খাদ্যাখাদ্য

শিবরাম চক্রবর্তী

সকাল থেকে কোনো খেলাই জমছিল না। ডালুমাসি বাগড়া দিচ্ছিলেন খালি খালি।

পুজোর মরশুমে বাড়ি মশগুল। ডালুমাসি, সালুমাসি, মামাবাবু সবাই এসেচেন! এসেচে মামাতো মাসতুতো পিসতুতো সৈন্যবাহিনী। মামাতো-টিকে বাহিনী না বলে বাহন বললেই ব্যাকরণ শুদ্ধ হয়। আমাদের মামাতো দাদা, মামার একমাত্র সন্তান— ল-পড়েন। আর আমাদের সকলের একমাত্র দাদা-ইন-ল।

দাদাটি আমার ল নিয়েই জন্মেছিলেন— উকিল হবার জন্যেই যেন। উকিলের মতোই তাঁরও নামের শেষে 'ল' জড়িত— জড়িত বা ষ-ড়িত যাই হোক— তা সে তুল্যমূল্যই!

ইন-ল আর আমি দাবা নিয়ে বসেছিলাম, ডালুমাসি এসে ছকসুদ্ধ সব উলটে দিলেন— রাজা, উজির, হাতি-ঘোড়া সব গড়াগড়ি যেতে লাগল। একটা নৌকো এই ফাঁকে কোথায় যে ভেসে পড়ল পাত্তা পাওয়া গেল না তার। আমার মন্ত্রীটাও নিখোঁজ।

'তাস, দাবা, পাশা— তিন সর্বনাশা!' বললেন ডালুমাসি 'বাড়িতে ঢুকেচে কি মা লক্ষ্মী বিদেয়! পাশা খেলার থেকেই পাণ্ডবদের সর্বনাশ হয়েছিল— তা জানিস?'

বলে দাবাবোড়ে— সবাইকে বগলদাবাই করে চলে গেলেন ডালুমাসি।

আমরা তাস নিয়ে বসলাম। পাশার থেকে হয়তো-বা কুরুক্ষেত্র বাধলেও তাসের থেকে লঙ্কাকাণ্ড লেগেছিল বলে কারো জানা নেই। অবশ্যি, ধরতে গেলে, লঙ্কাকাণ্ডের থেকেই রাবণের সর্বনাশের শুরু, আর ওই কাণ্ডে তাসের না হলেও, বাতাসের ঘোরতর ষড়যন্ত্র ছিল। তা সত্যি, আগুন লাগলেই তো পবনদেব লাফিয়ে এসে পড়েন। যদিও এ-ব্যাপারে তিনি নিজের নন্দনটিকেও অগ্নিদেবের সঙ্গে ল্যাজে বেঁধে এনেছিলেন।

তাসের আসরেও ডালুমাসি এসে হানা দিলেন। কিন্তু এখন আমরা চার জন, দাবার চেয়ে দলে ভারী, আর দাবার ছকের মতো সুবিস্তৃত খেলা নয় যে, সহজেই উলটে দেয়া চলে। সবাই আমরা হাতের তাস শক্ত মুঠোয় চেপে আর পিঠগুলিকে পায়ের তলায় পাঠিয়ে আত্মরক্ষা করতে লাগলাম। দাবার বেলায় মাসিমা যেমন আমাদের দাবিয়েছিলেন, তাসের বেলায় তেমনি তিনি হতাশ হলেন।

তবুও ডালুমাসির বিস্তারিত হবার কিছু বাধা হল না। ঘুরে ঘুরে সকলের হাত দেখে সবিস্তারিত হতে লাগলেন। সঠিক খেলা বাতলাতে লাগলেন সবাইকে। কার হাতে কী আছে, মাসিমার সৌজন্যে কারোই অজানা রইল না। তখন বিরক্ত হয়ে আমরাই নিজেদের তাস ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।

'পাশা দাবা তাস— তিনে সর্বনাশ।' খুশি হয়ে বললেন ডালুমাসি 'কী হয় এসব খেলে? খালি বাজে সময় নষ্ট । তাস খেলে লাভ আছে কারো? এতে কি কোনো শিক্ষা হয়? কেন, এমন খেলা কি নেই, খেলা যায় না কি, যাতে আমরা জ্ঞানও পাই— আবার আনন্দও পেতে পারি?' ডালুমাসি ভ্রূকুটি করলেন।

তারপর তাসগুলো নিয়ে কুটি কুটি করতে লাগলেন তিনি। ওধারে জুলু আর জবা স্নেক অ্যান্ড ল্যাডার নিয়ে বসেছিল, লাফিয়ে উঠল— ওই দৃশ্য দেখে। ঠিক সাপে কামড়ালে যেমন লাফায় লাফিয়ে উঠে জবাকে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল ছাতে— ডালুমাসির থেকে এনতার তফাতে। তাদের সিঁড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দ পেলাম। এমনকী, চিলেকোঠার খিল আঁটারও আওয়াজ এল। জুলু চালাক ছেলে— জুলুমের আগেই হাওয়া!

চকচকে ঝকঝকে তাসগুলো— আহা! দাদা-ইন-ল-র বড়ো আদরের। তিনি গুম হয়ে রইলেন। ভাবগতিক দেখে মনে হল, আইন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এই গুমোট কাটবে না। কিংবা আইনেই কি শানাবে, হাইকোর্টের জজ না হওয়া অবদি তাঁর মনের এই গজগজ হয়তো যাবার নয়।

কিন্তু আসলে যাঁর গজটজ গেছল তাঁর কোনো অশান্তির চিহ্ন ছিল না। দাবার ছক, মায় গজবোড়ে সব সমেত ছিল আমাদের মামাবাবুর— তাঁর দাবা খেলার উপর ছক্কা, এমনকী চিরকালের মতো ইস্তককাবার হয়ে যেতে দেখেও তিনি চুপ করে ছিলেন। কথাটিও কননি। কোনো দাবিদাবা না। মুখের প্রশান্ত মহাসাগরে একটিও ঢেউ দেখা যায়নি তাঁর। আপন মনেই তিনি গুড়ুক টানছিলেন।

কিস্তিমাত হয়ে গেলে যেমন হয়। আহা, হাতির দাঁতের আর কালো চন্দন কাঠের অমন চমৎকার দাবাবোড়ে। এ-রকমের দাবড়ানির পর প্রধূমিত হবার কথা তাঁরই— কিন্তু তিনি হুঁকোর পরেই সেই দায় চাপিয়ে নিজে নির্ধূম ছিলেন।

ভেবেছিলেন হয়তো, চেঁচিয়ে কী হবে, নিজের বোনকে তো ছোটোবেলা থেকেই চেনেন। অরণ্যে লোকে রোদন করে, উপবনেও গিয়ে কেউ কেউ কান্নার সুরে গদ্য কবিতা আওড়ায় শোনা যায়, কিন্তু এ-বোন তো সে-বন না। এ হচ্ছে প্রায় উলুবন, এখানে মুক্ত হয়ে লাভ নেই। ডাল গলানো যায়, কিন্তু ডালুমাসিকে গলানো যায় না।

ডালুমাসি বললেন— 'সত্যি, এইসব আজেবাজে খেলায় অমূল্য সময় না খুইয়ে শিক্ষাপ্রদ কিছু খেললে কী হয়? কেন, জ্ঞানবিজ্ঞানের মধুভাণ্ড কী হয়? হতে কী দোষ? অমূল্য, তুই তো এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো, পড়াশুনোও করেছিস একটু-আধটু, তুই-ই না-হয় মধুভাণ্ডারী হলি? এরা তোকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করুক, আর তুই সেসবের উত্তর দে। উত্তর দিয়ে দিয়ে এদের জ্ঞানপিপাসা মেটাতে থাক। সেটা কি খারাপ?'

অমূল্য ওরফে আমাদের ল্যফুল দাদা, যে নিজের মহামূল্য সময় হেলায়-খেলায় ওড়াচ্ছিল, তার দিক থেকে কোনো সাড়া এল না। উত্তরোত্তর আমাদের জ্ঞান লালসা চরিতার্থ করার তার কোনো উৎসাহ দেখা গেল না। লঙ্কাকাণ্ডের পর উত্তরকাণ্ড— রামায়ণে এরকম লিখলেও, অমুল্যের কোনো কাণ্ডজ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। তার ভাণ্ডারে মধুর চেয়ে হুল— হুলই যেন বহুল দেখলাম।

'বেশ তো, বেশ তো!' আগ্রহ দেখাল বিনিই 'মাসিমার কথাটা মন্দ কি? খেলা তো! একটা কিছু খেলা নিয়ে কথা! খেলতে গিয়ে সেইসঙ্গে যদি কিছু লেখাপড়াও হয়, শেখাও হয়ে যায়, সে তো ভালোই আরও।'

বিনি নিজের কাজ গুছিয়েছে বোঝা গেল। তোখোড় মেয়ে বিনি আমাদের। এই গায় পড়ে সায় দেয়ার বিনিময়ে, ডালুমাসির পুজোর উপহার— এবারকার লাল রুমালটা অন্য আর কারো নয়। বিনিরই একচেটে রইল, আমরা বুঝলাম।

বিনির উৎসাহে মাসিমা হাসিমা হয়ে উঠলেন— 'বিনু আমার কেমন বুঝদার মেয়ে! সাধে কি ওকে আমি এত ভালোবাসি?'

বিনুও আদরে বিনুনির মতো এলিয়ে পড়ল— 'আচ্ছা মাসিমা, তোমার মধুভাণ্ডও তো কিছু কম নয়। তুমিই কেন আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারী হও না? তোমাকেই আমরা জিজ্ঞেস করি?'

ইস, বিনিটা যেন কী! লাল রুমালটা এখন আড়ে-বহরে আরও বেড়ে গেল লাল শাড়ি হয়ে না দাঁড়ালেই বাঁচি! মামাবাবু কি ডালুমেসো হলে বলা যেত, মোসাহেবি করা হচ্ছে। কিন্তু মাসিমার বেলায় সে-কথা খাটে না, ব্যাকরণে বাধে মাসিমারা তো সাহেব নন।

যাই হোক, বিনির মো-মেমইতে মাসিমা তো গলে পড়লেন— মোমের মতোই! 'না বাছা, আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। আমি ওসব পারি? তোর দাদাকে বল বরং। সে গল্প-টল্প লেখে।'

'হ্যাঁ, দাদার যা জ্ঞানগম্যি—' বিনি ঠোঁট ওলটায় 'তা আমার জানাই আছে।'

আমিও সায় দিই— 'হ্যাঁ, আমার জ্ঞানভাণ্ডে মা ভবানী।' বিনির সঙ্গে এ-বিষয়ে আমি একবাক্য।

'তাই তো আমি বলছিলুম অমূল্যকে শুরু করতে—' সেই এক অমূল্য উপদেশ মাসিমার।

এবার কিন্তু শুরু করতেই অমূল্যর সাড়া এল 'বেশ, আমি রাজি। বর্ষণ কর তোমাদের প্রশ্নবাণ!'

'কী বিষয়ে জিজ্ঞেস করব?' বিনি জানতে চায়।

'তাও কি আমি বলে দেব? মামাতো দাদার দামামার মতো নিনাদ— 'প্রশ্ন করার পালা আমার নয়। আমার দায় খালি উত্তর দেয়ার।'

'তাহলে প্রাণীজগৎ থেকে শুরু হোক!' বিনিকে আমি বাতলাই 'জীব বিজ্ঞান নিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস কর না— অবিশ্যি, তোর নিজের জিব বাদ দিয়ে। তাহলে আবার জিলিপির প্যাঁচে গিয়ে পড়বি।'

'আমার জিব তোমার মতো লম্বা না। অত জিলিপির প্রত্যাশী নয়।' বিনি জিব বার করে দেখায়।

বিনির ওই দোষ! নিজের জিবকে ও টাকার ন্যায় জ্ঞান করে! প্রায়ই ভাঙায়। আমি কিন্তু মোটেই তা অত দামি মনে করি না!

বিনির প্রদর্শনী দেখে বিচলিত হয়ে মামাবাবু মুখ খোলেন এবার। 'সব জিব— সবার জিব সমান নয়। তার মধ্যে আবার আলজিবও আছে।' গুড়ুক থামিয়ে তিনি মন্তব্য করেন— 'তাহলেও, সমস্ত জীবই শ্রীকৃষ্ণের! নামে রুচি, জীবে দয়া, ভক্তি ভগবানে! হরি হে, পার করো।'

নিজের জিব এবং শ্রীকৃষ্ণের জীব। উভয়ের প্রতি যে একসঙ্গে দয়া দেখানো যায় না, উদাহরণ সমেত সেই কথা পাড়তে যাচ্ছি, অমূল্যদা বলেন, 'বেশ তো, জীবতত্ত্ব নিয়েই তোমরা জিজ্ঞেস করো। মনে করা যাক এমন একটা জীব—'

'খাদ্য না অখাদ্য?' ডালুমাসির জিজ্ঞাসা।

'সেটা নির্ভর করে।' অমূল্যদা বলেন।

'করেই তো। হজম শক্তির ওপরেই নির্ভর করে?' মামাবাবুর সাড়া পাই

একজনের খাদ্য আরেকজনের কাছে অখাদ্য। খেয়ে পরিপাক করতে যদি না পার তাহলে তা-ই তোমাকে অবশেষে খাবে!'

'হজম করতে না পারলেই যম।' সোজা কথায় আমি বোঝাই।

'অতশত বুঝিনে বাপু!' বলেন ডালুমাসি, 'যে-জীবের কথা বলছিস— তুই খেতে পারিস?'

'আমি? না, আমি পারিনে।'

'আর কেউ পারে?' বিনির প্রশ্নবাণ।

'আফ্রিকায় খায় বলে শুনেছি। পেলে হয়তো খায়।'

আফ্রিকার কথা রাখ! তুই পারিস কি না তাই বল?' ডালুমাসি নাছোড়বান্দা।

'আমি? না, আমার রুচি হয় না।'

'রুচি! মাসিমা ঝংকার দিয়ে ওঠেন— 'রুচি-রুচি করেই তুই গেলি। খাবার নিয়ে ছোটোবেলার থেকেই দেখেছি তোর এই আদিখ্যেতা। কত বার আমি বলেছি তোর মাকে— ছেলেটাকে দিদি, অত করে আদর দিয়ো না। আদর দিয়ে অমন করে ওর মাথাটা চিবিয়ে খেয়ো না। কিন্তু আমার কথা না শুনে আস্কারা দিয়ে এখন কী হয়েছে? খাওয়াতে শোয়াতে সব বিষয়েই ওঁর রুচি!'

'অমূল্যদার দোষ কি মাসিমা? রুচিবাই একরকমের ব্যায়রাম। ঠিক শুচিবাইয়ের মতোই!' আমি জানাই। 'যার থাকে তার থাকে।'

'সবাই খেতে পারে, আফ্রিকায় পারে, বিলেতে পারে আর উনি পারেন না?' মাসিমা তবু গজরান— 'আহা, কী আমার খাইয়ে রে!'

'তুই মিছে রাগ করছিস ডালু। সব জীব যেমন সমান নয়, সবার রুচি তেমনি সমান হয় না।' মামাবাবু হুংকার এবং নিজের— হুংকার একসঙ্গে ছাড়েন।

'কেন হবে না? খেতেই হবে ওকে। খিদে পেলেই খাবে। না খেয়ে যাবে কোথায়? কেমন না-খাইয়ে আমার জানা আছে। না খেয়ে শুকিয়ে মরবার ছেলেই কিনা ও!'

অমূল্যদা মুখ খুলছিলেন, কিন্তু ডালুমাসির চোখের ওপর চোখ পড়তেই বুজিয়ে ফ্যালেন আবার। মুখের কথা আর সম্মুখে আনেন না।

'বেশ, তোমার হয়তো ভাতের সঙ্গে খেতে রুচি হয় না অমূল্যদা, কিংবা রুটির সঙ্গেও না হতে পারে—' রেবার জেরা এবার 'কিন্তু জলখাবারের সাথে তো খেতে পার?'

'কোনো খাবারের সাথেই না।' দাদার সেই এক গোঁ!

এই অমূল্য উত্তর লাভ করে রেবা, শিপ্রা, বিনি একসাথে চেঁচিয়ে ওঠে (ক) 'এ কখনো হতেই পারে না।' (খ) 'বাজে কথা!' (গ) 'কথার কোনো মাথামুণ্ডু নেই, মানেই হয় না।'...এদের ওপরে ফের মাসিমার অনুযোগ শোনা যায়— 'অমূল্য একটা আহাম্মক।'

আমারও তাই মনে হয়। খাবারের মোকা পেয়েও যে খায় না— আহা, খাবার কী জিনিস! আস্তই সে আহাম্মক। বাস্তবিক!

'ভাত কিংবা জলখাবারের মতো বোধ হয় প্রধান কোনো খাদ্য নয়।' মামাবাবুর আন্দাজ 'প্রাতরাশে বা মধ্যাহ্নভোজে খাওয়া যায় না হয়তো। —তবে মনে হয়, যখন তখন মুখে ফেলা চলে। এই যেমন— ধর না, যখন তখন মুখ চালাতে— যথা—'

'যথা— ডালমুট, চানাচুর, কাজুবাদাম, টফি কিংবা লেবেনচুস।' আমাকেই উদাহরণ জোগাতে হয়।

'ঠিক বলেছিস!' যথাযথ কথাটি পেয়ে মামাবাবু ভারি খুশি। খুশি হয়ে ছেলের দিকে তাকান— তাই কি বলছিস তুই? যখন-তখন খাবার মতন— তাই কি?'

অমূল্যদা ডালুমাসির দিকে তাকান, তাঁর চোখে ভ্রূকুটি, কপালে রেখা দেখা দেয়। অবশেষে মুখ বিকৃতি করে তিনি বলেন 'নাঃ— আমি— আমি তো কখনোই খেতে পারি না— কক্ষনো না।'

'জীবটা বুঝি ইঁদুর বেড়াল জাতীয়?' শিপ্রা অনুমান করে।

'একি আবার একটা প্রশ্ন হল?' ডালুমাসি বলেন — 'ছিঃ— ছ্যাঃ!'

'আচ্ছা কী ধরনের জানোয়ার? গায়ে রোঁয়া আছে, না চামড়া?' রেবার পালা এবার।

'হ্যাঁ, রোঁয়া আছে। কিছু কিছু। আবার, কতকটা চামড়ার মতো।'

'কটা পা' মামাবাবুর জিজ্ঞাসা।

'দুটো।'

বিনি— 'পাখি টাখি?'

'না, পাখি নয়।'

রেবা— 'তাহলে মানুষ নাকি?'

'হ্যাঁ।'

'ছেলে না মেয়ে?' শিপ্রা জানতে চায়।

'মেয়ে।'

'মেয়ে। কীরকমের মেয়ে?' আমার অনুসন্ধিৎসা— 'গাদা গাদা মেলে?'

'না ভূভারতে একটাই আছে মোটে। এহেন জীব আর দুটি নেই।'

গাদা গাদা নয়, শুধু একটাই— শুনে আমি তো অগাধ জলের মধ্যে পড়ি। কিন্তু কূলের রেখাও দেখা যায় যেন।

'এদেশের মেয়ে? বাঙালি কি?' শুধাই আমি।

'আলবাত।'

'কোনো দেশবিখ্যাত মেয়ে?' বিনির খোঁজ।

'তা দেশবিখ্যাত না হলেও, বেশ বিখ্যাত। অন্তত নিজের পারিবারিক গণ্ডিতে তো বটেই।'

'বাচ্চা?...দেখতে ভালো?' রেবা জানতে চায়— বিনির দিকে চোখ রেখে।

'না না— মোটেই দেখতে ভালো না। বাচ্চাও নয়।'

এই অমূল্য-নির্ধারণের পর কিছুক্ষণের জন্যে সবাই চুপ। সবাই আমরা ধারণা করতে থাকি। কী হতে পারে আন্দাজ করার চেষ্টা পাই।

শিপ্রাই স্তব্ধতা ভাঙে।

'এই মহিলাটিকে কি আমরা চিনি অমূল্যদা?'

মামাতো দাদা এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেন না। তাঁর কর্ণমূল লাল হয়ে ওঠে আরক্ত মুখে নীরবে নতনেত্রে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মামাবাবুকেও যেন ইষৎ সলজ্জ দেখা যায়।

'অমু একটা আহাম্মক।' ডালুমাসিকে বলতে শুনি। বেশ জোরের সঙ্গেই তিনি জানান 'খাদ্যাখাদ্যের ভারি ওর বিচার। ছোটোবেলার থেকে এটা খাবে না, ওটা খাবে না— যাক গে, না খায় না খাক গে। আমার বয়ে গেল। আমার মাথা ধরেচে— আমি চললাম।'

ডালুমাসি পালালেন। সেদিনকার প্রশ্নোত্তরের পালাও— সেইখানেই খতম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%