বন্ধুত্বের জলাঞ্জলি!

শিবরাম চক্রবর্তী

বঙ্কু আমার বন্ধুই ছিল— সেদিন পর্যন্ত। তার বন্ধুত্ব এবং তাকে যে একসঙ্গে আমায় জলাঞ্জলি দিতে হবে একথা কোনোদিন ভাবিনি। বঙ্কুও ভাবেনি বোধ হয়। কিন্তু এই পৃথিবীতে অভাবিত কত কী-ই তো ঘটে থাকে, বন্ধুর স্থলে বঙ্কুর অভাব হয়তো সেইরকমই একটা অভাবনীয় দুর্ঘটনা।

কে— কী— কেন— কবে— কোথায়?— এই জাতীয় একখানা বই কদিন ধরে তার বগলে বগলে দেখছিলাম, তখন কি আর জানি যে ও তার সর্বাধুনিক সংস্করণ হবার সাধনায় আছে। কিন্তু অচিরেই জানতে হল, এবং সেই জ্ঞানলাভের সাথে সাথে আরও এই জানতে পারলাম, ধরাধামে যেসব লোক জলাঞ্জলি যাবার জন্যেই জন্মেছে বঙ্কু তাদের অন্যতম। আর তৎক্ষণাৎ তাকে জলে ফেলে দিতে দ্বিধা করলাম না।

জ্ঞানযোগের সঙ্গে সঙ্গেই কর্মযোগ— এমন যোগাযোগ আমার জীবনে প্রায়শই ঘটে না, কার জীবনেই বা ঘটে? কিন্তু বঙ্কু-যোগে সমস্তটাই যেন বিদ্যুদ্বেগে ঘটে গেল। বঙ্কু সেদিন কার্জন পার্কে পেয়েছিল আমায়। দেখামাত্রই তার প্রথম কথা 'আচ্ছা, ওই মনুমেন্টটা যদি ভেঙে পড়ে— লম্বালম্বি হয়ে পড়ে যদি— তাহলে লাটসাহেবের বাড়ি পর্যন্ত তা পড়বে কি না, বলতে পারো?'

'কি জানি! ওর শেষ ইটখানা হয়তো হাইকোর্টে গিয়েই পৌঁছুতে পারে।' মানসাঙ্ক কষে আমি জানাই— 'কোথায় ওর চূড়ান্ত হবে বলা যায় না তো।'

'তোমার ভুল।' বঙ্কু আমায় বলল, 'কার্জন পার্কের কিনারা অবধি আসবে কি না সন্দেহ। এমনকী, আমার তো মনে হয়, উঁচুতে যতই হোক, পড়তে গেলে নিজের চারপাশেই ওর ছড়িয়ে পড়তে হবে, নিজের পঞ্চাশ হাতের মধ্যেই স্তূপাকার হয়ে থাকতে হবে ওকে।... মাধ্যাকর্ষণ নেই?'

'আচ্ছা বলো দেখি,' বঙ্কু আরম্ভ করল আবার— 'মনুমেন্টের মাথা থেকে কেউ যদি এখন তির ছোড়ে, সে তির কদ্দূর যেতে পারে বলে তোমার ধারণা?'

'গঙ্গার তীর পর্যন্ত?' আমি প্রশ্নের সুরেই উত্তরটা দি।

'পাগল! গঙ্গা পশ্চিম দিকে না? পশ্চিম দিক থেকেই বাতাস বইছে না এখন? গঙ্গার দিকে তির ছুড়লেও সে তির হাওয়ার জোরে ঘুরে গিয়ে হোয়াইটওয়ে লেডল-এর ছাতে এসে আটকে যাবে। বুঝেচ?'

