শিবরাম চক্রবর্তী

বিনিকে নিয়ে... কী আর বলব? যা মুশকিল হয়েছে আমার!
বিশ্ব-ব্যাকরণের মধ্যে না থাকলেও বিনি প্রত্যয় বলে একটা জিনিস আছে, যার সংজ্ঞা হয় না। আমার বোন বিনির মতন মেয়ের খপ্পরে যে পড়ে, কেবল তার ভেতরেই এই বোধ গজায়। এক রকমের প্রজ্ঞা... বোধও হয়তো বলা যায়, যা তার অন্তরে সঞ্চারিত হয় যার দ্বারা...
যার দ্বারা সে বেহুঁশ হতে হতে সামলে ওঠে।
এই যেমন আজ সকালেই।
একটা জরুরি ঠিকানা কী করে পাই তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি, সেই দুর্ভাবনার দারুণ মুহূর্তে বিনি এসে উপস্থিত।
'হ্যাঁ দাদা? সেই লোকটার নাম কী বলোতো... সেই কমিডিয়ান?'
'কে?' ভাবনার মধ্যিখানে আমি হোঁচট খাই।
'সেই যে বাদামি রঙের বেঁটে মানুষটি চোখে চশমা... বিলিতি হাসির বইয়ে প্রায়ই যাকে দেখা যায়...'
'ড্যানি কেয়ির কথা বলছিস?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ— সেই তো ড্যানি কেয়িই তো। আশ্চর্য, তার নামটাই ভুলে গেলাম।'
'কিন্তু সে তো মোটেই বেঁটে নয়। বেশ লম্বা চেহারার। আর রঙও তার বাদামি না, তা ছাড়া তার চশমাও নেই।'
'হ্যাঁ তা বটে।' বলল বিনি, 'তাহলেও তুমি তো বুঝেছ আমি কাকে মিন করেছি।' তা বুঝেছি বটে, বিনির প্রত্যয়ের দ্বারাই বুঝেছি। এটাকে টেলিপ্যাথি বলতে পারো কিংবা অষ্ট বিভূতির কোনো একটিও হতে পারে, যা কোনো কষ্ট না করেই আমার আয়ত্তে এসে গেছে। আসলে এটা বিনির সাহচর্য। তার সঙ্গে বহু বিনিদ্র দিবসের বাক্যবিনিময়ের ফল।
'ড্যানি কেয়ির একটা ছবি এসেছে মেট্রোয়, তার টিকিট কাটতে যাচ্ছিস বুঝি? তা যা। আমিও যেতাম, কিন্তু আমি একটা খুব জরুরি ঠিকানা নিয়ে পড়েছি... খোঁজ পাচ্ছিনে।'
'ঠিকানা, কার ঠিকানা গো? কীসের ঠিকানা?'
'এক উপমন্ত্রীর।'
'উপমন্ত্রী? তা, দমকলে খোঁজ করলেই পারো।'
'দমকল? দমকলে খোঁজ করতে বলছিস?' বিস্ময়ে আমার দম আটকায়, 'তারা তো আগুন নেবায় রে? আমার মাথার আগুন কি নেভাতে পারবে তারা? ও বুঝেছি। তুই রাইটার্স বিল্ডিংয়ে খবর নিতে বলছিস? তাই না?' আবার সেই বিনি প্রত্যয় কাজে লাগে। অকৃত্রিম এবং অব্যর্থ।
'তাই তো বলছি আমি। তাই তো বলছি আমি। সেইখানেই তো পাঁচ বছর অন্তর অন্তর উপযুক্ত মন্ত্রীদের দম দিয়ে আবার চালু করে দেওয়া হয়।'
'তাই বল।' তারপরে আমি রাইটার্স বিল্ডিং নিয়ে পড়ি। বিনি চলে যায়। টেলিফোন করি রাইটার্স বিল্ডিংয়ের অনুসন্ধান বিভাগে।
'হ্যালো হ্যালো হ্যালো...'
'হ্যালো... কাকে চাই?' ললিত ললনা কণ্ঠের স্বরলহরী শোনা গেল।
আমি উপমন্ত্রীর নাম বললাম।
'কে আপনি?'
'আমি? আমি শিবরাম চক্রবর্তী।'
'বরাম, না ব্রাম?'
'সে কী?' শুনে আমার চমক লাগে।
'তার মানে?'
'মানে, আপনি শিবরাম না শিব্রাম? উপমন্ত্রী মশাই এখন অফিসে নেই।'
'কোথায় গেছেন? কখন আসবেন?'
'মাপ করবেন। মন্ত্রীদের গতিবিধির কথা জানাতে মানা আছে।'

'কী মুশকিল! আমার যে ভীষণ দরকার তাঁকে। দয়া করে তাঁর বাড়ির ঠিকানাটা বলুন তাহলে। বাড়িতে নিরিবিলি পেলেই আমার সুবিধে আরও।'
'বাড়ির ঠিকানা? অসম্ভব! বাড়ির ঠিকানা আমি বলতে পারব না।'
'জানা নেই আপনার?'
'জানি বই কী, কিন্তু বলা নিষেধ।'

