গ্যাস মিত্রের গ্যাস দেওয়া!

শিবরাম চক্রবর্তী

খুব ভোরে ওঠার উপকারিতা আছে, হাইজিনের বইয়ে পড়েছিলাম। সেই থেকে আমার ভোরে ওঠার বদভ্যাস।

তখন বাড়ির সবাই ঘুমন্ত। কাক চিল পর্যন্ত নিঃসাড়। একবার বাথরুমে যাই, একবার বারান্দায় দাঁড়াই। শুকতারার সঙ্গে মুখোমুখি হয়। বাড়ির কেউ আমার আগে ভোরে আর উঠতে পারে না।

হ্যাঁ, খুব ভোরে আমি উঠি। উঠেই একটু ঘুমিয়ে নিই আবার।

তারপর, প্রাত নিদ্রাটা সেরে উঠতে আটটা বেজে যায়। বাজবেই তো, না ওঠা খুব সহজসাধ্য নয়। প্রথমে তো ময়লা ফেলা গাড়িগুলোর ঘড়রঘড়র তারপর রামাবতার সিং-এর রামভজন, তারপরেই বাড়ির কাচ্চাবাচ্চাদের চ্যাঁ-ভ্যাঁ, পাড়ার যত উজবুক ছোঁড়াদের চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে রিডিং পড়া— এই সব শুরু হয়ে যায়, এর মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে আরামে একটা গড়াগড়ি দেব তার জো কি!

সটান চলে এলাম মেজোমামার বাড়ি। সেইজন্যেই।

কিন্তু এখানে এসে আরেক উৎপাত! 'না, ভোরে ওঠার অভ্যাস ঠিকই বজায় আছে আমার, কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করেনি। তবে—

মামার বাড়ি কয়লা-উনুনের কারবার। আর, খুব ভোরেই উনুনে আঁচ দেওয়া তাদের এক ব্যায়রাম। রান্নাঘর আবার একতলায়। কাজেই আগুন দেবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই, একতলা, দোতলা, তেতলা ভেদ করে বাড়ির চিলেকোঠা পর্যন্ত ধোঁয়ায় ছাপিয়ে ওঠে। চারধার ধোঁয়ায় ধোঁয়াক্কার হয়ে যায়।

কোনো ঘর বাকি থাকে না। দরজা ভালো করে ভেজিয়ে, হুড়কো লাগিয়ে, কিছুতেই নিস্তার নেই। ধোঁয়া কোনো ফাঁকে ঢুকবেই। আর সে কী ধোঁয়া রে! চোখে কানে দেখতে দেয় না, দম বন্ধ হবার জোগাড়। বাপস!

সকাল-সন্ধ্যায় রোজ এই উপদ্রব! সন্ধ্যায় ধোঁয়া খাওয়ার চেয়ে হাওয়া খাওয়াটাই আমি বেশি পছন্দ করতাম, কাজেই বাইরে বেরিয়ে পড়তে কোনদিন দ্বিধা করিনি। কিন্তু সকাল বেলার দিকটায়—!

বিছানা আঁকড়ে ক-দিন তো থাকলাম খুব। কিন্তু নাঃ, আর পারা যায় না, পরাজয় স্বীকার করতেই হল। তারপর থেকে, ভোরে ওঠার পরই, ধুম্রলোচনের প্রাদুর্ভাব হতে-না-হতেই, তীরবেগে প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। পাশবালিশের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করেই!

দিনকতক মুখ বুজে প্রাতভ্রমণই করলাম। কিন্তু কাঁহাতক আর পারা যায়? হলই বা ভোরের হাওয়া! একদিন মেজোমামাকে মুখ ফুটে বলেই ফেলি— 'জানেন, কয়লার উনুন ভারি অস্বাস্থ্যকর? সেদিন এক বইয়ে পড়ছিলাম—'

'কেন? হজম হয় না বুঝি?'

'না, হজম নয়, ভারি ধোঁয়া হয় কিনা!'

'আমি তো জানতাম হাওয়া হয় কারু কারু পেটে। পেট থেকে আবার ধোঁয়া বেরয়, শুনিনি তো!'

মেজোমামা অবাক হয়ে যান—

'কোন বইয়ে লিখছে এ-কথা?'

'কোন বই?' আমি আমতা আমতা করি— 'বইটা হচ্ছে হাইজিন! আমাদের ইস্কুলের বই।'

'বইয়ে লিখেছে এমন কথা! আশ্চর্য!'

'পেটে ধোঁয়ার কথা লেখেনি কিছু। পেটে কখনো কখনো আগুন জ্বললেও ধোঁয়া বেরোয় না বলেই আমার ধারণা। কয়লার উনুনের ধোঁয়ার কথাই হচ্ছিল।'

'আমি তো জানতাম কাঠের উনুনেই ধোঁয়া হয়ে থাকে।' মামা বললেন।

'কাঠের উনুনে হয় হরদম ধোঁয়া আর কয়লার উনুনে বেদম ধোঁয়া। অবশ্যি প্রথম দিকটাতে কেবল। বইয়ের দরকার কী, চোখেই দেখতে পাওয়া যায়।'

এতগুলো কথা এক নিশ্বাসে বলে যাই। মেজোমামা একটু কাবু হন যেন।

'কেন দেখতে পান না?' আমি বলেই চলি। 'কড়িকাঠগুলোর পর্যন্ত কী অবস্থা হয়েছে। দেয়ালের চেহারার দিকে তো আর তাকানো যায় না। কালিঝুলিতে একাকার। বাড়িঘরগুলোর তো হাড় কালি হয়ে গেল। দেরাজ টেবিল আয়না আলমারির হাল দেখলে কান্না পায়। আর কাপড়চোপড়গুলো তো দু-দিন না যেতে যেতেই কালি মেরে যাচ্ছে। কোনো দিকেই চোখ ফেরানোর উপায় নেই— এসব কেন, কীজন্য?'

'ওই কয়লার উনুন!' মেজোমামাই ঘাড় নেড়ে কথাটাকে সমাপ্ত করেন।

'এসব তো বাইরের দশা— কিন্তু ভেতরের? ভেতরের কথাটা কি ভেবেচেন একবার?'

'না, ভাবিনি তো।' মামার জিজ্ঞাসা 'কীসের ভেতরের?'

'আমাদের ভেতরের। আমাদের নিজেদের ভেতরের। বাইরের দেয়ালে যেমন ঝুলকালি দেখছেন, তেমনি হার্টের লাংসের ভেতরেও অমনি কালিঝুলি পড়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ার অত্যাচারে। এই কথাই হাইজিনে লিখেছে।'

এইবার মেজোমামা সত্যিসত্যিই ভারি কাহিল হয়ে পড়েন— 'অ্যাঁ? বলিস কি? এই সব কথা লিখছে হাইজিনে? তা লিখবেই বা না কেন? এতো কিছু আশ্চর্যের কথা নয়। বাইরেও যেমন ভেতরেও তেমনি— কালিঝুল পড়তে বাধ্য।'

ঘাড় হেঁট করে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবেন। 'যাক, একটা উপায় হয়েছে। এর প্রতিকার বের করা গেছে।'

আমি মাতুলের দিকে তাকাই।

'কাল সকালেই মিস্ত্রি ডাকিয়ে বাড়িঘরে চুনকামের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তাহলেই আর কালিঝুল থাকবে না। সব পরিষ্কার।'

'সে তো বাইরের করলেন, কিন্তু ভেতরের?'

'ভেতরের?' মেজোমামা আবার ভাবিত হয়ে পড়েন, 'ভেতরের কী করা যাবে বল তো? ভেতরে তো চুনকাম করা যায় না। তাহলে? তুই কি বলিস তবে চুনের জল খেতে? না, সেই লাইমজুস যেটা তোর মামি চুলে দ্যায়?'

'আমি কি তাই বলেছি?'

'আহা, তুই কেন বলবি? তোর হাইজিন কী বলে?' মেজোমামা উৎসুক ভাবে আমার উপদেশের প্রতীক্ষা করেন।

'লাইমজুস খাবার, অত কাণ্ড করবার কী দরকার মামা, তার চেয়ে এক কাজ করলেই তো হয়। আমাদের বাড়ির মতো গ্যাসের ব্যবস্থা করলেই তো পারেন?'

'গ্যাস?' মেজোমামার চোখ জ্বলে ওঠে 'ঠিক বলেছিস! আঃ, এতদিন মাথাতেই আসেনি এই কথাটা! তাই তো! তাই তো! তাই করলেই তো সব হাঙ্গামা চুকে যায়! ঠিক বলেছিস। মানে, তুই না, তুই আর কী বলবি— তোর হাইজিনের কথাই ঠিক।'

মেজোমামা তৎক্ষণাৎ গ্যাস কোম্পানিকে টেলিফোন করে দেন, বাড়িতে গ্যাসের কানেকশন দেবার জন্যে। আমিও পরদিন সকালের সুখস্বপ্ন দেখতে শুরু করি।

গ্যাসের আমদানির পর দিনকতক খুব সুখেই কাটল। গ্যাসের উনুনেই সব রান্নাবান্না হয়— ধুমধাড়াক্কা একেবারে বন্ধ। তা ছাড়া আরও কত রকমের সুবিধা। স্নানের ঘরে গরম জল পাওয়া যেতে লাগল। শীতও এসে পড়েছিল— ফুলকপির ডালনার সঙ্গে গরম জলের চান— এমন সুখকর স্নানাহারের যোগাযোগ কপালে খুব কমই লেখে।

কেরোসিনের হ্যারিকেন তুলে দিয়ে গ্যাসের বাতির বন্দোবস্ত হল। প্রচুর ঠান্ডা আলোয় চোখ যেন জুড়িয়ে যায়। আমরা সকলেই গ্যাসের দারুণ ভক্ত হয়ে পড়লাম। আমি তো বলেই ফেললাম— 'হ্যারিকেনের আলোয় এতদিন কেবল কানা হতেই বাকি ছিল। কী খাসা আলো দেখছেন মামা? ইলেকট্রিক কোথায় লাগে?'

মেজোমামা ঘাড় নাড়েন— 'হুঁ। গ্যাস মানুষ নয় রে, দেবতা, আসল দেবতা! দ্বাপরে ছিলেন ব্যাসদেব আর কলিতে গ্যাসদেব।'

গ্যাসের মিটারটি মামার ভারি প্রিয়। দিনরাত তার দিকে মামার নজর। একটা স্পেশাল চাকরই বহাল করে দিয়েছেন, সে সদাসর্বদা ওটার তোয়াজ করছে। মিটারের একটু অযত্ন, ঝাড়পোঁছে ঈষৎ অবহেলা হয়েছে কী অমনি বেচারার জরিমানা হয়ে যাচ্ছে।

মামা বলেন, 'বুঝলি, ওই মিটারটাই হচ্ছে গ্যাসের মালিক। এটিই আসল। ওইখান থেকেই গ্যাস তৈরি হচ্ছে কিনা—'

'উঁহুঁ'— আমি প্রতিবাদ করতে যাই।

'আহা, তৈরি না হোক, তৈরি যেখানে খুশি হোক না, এই মিটার সেই গ্যাস আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে আসছে আমার বাড়ি। আর কীরকম ওর মাথা! কত কত গ্যাস খরচ হচ্ছে তার ঠিক ঠিক হিসাব রাখছে সেইসঙ্গে! কম কথা নয়!'

মাসকাবারে গ্যাসের বিল এল! এমন কিছু নয়, কয়লা ও কেরোসিনে যা খরচ হত, তার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশিই হয়তো। কিন্তু তেমনি আরামের দিকটাও তো বিবেচনা করবার। মামার ভয় ছিল কত টাকাই না জানি দিতে হবে, কিন্তু সামান্য কয়েকটা টাকা দেখে তিনি কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যেন প্রকাণ্ড একটা বোঝা তাঁর কাঁধ থেকে নেমে গেল। পিয়নের বিল চুকিয়ে, তাকে বকশিশ দিয়ে ফেললেন আনন্দের আতিশয্যে।

আমাকে একটা টাকা দিয়ে বললেন— 'যা, বায়স্কোপ দেখগে যা। ভাগনেরা প্রায়ই হাঁদা হয়, তুই সেরকম না। তোর বুদ্ধিতেই— না, তোর আর বুদ্ধি কী? তোর হাইজিনের বুদ্ধিই বলতে হবে। তা সে যাই হোক, যারই বুদ্ধি হোক, গ্যাসের নিয়ে আসাটা মন্দ হয়নি।'

বায়স্কোপ থেকে ফিরে দেখি, মিটারের গলায় গোড়ের মালা ঝুলছে। জানা গেল ওটা ওর জয়মাল্য! জাগ্রত এই সাক্ষাৎ গ্যাসদেবের পূজোআর্চায় স্বয়ং মামারই এই কীর্তি!

মালাটা হস্তগত করব কি না ভাবছি, এমন সময়ে মামা নেমে এলেন! যেন আমার আসার আগমনের অপেক্ষা করছিলেন।

'কীরকম মানিয়েছে দেখ দিকি! মালা পরে যেন হাসছে। ওর আমি আজ নতুন নামকরণ করেছি! মিটার মানে তো মিত্র? আর তোর প্রেমেন মিত্র হচ্ছে প্রেমেন মিটার, তাই আজ থেকে ওর নাম দিলাম গ্যাস মিত্র। তুই কি বলিস?'

আমি কী বলব? মামার কথায় সায় দিতেই হয় আমায়।

'হ্যাঁ, তাহলে ঠিকই হয়েছে? কি বলিস? বলতেই হবে। না বলে উপায় কী?' মেজোমামা আমার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিপাত করেন, 'দেখ, এই ফুলের মালায় হাত দিসনে যেন। তোর জন্যে একটা ফুল আলাদা করে আমি রেখে এসেছি তোর টেবিলে।'

ক-দিন থেকে শীতটা একটু জোর পড়েছিল। মেজোমামা আপিস থেকে ফিরে হঠাৎ গ্যাস মিত্রের গায়ে হাত দিয়ে দেখেন দারুণ ঠান্ডায় তিনি কনকন করছেন! তৎক্ষণাৎ মিত্রবরের খাস খানসামার তলব হল।

মামা তো বাড়ি মাথায় তুললেন— 'হ্যাঁ, ও কিনা গ্যাস চালিয়ে আমাদের সকলকে গরমে রাখছে, আরামে রাখছে, আর ওরই এই দুর্দশা? এই প্রচণ্ড শীতে বেচারা একেবারে ঠান্ডা মেরে গেছে। হ্যাঁ?'

খুব মাসাজ করা হল। খানসামা, আমি এবং মামা তিন জনে মিলেই হাত চালালাম। কিন্তু শৈত্য কমার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না!

মামা মিটারের গায়ে কান পেতে শোনেন— 'কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। চলছে কিনা কে জানে! হায় হায়, এমন মিত্র আমাদের মারা পড়ল শেষটায়। কেবল তোদের অমনোযোগে।'

তারপর মামা মাথা ঘামাতে লাগলেন।

মামা মাথা ঘামালেই কিনারা হয়। কেমন করে যেন হয়ে যায়, আমি বরাবর দেখে আসছি। তিনি হুকুম করলেন— 'গরম জল কর। করে ঢাল ওর মাথায়।'

বালতি বালতি গরম জল মিটারের মাথায় পড়তে লাগল। অল্পক্ষণেই মিত্র মহাশয়ের দেহ তেতে উঠল। মামা তখন একটা পোকার নিয়ে, এক জায়গায় গর্তের মতো ছিল, তারই সুযোগ দিয়ে ভালো করে ভেতরটা খুঁচিয়ে দিলেন। তারপর আরেকটা ছ্যাঁদার উপলক্ষ নিয়ে একটা সিক চালালেন— চালিয়ে মিটারের ভেতরটা খুব করে ঘুরিয়ে দিলেন— গায়ে যত বল ছিল সব দিয়ে। মুহূর্ত মধ্যেই মিস্টার মিটারের পরিবর্তন দেখা গেল। আগেও তিনি চলতেন, কিন্তু তাঁর চালচলন ছিল কেমন নিঃশব্দ। এখন তাঁর ভেতরের কলকবজা বেশ সজোরে আর সশব্দে চলতে শুরু করেছে। আগে এমনটা ছিল না। মিত্র-দেহে নব জীবনের সঞ্চার দেখে মেজোমামা খুব প্রীত হলেন। পুলকিত হয়ে ওপরে গেলেন।

মিটারের উৎসাহের লক্ষণ আমরা সকলেই লক্ষ করছি ক-দিন থেকে। তার ভেতরের যন্ত্রপাতি প্রবল উদ্যমে চলছে। বাড়ির সব জায়গা থেকেই মিটারের আওয়াজ শোনা যায়। মেজোমামা ভারি খুশি। মিত্র মহাশয়ের ব্যায়রাম তিনিই চিকিৎসা করে আরাম করেছেন।

মাসকাবারের যথারীতি গ্যাসের বিল এল! গ্যাসের বিল দেখে তো মামার চক্ষুস্থির! আমাদেরও চোখ ছানাবড়া হয়ে এল। মেজোমামা নাকি এই মাসে পনেরো লক্ষ ফিট গ্যাস পুড়িয়েছেন, এবং সেজন্য তাঁর কাছে গ্যাস কোম্পানির পাওনা হয়েছে দেড লক্ষ টাকা। বিলের টাকাটা অবিলম্বে দিয়ে দেবার জন্যে অনুরোধ করা হয়েছে।

মেজোমামার মাথার চুল সব খাড়া হয়ে উঠল। এবং তার মাথার চুল নামার আগেই মেজোমামি ফিট হয়ে পড়লেন। পনেরো লক্ষ ফিটের পর আরেক ফিট বাড়ল। মানসাঙ্ক কষে আমি হিসাব করলাম।

'হ্যাঁ? দেড় লক্ষ টাকা!' বলতে বলতে মেজোমামা বেরিয়ে পড়লেন। সোজা গ্যাস কোম্পানির আপিসের উদ্দেশে। এই প্রথম তিনি বেরুবার মুখে, মিত্রবরের প্রতি দৃকপাত করতে ভুলে গেলেন। গ্যাসদেবকে তিনি নমস্কার করে বেরুতেন রোজ।

গিয়ে কেরানিদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এ মাসে কত গ্যাস তোমরা তৈরি করেছ?'

'ঠিক বলতে পারব না, তবে দশ লক্ষ ফিট এই রকম আন্দাজ।'

'কিন্তু আমার বিলে দেখছি যা তৈরি করেছ, তার চেয়েও পাঁচ লক্ষ ফিট বেশি চার্জ করেছ তোমরা। ভুলটা শোধরানো দরকার।'

'কই, বিল দেখি। হুম-ম-ম। ও ঠিকই আছে। মিটার দেখেই ওই বিল করা হয়েছে কিনা। মানে, ও হচ্ছে আপনারই মিটার হিসাব।'

'তা বলে তো যা গ্যাস তৈরি হয়েছে তার বেশি আমি কখনো খরচ করতে পারি না?'

'তার আমরা কী করব? মিটারের হিসাব কখনো ভুল হতে পারে কি?' কেরানিটি সবিনয়ে জবাব দেয়। 'বৈজ্ঞানিক সত্যের উপর তো আমরা কলম চালাতে পারি না মশাই। আমরা মিটারের ওপরই নির্ভর করি। মিটার যদি বলে আপনি ষাট লক্ষ ফিট গ্যাস পুড়িয়েছেন তবে আপনি তাই পুড়িয়েছেন নিশ্চয়! এমনকী যদি সে-মাসে আমাদের এক ফিট গ্যাসও না তৈরি হয় তবুও।'

মেজোমামা বলেন— 'বেশ, আমিও সোজা পাত্র নই। আমারও নাম অবিনাশ মিটার। যা ন্যায্য পাওনা তোমাদের আমি দেব, তার বেশি কানা কড়িও না। হ্যাঁ, বাড়তির জন্যে আমি এক পয়সাও দেব না। তবে দশ লক্ষ ফিট, যা আমার পক্ষে খরচ করা সম্ভব, তার জন্যে এক লক্ষ টাকা দিতে আমি প্রস্তুত আছি। আমার বাড়ি ঘর বেচে ফতুর হয়েও আমি তা দেব— কিন্তু ওই বাড়তি পঞ্চাশ হাজারের জন্যে এক পয়সাও না।'

কেরানি বললে— 'পুরো বিলই আপনাকে চোকাতে হবে, তা না হলে আমরা গ্যাস বন্ধ করে দেব।'

'বেশ, তাই দাও তাহলে।' বলে মেজোমামা রেগে বাড়ি চলে এলেন।

ইতিমধ্যে মিত্র মহাশয়, মেজোমামা এসেই লক্ষ করে দেখেন, বিল হওয়ার পর থেকে আরও দশ লক্ষ ফিটের হিসেব তৈরি করে রেখেছেন এবং প্রতিমুহূর্তেই ফিটের পর ফিট বেড়েই চলেছে। যে রকম মিনিটে মিনিটে হাজার হাজার টাকার অঙ্ক বাড়ছে তাতে আর কিছুদিন চললে গ্যাস কোম্পানির কাছে তাঁর দেনা গত মহাযুদ্ধের সম্মিলিত শক্তিরা সবাই মিলে আমেরিকার কাছে যা ঋণ করেছিল তার সীমা ছাড়িয়ে যাবে বলে তাঁর আশঙ্কা হতে লাগল।

মেজোমামার মেজাজ গেল খেপে। তিনি এক লোহার ডান্ডা নিয়ে এসে, বলা নেই কওয়া নেই, দুদ্দাড় করে মিটারটাকে পিটতে শুরু করে দিলেন। যতক্ষণ ওই পদার্থ নিতান্ত অপদার্থে পরিণত না হল ততক্ষণ ওকে রেহাই দিলেন না। তারপরে ওই জড়পিণ্ড, ভূতপূর্ব গ্যাস মিত্রের খাস খানসামাকে দিয়েই বাড়ির থেকে বিদেয় করে বহুদূরে, রাস্তার চৌমাথার ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আমার ব্যবস্থা করলেন। তারপরে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

পরের দিন থেকে আবার সেই ধুম্রলোচন প্রাদুর্ভাব!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%