মতি নন্দী
“এসে গেছেন! আচ্ছা এক মিনিট, আপনি বরং এখানেই বসুন।”
অনুরোধ নয়, যেন নির্দেশ। তরুণ সাংবাদিক ঢোক গিলে ঘাড় নাড়ল এবং নড়বড়ে লোহার চেয়ারটায় বসে সপ্রতিভ হবার জন্য রুমাল দিয়ে ঘাড়-গলা মুছে, পায়ের উপর পা তুলে প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করল, তারপর কী ভেবে সিগারেটটা আবার প্যাকেটে ভরে রাখল।
তার দশ গজ দূরেই ছড়িয়ে রয়েছে হাফপ্যান্ট-পরা, কতকগুলো আদুড় দেহ। তারা ঘাসের উপর চিত হয়ে, উপুড় হয়ে বা পা ছড়িয়ে বসে। ঘাম শুকিয়ে এখন ওদের চামড়ার রঙ ঝামা ইটের মত বিবর্ণ, খসখসে। সন্তর্পণে তারা শ্রান্ত হাত পা বা মাথা নাড়ছে। চোখের চাহনি ভাবলেশহীন এবং স্থির।
ওদের একজন গভীর মনোযোগে পায়ের গোছে বরফ ঘষছে; ধুতি-পাঞ্জাবি পরা স্থূলকায় এক মাঝবয়সী লোক তার সামনে উবু হয়ে দু’বার কি বলল, মাথা নিচু করে ছেলেটি বরফ ঘষেই যাচ্ছে, জবাব দিল না।
উপুড় হয়ে দুই বাহুর মধ্যে মাথা গুঁজে এতক্ষণ শুয়েছিল যে ছেলেটি, সে হঠাৎ উঠে বসে কর্কশস্বরে চীৎকার করল, “কেষ্ট, কতক্ষণ বলেছি জল দিয়ে যেতে।”
তাঁবুর পিছন দিক থেকে একটা চাপা গজগজানি এর জবাবে ভেসে এল।
তরুণ সাংবাদিক তাঁবুর ভিতরে তাকাল। তাঁবুর মাঝখানে সিমেন্টের একফালি চত্বর। পাতলা কাঠের পাল্লা দেওয়া স্প্রিং-এর দরজা দু’ধারে। দরজাগুলো ঝাপট দিচ্ছে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনায়, চত্বরটার পিছনটা খোলা। সেখান দিয়ে পাশের তাঁবু এবং একটা টিউবওয়েল দেখা যাচ্ছে। একটা গোল স্টিলের টেবিল চত্বরের মাঝ-খানে, সেটা ঘিরে সাত-আটজন লোক বসে এবং গলা চড়িয়ে তারা তর্ক করছে। কয়েকটা চায়ের কাপ টেবিলে। একজন চোখ বুঁজে টোস্ট চিবোচ্ছে। পাখা ঘুরছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় তাঁবুর ভিতরটায় ভ্যাপসা গুমোট।
“আপনার চা।”
সাংবাদিক চমকে তাকাল। গেঞ্জি-পরা একটা ছেলে, হাতে ময়লা কাপ। দুটি বিস্কুট কোনক্রমে কাপের কিনারে পিরিচে জায়গা করে রয়েছে।
“আমার! আমি তো—”
“কমলবাবু পাঠিয়ে দিলেন।”
সাংবাদিক হাত বাড়িয়ে পিরিচটা ধরল, আর চা খেতে খেতে মনের মধ্যে গুছিয়ে নিতে লাগল গত দু’দিন ধরে তৈরী করে রাখা প্রশ্নগুলো।
“তোকে পইপই বললাম, ডানদিকটা চেপে থাক, তবু ভেতরে চলে আসছিলিস।”
“আমি কি করব, শম্ভুটা বার বার বলছে—রাখতে পাচ্ছি না, রাখতে পাচ্ছি না, বলাই একটু এধারে এসে আগলা। সাইড আর মিডল দুটো ম্যানেজ করব কি করে?”
“সলিলটা যদি চোট না পেত! ভালই খেলছিল। সুকল্যাণের ওই শট গোললাইনে বুক দিয়ে আটকানো, বাপ্স। আমি তো ভাবলাম বুকটা ফেটে গেল বুঝি।”
“সলিলের লেগেছে কেমন?”