এমন সময় পাশের ঘর থেকে বিনির আতঙ্কিত আর্তনাদ ভেসে আসে, 'দাদা, দাদা। ওমা, এ কী!' আওয়াজটা ছুটে এসে আমার টেলিফোন সূত্র ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
রিসিভার ফেলে ও ঘরে দৌড়ই।
'কী হয়েছে দ্যাখো তো একবার।' বিনি দেখায়।
'কিছুই তো দেখতে পাচ্ছিনে। ঠিকই তো আছে।'
'কী নোংরা হয়েছে, ইস। তেলচিটে পড়ে গেছে সব। এমন নোংরা বিছানায় তুমি শোও কী করে গো? কী নোংরা তুমি বাবা!'
'আমি মুখ বুজে খাই, চোখ বুজে শুয়ে পড়ি। চোখ খুলে ঘুমাইনে।'
'বলি নাক তো আছে? টের পাও না নাকে?' বলে বিনি উদাহরণস্বরূপ হয়ে ওঠে, নাকে কাপড় চাপা দেয়, 'নাক ডাকিয়ে ঘুমোও বলে কি নাকে গন্ধ পাও না? তোমার চাদরের গন্ধে যে ভূত পালায় গো!'
'ভূত পালাতে পারে।' আমি নিজেই সাফাই দিই, 'আমি তো এখনও ভূত হইনি। ভূত-পূর্ব অবস্থাতেই আছি।'
'যাও নিয়ে যাও।' চাদরটা গুটিয়ে আমার হাতে তুলে দেয় সে। 'নাও, ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে রেখে দাওগে, আর সব ময়লা কাপড়ের সঙ্গে। ধোপা এসে নিয়ে যাবে এখন।' বলে সে বিছানায় ধোপদুরস্ত চাদর পাতে একটা।

বিনি কী বলতে চেয়েছে বুঝতে পারি। কিন্তু এবার আমার প্রজ্ঞা না খাটিয়ে ওর আজ্ঞামতোই চলি, চাদরটা ধোপার ময়লা কাপড়ের ঝুপড়িতে না ফেলে আমার টেবিলের পাশে ফালতু কাগজের বালতিতে গুঁজে দিই। দেখবার মতন একখানা দৃশ্য হয় বটে!
টেলিফোন নিয়ে পড়ি আবার।
'হ্যাঁলো... শুনুন! ওঁর বাড়ির ঠিকানাটা আমার ভীষণ ভীষণ ভীষণ দরকার!'


'বুঝলাম, কিন্তু বাধা আছে। অফিসিয়াল রেগুলেশনে বাধে।'
'আমাকে আন-অফিসিয়ালি বলতে পারেন না। লক্ষ্মীটি।'
'মাফ করবেন। নিষেধ অমান্য করতে পারব না।'
'তাহলে আর কী কারে তাকে পাব।' সখেদে আমি বলি।
'মিস্টার ব্রাম, কিছু মনে করবেন না। আমি অতিশয় দুঃখিত।'
'তা তো বুঝলাম।' ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে আওড়াই, 'আপনাকে দুঃখ দেওয়ার জন্য আমিও দুঃখিত কম নই। ক্ষমা করবেন আমাকে। তার ঠিকানা দেখছি পাবার কোনো উপায় নেই।' আমার দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে।
'দেখুন কিছু মনে করবেন না। আমাদের হাত-পা বাঁধা।'
তিনি সুমধুর কণ্ঠে জানান, 'আপনি একবার টাইমটেবিলটা উলটে দেখুন না। সেইখানেই তাঁর ঠিকঠিকানা পেয়ে যাবেন।'
'টাইমটেবিল!' শুনে আমি ঘাবড়ে যাই। মন্ত্রীবর কিছু মেল ট্রেন নন (এমনকী তিনি মেল হলেও) যে নম্বর ওনারি প্ল্যাটফর্মে তাঁর যাতায়াতের খবর পাব। মেয়েটির এহেন রসিকতা করার মানে?
দুর্জ্ঞেয় রহস্যভেদের সাধনায় রয়েছি, বিনি তার মাঝখানে এসে হানা দেয়, 'এর মানে?' সে চেঁচিয়ে ওঠে, 'নোংরা চাদরটা তুমি এখানে এই ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে গুঁজে রেখেছ যে?'
'তুই তো বললি। ওয়েস্ট পেপারের মধ্যে রাখতে বললি না?'
'চালাকি কোরো না। আমি যা বলেছি তুমি বেশ বুঝেছ। কী বলেছি আমি?'
'বল-ই না। তুই বললে তবে তো আমি বুঝব।'
'আমি বলেছি বাজারের থলির মধ্যে রাখতে।'
'তা আমি পারব না।' সাফ বলে দিই, 'থলের ভেতর ওই ময়লা চাদর ঠেসে নিয়ে বাজারময় আমি ঘুরতে পারব না। তাহলে বাজার রাখব কার মধ্যে? না, তুই নিয়ে যা ওটা, তোর ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে পুরে রাখ বরং।'
না, বিনি প্রত্যয়ের দ্বারা কিছুতেই আমি বুঝব না। বুঝতে চাইব না। চূড়ান্ত হয়েছে। এবার আমি মরিয়া। যেটি বলবে ঠিক সেইটেই করব আমি এখন থেকে। কথামতন কাজ।
কিন্তু উপমন্ত্রীর ঠিকানা?
মেয়েটি বলল, রেলের টাইমটেবিলের পাতা হাঁটকাতে...
ও, তাই। বিনি প্রত্যয় হঠাৎ এসে আমার মগজের মধ্যে ঘাই মারে। আমি ছাড়তে চাইলেও কমলি আমায় ছাড়ে না।
মেয়েটি টাইমটেবিল দিয়ে কী বলতে চেয়েছিল আমি বুঝতে পারি। সঙ্গে সঙ্গেই উপমন্ত্রী মশায়ের বাড়ির হদিস আমি পেয়ে যাই।
সব মেয়েই আমার সগোত্র। আমার বোনের মতোই সুগভীর বন সব অরণ্যানী— এক কথায়!
যা বলতে চেয়েছিল মেয়েটা... টেলিফোন ডিরেক্টরির মধ্যেই ঠিকানাই পেয়ে গেলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন