের পড়া দিতে হবে। বিশেষ করে অঙ্ক।

ইলেভেনে ওঠার পরে প্রথম-প্রথম ক্যালকুলাস শিখতে গিয়ে কান্না পেয়ে যাচ্ছিল রুমির।

এ কীরে বাবা! অ্যালজেব্রার সেই চেনা নিয়মগুলো কোথায় গেল? এখন থেকে কি আর সমান চিহ্নের ডানদিকের সঙ্গে বাঁদিক মিলবে না?

কল্যাণদাকে বললে মুচকি হেসে বলত, কেন মিলবে না? মিলের দিকেই এগোচ্ছে তো। দেখতে পাচ্ছিস না একটা ভেরিয়েবেলের রেসপেক্টে ফাংশনগুলো কেমন গুটি গুটি পায়ে হেঁটে তার ভ্যালুর দিকে এগোচ্ছে? কিন্তু সবসময় মনে রাখবি ফাংশনকে সিম্পলিয়েস্ট ফর্মে নিয়ে যেতে হবে। যতক্ষণ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করা যাচ্ছে নিয়ম মেনে করতে থাক। কমন গেলে নিয়ে নে। এমনকী মাধ্যমিকে যেমন ভ্যানিশিং, মিডল টার্ম শিখেছিলি সেসবও ব্যবহার কর। কিচ্ছু ভোলা চলবে না। এই দ্যাখ এখানে ওপর নিচে কাটাকুটি যাবে। করে নিয়ে তারপর ভ্যালু বসা।

হঠাৎ একটা ফোঁপানির আওয়াজ শুনে কল্যাণদা খাতার পাতা থেকে মুখ তুলে রুমির মুখের দিকে তাকালেন।

রুমি মাথা নীচু করে প্রাণপণে ঘাড় নাড়তে-নাড়তে বলত, আমি পারব না কল্যাণদা। কিছুতেই পারব না। শুধু সূত্র সূত্র সূত্র। রুল রুল আর রুল। আমার দ্বারা হবে না। মুখস্থ করে অঙ্ক কষা যায়? আমি বায়ো-সায়েন্স নিয়ে নেব।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কল্যাণদা সেদিন বলেছিলেন, আর একটা মাস। মাত্র আর একটা মাস অঙ্ককে সময় দে, রুমি। দেখবি হঠাৎ করেই সমস্ত সূত্রের পেছনের সত্যগুলো তোর চোখে ভেসে উঠবে। তখন তোকে যদি আমি ধরে পেটাই, তাহলেও তুই ক্যালকুলাসকে ছাড়তে পারবি না।

এখন রুমি ভাবে, কল্যাণদা কি ম্যাজিশিয়ান? মোটামুটি ওই একমাসের মাথাতেই একদিন ফিজিক্সের পোটেনসিয়াল-ডিফারেন্স পড়তে গিয়ে তার মনে হল, ঠিকই তো। এখানে যেমন একটা ছোট্ট জায়গায় কতটা চার্জ আছে সেটা বার করে নিয়ে তারপর সেই হিসেবে বড় জায়গাগুলোর চার্জ বার করছি, একইভাবে তো ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসকেও ভাবা যায়। সেখানেও তো ছোট-ছোট টুকরোগুলোকেই একটা বড় জিনিসের মধ্যে জোট বাঁধাচ্ছি, ইন্টিগ্রেট করছি।

সেই থেকে রুমি অঙ্কের সূত্রগুলোকে বস্তুপৃথিবীর সূত্রের সঙ্গে কিছুটা কিছুটা মিলিয়ে নিতে পারল। এখন আর ক্যালকুলাসকে তার শুধুই মুখস্থবিদ্যে বলে মনে হয় না। ভালো লাগে তার অঙ্ক কষতে।

ঘণ্টাদুয়েক অঙ্ক নিয়ে উস্তুমখুস্তুম করার পর রুমি বইয়ের স্তূপের ওপরে রাখা রিস্ট-ওয়াচটা নিয়ে একবার সময় দেখল। বড্ড দামি এই ঘড়িটা। মাধ্যমিক পাশ করার পরে কল্যাণদা দিয়েছিলেন। উপহারের জিনিস নিয়ে কিছু বলতে নেই। নাহলে রুমি বলত, আমাকে আরেকটু সস্তার ঘড়ি দিন কল্যাণদা। আপনি এতকিছু বোঝেন, আর এইটা বোঝেন না যে, এই ঘড়ির সঙ্গে পরার মতন জামাকাপড় আমার নেই।