“কে জানে, কমলদা তো ভেতরে নিয়ে গিয়ে কি-সব ওষুধ-টষুধ দিচ্ছে।”
“পুষ্যিপুত্তুর কিনা, তাই ওর বেলা ওষুধ আর আমাদের বেলা বরফ ঘষো।”
“ট্যালেণ্ট। ওর মধ্যে ট্যালেণ্ট আছে আর আমাদের মধ্যে গোবর। যাক্গে, ছোটমুখে বড় কথা বলে লাভ নেই; বলাই, মনে থাকে যেন কাল ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বসুশ্রীর গেটে।”
“এখনো তোর কাছে চার আনা পাই।”
“কিসের চার আনা?”
“ভুলে মেরে দিচ্ছ বাবা, ‘দিলকো দেখো’-র টিকিট কাটার সময় ধার নিয়েছিলি না?”
“উঃ, কবেকার কথা ঠিক মনে রেখে দিয়েছিস তো। চার আনা আবার পয়সা নাকি!”
সাংবাদিক কান খাড়া করে ওদের কথা শুনছে। ডিগডিগে লম্বা যে ছেলেটি এতক্ষণ চিত হয়ে দু’হাতে চোখ ঢেকে শুয়েছিল, অস্ফুট একটা শব্দ করে হাত নামিয়ে তাকাতেই সাংবাদিকের সঙ্গে চোখা-চোখি হলো।
“রেজাল্ট কি?” সাংবাদিক চাপা গলায় জানতে চাইল।
“পাঁচ।”
সাংবাদিক সমবেদনা জানাতে চোখমুখে যথাসম্ভব দুঃখের ভাব ফুটিয়ে তুলল। ছেলেটি শুকনো হেসে বলল, “ডজন দিতে পারত, দেয়নি।”
“সিজনের প্রথম খেলা এটা?”
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে উঠে বসল। ঢোক গিলল, শুকনো ঠোঁট চাটল, জিরজিরে বুক। কাঁধে উঁচু হয়ে রয়েছে হাড়। কোমর থেকে পাতা পর্যন্ত পা দুটো সমান। পেশীর ওঠানামা কোথাও ঘটেনি। সাংবাদিকের মনে হলো ছেলেটিকে গোল পোস্টের মাঝখানে ছাড়া মাঠের আর কোথাও ভাবা যায় না।
“সরি, অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। চা দিয়ে গেছে তো?”
একটা চেয়ার টানতে টানতে কমল গুহ সাংবাদিকের পাশে এনে রাখল।
“আর এক কাপ হোক।”
“না না, আমি বেশি চা খাই না।”
“ভাল। বেশি চা খেলে স্বাস্থ্য থাকে না। গত পঁচিশ বছরে আমি ক’কাপ চা খেয়েছি বলে দিতে পারি। ফুটবলারের সব থেকে আগে দেখা উচিত নিজের শরীরটাকে। নয়তো বেশিদিন খেলা সম্ভব নয়। ফার্স্ট ডিভিশনেই কুড়ি বছর, হ্যাঁ, প্রায় কুড়ি বছরই খেলছি।”
সাংবাদিক ইতিমধ্যে তার নোটবই খুলে বল-পেনের আঁচড়ে দু’চার কথা লিখে ফেলেছে।
“আপনার বয়স কত এখন?”
“আপনিই বলুন।”
“কুড়ি বছর যদি ফার্স্ট ডিভিশনে হয় তাহলে অন্তত চল্লিশ।”
কমলের চোখে আশাভঙ্গের ছাপ ফুটে উঠল। “আপনি আমার কেরিয়ার থেকে হিসেব করে বললেন। কিন্তু আমায় দেখে বলুন তো বয়স কত?”