তারপর সে আমাকে বলল কলকাতায় এমন কোনো রাস্তা নেই যার কোনো-না-কোনো জায়গা থেকে একটা-না-একটা গাছ চোখে না-পড়ে। আবার আমি মাথা ঘামাই, আমার মনে মনেই। যতগুলো রাস্তা আমার ধারণায় ছিল আর আমার মনে পড়ল, একে একে মন দিয়ে দেখবার চেষ্টা করি— কিন্তু বঙ্কুর কথাই ঠিক; যেমন যেমন সেই রাস্তাগুলো আমার মানসপটে উদিত হতে থাকে, তার কোথাও-না-কোথাও একটা-না-একটা গাছ আমার মনশ্চক্ষে পড়ে যায়।

'বিদ্যাসাগর কলেজের কাছে কটা রেস্তরাঁ— জানা আছে?' সে জিজ্ঞেস করল আমাকে।

আমি বললাম, 'তিনটে।'

সে বললে, 'উঁহু, দুটো। তৃতীয় যেটাকে তুমি আন্দাজ করছ, সেটা কলেজের কাছে নয়, একটু দূরে, ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে ওধারে। আর আজকাল যেরকম মিলিটারি লরির হুড়ো, ট্রাম রাস্তা পেরুতে গিয়ে ওটা যে তুমি পাবে তার ঠিক কি? রেস্তরাঁ-প্রাপ্তির পূর্বেই তোমার মিলিটারি যোগ ঘটতে পারে।'

সে জিজ্ঞেস করল, 'হাওড়া স্টেশনে কটা প্ল্যাটফর্ম শুনি?'

আমি বললাম, 'সতেরোটা।' আন্দাজেই বললাম অবশ্যি। এবং আবার ভুল হল। এবং সেই দণ্ডেই ওকে জলাঞ্জলি দেবার বাসনা আমার হৃদয়ে বলবৎ হল।

'আচ্ছা, এ আর পি-রা পুলিশের মতো বেলট লাগায় কিনা তোমার জানা আছে?' জিজ্ঞেস করল সে।

আমার উত্তর ভুল হল আবার যেমন হয়ে থাকে।

'আচ্ছা, পুলিশরা কোথায় বেলট লাগায়?'

'স্বদেশিওলাদের পিঠে?'

'তোমার মাথা! নিজেদের কোমরে। কেন, কখনো চোখেও দ্যাখোনি?'

সত্যি বলতে, কক্ষনো না। পুলিশ দেখলেই আমি পালিয়ে যাই। কবে যেন একবার কোন হুজুগে বন্দে মাতরম বলে চ্যাঁচাতে গিয়ে পুলিশের ওই বেলট নিজের পিঠের ওপর দেখেছিলাম— তারপর থেকে পুলিশ এবং বেলট পরস্পর কীভাবে সম্বন্ধ তা দেখবার জন্যে মুহূর্তমাত্র দাঁড়াইনি।

'আচ্ছা, বাসের কন্ডাকটাররা কোন ধারে তাদের ব্যাগ ঝোলায়— বলতে পারো?'

আবার আমার ভুল হল। হবার কথাই। ভালো ভালো পিকপকেটরাই এর নিখুঁত উত্তর দিতে পারবে— যারা ওই ঝোলা বাগাবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনে মনে পোষণ করছে। বাসে উঠলে, যাত্রী ভরতির ফাঁকে কোথায় একটা খালি সিট এবং কোন সিটটা খালি মেয়েদের নয়— সেইদিকেই আমি নজর দিই, কন্ডাকটারের ঝোলানো ব্যাগের কথা আমার মনেই থাকে না।

'বলো দেখি, এটা পারো কিনা? ধর্মতলা-চৌরঙ্গীর মোড় থেকে পার্ক স্ট্রিট কাছে, না, ধর্মতলা-মৌলালির মোড় থেকে পার্ক স্ট্রিট কাছে?'

বলা বাহুল্য, এবারও আমি সদুত্তর দিতে পারলাম না।

'আচ্ছা, এই কার্জন পার্ক থেকে কোন পথে সব চেয়ে চট করে লেকে পৌঁছানো যায়? লেকে তো তোমার যাতায়াত আছে, এটা তুমি বলতে পারবে নিশ্চয়?' বঙ্কু আমায় ওসকাল।

অনেক ভেবেচিন্তে একটা পথ আমি বার করলাম। ওর চেয়ে শর্টকাট আর হতে পারে না। বঙ্কু কিন্তু হাসতে লাগল হি হি করে— 'এই তোমার সোজা পথ? হা হা হা।'

'এর চেয়ে সোজা পথ আছে নাকি?' এবার আমি চটে যাই।

' তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হলে সবচেয়ে সোজা পথ হচ্ছে ট্যাক্সি।' বঙ্কু আবার ফ্যা ফ্যা করে হাসতে শুরু করে।

আমার অসহ্য হয়ে উঠল। আমি বললাম, 'এবার আমার পালা। আমি জিজ্ঞেস করব তোমায়।'

'স্বচ্ছন্দে। তোমার যা খুশি। কলকাতা কেন— এই পৃথিবীর যেখান থেকে খুশি! বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও কোনো কিছু আমার অজানা নেই।'

এই বলে বঙ্কু আবার বিমল-হাসি হাসতে থাকে।

'আচ্ছা, লেকের সেই পুলের ওপর থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখা যায় কি যায় না?'

'যায় না।' বলল বঙ্কু।

আমি বললাম, 'যায়।'

'কক্ষনো না!' বলল বঙ্কু। 'কী করে দেখা যাবে?'

আমি বললাম, 'লেক তো খুব দূরে নয়। ট্যাক্সিও রয়েছে— সোজা পথ সামনেই। গিয়ে দেখলেই হয়, দেখা যায় কিনা।'

বঙ্কু বলল, 'বেশ, তাই হোক, দেখবার ভার এবং ভাড়া তোমার।'

ট্যাক্সিতে যাবার সময়ে বঙ্কু আবার তার বিদ্যার বহর বিস্তার করতে লাগল। ট্যাক্সির নম্বর আর ড্রাইভারের লাইসেন্স নম্বর এক কিনা জিজ্ঞাসা করল আমাকে। আমি বললাম, 'এক।' ও বলল, 'না।' ও আরও বলল, 'বলো তো আমি ড্রাইভারের কাছ থেকে যাচাই করে জানিয়ে দিচ্ছি এখনই।' আমি কিছু বললাম না। যাচাই করে আর কী হবে? আমার যা বলবার, যা আমি চাই, লেকের সেই পুলের ওপরেই বলা যাবে। দূর তো নয়। দেরি কী?

অবশেষে আমরা লেকের কাছে পৌঁছলাম। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালাম গিয়ে পুলের ওপর। বঙ্কুকে ধার ঘেঁষে দাঁড় করিয়েছি— ঠিক মাঝখানে। এক ধাক্কায় জলে ফেলে দেবার পক্ষে এমন আদর্শস্থল বোধ হয় আর নেই। হতভাগা কিন্তু হাসছে তখনও।

'দেখাও তো আমাকে, এখান থেকে কোথায় তোমার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখা যায়!' বলে আবার হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগল।

'এই যে দেখাচ্ছি।' বলে এক ধাক্কায় বলতে-না-বলতে বঙ্কুকে লেকের গর্ভে বিসর্জন দিয়েছি।

দুঃখের বিষয়, পড়বার সময় আমাকে টেনে নিয়ে ও জলে পড়ল। আরও দুঃখের কথা, ওকেই আবার আমায় টেনে তুলতে হল। ও-ই আমাকে জল থেকে— সলিল-সমাধি থেকে উদ্ধার করল। যেমন অনেক কিছুই আমি জানিনে, তেমনি বলব কী, সাঁতারও আমার জানা ছিল না।

এর পর আর বঙ্কুর সঙ্গে কী করে বন্ধুত্ব রাখা যায়? তোমরাই বলো?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%