প্রতিদিন এই সময়টুকুই রুমি কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে কাটায়। চান করতে যাওয়ার আগে এই আধঘণ্টা সে কিছু স্মৃতি আর কিছু স্বপ্নের জন্যে বরাদ্দ করে রেখেছে। বাকি সময়টা পড়াশোনার। প্রস্তুতির। একটা মোটা দাঁড়ার চিরুনি নিয়ে রুমি এখন জানলার সামনে দাঁড়াবে। হালকা হাতে চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে আকাশ-পাতাল ভাববে।

জানলা দিয়ে তাকালে যেমন দিগন্ত চোখে পড়ে, যা রুমিকে কলকাতার কথা মনে পড়িয়ে দেয়, তেমনি আবার রাতুলদের উঠোনটাও চোখে পড়ে। রুমির একেবারে হাতের নাগালে ওটাও এক নতুন দিগন্ত।

রাতুল। খুব আস্তে-আস্তে নামটা একবার উচ্চারণ করেই ফিক করে হেসে ফেলল রুমি। ওর চেয়ে অনেক বড়। হিসেব করে দেখেছে, প্রায় ছ’বছরের। রাতুল বলাটা উচিত নয় নিশ্চয়। কিন্তু প্রেমিককে কি রাতুলদা বলেও ডাকা যায়। আপাতত যে-ক’দিন ওর সঙ্গে কথা হয়েছে, বিনা-সম্বোধনেই চালিয়ে দিয়েছে রুমি।

প্রেমিক, এই কথাটাও একবার খুব সাবধানে উচ্চারণ করল সে। তারপর আরো সাবধানে বলল, লাভার। মুখ দেখেই বোঝা গেল কোনওটাই তার ভালো লাগল না। রাতুলের উপযোগী আরো গভীর, গম্ভীর কোনও শব্দ খুঁজছিল সে।

সত্যিই রাতুলের মধ্যে ভারি সুন্দর একটা গভীরতা খুঁজে পায় রুমি। কথা বলার দরকার পড়ে না, ছোঁয়ার দরকার পড়ে না। শুধু ও যখন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন সেই চোখদুটোর দিকে চোখ পড়ে গেলে রুমির মনে হয়, সে যেন একটা নদীর ধারে বসে আছে। রুমির তেলহীন লালচে চুল, চোখের নীচের কালি, কনুইয়ের ময়লা, প্লাস্টিকের চটি—সবকিছুর ছায়া সেই নদীর বুকে ধরা থাকছে। রুমি চলে গেলেও ছায়াগুলো রাতুলের চোখ থেকে মুছে যাবে না।

প্রেমিকের মতন রাতুল কোনওদিন ওকে মোগলাই পরোটা খাওয়াতে নিয়ে যায়নি। লাভারের মতন সিনেমাতেও না। তাহলে কী করেছে রাতুল? নাওয়া-খাওয়ার বেলা চলে গেলে রাতুল মাঝেমাঝে ওর বাবাকে খুঁজে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। তাও রুমি জানে, ও যদি আজ রাতুলকে ওই কাজটাও করতে বারণ করে দেয়, তাহলে কাল থেকে রাতুল আর করবে না।

এই যে গলির মোড়ে মাঝে-মাঝে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওদের কথা হয়, তখন রাতুল রুমিকে কী বলে?

রুমির যা-নেই তার কথা ও একবারও বলে না। ও শুধু বলে, রুমির যা আছে তার কথা। ওর মেধার কথা বলে। ওর সুন্দর চোখের কথা বলে। একদিন এমন একটা আশ্চর্য কথাও বলেছিল—রুমির শিরদাঁড়া সোজা রেখে, ঘাড় উঁচু করে হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিটাও নাকি ওর খুব ভালো লাগে। সেদিন ভীষণ আশ্চর্য হয়েছিল রুমি। তাহলে ওকে যে ঠাম্মা থেকে শুরু করে নীচের দালানে সন্ধেবেলায় আড্ডা মারতে আসা কাকিমা-জেঠিমারা এতদিন ধরে বললেন—অমন মর্দানির মতন চলন কেন মা তোমার—সেটা কি ভুল?

একদিন, শুধু একদিনই রাতুল হঠাৎ ওকে জিগ্যেস করে বসেছিল, তুমি আমাকে ভালোবাসো কেন?

রুমি সিনেমা-সিরিয়াল দ্যাখে না। বান্ধবীদের কাছে তাদের প্রেমের গল্পও শোনে না খুব একটা। সতেরোবছর বয়স হয়ে গেলেও তখনো ওর ভালোবাসার প্রচলিত-ভাষা শেখা হয়নি। তাই সেদিন রাতুলের ওই প্রশ্নটার মুখে পড়ে ভীষণ থতমত খেয়ে গিয়েছিল। তবু ওর যা স্বভাব, প্রথমেই যেটা মনে হয়েছিল সেটাই বলে ফেলেছিল—তুমি আমাকে ভালোবাসো তাই।

রাতুলের শিশুর মতন মুখে খুব সহজেই মনখারাপের ছায়া পড়ে। ও মনখারাপ নিয়েই চলে যাচ্ছিল। রুমি পেছন থেকে ওর শার্টটা টেনে ধরে বলেছিল, শোনো।

কী?

তোমার গায়ের গন্ধটা আমার খুব ভালো লাগে। ভিজে মাটি আর ঘামের গন্ধ মিশিয়ে কী সুন্দর একটা গন্ধ। চোখ বাঁধা থাকলেও আমি বলে দেব, তুমি সামনে এসে দাঁড়িয়েছ।

তাই শুনে প্রথমে রাতুলের চোখদুটো আস্তে-আস্তে বড় হয়ে উঠেছিল। তারপরেই একেবারে স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠেছিল। রুমি ভয়ের চোটে সঙ্গেসঙ্গে ওর মুখের ওপরে নিজের হাতের পাতাটা চেপে ধরে, ফিসফিস করে বলেছিল, চুপ, চুপ, চুপ। সারা পাড়া জাগিয়ে দিচ্ছ তো, পাজি কোথাকার!

রুমির হাতের চাপে কোনওরকমে হাসিটা গিলে ফেলে রাতুলও ফিসফিস করে বলেছিল, আজ কুমোরের ছেলের মাটি মাখা সার্থক হল।

এখনও রুমি জানলা দিয়ে রাতুলকে দেখতে পাচ্ছে। একদম ডুবে রয়েছে ও কাজের মধ্যে। রুমি যে জানলায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটা খেয়ালই করছে না। অবশ্য আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়িই উঠে পড়েছে রুমি। কী জানি কেন, আজ মনটা একটু অস্থির হয়ে রয়েছে।

এই ডিসেম্বরের শুরুতে যেহেতু আর কোনও পুজো-টুজো নেই, তাই রাজেন পালের উঠোন এখন প্রায় ফাঁকা। শুধু একটাই মূর্তি ধীরে-ধীরে তৈরি হয়ে উঠছে। রুমি দেখছে, গত একসপ্তাহ ধরে এই মূর্তিটা নিয়েই পড়ে রয়েছে রাতুল। কোনও দেবদেবীর মাটির মূর্তি নয়। প্যারিস-প্লাস্টার দিয়ে রাতুল প্রমাণ সাইজের এক মহিলা-সাঁতারুর মূর্তি তৈরি করছে।

ক’দিন আগে রুমি ওকে কৌতূহলবশত জিগ্যেস করেছিল, ওটা কী বানাচ্ছ গো? তাতে রাতুল বলেছিল, পঁচিশে ডিসেম্বর থেকে ক্রীড়া-দপ্তরের উদ্যোগে কৃষ্ণনগরে যে অ্যাথলেটিক্সের প্রতিযোগিতা শুরু হবে, তার তিনটে গেটের মাথায় বসানোর জন্যে এরকম তিনটে ফিগার বানাবার অর্ডার পেয়েছে ওরা—একটা স্প্রিন্টারের, একটা জিমন্যাস্টের আর একটা এই সুইমারের।

পারবে? ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করেছিল রুমি। আগে কখনো এরকম মূর্তি বানাওনি তো।

রাতুল ওর সেই নম্র কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হাসিটা হেসে বলেছিল পারব। কেমন করে পারব দেখতে চাও? চলো আমার সঙ্গে। তারপর ওকে একরকম টানতে-টানতেই নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সোজা নিয়ে গিয়েছিল দোতলায় কোনার দিকে ওর নিজের ঘরটায়। আর সেই ঘরে ঢুকেই চমৎকৃত হয়ে গিয়েছিল রুমি, কারণ ও বুঝতে পেরেছিল তার মতন রাতুলেরও একটা ধ্যানের আসন রয়েছে।

ঘরটা ছোট, কিন্তু চার-দেয়ালের বড়-বড় জানলা দিয়ে প্রচুর আলোর আনাগোনা। অনেক বই, অনেক ম্যাগাজিন ডাঁই করে রাখা আছে চারিদিকে। একবার চোখ বুলিয়েই রুমি বুঝতে পারল সবই শিল্প-সম্পর্কিত বই।

এই ছেলে বি.এ.-তে খারাপ রেজাল্ট করবে না তো কে করবে?

আর ছিল ছোট-ছোট প্লাস্টারের ফিগার-স্টাডি। নানান ভঙ্গিতে নারী ও পুরুষের মূর্তি।

খাটের ওপরে রাখা ছিল অন্তত দশটা দেশি ও বিদেশি স্পোর্টস জার্নাল আর একটা বিরাট মোটা ইংরিজি বই। মলাটে লেখকের নাম লেখা ছিল—অ্যান্ড্রু লুমিস।

একবার দেখব? জিগ্যেস করল রুমি।

রাতুল বলল, দ্যাখো না। দেখবার জন্যেই তো তোমাকে নিয়ে এলাম।

বইটার গ্লসি-পেজগুলো একটার পর একটা ওলটাতে-ওলটাতে হতভম্ব হয়ে গেল রুমি। মানুষের শরীরের প্রতিটি পেশীর যতরকমের অবস্থান সম্ভব, সমস্ত ছবি এঁকে দেখানো রয়েছে।

এই বইটা তুমি পড়? অবাক হয়ে ও জিগ্যেস করল।

পড়বার চেষ্টা করি। পুরোটা পড়বার পক্ষে একটা জীবন তো বড্ড কম সময়। বিষণ্ণ গলায় বলল রাতুল।

রুমি জানে, ওর একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, কখন কী কথা বলতে হবে বুঝতে পারে না। ছোটবেলা থেকে আশেপাশে কথা বলার মানুষ না পাওয়ার কুফল। তাই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, কী করবে পড়ে? দুর্গাঠাকুর, সরস্বতীঠাকুর বানানোর জন্যে এত কিছু কি জানতে হয়? বলেই মনে-মনে জিভ কাটল রুমি।

রাতুল কিন্তু একটুও রাগল না। বরং খুশিমনেই উত্তর দিল, একদম ঠিক বলেছ। ঠাকুর বানাতে গেলে এত কিছু লাগে না। আসলে আমার মনের মধ্যে স্কাল্পটর, মানে ভাস্কর হওয়ার একটা স্বপ্ন ছিল। এখনো রয়েছে। তবে যত দিন যাচ্ছে, বুঝতে পারছি হবে না। পারব না।

কেন? পারবে না কেন?

ওর জন্যে ফর্মাল ট্রেনিং লাগে। আরো ছোটবেলায় সেরকম কোনও ট্রেনিং-ইনস্টিটিউটে ঢুকে পড়তে হয়, যেখানে শুধু মাটি কিম্বা প্লাস্টার নয়, ব্রোঞ্জ, পাথর এরকম হাজারটা মিডিয়ামে কাজ করতে শেখায়। সবচেয়ে বড় কথা, ন্যুড-স্টাডি করার সুযোগ পাওয়া যায়। বই পড়ে কি আর পুরোটা হয়? এসব হচ্ছে গুরুমুখী বিদ্যা। এখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

রুমি ঘরের অন্য কোনায় দাঁড়িয়ে একটা ম্যাগাজিনের আড়ালে মুখ লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন যে রাতুলের জীবনে কোনও কল্যাণ বাড়ই এলেন না!

সেই মহিলা-সুইমারের মূর্তিটা এখন প্রায় শেষের দিকে। এখনো রঙ পড়েনি, তবুও তাতেই অদ্ভুত জীবন্ত লাগছে। জলের ওপর চিৎসাঁতার কাটছে মেয়েটা। দীর্ঘ, নির্মেদ শরীর, কিন্তু ঊরুদুটো সামান্য ভারী—সাঁতারুদের যেমন হয়। ডানহাতটা যখন মাথার ওপরে হাওয়ার মধ্যে টান-টান, ঠিক তখনই বাঁ-হাতটা যেন তরোয়ালের মতন মসৃণভাবে গেঁথে যাচ্ছে জলের বুকে। স্যুইমিং-স্যুট আর ক্যাপ নিশ্চয় রঙ করার পরে বোঝা যাবে। আপাতত মেয়েটিকে নগ্ন বলেই মনে হচ্ছে।

হাতে একটা স্ক্যালপেল আর নরম প্লাস্টারের ডেলা নিয়ে মেয়েটির চিবুকটাকে আরো একটু উঠিয়ে দিচ্ছিল রাতুল। অনেকগুলো পকেটওলা একটা কার্গো-প্যান্ট আর জলপাইরঙের টি-শার্ট পরে আছে ও। রুমি জানে, এটাই ওর কাজের পোশাক। সহজে ময়লা হয় না বলে এটাই পরে থাকে। ক’দিন হল আবার হালকা দাড়ি রেখেছে। জানলার পাল্লার আড়ালে দাঁড়িয়ে রুমি কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখল। বিশেষ করে ওর হাতদুটোকে। রাতুলের হাতদুটো ওর খুব প্রিয়।

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় রুমি যতক্ষণ পারে রাতুলের হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে ধরে থাকে। ওর হাতের পাতায় ক্রমাগত হাত বোলায়। না বুলিয়ে পারে না...ভীষণ ভালো লাগে ওর। পাতা তো নয়, পাঞ্জা বলাই ভালো। খসখসে চামড়ায় ঢাকা বিরাট চেটো। অথচ লম্বা-লম্বা আঙুলগুলো ভীষণ নমনীয়! মনে হয় ভেতরে যেন হাড় নেই। ওই আঙুলগুলোকে নিজের আঙুলের মধ্যে নিয়ে নানাভাবে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে দেওয়াটাও রুমির প্রিয় খেলা, যদিও রাতুল খেলাটা খেয়াল করে কিনা ও জানে না।

জানলার কাছ থেকে সরেই আসছিল রুমি। কিন্তু তখনই রাতুল একটা কাঠের টুলের ওপরে দাঁড়িয়ে সেই সাঁতারু-নারীর স্তনদুটোকে মসৃণ করার কাজটা শুরু করল। রুমির পা-দুটো যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। ওই সাঁতারু-মেয়ের স্তনদুটোও ওর মতনই ছোট। রাতুলের বিশাল পাঞ্জার আড়ালে একেকবার একেকটা স্তন পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছিল। তখনই রুমি নিজের স্তনের ওপরে অনুভব করছিল একটা খসখসে তালুর চাপ।

দেখতে-দেখতে রুমির নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল, নাকের নীচে জমে উঠল গুঁড়িগুঁড়ি ঘামের ফোঁটা। ও পরিষ্কার বুঝতে পারছিল ওর নিজের স্তনবৃন্তদুটিও ওই জমাট প্লাস্টারের বৃন্তের মতন কঠিন হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ বাদে রুমি নিজেকে জোর করে জানলার সামনে থেকে সরিয়ে চানঘরে ঢুকে পড়ল। কল থেকে বালতিতে জল ভরার শব্দের আড়ালে জড়ানো-গলায় বলল, আমাকে তুমি কবে ওইভাবে আদর করবে রাতুল?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%