ভ্রূ কুঁচকে সাংবাদিক বোর্ডে দুরূহ কোনো অঙ্কের দিকে তাকানো মেধাবী ছাত্রের মত ওর দিকে তাকাল। চুলগুলো কোঁকড়া, মোটা, ছোট করে ছাঁটা। দু’কানের উপরে অনেক চুল পাকা। কপালে রেখা পড়েছে তিন-চারটি। সাংবাদিকের মনে পড়ল একটা বইয়ে পাতাজোড়া স্ট্যানলি ম্যাথুজের মুখের ছবি সে দেখেছিল। তলায় লেখা—‘দি ফেস অফ থারটিফাইভ ইয়ারস্ অফ টেনশন ইন ফুটবল।’ ম্যাথুজের কপালে পাঁচটি রেখা; ঠোঁটের কোলে একটি, তার পরেই আর একটু বড় আকারের টানাপোড়েনে থরথর দুটি ঢেউ যেন আছড়ে পড়েছে। এরপর চোখের কোণ পর্যন্ত সারা গাল বেলাভূমির মত কুঞ্চিত। কিন্তু কমল গুহর চোখ ম্যাথুজের মতন বিশ্রামপ্রত্যাশী অবসন্ন নয়। পাথরের মত ঝকঝকে, কোটরের মধ্যে বসানো। অসন্তুষ্ট বিক্ষুব্ধ এবং চ্যালেঞ্জ জানায়।
সাংবাদিক নোটবইটা কাত করে, কমল গুহর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায়ই পাতার কোণায় চট্ করে লিখল—রাগী, ভোঁতা, সেন্টিমেন্টাল।
বেশি দুধ দেওয়া চায়ের মতন গায়ের রঙ কিংবা মেদহীন মধ্যমা-কৃতি এই বাঙালী ফুটবলারের চেহারার মধ্যে সাংবাদিক কোনো বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেল না। গলার স্বর ঈষৎ ভারী ও কর্কশ। শুধু চোখে পড়ে হাঁটার সময় দেহটি বাহিত হয় শহীদ মিনারের মত খাড়া মেরুদণ্ড দ্বারা। হাঁটার মধ্যে ব্যস্ততা নেই।
“আটাশ বড়জোর তিরিশ।” সাংবাদিক ইতস্তত করে বলল।
আচমকা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল কমল গুহ। সাংবাদিকের অস্বস্তি দেখে হাসিটা আরো বেড়ে গেল। তাঁবুর সামনে দিয়ে দুটো ঘোড়সওয়ার পুলিস ডিউটি সেরে ফিরছিল। তারা বাধ্য হলো ঘোড়ার রাশ টেনে ফিরে তাকাতে।
“বড্ড কমালেন কিন্তু। আমার অফিসের বয়স কমানো আছে বটে, কিন্তু এতটা কমাতে সাহস হয়নি।’ কিছু মনে করবেন না, আপনার বয়স কত?”
সাংবাদিক গলা খাঁকারি দিয়ে খুব গম্ভীর হতে হতে বলল, “পঁচিশ।”
কমল গুহ ভুরু নাচিয়ে বলল, “আসুন মাঠটা দশ পাক দৌড়ে আসি।”
“তা কি করে সম্ভব!” সাংবাদিক প্রতিবাদ করল। “একজন ফুট-বলারের সঙ্গে আমি পারব কেন। আপনাকে যদি বলি একপাতা, লিখতে পারবেন কি আমার মতন?”
কমল গুহর মুখ থেকে মজার ভাবটা আস্তে আস্তে উবে গেল।
“ঠিক। বলেছেন ঠিকই। আমি পারব না একপাতা লিখতে। কিন্তু আপনি আমার বয়স জানতে চাইলেন কেন? আমার শরীরের ক্ষমতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার জন্যই তো? যদি বলি পঁচিশ তাহলে ভেবে নেবেন, অন্তত ১১ সেকেণ্ডে আমি ১০০ মিটার দৌড়তে পারি। যদি বলি চল্লিশ তাহলে সেটা ১৫ সেকেণ্ড হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আমরা দুজনে দৌড়োই এবং আপনাকে হারিয়ে দিই, তাহলে কি আমার বয়স পঁচিশ বছর বলে আপনি মেনে নেবেন না? সন তারিখ দিয়ে কি বয়স ঠিক করা যায়, শরীরের ক্ষমতাই হচ্ছে বয়স। বুঝলেন, এখন আমার বয়স সাতাশ।”

আসুন, মাঠটা দশ পাক দৌড়ে আসি।
সাংবাদিক টুক্ করে তার নোটবইয়ে ‘হামবাগ’ কথাটা লিখে প্রশ্ন করল, “আপনার লাস্ট ম্যাচ কোনটা যেটা খেলে রিটায়ার করেন?”
“রিটায়ার, আমি? লাস্ট ইয়ারেও দুটো ম্যাচ খেলেছি হাফ-টাইমের পর। দরকার হলে এ বছরও খেলব। সলিলটা আজ হাঁটুতে চোট পেয়েছে, সারতে মাসখানেক লাগবে। হয়তো আমাকে নামতে হতে পারে। স্টপারে খেলা, ছোট একটা জায়গা নিয়ে, খুব একটা অসুবিধে হয় না।”
“স্ট্যানলি ম্যাথুজ তো প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবল খেলে গেছেন। ইংল্যাণ্ডের হয়েই তো খেলেছেন তেইশ বছর।”
“মহাপুরুষ ওরা। তাও উইং ফরোয়ার্ডে। অত বয়সে ওই পজিশনে খেলা ভাবতে পারি না। আমি প্রথম যখন ফার্স্ট ডিভিশনে শুরু করি, রাইট ইনে খেলতাম।”
“কোন ক্লাবে?”
“এখানে শোভাবাজার স্পোরটিংয়েই প্রথম দু’বছর, তারপর ভবানীপুর, দু’বছর পর এরিয়ানে, সেখানে এক বছর কাটিয়ে যুগের যাত্রীতে চার বছর, মোহনবাগানে এক বছর, আবার যুগের যাত্রীতে দু’বছর, তারপর আবার শোভাবাজারে। টু ব্যাক সিস্টেমে খেলা শুরু করে, থ্রি ব্যাক পার করে ফোর ব্যাকে পৌছে গেছি। রাইট ইন থেকে পল্টুদা আমাকে স্টপারে আনেন।”
“কে পল্টুদা?” সাংবাদিক বল-পেন উচিয়ে প্রশ্ন করল।
“চিনবেন না আপনি। পল্টু, মুখার্জি, আমার গুরু। থারটি-ফাইভে উনি খেলা ছেড়েছেন। দুখিরাম বাবুর হাতে তৈরী, খেলতেনও এরিয়ানে। ওর আড্ডা ছিল এই শোভাবাজার টেণ্টে তাস খেলার। জুয়া, রেস, নেশাভাঙ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। কিন্তু তৈরী করেছেন অনেক ফুটবলার। ফুটবলের যতটুকু শিখেছি বা যতটুকু খ্যাতি পেয়েছি সবই ওর জন্য। গুরুর ঋণ আমি কোনদিনই শুধতে পারব না। বলতে গেলে, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আমাকে মানুষ করেছেন। কতদিন ওর বাড়িতেই খেয়েছি, থেকেছি। উনিই আমাকে ম্যাট্রিক পাশ করিয়েছেন।”
কমল গুহ হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে জামা খুলতে শুরু করল। সাংবাদিক অবাক হয়ে থাকার মধ্যেই চট করে নোটবইয়ে লিখে ফেলল, ‘গুরুবাদী’।
জামাটা গলা পর্যন্ত তুলে কমল গুহ পিছন ফিরে বলল, “দেখছেন ঘাড়ের নীচে শিরদাঁড়ার কাছে?”
একটা বহু পুরনো, প্রায় দু’ইঞ্চি দাগ দেখতে পেল সাংবাদিক। “হ্যাঁ, বুটের দাগ।”
“বুটের নয়, কাঁসার বগিথালা দিয়ে পিটিয়েছিলেন।”
“থালা দিয়ে!”
কথাটা কে বলল দেখার জন্য সাংবাদিক পিছন ফিরে তাকাতেই তার শরীর সিরসিরিয়ে উঠল। একটা বনমানুষ যেন জামা-প্যাণ্ট পরে দাঁড়িয়ে। নিকষ কালো রঙ, ভুরুর এক ইঞ্চি উপর থেকে শুরু মাথার চুল, চোখ দুটো কুতকুতে গর্তে ঢোকানো। নীচের ঠোঁট এত পুরু যে ঝুলে পড়েছে।
কমল গুহ সামনে ফিরে, দু’হাতে মাথার চুলগুলোকে দুধারে টেনে বলল, “এখানে আছে একটা। খড়ম পরতেন তারই প্রমাণ। রেখে দিয়েছেন।”
“এইভাবে মার খেয়েছেন, কই, কখনো তো বলেননি!” ছেলেটির মুখ দেখে বোঝা যায় না তার মনে ভয় শ্রদ্ধার উদয় হয়েছে! কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত মুখের জমি প্রায় সমান। যেন ভূমিষ্ঠ হবার সময়ই মুখে প্রচণ্ড থাবড়া খেয়েছে। কণ্ঠস্বর ওর মনের ভাব প্রকাশ করে।
“খেলা শেখার মাশুল; দস্তুরমত মার খেয়ে শিখেছি। থালাটা পিঠে পড়েছিল আমাকে সিনেমা হল থেকে বেরোতে দেখে, খড়মটা মাথায় পড়ে টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে।” বলতে বলতে কমল গুহর গলার স্বর ভারী হয়ে এল। চিকচিক করে উঠল চোখের শাদা অংশ। “গুরু হতে গেলে যা হতে হয়, তাই ছিলেন। এখন এভাবে খেলা শেখার কথা ভাবাই যায় না। শট মারতেও শিখল না, বলে— কত টাকা দেবেন? যদি বলো ট্রেনিংয়ে আসনি কেন, অমনি চোখ রাঙিয়ে বলবে, আমি কি ক্লাবের চাকর? ওই জন্য কিছু আর বলি না। পচা পচা, সব পচা। যে হতে চায় তাকে তাগিদ দিতে হয় না।”
কমল গুহ কথাগুলো বলল ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে। মুখ নামিয়ে ছেলেটি দাঁড়িয়ে।
“আজই ডাক্তারের কাছে যাবি। হাঁটু খুব বিশ্রী ব্যাপার, কোন-রকম গাফিলতি করবি না। বহু ভাল ফুটবলারকে শেষ করে দিয়েছে এই হাঁটু। ট্যাক্সিতে যা, টাকা আছে তো?”
ছেলেটি ঘাড় নাড়ল।
কমল গুহ সন্দিহান হয়ে বলল, “কই, টাকা দেখি?”
“ঠিক চলে যাবোখন।” ছেলেটি ব্যস্ত হয়ে বলল। কমল গুহ পকেট থেকে একটা পাঁচটাকার নোট বার করে এগিয়ে ধরল।
“না না, বাসেই চলে যেতে পারব।”
“যা বলছি তাই কর্।”
ছেলেটিই শুধু নয়, সাংবাদিকও সেই গম্ভীর আদেশ শুনে কুঁকড়ে গেল। নোটটা নিয়ে ছেলেটি কমল গুহকে প্রণাম করল। কমল গুহ আলতো হাত রাখল পিঠে, তারপর ও চলে গেল বাঁ পা টেনে টেনে।
“ছেলেটা সিরিয়াস। গুড মেটিরিয়াল। পড়াশুনা হয়নি, বুদ্ধি কম কিন্তু খাঁটি সোলজার। যা হুকুম হবে তাই পালন করবে। প্রাণ দিতে বললে দেবে। এমন পেয়ারও দরকার হয়। দেখি কতখানি তৈরী করা যায়।” কমল গুহর স্বর এই প্রথম কোমল শোনা গেল।
“আপনি কি ওর কোচ?” সাংবাদিক বল-পেন বাগিয়ে ধরল।
“কোচ? ওহ্, না, ক্লাবে এন-আই-এস থেকে পাস করা কোচ একজন আছে। তবে সলিলকে আমি নিজের হাতে গড়ছি। বস্তিতে থাকে, ন’টা ভাইবোন, যতটুকু পারি সাহায্য করি। বেঁচে থাকার লোভ তো সকলের মধ্যেই আছে, কিন্তু একটা সময় আসে যখন মানুষকে মরতেই হয়। তখন সে বেঁচে থাকে বংশধরের মধ্য দিয়ে। ফুটবলারকেও একসময় মাঠ ছাড়তে হয়। কিন্তু সে বাঁচতে পারে ফুটবলার তৈরী করে। সলিলই আমার বংশধর!”
“আপনার ছেলেমেয়ে ক’টি?”
কমল গুহর মুখের উপর দিয়ে ক্ষণেকের জন্য বেদনা ও হতাশার মেঘ ভেসে চলে গেল। “একটি মাত্র ছেলে। বয়স সতেরো, প্রি-ইউ পড়ে। আমার বিয়ে হয়েছিল খুবই অল্প বয়সে।”
“কোথায় খেলে এখন?”
“কোথাও না। জীবনে কোনদিন ফুটবলে পা দেয়নি। হি হেটস্ ফুটবল। এমনকি খেলা পর্যন্ত দেখে না। আমার খেলাও দেখেনি কখনো। ভাবতে খুব অবাকই লাগে, তাই নয়?”
“আপনার স্ত্রীর ইন্টারেস্ট নেই আপনার খেলা সম্পর্কে?”
কমল গুহ মাথা নাড়ল ক্লান্ত ভঙ্গিতে। “নেই নয়, ছিল না। দশ বছর আগে মারা গেছে, আমার খেলার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেনি একদিনও। অমিতাভ তার মা’র কাছ থেকেই ফুটবলকে ঘৃণা করতে শিখেছে। পলিটিক্সে কথা বলে, তাই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, গান গায়, কবিতা লেখার চেষ্টা করে কিন্তু ফুটবল সম্পর্কে একদিনও একটি কথা বলেনি।”
“স্ট্রেঞ্জ!” সাংবাদিক তারপর নোটবইয়ে লিখল, “স্যাড লাইফ’।
কমল গুহ আনমনা হয়ে স্থির চোখে বহুদূরে এসপ্ল্যানেডের একটা নিওন বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সাংবাদিক অপেক্ষা করতে লাগল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। যে-সব ফুটবলার খালি গায়ে শুয়ে-বসে ছিল, তারা স্নান সেরে ফিটফাট হয়ে এখন পাঁউরুটি আর মাংসের স্টু খাওয়ায় ব্যস্ত। তাঁবুর মধ্য থেকে ভেসে আসা টুকরো টুকরো কথা শোনা যাচ্ছে।
“কালিঘাটের খেলার রেজাল্ট কি হলো রে⋯”
“চলে না দাদা, চলে না, ওসব প্লেয়ার কলকাতা মাঠে সাতদিন খেলবে। বৃষ্টি নামুক, দেখবেন তখন কিরকম মাল ছড়াবে⋯”
“একশো টাকা হারবো যদি কখনো নিমু হেড করে গোল দেয়⋯”
“আমাদের নেক্সট ম্যাচ কার সঙ্গে রে⋯”
“তুই বলটা শ্ৰীধরকে না দিয়ে গোপালকে চিপ করলি কেন, এয়ারে নামিমের সঙ্গে কি ও পারে?”
“আপনার আর কি প্রশ্ন আছে?”
সাংবাদিক ইতস্তত করে বলল, “বহু প্রশ্ন ছিল।”
“যেমন?” কমল গুহ নিরুৎসুক স্বরে জানতে চাইল।
“আপনি ফিফটিসিক্স ওলিম্পিকে যাবেন বলেই সবাই ধরে নিয়েছিল কিন্তু যেতে পারেননি। কি তার কারণ? আপনি চারবার সন্তোষ ট্রফিতে খেলেছেন, রাশিয়ান টিমের সঙ্গে দুটো ম্যাচ খেলেছেন, ইণ্ডিয়ার সেরা স্টপার হিসেবে আপনার নাম ছিল অথচ কত আজে-বাজে প্লেয়ার এশিয়ান গেমসে বা মারডেকায় খেলতে গেল আর আপনি একবারও ইণ্ডিয়ার বাইরে যেতে পারেননি, কেন?”
“আর কি প্রশ্ন?”
কমল গুহর নিরুৎসুক স্বর একটুও বদলায়নি। সাংবাদিক তাইতে গম্ভীর হয়ে ওঠা উচিত মনে করল। “কলকাতার মাঠে আপনাদের মত ফুটবলার আর পাওয়া যাচ্ছে না, তার কারণ কি? নব্বুই মিনিটের ফুটবল আমাদের পক্ষে খেলা সম্ভব কিনা? ফুটবল সিজন শীতকালে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলে খেলা আরো ভাল হবে কিনা⋯।”
সাংবাদিক থেমে গেল। তাঁবুর মধ্যে ফোন বাজছিল। একজন চীৎকার করে ডাকল, “কমলদা, আপনার ফোন।”
কমল গুহ চেঁচিয়ে তাকে বলল, “আসছি, এক মিনিট ধরতে বল্।”
তারপর দ্রুত সাংবাদিককে বলল, “আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে অনেকক্ষণ সময় লাগবে, আপনি বরং আর একদিন আসুন।”
“যদি আপনার বাড়িতে যাই?”
তাঁবুর দিকে যেতে যেতে কমল গুহ বলল, “তাও পারেন। ছুটির দিনে আসবেন। সকালে।”
সাংবাদিক তার নোটবইটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কিছু একটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করল এবং গভীর বিরক্তিতে ভ্রূ কুঞ্চিত অবস্থায় শোভাবাজার স্পোর্টিংয়ের বেড়ার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে একবার পিছু ফিরে তাকাল। তাঁবুর একটা জানালার মধ্যে দিয়ে কমল গুহকে দেখা যাচ্ছে, ঘাড় নিচু করে ফোনে কথা বলছে।
“অরু! অরুণা? কি ব্যাপার, হঠাৎ যে…অ্যাঁ! পল্টুদা পড়ে গেছেন? ব্লাডপ্রেশার আবার⋯ডাক্তার কি বলেন!⋯দেখানো হয়নি! হ্যাঁ হ্যাঁ যাচ্ছি, এখুনি রওনা হচ্ছি। টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে, তুমি ডাক্তার আনো।” ফোন রেখে কমল ঘরের একমাত্র লোক শোভাবাজারের সহ-সম্পাদক অবনী মণ্ডলকে বলল, “কিছু টাকা এখুনি চাই, শ’খানেক অন্তত।”
“এ্যাক—শো! এখন কোথায় পাব?”
“যেখান থেকে হোক, যেভাবে হোক এখুনি।”
“চাই বললেই এখন কোথায় পাই, শোভাবাজারের ক্যাশে কত টাকা তা তো আপনাকে বলার দরকার নেই।”
কমল একটা অসহায় রাগে আচ্ছন্ন হয়ে কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। অবনী যা বলল তা সত্যি। কিন্তু এখনি টাকাও চাই। এই তাঁবুতে যারা গল্প করছে বা তাস খেলছে তারা কেউ একশো টাকা পকেটে নিয়ে ঘোরে না।
“পল্টুদার স্ট্রোক হয়েছে, এই নিয়ে তিনবার। ওর বড় মেয়েই ফোন করেছে। কিন্তু কি করে এই মুহূর্তে টাকা পাওয়া যায় বলুন তো? বাড়িতে আছে কিন্তু এখন বাগবাজারে গিয়ে আবার নাক-তলায় যেতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।”
“তাইতো, গড়ের মাঠে এই সময় একশো টাকা—” অবনী মণ্ডলের চিন্তিত গলা থেমে গেল। কমল ফোনটা তুলে দ্রুত ডায়াল করছে।
“রথীন মজুমদার আছে? আমি কমল, কমল গুহ শোভাবাজার টেন্ট থেকে বলছি। খুব দরকার⋯হ্যাঁ ধরছি।”
মিনিট দুয়েক অধৈর্য প্রতীক্ষার পর ওদিক থেকে সাড়া পেয়ে কমল বলল, “কমল বলছি।” সংক্ষেপে একশো টাকা চাওয়ার কারণটা জানিয়ে বলল, “যদি পারিস তো দে, চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব তোর কাছে। অনেক তো করেছিস আমার জন্যে, এটাও কর। গুরুদক্ষিণা তো জীবনে দেওয়া হলো না, চিকিৎসাটুকুও যদি করতে পারি। কালই অফিসে নিশ্চয়ই টাকাটা দিয়ে দেবো।”
ওধার থেকে জবাব শোনার অন্য অপেক্ষা করে কমল বলল, “যুগের যাত্রী টেণ্টে? এখুনি? হ্যাঁ হ্যাঁ, দশ মিনিটেই পৌঁচচ্ছি।”
কমল রিসিভারটা ছুঁড়েই ক্রেডলের উপর ফেলল। তাঁবু থেকে দ্রুত বেরিয়ে বেড়ার দরজা পার হয়ে ময়দানের অন্ধকারে ঢোকার পর সে প্রায় ছুটতে শুরু করল যুগের যাত্রীর তাঁবুর দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন