শিবরাম চক্রবর্তী
বাড়ি থেকে না বেরুতেই বেরুবাড়ি!
দমদম থেকে প্লেনে চেপে দেখতে-না-দেখতেই একেবারে পাকিস্তান সীমান্তে এসে হাজির।
সীমানা নির্দেশক কাঠের খুঁটি পোতার বিরাট এক কনট্রাক্ট পেয়েছিলেন হর্ষবর্ধনরা। তারই তদবির তদারকে তাঁদের দুই ভাইয়ের প্লেনে চেপে এই বেরুবাড়ি আসা।
অনেক টাকার আশা! কিন্তু আশায় বুঝি ছাই পড়ে যায় শেষটায়!
বেরুবাড়িতে নামতেই খবরটা পেলেন— পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে লড়াই বেধে গিয়েছে ভাতরবর্ষের সঙ্গে। ঘোরতর সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে সেধারটায়।
আর, এধারেও এই পুব সীমান্তেও পাকিস্তানি সাজ সাজ রব শোনা গেল। চোখেও পড়ল সঙ্গে সঙ্গে —বলতে কী!
'বুমবুম— বুবুম— বোম বোম!'
ঘনঘোর গর্জন হতে শুরু হল। ঘন ঘন ঘোর গর্জন।
আর, আওয়াজের সাথে সাথেই বোমারু বিমানের কুচকাওয়াজে ছেয়ে গেল সারা আকাশ।
যেই না দেখা, যেমনি না শোনা, গোবর্ধন অমনি চিতপটাং হয়ে পড়েছে এবং দাদাকেও ভূমিশয্যায় আহ্বান করেছে তৎক্ষণাৎ!
'চটপট শুয়ে পড় দাদা! দেখছ কি দাঁড়িয়ে? শুয়ে না পড়লে বুমিয়ে দেবে যে! বুঝছ না?'
'বুম— বাম— বোম— ব্যাম— বিউম!' বলতে-না-বলতে আকাশবাণীর মধ্যে গোবর্ধনের আমন্ত্রণপত্রের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

হর্ষবর্ধন অটল অবিচল— বড়ো বড়ো বিপদের সম্মুখে চিরদিনই তিনি তাঁর গোঁফের ন্যায় চাঞ্চল্যহীন, গোবর্ধনের কথাটা গেরাহ্যই করেন না।
'হ্যাঁ, শুয়ে থাকবার জন্যই এখানে আসা কিনা আমাদের! অমন কত বুম বাম হবে, কত কী হবে, শুয়ে থাকলেই চলবে কিনা! পয়সা উপায় করা চাট্টিখানি নয় ভাই! যখন এই বেরুবাড়িতে পা দিয়েছি তখন বলতে গেলে প্রাণ হাতে করেই বেরিয়েছি, পকেটে নিয়েই বসে আছি প্রাণ— দরকার হলে এই তুচ্ছ প্রাণের বিনিময়ে পকেট ভরতি করে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরব— এই বেরুবাড়ির থেকেই, বুঝলি? তোর মতন শুয়ে শুয়ে ল্যাজ নাড়া আমার কম্মো না।'
'বুবুম— বাবুম...বাবুম বুবুম—বুমবুমাবুম—বুং।' তর্জনগর্জনের তোড়জোড় বেড়েই চলল— আরও আরও।
'শুনলে না? শুনলে না তো? আমাকেই ভুগতে হবে শেষটায়, বুঝছি বেশ।' গোবর্ধন আক্ষেপ করতে থাকে।
খানিকক্ষণ গর্জন আর বর্ষণের পর বোমারুরা বিদায় নেয়। কিন্তু অমনি দেখতে-না-দেখতে কোত্থেকে আবার এক ঝাঁক গোলাগুলি এসে হাজির। কোথায় যেন ওত পেতে বসেছিল ওরা।

দাঁড়িয়ে উঠতে-না-উঠতেই গোবরা আবার চারিয়ে গেছে মাটিতে। চার হাত পা চার কোণে ছড়িয়ে দিয়ে।
'মাটি করলে! মাটালে! দাদাটাই মাটালে দেখছি!' শুয়ে শুয়ে ফোঁস ফোঁস করে সে, 'মাঠময় করে ছাড়লে তুমি!'
'কেন বকবক করছিস বলতো।' হর্ষবর্ধন ধমক লাগান। 'বকরবকর করতে ভাল্লাগে তোর?'
'আর রক্ষে নেই গো দাদা! বেশিক্ষণ আর বকতে হবে না আমায়। কী গোলাগুলির তোড় রে বাবা! তোমার গালাগালির জোরকেও হার মানিয়ে দেয়।...আরি ভোঁয়া, দাদা, ভোঁয়া।'
'ভারি যে ধোঁয়া বার করছিস, ব্যাপার কী?' উসকে ওঠেন দাদা।
'ধোঁয়া নয় দাদা, ভোঁয়া! আরি ভোঁয়া।'
'আরবি ফারসি ঝাড়ছিস আমার কাছে?' গোঁসা হয়ে যায় দাদার 'বিদ্যে ফলানো হচ্ছে?'
সে-কথার কোনো জবাব না দিয়ে কাতর স্বরে গোবরা পুনরুক্তি করে 'আরি ভোঁয়া, দাদা, আরি ভোঁয়া।'
'আড়ি দিচ্ছিস আমার সঙ্গে?' গর্জন করে ওঠেন হর্ষবর্ধন 'বটে?'
'আড়ি নয় দাদা, আরি ভোঁয়া।'
'তার মানে?'
'তার মানে হচ্ছে, বিদায় নিচ্ছি তোমার কাছে। ইংরেজিতে ওর মানে হচ্ছে গুডবাই। ফরাসি ভাষায় তাই হল গিয়ে আরি ভোঁয়া। ফরাসি বলো আর ফারসিই বলো, একই কথা।'
কোন বইয়ে পড়েছিল বা কার কাছে শোনা কে জানে, মৃত্যুর মুখোমুখি শুয়েও বিদ্যে জাহির করার এই সুবর্ণ সুযোগ সে ছাড়ে না। ছাড়তে পারে না।
গোলাগুলির খচখচানিতেও যতটা হর্ষবর্ধনের মেজাজ না খিঁচড়েছিল, গোবর্ধনের পাণ্ডিত্যের খোঁচায় তার চেয়ে ঢের বেশি বিগড়ে যায়। খানিকক্ষণ গুম হয়ে থেকে, তারপর তিনিও আওড়ান 'পটাসিয়াম সাইনাইড।'
ভাষাবিজ্ঞানে, জগতের বিভিন্ন ভাষাজ্ঞানে, তিনিই বা কারু চেয়ে কম কীসে? তিনিও বলেন 'বেশ, তবে তাই হোক— পটাসিয়াম সাইনাইড।'
'তার মানে?' এবার গোবরার অবাক হবার পালা।
'তার মানে গুডবাই— তবে কিনা যেকোনো ভাষাতেই।'
'গুড়ুম— গুড়ুম— গুম। বাবুম বুম!' আকাশবাণীও যেন ওঁর কথায় সায় দেয়।
'বুঝিয়ে দিলে দাদা! গুমিয়ে দিলে একেবারে।' আর্তনাদ করে গোবর্ধন 'পট করে শুয়ে না পড়লে পটাসিয়াম সুইসাইড হয়ে গেলে, দেখচ কী?'
'আরে, ঘাবড়াচ্ছিস কেন রে! এর নামই তো ওয়ারবুম।' ভাইকে তিনি বাতলান।
'ওয়ারবুম— তার মানে?' জানতে চায় সে।
'ওয়ারবুম মানে ফলাও কারবার।' দাদার ব্যাখ্যা করে দেওয়া, 'ওয়ারবুম মানে, লোহার দাম বাড়বে, লক্করের দাম বাড়বে, কাঠের দাম বাড়বে, আকাঠদের দাম বাড়বে— সব কিছুর দাম বাড়বে। টাকাকড়ির স্রেফ ছড়াছড়ি হবে, যত পার লুটে নাও— এই হচ্ছে ওয়ারবুম। এতে ভয় খাবার কিসসু নেই।'
দেখতে-না-দেখতে পাঁই পাঁই করে আবার আকাশ বাতাস ছেয়ে এল— বোমারু বিমানরা। আবার শুরু হল হরদম আর ভরদম— বুম বুম বাবুম বুবুম! বুম্ম বুম! একটানা বুমুৎকার। ওয়ারবুম যাকে বলে।
উপরের বিমান উবে না যেতেই সীমান্ত পার থেকে সাঁই সাঁই করে গুলির ঝাঁক তেড়ে আসে। শনশন করে এসে কানের পাশ দিয়ে বনবন করে চলে যায়— শিস দিতে দিতে। দমদম বুলেট যত। হর্ষবর্ধন কিন্তু গ্রাহ্যই করেন না।
'ডোবালে দেখছি!' গোবর্ধন শুয়ে শুয়ে প্যাচাল পাড়ে। 'দাদাটাই ডোবালে!'
এবার ঝমাঝম করে গুলিরা আসতে থাকে— শ্রাবণের ধারার মতন এসে হানা দেয় তাদের ওপর। আরম্ভর সাথে সাথেই তাদের আড়ম্বর।

'গেছিরে বাবা! গোল্লায় গেছি।' গোবর্ধন বলে 'আমি না গেলেও তুমি তো গিয়েছ! কয়েক ইঞ্চির জন্যে ওদের ফসকে যাচ্ছে কেবল। তোমার মাথার খুলিটা খুঁজে বার করতেই যা দেরি হচ্ছে ওদের।'
হর্ষবর্ধন তথাপি নট নড়নচড়ন। তবুও কোনো হুঁশ নেই ওঁর।
'ধুত্তোর।' বলে গোবর্ধন চটে মটে উঠে দাদাকে শুইয়ে দিতে যায়, কিন্তু তার দরকার হয় না। একটা ছুটকো গুলির ছররা তাঁর কানের কানকো প্রায় ছুঁয়ে যেতেই, তিনি ভায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তৎক্ষণাৎ কাত হয়ে পড়েছেন।
'তবে তাই হোক।' ধরাশায়ী হয়ে হর্ষবর্ধন গলা ছাড়ে 'তুই যা বলছিস তাই করি ভাই।'
'করলে বলেই বেঁচে গেলে এ যাত্রা। নইলে পটল তুলতে হত এতক্ষণে!' গোবর্ধন বলে 'তা পটলই বল বা তোমার ভাষায় ওই পটলসাইডই বল!'
'ভ্রাতঃ! দাদার গলা গদগদ হয়ে ওঠে 'ভ্রাতঃ গোবর্ধন! সত্যিই তুই আমায় ভালোবাসিস। আমার জন্যে প্রাণ দেওয়া তোর পক্ষে কিছু না। আমি জানি; কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা, তোর নিজের জন্যেই আমার প্রাণটা তুই বজায় রাখতে চাস।'
'চাই না ছাই!' গোবর্ধন গজগজ করে 'কেন তুমি মলে কি আমি পিতৃহীন হব? অনাথ হয়ে যাব একেবারে, তুমি কি তাই ভাব? আমার তিনকূলে কেউ আর থাকবে না?' সে গজরায়।
'না না, তা কেন? তা কী আমি বলেছি?' হর্ষবর্ধন বলেন 'তবে তুই যে আমার ভালো মন্দ দেখছিস, এই বেরুবাড়ির প্রান্তে এসেও সেটা ভুলে যাসনি, সেটাই কি কম বড়ো কথা রে? তোর পক্ষে এ কী কম প্রশংসনীয়?'
'ভালো-মন্দ না কচু! স্থানে অস্থানে একটা গুলি এসে লাগলে কী হত তোমার? খেয়াল আছে তার?'
'বড়োজোর মারা যেতাম, এই তো? তার বেশি তো আর কিছু নয়। তার জন্যে আমি ভাবি না, কিন্তু তুই যে এতখানি আমার জন্যে ভেবেছিস এতেই আমি মর্মান্তিক কাবু হয়ে গেছি। মর্মে মর্মে মরে আছি বলতে কী! আমি যাতে মারা না যাই তাই ভেবে ভেবেই না তুই এতটা কাহিল!'
'মারা গেলে তো বাঁচতুম!' গোবর্ধন বাধা দিয়ে বলে সেই কথাই আমি ভাবছিলুম কিনা! কিন্তু খুন না হয়ে জখম হতে যদি— কী দশা হত আমার, সেটা ভেবেচ? দৈবাৎ তাই যদি হত, তবেই তো হয়ে গেছল আমার! তাহলে তোমার ওই পাক্কা তিন মন কাঁধে করে সাত মাইল দূরের হাসপাতালে আমাকেই বয়ে নিয়ে যেতে হত না? বাবাগো! সে কী চাট্টিখানি। তাহলেই তো গেছলাম! সুখ আর ধরত না আমার!'
হর্ষবর্ধন চুপ করে থাকেন। গোবরার বক্তব্যটা হৃদয়ঙ্গম করতে তাঁর সময় লাগে। তারপরে বিশদভাবে সেটা বুঝতে পেরে তিনি গুম হয়ে যান আরও।
নিজের কলেবরের দিকে দৃকপাত করে অবশেষে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে ক্ষুণ্ণ স্বরে তিনি বলেন 'ও রকম বইতেই হয়। যুদ্ধ তবে বলেছে কেন? ভারী ভারী যুদ্ধের বোঝা কি কম নাকি?'
তাঁর মুখ থেকে কেবল এইকটি কথা বেরিয়ে আসে। আর্তনাদের সুরেই বার হয়।
'যুদ্ধ তো ভারী!' জবাব দেয় গোবর্ধন 'তুমি নিজে কেমন ভারী সেটা তো দেখ না। খেয়ে না খেয়ে যা একখানা লাশ বানিয়ে তুলেছ নিজেকে। বলতে কী, তুমিই এই যুদ্ধটাকে আরও ভারী করে তুলেছ দাদা!'
গোবর্ধনও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে দেয়।
'তাহলে তুই যখন হালকা থাকতে চাস— আমার বোঝা বইতে যখন এতটাই তুই নারাজ— বেশ— তাহলে—' হর্ষবর্ধন একটু থামেন।
অন্তিমস্বরে চূড়ান্ত ব্যঞ্জনা দিতেই তিনি থামেন, তারপর অতি করুণ কণ্ঠে তাঁর শেষ বিদায়বাণী উচ্চারিত হয়
'তবে তাই হোক ভাই! তাহলে পটাসিয়াম সাইনাইড— চিরদিনের মতোই ওই পটাসিয়াম সাইনাইড।' বলে মাটির উপরেই মুখ ফিরিয়ে তিনি পাশ ফিরে শোন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন