ভূতনাথের বাড়ি

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

'আচ্ছা মশাই, এদিকটাতেই কি ভূতনাথবাবুর বাড়ি?'

'না না, এ পাড়ায় ভূতনাথ বলে কেউ থাকে না৷'

'কী আশ্চর্য! কিন্তু আমার কাছে যে ঠিকানাটা দেওয়া আছে তাতে স্পষ্ট লেখা অশ্বিনী মিত্র রোড, হাকিমপাড়া, তা এটা কি হাকিমপাড়া নয়?'

'তা হবে না কেন? এটা হাকিমপাড়া হতে বাধাটা কীসের? আটকাচ্ছে কে?'

'তাহলে অশ্বিনী মিত্র রোডটা?'

'এটা অশ্বিনী মিত্র রোডও বটে৷'

'কিন্তু তাহলে ভূতনাথবাবুর বাড়িও তো এখানেই হওয়া উচিত৷'

'না মশাই, কক্ষনো এখানে ভূতনাথবাবুর বাড়ি হওয়া উচিত নয়৷'

'বলছেন! কিন্তু তা হয় কী করে? ভূতনাথবাবু নিজেই এই ঠিকানা দিলেন যে!'

'আর আপনিও অমনি ফস করে বিশ্বাস করে ফেললেন তো?'

'যে আজ্ঞে৷ ভূতনাথবাবুকে বিশ্বাস করা কি উচিত হয়নি মশাই?'

'বিশ্বাস করা না করা আপনার দায়৷ আমার তো নয়৷ তবে একথাও বলতে ইচ্ছে করে, কেউটে সাপ বা সোঁদরবনের বাঘকেও কি বিশ্বাস করা উচিত?'

'আজ্ঞে না৷ তাদের কথা আলাদা৷ বন্যপ্রাণী আর মানুষে তফাত আছে৷'

'তফাতটা কী? তফাতটা কোথায়? ভূতনাথ বিশ্বাসকে যদি বিশ্বাস করা যায় তাহলে কেউটে সাপ বা সোঁদরবনের বাঘের দোষ কী বলুন!'

'আপনি বলতে চান ভূতনাথ বিশ্বাস সাপ বা বাঘের মতোই বিশ্বাসের অযোগ্য৷'

'অতটা বলতে চাই না৷ তা ছাড়া আমি তো বলেই দিয়েছি, ভূতনাথ বিশ্বাস নামে কেউ এ পাড়ায় থাকে না৷'

'তবে তিনি থাকেন কোথায়? সম্প্রতি কি বাসা বদল করেছেন?'

'করাই উচিত৷ বাসা বদলালে বহু মানুষের উপকারই হত৷ তবে ওসব আমি বলতে চাইছি না৷ তা আপনি আসছেন কোথা থেকে?'

'আমি আসছি নিশিগঞ্জ থানা থেকে৷'

'অ্যাঁ! বলেন কী? থানা থেকে? আরে, তা আগে বলতে হয়৷ তা সার্চ ওয়ারেন্ট এনেছেন তো!'

'তা আর আনিনি! সার্চ ওয়ারেন্ট আছে, অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে, আদালতের সমন আছে৷ আমার কাছে সবকিছু পাবেন৷'

'বাঃ, বাঃ! এ তো খুব ভালো কথা মশাই! তা আসুন না, এই গরিবের বাড়িতে একটু পায়ের ধুলো দেবেন৷ কাছেই আমার বাড়ি৷ ওই যে সামনের লাল বাড়িটা!'

'তা মন্দ কী? পথ তো আর কম নয়৷ দুপুরের এই রোদে এতটা পথ আসতে বড়ো হাঁপসে পড়েছি মশাই৷'

'আহা, আমারই দোষ৷ মান্যগণ্য লোক আপনি, এভাবে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখাটা আমার ঠিক হয়নি৷ আসুন আসুন৷'

'বাঃ, আপনার বাড়িটি তো বেশ৷'

'সবাই তা বলে বটে৷ তবে এ আর এমন কী বলুন৷ হারু ঘোষের বাড়ি আরও পেল্লায়৷'

'তা আপনার বাড়িই বা কম কীসে? ক-বিঘে জমি নিয়ে বাগানখানা করেছেন বলুন তো!'

'না না, জমি কোথায়! বাড়িখানাই তো অর্ধেক জমি গিলে খেল৷ এখন মোটে বিঘে দশেক পড়ে আছে৷'

'বাপ রে! দশ বিঘে জমি কি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতো জিনিস! তা মার্বেল বসিয়েছেন বুঝি মেঝেতে?'

'মার্বেলই বটে৷ তবে এক নম্বর সরেস জিনিসটা তো আর পেলাম না৷ তাই বাধ্য হয়ে ইটালিয়ান মার্বেলই বসাতে হল৷'

'ইটালিয়ান মার্বেল! সে তো অনেক দাম মশাই৷ তার চেয়ে সরেস মার্বেল পাবেন কোথায়?'

'লোকে তাই বলে বটে৷ তবে এই অখাদ্য জায়গায় ভালো জিনিসের সমঝদারই বা কোথায় বলুন৷ বসুন তো, এই সোফায় বসুন৷ আমি বরং ঠান্ডা মেশিনটা চালিয়ে দিই৷ আপনার তো বেশ ঘাম হচ্ছে দেখছি৷'

'ঠান্ডা মেশিনও লাগিয়েছেন? বাঃ, আপনার নজর তো খুব উঁচু৷'

'কী যে বলেন! ওসব আজকাল হ্যাতাপ্যাতাদের ঘরেও থাকে৷ তা এই গরমে কি একটু লেবুর শরবত খাবেন?'

'না না, এসব ঝামেলা করতে হবে না৷ অন ডিউটি আমাদের এসব খেতে-টেতে নেই৷'

'আহা ডিউটি করতে করতেই খাবেন৷ এক গেলাস শরবত বই তো নয়৷ দাঁড়ান, ভিতরে বলে আসছি৷ . . . হ্যাঁ, তারপর বলুন তো, ভূতনাথের কেসটা কী?'

'খুব খারাপ কেস মশাই, খুব খারাপ কেস৷'

'কত ধারায় মামলাটা ঠুকছেন?'

'ধারা-টারা উকিলের ব্যাপার, তারা বুঝবে৷ আমরা চার্জশিট দাখিল করব, তারপর কেস কোর্টে যাবে৷'

'বাঃ বাঃ, এ তো খুব ভালো খবর মশাই৷ মা কালীকে জোড়া পাঁঠা মানত করা ছিল৷'

'আচ্ছা, জোড়া পাঁঠা কেন মানত করেছিলেন বলুন তো!'

'অতি দুঃখেই মানত করতে হয়েছিল মশাই৷'

'কিন্তু দুঃখটা কীসের?'

'সে আর বলবেন না৷ দুঃখ কি একটা? ভূতনাথের জ্বালায় এ পাড়ার সবাই অতিষ্ঠ৷ ধরুন কেউ হয়তো শীতলা পুজোয় একটু মাইক-টাইক লাগিয়েছে৷ তা পুজো টুজোয় ও তো লোকে লাগিয়েই থাকে৷ ভূতনাথ তার দলবল নিয়ে এসে সব চোঙা-টোঙা খুলে নিয়ে যায়৷ তারপর ধরুন কেউ হয়তো রাস্তার ধারে একটু তরকারির খোসা বা মাছের আঁশ ফেলেছে, অমনি ভূতনাথ এসে কী হম্বিতম্বি! তারপর অধরবাবুর খিটখিটে বুড়ো বাপটা সারাদিন খাই খাই করে পেট নামিয়ে ফেলে, তাই অধরবাবুর বউ শ্বশুরকে বলেছিল, অত খাওয়া কি ভালো? হয়তো একটু ঝাঁঝের গলাতেই বলেছিল, তাইতে ভূতনাথ এসে চড়াও হয়ে মানবাধিকার কমিশনের ভয় আর সামাজিক বয়কটের জুজু দেখিয়ে কী অত্যাচারটাই না করে গেল৷ ওই যে নবকুমার, তার দোষ হয়েছিল, বাগানের পাঁচিলটা তোলার সময় মাপজোকের ভুলে রাস্তার খানিকটা সীমানায় ঢুকে যায়৷ ভূতনাথ সেই দেয়াল ভাঙিয়ে তবে ছাড়ল৷'

'এ তো ভূতনাথের খুব অন্যায়!'

'অন্যায় নয়? আমাকেই কি কম জ্বালাতন হতে হচ্ছে মশাই? শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে কোনোমতে বাড়িটা খাড়া করেছি, ভূতনাথ এসে রোজ দলিল দেখতে চায়, ভয় দেখায়৷ আমি নাকি সরলাবালা নামে এক বিধবার জমি চালাকি করে লিখিয়ে নিয়েছি৷'

'লিখিয়ে নেননি তো!'

'তা লিখিয়ে নেব না কেন? নিয়েছি বই কী৷ কিন্তু তার জন্য তিন কিস্তিতে ন্যায্য দামও সরলাবালাকে মিটিয়ে দিয়েছি৷ রসিদও আমার কাছে আছে৷ কিন্তু কলিকাল তো, ভালো মানুষদের বড়ো দুর্দিন৷ ভূতনাথ আমার বিরুদ্ধে লোককে খেপিয়ে তুলছে৷'

'না, না এসব তো ভালো কথা নয়!'

'আপনারা পাঁচজন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এসে দেখুন কত বড়ো অবিচার এবং অনাচার চলছে এখানে৷ ওই যে, মিষ্টিটুকু মুখে দিয়ে ঠান্ডা ঘোলটা এক চুমুকে মেরে দিন তো, শরীর ঠান্ডা হবে৷'

'ও বাবা৷ এত আয়োজন! না মশাই, আমার পক্ষে দশ-বারোটা মিষ্টি খাওয়া সম্ভব নয়৷ আমি পেটরোগা মানুষ৷'

'আহা, আপনি তো ইয়ংম্যান৷ কতটা হেঁটে আসতে হয়েছে৷ লজ্জা করবেন না, খেয়ে নিন৷'

'তাহলে ভূতনাথবাবুর জন্যই আপনারা শান্তিতে নেই?'

'না মশাই, সে বিদেয় হলে বাঁচি৷ তা তার বিরুদ্ধে কীসের মামলা বলুন তো! খুন-জখম-রাহাজানি, নাকি চারশো বিশ ধারা, নাকি ট্যাক্স ফাঁকি?'

'কেসটা আমি খুব ভালো জানি না৷ তবে তার নামে সরকারি চিঠি আছে৷'

'সেই চিঠিতে কী আছে মশাই? যাবজ্জীবন হলে খুব ভালো হয়, ফাঁসি হলে তো চমৎকার, নিদেন আট-দশ বছরের কয়েদ তো বোধ হয় হচ্ছেই৷ কী বলেন?'

'তাও হতে পারে৷ সবই সম্ভব৷ আচ্ছা, আপনার কি একটা দশ লাখ টাকার ব্যাঙ্ক লোন আছে?'

'অ্যাঁ! ব্যাঙ্ক লোন! দাঁড়ান, মনে করে দেখি! আচ্ছা আচ্ছা মনে পড়ছে, একটা লোন যেন ছিল! তা তো এতদিনে শোধ হয়ে যাওয়ার কথা! গেছেই বোধ হয়৷ তা এ-খবর কে দিল আপনাকে? ভূতনাথ নাকি?'

'জয়কৃষ্ণ সরখেল তাঁর বাড়িঘর আপনার কাছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় বাঁধা রেখেছিলেন৷ তিনি মারা যাওয়ার পর কি আপনি পঞ্চাশ লাখ টাকার দাবিতে তাঁর নাবালক পুত্র-কন্যাকে বের করে দিয়ে জমি-বাড়ি দখল করেছেন?'

'এই দেখো কাণ্ড! তাই বলেছে বুঝি ভূতনাথ? একদম বিশ্বাস করবেন না মশাই, আমার বড্ড নরম মন৷ পাঁচ হাজার নয়, অনেক বেশিই নিয়েছিল জয়কৃষ্ণ৷ কাগজপত্র সব পরিষ্কার৷'

'না, আপনি যে ভালো লোক তা যেন বুঝতে পারছি৷ তবে কিনা সেটা প্রমাণ করা বেশ শক্ত হবে৷ কলিকাল তো৷ এই কলিকালে ভালোমানুষদের যে কষ্ট পেতেই হয়৷ চলুন মশাই কষ্ট করে একটু থানায় চলুন৷ বড়োবাবু আপনার জন্য বসে আছেন৷'

'সে কী? আর ভূতনাথ?'

'তাকে তো সরকার কী খেতাব-টেতাব দেবে বলে শুনছি৷ সেই চিঠিও আমার সঙ্গেই আছে৷'

অধ্যায় ১ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%